অসচেতনতায় সংক্রমণ আরও বাড়বে

দেশে একদিনে সর্বোচ্চ করোনা শনাক্ত ১৬১৭ মৃত্যু ১৬

প্রকাশ: ২১ মে ২০২০       প্রিন্ট সংস্করণ

রাজবংশী রায়

নমুনা পরীক্ষা বৃদ্ধির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে আক্রান্তের সংখ্যা। বাড়ছে মৃত্যুও। গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে আরও এক হাজার ৬১৭ জনের শরীরে করোনার সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছে। মৃত্যু হয়েছে আরও ১৬ জনের। দেশে এখন করোনাভাইরাস সংক্রমণের 'পিকটাইম' চলছে।
গত ৮ মার্চ দেশে করোনার সংক্রমণ শনাক্ত হওয়ার পর একদিনে এটিই সর্বোচ্চ আক্রান্তের সংখ্যা। এর আগে গত সোমবার সর্বোচ্চ শনাক্তের সংখ্যা ছিল এক হাজার ৬০২ জন। এ নিয়ে মোট আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়াল ২৬ হাজার ৭৩৮ জন। মৃত্যুর মোট সংখ্যা পৌঁছাল ৩৮৬ জনে।
পরিস্থিতি বিশ্নেষণ করলে দেখা যায়, গতকাল পর্যন্ত দেশে ২ লাখ ৩ হাজার ৮৫২ জনের নমুনা পরীক্ষা করে শনাক্ত হয়েছেন ২৬ হাজার ৭৩৮ জন। আক্রান্তের হার ১৩ দশমিক ১১ শতাংশ। মৃত্যুহার ১ দশমিক ৪৪ শতাংশ। মোট আক্রান্তের মধ্যে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন পাঁচ হাজার ২০৭ জন। সুস্থতার হার ১৯ দশমিক ৪৭ শতাংশ। মৃত্যু হয়েছে ৩৮৬ জনের।
পরিধি বৃদ্ধির পর বর্তমানে প্রতি ১০ লাখে এক হাজার ২৩৯ জনের নমুনা পরীক্ষা করা সম্ভব হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে সার্কভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে একমাত্র আফগানিস্তানের ওপরে রয়েছে বাংলাদেশ। সবার ওপরে থাকা ভুটানে প্রতি ১০ লাখে ১৮ হাজার ৫৪৯ জনের নমুনা পরীক্ষা হয়েছে।
পরিস্থিতি যেদিকে যাচ্ছে, তাতে দেশে করোনার সংক্রমণ আরও বাড়বে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা। এর পেছনে কয়েকটি কারণ উল্লেখ করেছেন তারা। তার মধ্যে রয়েছে- ঈদ সামনে রেখে সড়ক-মহাসড়কে ঘরমুখো মানুষের ভিড় এবং সবচেয়ে সংক্রমিত জোন রাজধানী ঢাকা থেকে গ্রামে ফেরা। এ কারণে অসংক্রমিত এলাকাগুলোতেও সংক্রমণ ছড়াবে। এতে করে আক্রান্ত ও মৃত্যুও বাড়বে। গতকাল বুধবার সচিবালয়ে সংবাদ সম্মেলনে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মিডিয়া সেলের প্রধান ও অতিরিক্ত (প্রশাসন) সচিব হাবিবুর রহমান খান সংক্রমণ বাড়ার ইঙ্গিত দিয়ে বলেছেন, 'সংক্রমণের সর্বোচ্চ সীমার কাছাকাছি আমরা চলে এসেছি। ঈদের পর হয়তো সর্বোচ্চ সীমায় পৌঁছে যাব।'
জনস্বাস্থ্যবিদদের নিয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের গঠিত কমিটির প্রধান সাবেক মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. শাহ মনির হোসেন সমকালকে বলেন, কমিটির মূল্যায়ন ছিল চলতি মাস থেকে শুরু করে আগামী জুনের মাঝামাঝি পর্যন্ত পিকটাইম চলবে। এরপর ধীরে ধীরে সংক্রমণের মাত্রা হ্রাস পাবে। ঈদের ছুটিতে হাজার হাজার মানুষ ঢাকা থেকে গ্রামে ফিরে যাওয়ায় ওই পূর্বাভাস কাজে আসবে না। সংক্রমণমুক্ত গ্রামগুলোতে এসব মানুষ গিয়ে সেখানেও ঝুঁকি তৈরি করবে। ফলে ওইসব এলাকায় আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যাও বাড়বে। এভাবে ভাইরাসটি দেশের সর্বত্র বিস্তার লাভ করতে পারে। সেইসঙ্গে সংক্রমণ হ্রাসের প্রক্রিয়াটি বিলম্বিত হবে।
