'আমার ভাইয়ের করোনা পরীক্ষার ফল নেগেটিভ এসেছে। শুরু থেকেই বলেছি, তার করোনা নেই। তবু লাশ নিয়ে এত হয়রানি কেন? শেষ পর্যন্ত যুদ্ধ করেই ভাইয়ের লাশ পেয়েছি। হাসপাতাল আর পুলিশের কাছে ক্লিয়ারেন্সের জন্য দৌড়াতে দৌড়াতে চার দিন চলে গেল। পাঁচ দিনের মাথায় লাশ পেয়েছি। মরতে তো একদিন হবেই। কিন্তু করোনা সন্দেহে লাশ নিয়ে কোনো স্বজনকে যেন এমন দুর্ভোগ পোহাতে না হয়। এটা যে কী কষ্টের তা বলে বোঝাতে পারব না।'
অ্যাডভোকেট প্রতিভা বাগচী গতকাল বৃহস্পতিবার এমন অভিজ্ঞতার কথা প্রকাশ করেন সমকালের কাছে। গত ১০ এপ্রিল তার একমাত্র ভাই তুষার কান্তি বাগচী ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মারা যান। অনেক হয়রানির পর মরদেহ পেয়েছেন ১৪ এপ্রিল। এরপর পোস্তগোলা শ্মশানে লাশ সৎকার করা হয়েছে।
বাংলাদেশ জাতীয় হিন্দু মহাজোটের কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক প্রতিভা বাগচী জানান, তার ভাই তুষার কান্তি রাজধানীর পল্টন এলাকায় একটি ইন্স্যুরেন্স কোম্পানির অফিসে চাকরি করতেন। ১০ এপ্রিল জ্বরসহ অসুস্থ বোধ করায় তাকে পান্থপথের একটি হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে পরীক্ষার জন্য রক্ত দেওয়ার পর তাকে বাসায় নিয়ে আসা হয়। বাসায় ফিরে আবার অসুস্থবোধ করায় আবার নেওয়া হয় ওই হাসপাতালে। তারা ভর্তি না করে তুষারকে পাঠিয়ে দেয় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। সেখানে নেওয়ার পরপরই তাকে করোনা ইউনিটে পাঠানো হয়। রাত ১১টার দিকে তুষারকে মৃত ঘোষণা করেন কর্তব্যরত চিকিৎসকরা। এরপর শুরু হয় আরেক দুর্ভোগ।
প্রতিভা বাগচী বলেন, লাশ পেতে আমরা প্রতিদিন দৌড়াতে থাকি এ দরজা থেকে সে দরজায়। মারা যাওয়ার তিন দিনের মাথায় হাসপাতাল থেকে ফোনে জানানো হয়, পরীক্ষায় তুষারের করোনা ধরা পড়েনি। পুলিশের কাছ থেকে ক্লিয়ারেন্স এনে যেন লাশ নিয়ে যাই। এরপর শেরেবাংলা নগর থানায় গেলে তারা বলে- এটি পুলিশ কেস নয়, পুলিশ কেন ক্লিয়ারেন্স দেবে। শেষ পর্যন্ত পুলিশ আর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে বন্ডসই দিয়ে লাশ পেয়েছি। তার অভিযোগ- যখন হাসপাতালে চিকিৎসা চলছিল তখনও তুষার বেঁচে ছিলেন। এটা অ্যাম্বুলেন্সের চালকসহ সেখানে উপস্থিত সবাই দেখেছে। পরে মারা যাওয়ার পর 'ব্রট ডেথ' লেখা হয়েছিল।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এ কে এম নাসির উদ্দিন সমকালকে বলেন, যদি হাসপাতালে পৌঁছার আগেই কোনো রোগী মারা যায় তাহলে অবশ্যই তার মৃত্যুর কারণ অনুসন্ধানের জন্য পুলিশি তদন্তের দরকার হয়। সে ক্ষেত্রে পুলিশ ক্লিয়ারেন্স চাওয়া হয়। আইনি প্রক্রিয়া ছাড়া লাশ দেওয়া হলে যদি পরে কেউ এসে অভিযোগ করেন তখন সংশ্নিষ্ট চিকিৎসক কী জবাব দেবেন। তাই ঢাকার ভেতরে কোনো ঘটনা থাকলে সংশ্নিষ্ট থানায় ফোন করা হয়। ঢাকার বাইরে হলে শাহবাগ থানায় জানানো হয়।
এ ব্যাপারে পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের ডিসি বিপ্লব বিজয় তালুকদার সমকালকে বলেন, স্বাভাবিক মৃত্যুর ক্ষেত্রে পুলিশ ক্লিয়ারেন্স দেওয়ার আইনগত ভিত্তি নেই। সম্প্রতি দুটি ঘটনায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে পুলিশ ক্লিয়ারেন্স চাওয়া হয়েছে। আমরা বলেছি, এসব মৃত্যুতে পুলিশ ক্লিয়ারেন্স দেওয়া এখতিয়ারবহির্ভূত। আর করোনায় কেউ মারা গেলে নিয়ম অনুযায়ী লাশের সৎকার হবে।
তুষার বাগচীর স্ত্রী সাথী বিশ্বাস গত ১৩ এপ্রিল শেরেবাংলা নগর থানায় একটি আবেদন করেন। সেখানে তিনি বলেন, 'তার স্বামীর মৃত্যুর ব্যাপারে ভবিষ্যতে তাদের পরিবারের কেউ কোনো মামলা-মোকদ্দমা করবে না।' ময়নাতদন্ত ছাড়া লাশ পাওয়ার আবেদন করেন তিনি।
একাধিক থানার ওসির সঙ্গে যোগাযোগ করে জানা গেছে, করোনা আক্রান্ত হয়ে সরকারি হাসপাতালে কেউ মারা গেলে সংশ্নিষ্ট কর্তৃপক্ষ পুলিশকে বিষয়টি অবহিত করে। এরপর আইইডিসিআরের পক্ষ থেকে পুলিশকে জানানো হয়। তাদের নির্দেশনার আলোকে কোনো এলাকা বা বাড়ি লকডাউন করা হচ্ছে।
একাধিক পুলিশ কর্মকর্তা জানান, কারও অস্বাভাবিক মৃত্যু হলে পুলিশ নিজে থেকেই ঘটনাস্থলে যায়। ময়নাতদন্তের জন্য আবেদন করে। সাধারণ কোনো রোগে মারা যাওয়ার পর লাশ পেতে পুলিশ সার্টিফিকেট নিতে হলে স্বজনের হয়রানি বাড়বে।
স্বাভাবিক মৃত্যুর পরও কেন পুলিশ ক্লিয়ারেন্স চাওয়া হলো- এমন প্রশ্নে সংশ্নিষ্টরা জানান, যদি হাসপাতালে পৌঁছার আগেই রোগী মারা যায় তাহলে পুলিশ ক্লিয়ারেন্স চাওয়া হয়। বর্তমান পরিস্থিতিতে পুলিশ ক্লিয়ারেন্স পেলে হয়তো এলাকায় দেখানো যাবে- এই রোগী অন্য কারণে মারা গেছে, করোনায় তার মৃত্যু হয়নি। এতে লাশ দাফনে বা সৎকারে ব্যাঘাত হবে না। তবে এ ধরনের ক্লিয়ারেন্স দেওয়ার আইনি কোনো বিধি পুলিশের নেই।