প্রাণঘাতী করোনাভাইরাসের সংক্রমণ থেকে রক্ষা পেতে মাস্ক, গ্লাভস, স্যানিটাইজারসহ নানা ধরনের সুরক্ষা সামগ্রী ব্যবহারের পরামর্শ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। তাই এগুলোর চাহিদাও বহুগুণ বেড়ে গেছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে বিশ্বব্যাপী এসব সামগ্রীর সংকট রয়েছে। এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে একাধিক সংঘবদ্ধ চক্র দেশে নকল এন-৯৫ মাস্ক, টেস্ট কিট, গ্লাভসসহ করোনার নানা সুরক্ষা সামগ্রী তৈরি করতে শুরু করেছে। পুরান ঢাকার অলিগলিতে তৈরি হচ্ছে নকল এসব পণ্য। আবার কেউ কেউ বিদেশ থেকে মানহীন পণ্য এনে অভিজাত ব্র্যান্ডের মোড়কে বাজারজাত করছে। নকল পণ্যই বিক্রি হচ্ছে কয়েকগুণ বেশি দামে।
এদিকে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে করোনাভাইরাস চিকিৎসায় কার্যকর দাবি করে নকল ওষুধের রমরমা ব্যবসার বিষয়ে সতর্ক করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। এ ব্যাপারে সতর্ক থাকার তাগিদ দিয়েছেন সংশ্নিষ্ট বিশেষজ্ঞরাও। তাদের মতে, মুনাফালোভীদের এই অমানবিক তৎপরতা পুরোপুরি বন্ধ করা না গেলে করোনা নিয়ে বিপদ আরও বাড়বে।
জানতে চাইলে র‌্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালতের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সারওয়ার আলম এ বিষয়ে সমকালকে বলেন, চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় বিভিন্ন চক্র করোনার নকল সুরক্ষা সামগ্রী তৈরি করে যাচ্ছে। পুরান ঢাকায় মাস্কসহ বিভিন্ন সামগ্রী তৈরি করে তাতে বিদেশি ট্যাগ লাগাচ্ছে। তারা নকল ওয়ান টাইম সার্জিক্যাল মাস্ক বানাচ্ছে।
সারওয়ার আলম আরও বলেন, যারা করোনার সুরক্ষা সামগ্রী নকল করছে, তাদের ওপর র‌্যাবের নজরদারি রয়েছে। গতকাল রোববারও অভিযান চালিয়ে নয়াবাজার থেকে নকল মাস্ক জব্দ করা হয়েছে। গোয়েন্দা তৎপরতাও বাড়ানো হয়েছে।
গত কয়েক দিন ধরেই করোনাভাইরাসের সুরক্ষা সরঞ্জাম মাস্ক, হ্যান্ড স্যানিটাইজার ও নানা ধরনের ওষুধ চড়া  দামে বিক্রি করায় ভ্রাম্যমাণ আদালত অভিযান চালাচ্ছেন। তবে জেল-জরিমানা করেও নকল পণ্য বিক্রি ও তৈরির সঙ্গে জড়িতদের সামলানো কষ্টসাধ্য হয়ে উঠছে।
র‌্যাবের দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, এর আগে গত ১৩ এপ্রিল রাজধানীর পান্থপথে বিপুল পরিমাণ নকল গ্লাভস ও গাউন জব্দ করে র‌্যাব। এ সময় ১০ লাখ টাকা জরিমানা ও গোডাউন সিলগালা করা হয়। এএসএম ট্রেডিং নামের একটি প্রতিষ্ঠানের নকল ও মানহীন পণ্যের গোডাউনের তথ্য পায় র?্যাব। অভিযানের সময় বিপুল পরিমাণ পুনঃব্যবহূত গ্লাভস, মাস্ক এবং বিভিন্ন ব্র্যান্ডের গ্লাভসের খালি প্যাকেট জব্দ করা হয়। এসব পণ্য বিক্রির অভিযোগে প্রতিষ্ঠানের মালিক এ এস এম মুসাকে ১০ লাখ টাকা জরিমানা ও অনাদায়ে তিন মাসের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। প্রতিষ্ঠানটি সিলগালা করে দেওয়া হয়।