এর আগে এই কমিটি চলতি মে ও জুনের মাঝামাঝি সময়কে সর্বোচ্চ করোনা সংক্রমণের সময়সীমা নির্ধারণ করে পূর্বাভাস দিয়েছিল। দুই ধাপে করা ওই পূর্বাভাস অনুযায়ী, সংক্রমণ পরিস্থিতি স্বাভাবিক মাত্রায় থাকলে মে মাসে ৪৮ থেকে ৫০ হাজার মানুষ আক্রান্ত হতে পারেন। একই সঙ্গে মৃত্যু হতে পারে ৮০০ থেকে এক হাজার মানুষের। তবে সংক্রমণ পরিস্থিতি তীব্র হলে আক্রান্ত এক লাখ ছাড়িয়ে যেতে পারে। একই সঙ্গে মৃত্যু হতে পারে ২ হাজার মানুষের। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা ওই পূর্বাভাসকে ছাড়িয়ে যাবে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও ভাইরোলজিস্ট অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম সমকালকে বলেন, করোনা সংক্রমণের আগে ও পরে যতগুলো পরিকল্পনা করা হয়েছিল, সেগুলোর একটিও যথাযথভাবে কার্যকর হয়নি। পরিকল্পনা অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে পারলে পরিস্থিতি অন্যরকম হতে পারত। প্রথমত বিদেশফেরতদের কোয়ারেন্টাইনে নেওয়ার ব্যাপারে স্বাস্থ্য বিভাগ উদাসীন ছিল। উহানফেরতদের মতো বিদেশফেরত অন্যদের বিষয়ে কোনো পরিকল্পনা নেওয়া হয়নি। শুধু স্ট্ক্রিনিং করে তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। এসব ব্যক্তি কোয়ারেন্টাইনে না থেকে ঘুরে বেড়িয়েছেন। তাদের মাধ্যমেই প্রথম সংক্রমণ শুরু হয়েছিল। অথচ তাদের প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টাইনে নেওয়া গেলে ভাইরাসটির বিস্তার হয়তো ঠেকানো যেত। এরপর শুরুতে সংক্রমণ ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ ও মাদারীপুরের শিবচরের মতো দু-একটি স্থানে ছিল। সব অঞ্চলকে কার্যকর লকডাউন করা গেলেও ভাইরাসটির বিস্তার রোধ করা যেত। আবার যখন সরকারি ছুটি ঘোষণা করা হলো- তার মধ্যেই গার্মেন্ট মালিকরা শ্রমিকদের ফিরিয়ে আনলেন। তাতে ঝুঁকি আরও বেড়ে গেল। এখন ঈদের ছুটিতে গ্রামে যাওয়া শুরু হয়েছে, যা কাম্য ছিল না। অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে বলা যায়, আমরা ভয়াবহ পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে যাচ্ছি।
করোনা পরীক্ষা রিপোর্ট যাবে এসএমএসে :করোনা পরিস্থিতি নিয়ে নিয়মিত ভার্চুয়াল স্বাস্থ্য বুলেটিনে গতকাল বুধবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. নাসিমা সুলতানা বলেন, নমুনা পরীক্ষার রিপোর্ট এখন থেকে মোবাইল ফোনে এসএমএসের মাধ্যমে পাঠানো হবে। নমুনা সংগ্রহের সময় দেওয়া ব্যক্তির মোবাইল নম্বরে ওই এসএমএস পাঠানো হবে। গ্রামীণফোন গ্রাহকরা গওঝ উএঐঝ শিরোনামে এবং অন্য অপারেটরের গ্রাহকরা ০১৭২৯০২৪৬১২ নম্বর থেকে এসএমএস পাবেন। এটি অফিশিয়াল রিপোর্ট হিসেবে বিবেচিত হবে।
২৪ ঘণ্টায় মৃত ১৬ জনের বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরে ডা. নাসিমা সুলতানা বলেন, মৃতদের মধ্যে ১৩ পুরুষ এবং তিনজন নারী। তাদের মধ্যে ৮১ থেকে ৯০ বছর বয়সী একজন, ৭১ থেকে ৮০ বছর বয়সী দু'জন, ৬১ থেকে ৭০ বছর বয়সী চারজন, ৫১ থেকে ৬০ বছর বয়সী পাঁচজন, ৪১ থেকে ৫০ বছর বয়সী একজন, ৩১ থেকে ৪০ বছর বয়সী একজন, ২১ থেকে ৩০ বছর বয়সী একজন ও ১০ বছরের কম বয়সী একজন রয়েছেন। রাজধানী ঢাকা ও কিশোরগঞ্জে দু'জন করে, গোপালগঞ্জ, শরীয়তপুর ও নরসিংদীতে একজন করে, চট্টগ্রামে তিনজন, কুমিল্লা ও চাঁদপুরে একজন করে, রংপুরে দু'জন, পঞ্চগড় ও সিলেটে একজন করে মৃত্যুবরণ করেছেন।
ডা. নাসিমা সুলতানা আরও জানান, ২৪ ঘণ্টায় আইসোলেশনে রাখা হয়েছে ৩০০ জনকে। বর্তমানে আইসোলেশনে আছেন তিন হাজার ৮১৬ জন। ২৪ ঘণ্টায় আইসোলেশন থেকে ছাড়া পেয়েছেন ১০০ জন। বর্তমানে দেশে মোট কোয়ারেন্টাইনে আছেন ৫২ হাজার ৯৪১ জন।
'সংক্রমণ বৃদ্ধির ধারা অব্যাহত থাকতে পারে' :করোনাভাইরাসের সংক্রমণ প্রতিদিন যে হারে বাড়ছে, তা আগামী ১৫ থেকে ১৬ দিন অব্যাহত থাকতে পারে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মিডিয়া সেলের প্রধান ও অতিরিক্ত সচিব হাবিবুর রহমান খান। গতকাল সচিবালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, আমরা পিকটাইমের কাছাকাছি চলে এসেছি। হয়তো ঈদের পর সেখানে পৌঁছে যাব। ল্যাবের সংখ্যা ও নমুনা পরীক্ষা প্রতিনিয়ত বাড়ছে। এখন প্রতিদিন ১০ হাজারের কাছাকাছি পরীক্ষা হচ্ছে। এটি আরও বাড়বে।
হাবিবুর রহমান খান বলেন, প্লাজমা থেরাপি নিয়ে বিশ্বের সাতটি দেশ কাজ করছে। আমরা সেটা করতে যাচ্ছি। প্লাজমা থেরাপির জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজে প্লাজমা সংগ্রহের কাজ চলছে। প্রাথমিকভাবে ৪৫ রোগীর ওপর পরীক্ষামূলক প্রয়োগ করা হবে। পরীক্ষায় ভালো ফল পাওয়া গেলে ঢাকাসহ সারাদেশের করোনা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রোগীদের ওপর তা প্রয়োগ করা হবে। একজনের কাছ থেকে সংগ্রহ করা প্লাজমা দু'জন রোগীর ওপর প্রয়োগ করা যাবে। এর বাইরে কয়েকটি ওষুধ নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে। দেশের পাঁচটি প্রতিষ্ঠান ওষুধ উৎপাদনে গেছে।
চিকিৎসা ব্যবস্থাপনার প্রস্তুতি নিয়ে বিস্তারিত তুলে ধরে হাবিবুর রহমান খান বলেন, সারাদেশে করোনা রোগীর জন্য ১১০টি হাসপাতাল প্রস্তুত করা হয়েছে। এর মধ্যে ঢাকায় সরকারি হাসপাতাল আছে ৯টি আর বেসরকারি পাঁচটি। ঢাকায় করোনা রোগীর জন্য সাত-আট হাজার বেডের ব্যবস্থা করা হয়েছে। বসুন্ধরা কনভেনশন সিটি হাসপাতালে কোনো সিরিয়াস রোগী যাবে না। সেখানে মূলত আইসোলেশন সেন্টারের কাজ হবে। তারপরও সেখানে পর্যাপ্ত বেড ও অক্সিজেনের ব্যবস্থা রয়েছে। সেখানে থাকা কোনো রোগীর পরিস্থিতি জটিল হলে তাকে করোনা হাসপাতালে নেওয়া হবে।
তামাকজাত দ্রব্য ও বিড়ি-সিগারেট উৎপাদন-বিক্রির বিষয়ে হাবিবুর রহমান বলেন, করোনার আপৎকালীন তামাকজাত দ্রব্য এবং বিড়ি-সিগারেট উৎপাদন ও বিক্রি সাময়িক বন্ধ রাখার অনুরোধ বা সুপারিশ করা হয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা তামাকজাত দ্রব্য ও ধূমপান থেকে বিরত থাকতে বলেছে।

বিষয় : করোনা