বিশ্বজুড়ে মানুষের এই ঘোরতর দুর্দিনে প্রকৃতি ভালোই আছে। নির্ভার প্রকৃতি আপন নিয়মেই আমাদের জন্য সাজাচ্ছে পুষ্পার্ঘ্য। আমরা সেই পুষ্পরাজি দেখে বিমোহিত হই, আপ্লুত হই। এমনই একটি ফুল হায়াসিন্থ। এই রঙ-বাহারি ফুলটি প্রথম দেখি ২০০৬ সালে মালয়েশিয়ার গেনটিং হাইল্যান্ডে একটি পাঁচতারকা হোটেলের লনে। ফুলটির চটকদারি রংয়ে মুগ্ধ হয়ে সেদিন অনেক ছবিও তুলি। কিন্তু নাম জানা ছিল না। ২০০৮ সালে ইউরোপে গিয়ে আবার দেখা পেলাম ফুলটির। তারপর আরও অনেক দেশে দেখেছি। ততদিনে নামও জেনেছি- হায়াসিন্থ। শীতের দেশগুলোতে বাগানের শোভা বাড়াতে এই ফুলের জুড়ি নেই। বর্ণবৈচিত্র্যেও এরা কম যায় না- সাদা, গোলাপি, নীল, বেগুনি, লাল। ভাবি, এমন সুদর্শন ফুলটি যদি আমাদের বাগানেও থাকত! তবে বিচ্ছিন্নভাবে সেই চেষ্টা অনেকেই হয়তো করেছেন। এবার চেষ্টা করে সফলও হলেন কৃষিবিদ মো. খলিলুর রহমান। তিনি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের প্রশাসন বিভাগের মহাপরিচালক হিসেবে কর্মরত রয়েছেন। তার ছাদবাগানে তিন রঙের হায়াসিন্থের সঙ্গে ফুটেছে হলুদ রঙের টিউলিপও। তিনি এ বছর হায়াসিন্থ আর টিউলিপের কন্দগুলো সংগ্রহ করেছেন আমেরিকা থেকে। তারপর নিজস্ব অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে ফুল ফুটিয়েছেন। জানা মতে বৃক্ষপ্রেমী সালমা বিনতে নূর ২০১৩ সালে প্রথম তার বাগানে হায়াসিন্থ ফুটিয়েছিলেন। বৃক্ষপ্রেমী খলিলুর রহমান প্রায় ২২ বছরের চেষ্টায় তার ছাদে একটি মিশ্ররীতির বাগান তৈরি করেছেন। তাতে আছে বিচিত্র ফুল, লতা-গুল্ম আর অনেক ধরনের ভেষজ উদ্ভিদ। স্বল্প পরিসরে তার সংগ্রহ উল্লেখ করার মতো।
আভিজাত্য আর জৌলুসের কারণে বিশ্বজুড়েই হায়াসিন্থ বেশ জনপ্রিয়। কিন্তু এমন সুদর্শন ফুলকে ঘিরে আছে ট্র্যাজিক উপাখ্যানও। ফরহাদ খানের প্রতীচ্য পুরাণ গ্রন্থ থেকে জানা যায়, হায়াসিন্থাস ছিল গ্রিক উপকথার এক সুদর্শন তরুণ। আলোর দেবতা অ্যাপোলো হায়াসিন্থাসকে ভারি স্নেহ করতেন। কিন্তু জেইফার সে স্নেহকে ঈর্ষা করত। সে কৌশলে হায়াসিন্থাসকে হত্যা করল। অ্যাপোলো তাতে খুবই আঘাত পেলেন এবং হায়াসিন্থাসের রক্ত দিয়ে একটি ফুলের জন্ম দিলেন। সেই ফুলের নামই হলো হায়াসিন্থ। মোগল শাসকদেরও প্রিয় ফুলের তালিকায় ছিল হায়াসিন্থ। যা তাদের জন্মস্থান মধ্য এশিয়ায় ছিল সহজলভ্য। দ্বিজেন শর্মা শ্যামলী নিসর্গ গ্রন্থে মোগলদের উদ্যানরীতির বর্ণনায় লিখেছেন- 'ধীরে ধীরে মাটির বুক ফুঁড়ে মাথা তোলে নার্সিসাস, হায়াসিন্থাস, আইরিস ও কারনেশন কুঁড়িরা, ফোটে লাইলাক, জেসমিন।'
হায়াসিন্থ (Hyacinthus spp) পূর্ব-মেডিটেরিয়ান অঞ্চলের কন্দজ গাছ। বর্তমানে আদি জাতগুলো থেকে তৈরি অসংখ্য আবাদিত জাতের ফুল চাষ হতে দেখা যায়। ফুল ফোটার মৌসুমে কন্দ থেকে প্রথমে চার বা ছয়টি লম্বা পাতা বের হয়। তারপর এক থেকে তিনটি ফুলের প্রায় ২০ সে.মি. দীর্ঘ লম্বাটে মঞ্জরি আসে। ফুল সুগন্ধি। আমাদের দেশে চাষের জন্য বিশেষ যত্ন প্রয়োজন।