প্লাবনসহ আসামিরা ধরাছোঁয়ার বাইরে

যেন ইঁদুর-বিড়াল খেলছে পুলিশ

প্রকাশ: ২১ মে ২০২০       প্রিন্ট সংস্করণ

সমকাল প্রতিবেদক, ঢাকা কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি

রেজাউল করিম প্লাবন

রেজাউল করিম প্লাবন

যৌতুক দাবি, যৌতুকের জন্য নির্যাতন এবং ভ্রূণ হত্যার অভিযোগে করা মামলার প্রধান আসামি রেজাউল করিম প্লাবন এবং অন্য আসামি তার মা-বাবা এবং দুই ভাই এখনও ধরাছোঁয়ার বাইরে। কুড়িগ্রামের চিলমারী উপজেলার পাত্রখাতা রহমান হাজির গ্রামে প্লাবনের বাড়িতে একাধিকবার অভিযান চালিয়েও তাদের গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ। এ ছাড়া ঢাকার মীরেরবাগের বাসায় একাধিকবার অভিযান চালিয়েও আসামি গ্রেপ্তারে ব্যর্থ হয় হাতিরঝিল থানা পুলিশ। প্রধান আসামিসহ অন্যরা এখনও গ্রেপ্তার না হওয়ায় মামলার বাদী নিরাপত্তাহীনতায় রয়েছেন। এদিকে আসামিদের দ্রুত গ্রেপ্তার, সাংবাদিক সাজিদা ইসলাম পারুলের নিরাপত্তাহীনতাসহ সার্বিক বিষয়ে সমকালের পক্ষ থেকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ছাড়াও পুলিশের শীর্ষ মহলে অবহিত করা হয়। এ ব্যাপারে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে।
তবে অভিযোগ উঠেছে, গ্রেপ্তারের নামে আসামিদের সঙ্গে ইঁদুর-বিড়াল খেলছে পুলিশ। চিলমারী থানা পুলিশ গ্রেপ্তার অভিযানে পাত্রখাতা রহমান হাজির গ্রামে যাওয়ার আগেই আসামিদের কাছে খবর পৌঁছে যাচ্ছে।
সূত্র জানায়, চিলমারী থানার ওসির সঙ্গে অনেক আগে থেকেই প্লাবনের অতি সখ্য। প্লাবন ওসির ঘনিষ্ঠ লোক হিসেবে এলাকায় পরিচিত। বাদীসহ সংশ্নিষ্টদের অভিযোগ, চিলমারী থানার ওসির কাছ থেকে অনৈতিক সুবিধা পেয়েই প্লাবন ও অন্য আসামিরা এখনও ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়েছেন। এ ছাড়া কুড়িগ্রাম ও ঢাকার কয়েকজন রাজনৈতিক নেতাও প্লাবনের গ্রেপ্তার ঠেকাতে কলকাঠি নাড়ছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এলাকার অনেকেই জানিয়েছেন, প্লাবনকে দু'তিন দিন থেকে প্রকাশ্যে দেখা যাচ্ছে না। আর তার মা-বাবা এবং দুই ভাই বাড়িতে থাকছেন। পুলিশ আসার আগে বাড়িতে তালা দিয়ে তারা সরে পড়ছেন। পুলিশ চলে যাওয়ার পর আবার ফিরে আসছেন।
এদিকে ঢাকা থেকে আসা অনুসন্ধান স্লিপের তদন্তকারী কর্মকর্তা চিলমারী থানার এসআই আহসান হাবিব জানান, গত ১৬ মে অনুসন্ধান স্লিপ পাওয়ার পর ওই দিন রাতে প্লাবনের বাড়িতে অভিযান চালিয়ে তাদের কাউকে পাওয়া যায়নি। পরদিন সকাল ১০টার দিকে আবার ওই বাড়িতে অভিযান চালানো হয়। দুর্গম এলাকা হওয়া সত্ত্বেও প্রতিদিন ওই এলাকায় গিয়ে অনুসন্ধান এবং আসামিদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চালানো হলেও এখন পর্যন্ত তাদের পাওয়া যায়নি। পাশাপাশি আসামিদের নামের সঠিকতা, ঠিকানা, বয়স এবং থানার রেকর্ডপত্র যাচাই-বাছাই করে অনুসন্ধান প্রতিবেদন মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তার কাছে পাঠানোর প্রক্রিয়া চলছে। তিনি আরও বলেন, আসামিরা বাড়িতে থাকছেন- এমন কোনো তথ্য আমাদের কাছে নেই। আমরা অভিযানে গিয়ে বাড়ি তালাবদ্ধ পাচ্ছি।