এর আগে ১৭ এপ্রিল আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানে বাংলামটরে জহুরা টাওয়ার থেকে উদ্ধার করা হয় করোনা পরীক্ষার অনুমোদনহীন কিটের মজুদ। এ ঘটনায় গ্রেপ্তার করা হয় চারজনকে। তারা হলেন আনোয়ার হোসেন, অমিত বসাক, শোয়াইব ও শুভ। অ্যাডভান্স বায়ো কেমিক্যাল (এবিসি) নামে একটি প্রতিষ্ঠান থেকে তা এনে তাদের কার্যালয়ে মজুদ করেছিল। যার বৈধ কোনো কাগজ তারা দেখাতে পারেননি। এ ছাড়াও এন-৯৫ বলে নকল মাস্ক কয়েকগুণ বেশি দামে বিক্রি করছিল প্রতিষ্ঠানটি। তাদের গুদামে থাকা অননুমোদিত ২৭৫ পিস করোনা টেস্টিং কিট, ৯ হাজার ৫০ পিস সাধারণ মাস্ক, ১০০ পিস নকল এন-৯৫ মাস্ক, ১৯৮ পিস পিপিই, ৯৬০ জোড়া হ্যান্ড গ্লাভস, ২৫০ জোড়া গগলস, ৯০০টি ক্যাপ, এক হাজার ৪৪০টি শু কভার জব্দ করা হয়।
অভিযানে সংশ্নিষ্ট একাধিক কর্মকর্তা জানান, চীন থেকে আনা করোনা পরীক্ষার যে কিট ওই প্রতিষ্ঠানে পাওয়া গেছে তা মানসম্মত কিনা এমন কোনো সনদ তাদের কাছে ছিল না। এ ধরনের কিট শুধু সরকারি হাসপাতালেই থাকার কথা। এ ছাড়া সেখানে এন-৯৫ ছাপ দেওয়া অনেক মাস্কের খালি প্যাকেট পাওয়া গেছে। নকল মাস্কগুলো এসব ব্যাগে ভরে বিক্রি করছিল তারা। এ ছাড়া বিপুল পরিমাণ করোনা সুরক্ষা সামগ্রী মজুদ করেছিল বেশি দামে বিক্রির জন্য।
অভিযানে অংশ নেওয়া রমনা জোনের সিনিয়র সহকারী পুলিশ কমিশনার এস এম শামীম সমকালকে বলেন, যে চক্রটিকে শনাক্ত করা হয়েছে, তারা মূলত চীন থেকে নিম্নমানের মাস্ক এনে এন-৯৫ বলে বিক্রি করে আসছিল। এ ছাড়া চীন থেকে করোনার আরও অনেক সুরক্ষা সামগ্রীও তারা এনেছিল। ডিএইচএল কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে এসব সরঞ্জাম আনা হয়েছে। প্রত্যেকটি পণ্য ১০-১৫ গুণ দামে তারা বিক্রি করত। পণ্য আমদানির কোনো বৈধ কাগজপত্র তারা দেখাতে পারেনি। এমনকি বিক্রির রসিদও তাদের নেই। এই চক্রের সদস্যরা ২০টি মাস্কের মূল্য হিসেবে এক ব্যক্তির কাছ থেকে ৩০ হাজার টাকা রেখেছিল। অতি মুনাফার জন্যই তারা নকল পণ্য এনে বাজারজাত করছে। 
এস এম শামীম আরও বলেন, জড়িত এই সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে। একই ধরনের কারবারে জড়িত আরও কয়েক জনকে খোঁজা হচ্ছে।
এর আগে মিটফোর্ড এলাকায় অভিযান চালিয়ে প্রায় পাঁচ কোটি টাকার নকল ওষুধ ও নিম্নমানের মাস্ক জব্দ করেন র?্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালত।