পদ্মা সেতুর ৪৬৫০ মিটার দৃশ্যমান

প্রকাশ: ১০ জুন ২০২০   

মুন্সীগঞ্জ প্রতিনিধি

জাজিরা প্রান্তে পদ্মা সেতুর ২৫ ও ২৬ নম্বর খুঁটির উপর বসানো হচ্ছে ৩১ তম স্প্যান

জাজিরা প্রান্তে পদ্মা সেতুর ২৫ ও ২৬ নম্বর খুঁটির উপর বসানো হচ্ছে ৩১ তম স্প্যান

প্রকৃতির বৈরী পরিস্থিতি উপেক্ষা করে পদ্মা সেতুর জাজিরা প্রান্তে ২৫ ও ২৬ নম্বর খুঁটির উপর বসেছে ৩১ তম স্প্যান। 

বুধবার বিকেল ৩টা ৪০ মিনিটের দিকে ক্রেনবাহী ভাসমান জাহাজ ‘তিয়ান-ই’ ক্রেনের সাহায্যে স্প্যানটির পাজরে আটকিয়ে খুঁটির ওপর বসিয়ে দেয়। এরপরই পদ্মা সেতুর মূল অবয়ব দৃশ্যমান হয়ে ওঠে ৪ হাজার ৬৫০ মিটার। 

পদ্মা সেতুর (মূল সেতু) নির্বাহী প্রকৌশলী দেওয়ান মো. আবদুল কাদের জানান, এ স্প্যানটি বসানোর পর জাজিরা প্রান্তে খুঁটির ওপর সব স্প্যান বসানো শেষ হলো। এখন শুধু মাওয়া প্রান্তে থাকা ৯টি খুঁটির ওপর ১০টি স্প্যান স্থাপনের কাজ শেষ হলেই ৬ দশমিক ১৫ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের দ্বিতল পদ্মা সেতুর শতভাগ কাজ শেষ হবে।

বুধবার ভোর থেকেই প্রচণ্ড ঝড়ো হাওয়া ও মূষলধারে বৃষ্টি শুরু হয়। পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হলে শুরু হয় ৩১ তম স্প্যান বসানোর কাজ। ১১ জুন স্প্যানটি বসানোর নির্ধারিত তারিখ থাকলেও বৃহস্পতিবার থেকে শনিবার পর্যন্ত ৩ দিন আবহাওয়া খারাপ হওয়ার পূর্বাভাস পাওয়ায় গৃহীত সিদ্ধান্ত মতে, একদিন আগেই বসানো হয় ৩১ তম স্প্যান। 

১৫০ মিটার দৈর্ঘ্যের ও ৩ হাজার ১৪০ টন ওজনের স্প্যানটি খুঁটির কাছে নিয়ে যেতে ক্রেনবাহী ভাসমান জাহাজ ‘তিয়ান-ই’ বুধবার সকালে মাওয়া প্রান্তের কুমারভোগ কনস্ট্রাকশন ইয়ার্ডের স্টক জেটি থেকে জাজিরা প্রান্তে খুঁটির কাছে নিয়ে যেতে রওনা হয়। দুপুর ১২টা ৪০ মিনিটের সময় ভাসমান জাহাজটি স্প্যান নিয়ে খুঁটির কাছে নোঙর করে। এরপর আগে থেকেই প্রস্তুত থাকা প্রকৌশলী ও শ্রমিকরা তাদের কর্মযজ্ঞ শুরু করলে ক্রেনবাহী ভাসমান জাহাজ ‘তিয়ান-ই’ ক্রেনের সাহায্যে স্প্যানটির পাজঁরে আটকিয়ে খুঁটির ওপর বসিয়ে দেয়। ফলে সেতুর মূল অবয়ব দৃশ্যমান হয়ে ওঠে ৪ হাজার ৬৫০ মিটার। ৩১ তম স্প্যান বসানোর পর জাজিরা প্রান্তে এখন এক সারিতে ২৯টি স্প্যান বসেছে।

২০০১ সালের ৪ জুলাই পদ্মা সেতুর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। পরের ৮ বছরে আর কোনো অগ্রগতি হয়নি। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ আবারও সরকার গঠনের পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা থেমে থাকা প্রকল্প বাস্তবায়নে উদ্যোগ নেন। ২০১২ সালে বিশ্বব্যাংক দুর্নীতির অভিযোগ তুলে ঋণ চুক্তি বাতিল করায় ২০১৩ সালের ৪ মে নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণের ঘোষণা দেন প্রধানমন্ত্রী। এরপর ২০১৪ সালের মার্চে শুরু হয় পাইলিংয়ের কাজ। ২০১৫ সালের ১২ ডিসেম্বর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পদ্মা সেতুর মূল অবকাঠামো নির্মাণ কাজের উদ্বোধন করেন।

প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, কর্মযজ্ঞের বছরওয়ারি হিসাব অনুযায়ী, ২০১৫ সালের ১১ ডিসেম্বর পদ্মা সেতু প্রকল্পের কাজ হয় ২৭ ভাগ। ২০১৬ সালের ১০ ডিসেম্বর পর্যন্ত ৪০ ভাগ, ২০১৭ সালের ১০ ডিসেম্বর পর্যন্ত ৫২ ভাগ, ২০১৮ সালের ১১ ডিসেম্বর পর্যন্ত ৭১ ভাগ এবং ২০১৯ সালের ১১ ডিসেম্বর পর্যন্ত মূল সেতুর কাজের অগ্রগতি হয় ৮৪ ভাগ এবং চলতি বছরের ১০ জুন পর্যন্ত ৫ মাস ১০ দিনে অগ্রগতি বৃদ্ধি পেয়ে এখন ৮৯ ভাগ সম্পন্ন হয়েছে। আর মাত্র ১১ ভাগ কাজ হলেই শতভাগ কাজ শেষ হবে।

সূত্রটি আরও জানায়, পদ্মা সেতুর ৪১টি স্প্যানের মধ্যে ২০টির অবস্থান শরীয়তপুরের জাজিরা অংশে ও ২০টি মুন্সীগঞ্জের মাওয়া অংশে এবং একটির অবস্থান মাদারীপুরের শিবচর অংশে।

প্রকল্পের দায়িত্বশীল কর্মকর্তা ও নির্বাহী প্রকৌশলী জানান, ২০১৭ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর প্রথম স্প্যান বসানোর পর ২০১৮ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ১৫ মাসে খুঁটির ওপর বসে ৭টি স্প্যান। অবকাঠামোর দৈর্ঘ্য দাঁড়ায় ১০৫০ মিটারে। আর ২০১৯ সালেই ১৩টি স্প্যান খুঁটির ওপর বসানো সম্ভব হওয়ায় পদ্মা সেতুর দৈর্ঘ্য দাঁড়ায় ৩ কিলোমিটার। আর চলতি বছরের মে পর্যন্ত বসে আরও ১০টি স্প্যান। বুধবার বসেছে ৩১ তম স্প্যান। এ নিয়ে ৫ মাস ১০ দিনে স্প্যান বসানোর সংখ্যা ১১টি। 

উল্লেখ্য, ৬ দশমিক ১৫ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের দ্বিতল পদ্মা সেতুতে সব মিলিয়ে ৪২টি খুঁটি নির্মাণ করা হচ্ছে। এর মধ্যে মাওয়া প্রান্তে ২১টি ও জাজিরা প্রান্তে ২১টি। আর ৪২টি খুঁটির ওপর বসবে ৪১টি স্প্যান। এর মধ্যে ৪০টি খুঁটি থাকবে পানিতে আর ২টি ডাঙায়। ডাঙায় থাকা দু’টি খুঁটি সংযোগ সড়কের সঙ্গে মূল সেতুকে যুক্ত করবে। ৬টি মডিউলে বিভক্ত থাকবে পদ্মা সেতুর মাওয়া প্রান্তে এক হাজার ৪৭৮ মিটার ভায়াডাক্ট বা ঝুলন্ত পথ ও জাজিরা প্রান্তে থাকবে এক হাজার ৬৭০ মিটার। 

বর্তমান সরকারের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী, নিজস্ব অর্থায়নে ৬ দশমিক ১৫ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যর দ্বিতল পদ্মা সেতুর পুরোটাই নির্মিত হবে স্টিল ও কংক্রিটে। সেতুর ওপরে থাকবে কংক্রিটিং ঢালাইয়ের চাল লেনের মহাসড়ক আর তার নিচ দিয়ে যাবে রেললাইন।