চিলমারী থানার ওসি আমিনুল ইসলাম অনুসন্ধান স্লিপ পাওয়ার কথা স্বীকার করে জানান, আসামিদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা অব্যাহত আছে।
এ প্রসঙ্গে পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মহিবুল ইসলাম খান জানান, মামলাটি রুজু হয়েছে ঢাকায়। এ অবস্থায় জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে চিলমারী থানার ওসিকে বলা হয়েছে, মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তাকে সব ধরনের আইনগত সহযোগিতা দেওয়ার জন্য।
পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের ডিসি বিপ্লব বিজয় তালুকদার সমকালকে বলেন, আসামিদের স্থায়ী ঠিকানায় অনুসন্ধান স্লিপ পাঠানো হয়েছে। আসামিদের গ্রেপ্তারে তৎপরতা ও তদন্ত কাজ চলছে। তবে করোনা পরিস্থিতির কারণে সবকিছু স্বাভাবিকভাবে করা যাচ্ছে না। হাতিরঝিল থানার ছয় পুলিশ সদস্য এখন পর্যন্ত করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন।
রংপুর রেঞ্জের ডিআইজি দেবদাস ভট্টাচার্য্য বলেন, আসামিদের গ্রেপ্তারে স্থানীয় পুলিশ প্রশাসনকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
যৌতুক দাবি, যৌতুকের জন্য নির্যাতন এবং ভ্রূণ হত্যার অভিযোগে গত ১১ মে হাতিরঝিল থানায় প্লাবনসহ পাঁচজনের বিরুদ্ধে মামলা করেন সমকালের স্টাফ রিপোর্টার সাজিদা ইসলাম পারুল। ২ এপ্রিল যুগান্তরের স্টাফ রিপোর্টার প্লাবনের সঙ্গে বিয়ে হয়েছিল তার। বিয়ের পর যৌতুক হিসেবে প্লাবন ঢাকায় একটি ফ্ল্যাট দাবি করেন পারুলের কাছে। একাধিক নারীর সঙ্গে প্লাবনের অনৈতিক সম্পর্ক থাকার কথা জেনে যান পারুল। অনৈতিক সম্পর্কে বাধা ও যৌতুক না দেওয়ায় পারুলকে নির্যাতন করা হয়। মারধরের কারণে পারুলের গর্ভের সন্তান নষ্ট হয়ে যায়। ৫ মে তিনি প্লাবনের গ্রামে বাড়ি গেলে সেখানেও মারধরের শিকার হন। প্লাবনের বড় ভাই এমএ আজিজ, ছোট ভাই এসএম নিজামউদ্দিন এবং বাবা সামসুল হক ও মা মারধর করেন পারুলকে।
এর আগে প্লাবনের গ্রেপ্তার জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছিল বাংলাদেশ উইমেন জার্নালিস্টস ফোরাম (বিডব্লিউজেএফ)। এ ছাড়া ফেসবুকসহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও প্লাবনসহ অন্য আসামিদের গ্রেপ্তারের দাবি জানাচ্ছেন নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ।
এদিকে প্লাবনের ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির স্থায়ী সদস্য পদ স্থগিত করা হয়েছে। সংগঠনের সাবেক নারী বিষয়ক সম্পাদক পারুলের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে শৃঙ্খলা কমিটির তাৎক্ষণিক পরামর্শে ডিআরইউ কার্যনির্বাহী কমিটি ওই সিদ্ধান্ত নেয়।







বিষয় : যৌতুক দাবি