সমকাল-সুনীতি অনলাইন গোলটেবিল

গৃহশ্রমিকদের মর্যাদা ও সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে

প্রকাশ: ২৬ জুন ২০২০       প্রিন্ট সংস্করণ

সমকাল প্রতিবেদক

আন্তর্জাতিক গৃহশ্রমিক দিবস উপলক্ষে বৃহস্পতিবার গোলটেবিল আলোচনায় অংশগ্রহণকারীরা	 অনলাইন থেকে

আন্তর্জাতিক গৃহশ্রমিক দিবস উপলক্ষে বৃহস্পতিবার গোলটেবিল আলোচনায় অংশগ্রহণকারীরা অনলাইন থেকে

'দেশে গৃহশ্রমিক নির্যাতনের মাত্রা দিন দিন বেড়ে চলেছে। এ বিষয়ে নীতিমালা থাকলেও এর যথাযথ বাস্তবায়ন ও সরকারি পর্যবেক্ষণ না থাকায় নির্যাতন থামানো যাচ্ছে না। করোনাভাইরাস পরিস্থিতিতে গৃহশ্রমিকরা পড়েছেন নতুন সংকটে। তাদের কর্মসংস্থান সংকুচিত হয়ে এসেছে। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে এটিকে প্রাতিষ্ঠানিক পেশা হিসেবে বিকশিত করতে হবে। প্রশিক্ষণ, কর্মসংস্থান এবং আইনি স্বীকৃতির মাধ্যমে গৃহশ্রমিকের সামাজিক মর্যাদা এবং সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে।
গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে এক অনলাইন সেমিনারে বক্তারা এ দাবি জানান। আন্তর্জাতিক গৃহশ্রমিক দিবস উপলক্ষে সুনীতি প্রকল্পের উদ্যোগে এ সেমিনার আয়োজন করা হয়। এতে সহযোগিতা করে দৈনিক সমকাল। সেমিনারে ট্রেড ইউনিয়ন, নাগরিক সমাজ, মানবাধিকার ও উন্নয়ন সংগঠন এবং গণমাধ্যমের প্রতিনিধিরা মতামত তুলে ধরেন।
বিলস চেয়ারম্যান মো. হাবিবুর রহমান সিরাজের সভাপতিত্বে এ সেমিনারে বিশেষ অতিথি ছিলেন শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়-সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য মো. ইসরাফিল আলম ও শামসুন্নাহার ভূঁইয়া। এ ছাড়াও সেমিনারে সম্মানিত অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ও গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে চৌধুরী, শ্রমিক কর্মচারী ঐক্য পরিষদের (স্কপ) যুগ্ম সমন্বয়কারী নইমুল আহসান জুয়েল, স্কপ প্রতিনিধি রাজেকুজ্জামান রতন, গৃহশ্রমিক অধিকার প্রতিষ্ঠা নেটওয়ার্কের ভারপ্রাপ্ত সমন্বয়কারী আবুল হোসাইন, অক্সফ্যাম বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর ড. দীপঙ্কর দত্ত, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকর্ম বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মোস্তাফিজ আহমেদ, লেবার রাইটস জার্নালিস্ট ফোরামের সভাপতি কাজী আব্দুল হান্নান, নারী মৈত্রীর নির্বাহী পরিচালক শাহীন আক্তার ডলি, অভিনেত্রী ও সুনীতি প্রকল্পের ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসাডর দীপা খন্দকার, হ্যালোটাস্কের সিইও মাহমুদুল হাসান লিখন, ইউসেপ বাংলাদেশের প্রকল্প পরিচালক শেখ রওশন আমিন, রেড অরেঞ্জ লিমিটেডের হেড অব প্রোগ্রাম নাকীব রাজীব আহমেদ প্রমুখ। অনুষ্ঠানে বিলসের পক্ষ থেকে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করে বক্তব্য দেন বিলস মহাসচিব ও নির্বাহী পরিচালক নজরুল ইসলাম খান। সেমিনারে মূল বিষয়বস্তু উপস্থাপন করেন গৃহশ্রমিক অধিকার প্রতিষ্ঠা নেটওয়ার্কের সদস্য সচিব নাজমা ইয়াসমিন এবং অনুষ্ঠান সঞ্চালনায় সহযোগিতা করেন বিলস উপপরিচালক মো. ইউসুফ আল মামুন। বক্তৃতা করেন স্কপভুক্ত ও বিলস সহযোগী জাতীয় ট্রেড ইউনিয়ন ফেডারেশনের নেতৃবৃন্দ, নাগরিক সমাজ সংগঠন, গবেষক, বেসরকারি সংস্থা, সাংবাদিকসহ প্রকল্পের সহযোগী সংগঠনের প্রতিনিধি ও বিভিন্ন পেশাজীবী সংগঠনের নেতারা।
সভাপতির বক্তব্যে হাবিবুর রহমান সিরাজ বলেন, গৃহশ্রমিকদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় আইএলও কনভেনশন-১৮৯ প্রণয়নে সরকার আইএলসিতে ভোট দিয়েছে এবং তার আলোকে নীতিমালা তৈরি করেছে। কিন্তু নীতিমালা বাস্তবায়নে আইনের দরকার রয়েছে। আইন হলেই নীতি বাস্তবায়ন সম্ভব।
রাশেদা কে চৌধুরী বলেন, গৃহশ্রমিক নীতিমালার পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন প্রয়োজন। গৃহশ্রমিকদের অধিকার ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠার জন্য একটি আইনি কাঠামো খুবই প্রয়োজন। উপযুক্ত কারিকুলাম উন্নয়ন ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে গৃহশ্রমিকদের সনদ দিয়ে তাদের পেশাগত মানোন্নয়নে মনোযোগী হওয়ার পাশাপাশি নিয়োগকারীদের মানসিকতার পরিবর্তন আনাও জরুরি।
শামসুন্নাহার ভূঁইয়া বলেন, করোনায় দেশের ৮৫ শতাংশ শ্রমিক কর্মহীন। গৃহশ্রমিকরা অনেকেই খণ্ডকালীন কাজ করতেন। তাদের সিংহভাগই এখন কাজ হারিয়েছেন। সরকারি সামাজিক নিরাপত্তা তহবিল বাড়িয়ে গৃহশ্রমিকদের এর আওতায় আনা জরুরি।
মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনকালে নাজমা ইয়াসমিন বলেন, শ্রমশক্তি জরিপ ২০১৬-১৭ অনুযায়ী, দেশে গৃহস্থালি কাজের সঙ্গে জড়িত শ্রমিকের সংখ্যা প্রায় ১৩ লাখ। ৮৩ শতাংশই নারী, যাদের মধ্যে অধিকাংশই শিশু ও তরুণী। গৃহশ্রমিক নির্যাতনের হার দিন দিন বেড়েই চলেছে। গত বছর দেশে ২৩ গৃহশ্রমিক মারাত্মকভাবে নির্যাতিত হয়। গত নয় বছরে হতাহত হয়েছে ৫১২ গৃহশ্রমিক। কভিড-১৯ পরিস্থিতিতে অনেকে বেতন পায়নি।
গৃহশ্রমিকদের সংখ্যা নিয়ে তথ্যের ঘাটতি আছে জানিয়ে মোস্তাফিজ আহমেদ বলেন, গৃহশ্রমিকদের একটি সুনির্দিষ্ট ডাটাবেজ থাকা দরকার। এমনিতেই গৃহশ্রমিকরা সুরক্ষিত নয়, তার ওপর করোনা তাদের আরও ঝুঁকির মুখে ফেলেছে। বর্তমানে ৯৫ শতাংশ গৃহশ্রমিক কাজে যেতে পারছে না।
স্কপ গৃহশ্রমিকদের আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করার জন্য কাজ শুরু করেছে জানিয়ে নইমুল আহসান জুয়েল বলেন, গৃহশ্রমিকরা যে কত অসহায়, করোনা সেটি পরিস্কারভাবে বুঝিয়ে দিয়েছে। গৃহশ্রমিকদের শুধু নীতিমালা থাকলেই চলবে না, তার বাস্তবায়ন হতে হবে এবং তাদের সংগঠিত হওয়ার অধিকার দিতে হবে।
রাজেকুজ্জামান রতন বলেন, অদৃশ্য করোনা কর্মক্ষেত্রে গৃহশ্রমিকদের অনুপস্থিতিকে আরও দৃশ্যমান করে তুলেছে। কোনো কোনো পরিবারে গৃহশ্রমিককে এতদিন গুরুত্বহীন মনে করা হলেও এখন তাদের অনুপস্থিতির যাতনা উপলব্ধি করা যাচ্ছে। বিপদে যাদের গুরুত্ব বোঝা গেছে, তাদের বিপদে পাশে দাঁড়াতে সবার প্রতি তিনি আহ্বান জানান। গৃহশ্রমিকদের সুরক্ষায় নিবন্ধন কার্যক্রম শুরু করার বিষয়ে গুরুত্বারোপ করে তিনি বলেন, কাজের দক্ষতা উল্লেখ করে গৃহশ্রমিকদের পরিচয়পত্র দেওয়া প্রয়োজন। গৃহশ্রমিকদের জন্য একটি মজুরির মানদ নির্ধারণ করাও দরকার।
আবুল হোসাইন বলেন, গৃহশ্রমিকরা কাজ হারিয়ে আর্থিক সংকটের মধ্যে রয়েছেন। তাদের কাজের নিশ্চয়তা, নিয়োগপত্র ও নির্দিষ্ট মজুরি নেই। বাজেটে সামাজিক নিরাপত্তা তহবিলে বরাদ্দ বাড়িয়ে তা বাস্তবায়নের দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, সরকারি সহায়তা ছাড়া গৃহশ্রমিকদের সুরক্ষা সম্ভব নয়।
গৃহশ্রমিকদের অধিকার বিষয়ে বেশি বেশি প্রচার চালাতে হবে উল্লেখ করে অভিনেত্রী দীপা খন্দকার বলেন, অনেক নিয়োগকারী জানেন না গৃহশ্রমিকের প্রতি তাদের দায়িত্ব ও কর্তব্য। তিনি মিডিয়ায় প্রচারের মাধ্যমে প্রত্যেক ঘরে ঘরে গৃহশ্রমিকদের অধিকার বিষয়ক বার্তা পৌঁছে দেওয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
স্বাগত বক্তব্যে ড. দীপঙ্কর দত্ত বলেন, করোনায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে শ্রমজীবী মানুষের। এর মধ্যে গৃহশ্রমিক অন্যতম। গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর অংশ গৃহশ্রমিকরা কাজের উদ্দেশ্যে শহরে আসে। কিন্তু করোনা তাদের শহর থেকে বিতাড়িত করেছে। এ ক্ষেত্রে সরকারি সাহায্য কতটুকু তাদের কাছে পৌঁছেছে, সেটি মনিটরিং করার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে।
কাজী আব্দুল হান্নান বলেন, করোনার কারণে পরিস্থিতি বদলে গেছে। করোনা-উত্তর পরিস্থিতিতে গৃহশ্রমিকদের জন্য আগের নীতিমালায় কাজ হবে না। বর্তমান পরিস্থিতিতে দেখা যাচ্ছে তাদের কর্মসংস্থান সংকুচিত হয়ে এসেছে। অর্থনৈতিক মন্দার প্রভাব তাদের ওপর বেশি পড়তে পারে।
শাহীন আক্তার ডলি বলেন, গৃহকর্মীদের অধিকার ও সুরক্ষা প্রতিষ্ঠায় আমরা দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছি। এই আন্দোলনকে আরও বেগবান করতে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।
মাহমুদুল হাসান লিখন বলেন, করোনা হয়তো একদিন শেষ হবে। কিন্তু গৃহশ্রমিক নির্যাতনের শেষ কোথায় কেউ জানে না। তাদের কর্মঘণ্টা এবং নির্যাতন কমানোর বিষয়ে নীতিমালা হলেও এর সুস্পষ্ট বাস্তবায়ন নেই। দেশে গৃহশ্রমিক নির্যাতন বন্ধে সরকারের উচিত কেন্দ্রীয় ব্যবস্থাপনা চালু করা। যাতে কেউ গৃহশ্রমিক নিয়োগ দিতে চাইলে সরকারের অনুমতি নিতে হয়।
শেখ রওশন আমিন বলেন, পারিবারিক ও সামাজিক মূল্যবোধের জায়গা থেকে গৃহকর্মীদের জন্য কাজ করতে হবে। তাদের অধিকার, মর্যাদা ও সুরক্ষার বিষয়টিকে সর্বোচ্চ প্রাধান্য দিতে হবে।
নাকীব রাজীব আহমেদ বলেন, প্রাতিষ্ঠানিক পেশা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চাইলে গৃহকর্মীদের জন্য পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণের দরকার। সুনীতি প্রকল্প সেটি করার চেষ্টা করছে। করোনা পরিস্থিতিতে বোঝা গেছে, প্রতিটি পরিবারে গৃহকর্মীদের ভূমিকা কত গুরুত্বপূর্ণ। সে বিবেচনায় যেন তাদের প্রতি নির্যাতন বন্ধে সবাই তৎপর হয়।
দু'জন গৃহশ্রমিক নাজমা আক্তার ও মুন্নি আক্তার বলেন, গত চার মাস তারা বেকার। মালিক তাদের খোঁজ নেয়নি। তারা এ পরিস্থিতিতে ঘর ভাড়া দিতে পারছেন না। ঘর ভাড়ার জন্য চাপ রয়েছে। করোনা পরিস্থিতি আরও দীর্ঘায়িত হলে তাদের দুর্ভোগ বাড়বে।
সেমিনারে বক্তারা গৃহশ্রমিকদের শ্রম আইনে অন্তর্ভুক্ত করে তাদের শ্রমিক হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া, গ্রামীণ এবং শহরকেন্দ্রিক বৈষম্য দূর করা, গৃহশ্রমিকদের জন্য মনিটরিং সেলের কার্যক্রম বৃদ্ধি ও সহজ করা, তাদের স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করা এবং ওয়ার্ডভিত্তিক কমিটি গঠনের জোর দাবি জানান।
উল্লেখ্য, সারা বিশ্বে প্রতি বছর ১৬ জুন আন্তর্জাতিক গৃহশ্রমিক দিবস পালিত হয়ে থাকে। এ বছর দিবসটি পালনের অংশ হিসেবে বিলস, গণসাক্ষরতা অভিযান, হ্যালোটাস্ক, নারী মৈত্রী, রেড অরেঞ্জ লিমিটেড ও ইউসেপ বাংলাদেশ যৌথভাবে অক্সফ্যাম বাংলাদেশের সহযোগিতায় ও গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্স কানাডার অর্থায়নে সুনীতি প্রকল্পের উদ্যোগে এই অনলাইন আলোচনার আয়োজন করে।