করোনার প্রভাব

সঞ্চয় ভেঙে খাচ্ছে মধ্যবিত্ত

চাকরি হারানোয় অনেকেই টাকা তুলে ব্যবসা শুরুর চেষ্টায়

প্রকাশ: ২৬ জুন ২০২০     আপডেট: ২৬ জুন ২০২০       প্রিন্ট সংস্করণ

ওবায়দুল্লাহ রনি

কেরানীগঞ্জের আব্দুল্লাহপুর বাজারের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী আলী হোসেন। বছরখানেক আগে বেসরকারি একটি ব্যাংকে পাঁচ হাজার টাকা করে দুটি ডিপিএস খুলেছিলেন। তবে করোনা মহামারি শুরুর পর ব্যবসা-বাণিজ্য ভালো না যাওয়ায় তার এখন সংসার চালানো দায় হয়ে পড়েছে।

টানা তিন মাস কিস্তির টাকা জমা দিতে পারেননি। কত দিনে অবস্থা ঠিক হবে, তা নিয়ে নিশ্চয়তা থেকে চলতি সপ্তাহে দুটি ডিপিএস ভেঙে ফেলেছেন। আলী হোসেনের মতো নিম্ন মধ্যবিত্তদের অনেকেই এখন আমানতের টাকা তুলে সংসার চালাচ্ছেন। জীবনযুদ্ধে টিকে থাকতে জমানো টাকা তুলে নিচ্ছেন হরহামেশা। আমানত উত্তোলন বেড়ে যাওয়া এবং নতুন আমানত কমে যাওয়ায় এখন ঋণের চাপ না থাকলেও ব্যাংকের দৈনন্দিন চাহিদা মেটাতে আন্তঃব্যাংক কলমানি ও বাংলাদেশ ব্যাংকে ধরনা দিচ্ছে কোনো-কোনো ব্যাংক।

ব্যাংকাররা জানান, গত কয়েক বছরে উচ্চবিত্ত ও মধ্যবিত্তদের পাশাপাশি রিকশাচালক, দিনমজুর, মুদি দোকানি, হোটেল কর্মচারী, অনানুষ্ঠানিক খাতের চাকরিজীবীসহ সব শ্রেণি-পেশার মানুষের মধ্যে সঞ্চয়ের একটা মনোভাব গড়ে উঠেছিল। ৫০০ টাকা থেকে শুরু করে বিভিন্ন পরিমাণের অর্থ মাসিক ভিত্তিতে সঞ্চয় করছিলেন অনেকে। আবার একবারে হাতে ৫০ হাজার, এক লাখ বা যে কোনো পরিমাণ টাকা এলে তা মেয়াদি আমানত হিসেবে জমা রাখছিলেন। তবে করোনাভাইরাসের কারণে এখন হঠাৎ অনেকে কর্মহীন হয়ে পড়েছেন। আয় না থাকায় অনেকেই শহর ছেড়ে গ্রামে ফিরছেন। এমন অবস্থায় সংসার চালাতে মাঝপথে সঞ্চয় ভেঙে ফেলছেন। চাকরি হারানোয় কেউ কেউ টাকা তুলে নিজেই ব্যবসা দাঁড় করানোর চেষ্টা করছেন। কেউবা আবার তুলনামূলক বেশি লাভে অন্য কোথাও বিনিয়োগ করছেন। আরেকটি শ্রেণি আছে যাদের আয় না কমলেও কখন কী হয় এই অনিশ্চয়তা থেকে টাকা তুলে নিচ্ছেন। কেউ কেউ আগে হয়তো মাসিক বেতন পর্যায়ক্রমে তুলে খরচ চালাতেন, কিন্তু এখন পুরো টাকা একবারে তুলে বাসায় রাখছেন। এসব কারণে বাংলাদেশ ব্যাংক তারল্য বাড়াতে নানা সুবিধা দিলেও অনেক ব্যাংকে নগদ টাকার ওপর একটা চাপ তৈরি হয়েছে।

জানতে চাইলে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ড. এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম সমকালকে বলেন, আয় না থাকায় অনেকে সঞ্চয় ভেঙে খাচ্ছে। দ্বিতীয়ত ব্যাংকের সুদহার অনেকে কমেছে। এতে করে ব্যাংকে টাকা রাখা প্রকৃতপক্ষে লোকসান। কেননা ৬ শতাংশের মতো মূল্যস্টম্ফীতির এই সময়ে আমানতে ৬ শতাংশের কম সুদ দেওয়া হচ্ছে। আবার সরকারের আবগারি শুল্ক্ক, অ্যাকাউন্ট রক্ষণাবেক্ষণ চার্জসহ নানা চার্জ রয়েছে। এমন সময়ে জীবনযাপনের প্রয়োজনে মানুষ চাইবে লাভজনক অন্য কোনো খাতে বিনিয়োগ করতে। এখন দেখা যাচ্ছে, স্বর্ণে বিনিয়োগ অনেক বেড়ে গেছে।

জানা গেছে, নগদ টাকার ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হলেও সামগ্রিকভাবে ব্যাংক খাতে এখন পর্যন্ত তারল্য ঘাটতি নেই। এর অন্যতম কারণ ব্যবসা-বাণিজ্য বন্ধ থাকায় ঋণ চাহিদা নেই বললেই চলে। ফলে করোনাভাইরাসের এ সময়ে আদায় না থাকলেও কাগজে-কলমে ব্যাংক খাতের উদ্বৃত্ত বেড়ে এপ্রিল শেষে এক লাখ ১৩ হাজার ৮০৭ কোটি টাকা হয়েছে। গত মার্চ শেষে উদ্বৃত্ত ছিল ৮৯ হাজার ৯০৯ কোটি টাকা। আর গত ডিসেম্বর শেষে যা ছিল এক লাখ ৫ হাজার ৬৪৬ কোটি টাকা। মূলত ব্যাংকগুলোর নগদ জমা সংরক্ষণের হার গত ২৩ মার্চ দশমিক ৫০ এবং ৯ এপ্রিল এক শতাংশ কমানো হয়। এতে করে ব্যাংকগুলোতে প্রায় ১৯ হাজার কোটি টাকার ঋণযোগ্য তহবিল তৈরি হয়েছে। এ ছাড়া বাজার থেকে বাংলাদেশ ব্যাংক ডলার কেনার ফলেও টাকা বেড়েছে। অবশ্য এই উদ্বৃত্ত তহবিলের বড় অংশই সরকারের ট্রেজারি বিল ও বন্ডে বিনিয়োগ করা আছে। তবে ব্যাংকগুলো চাইলে এসএলআরের অতিরিক্ত বিনিয়োগ ভাঙিয়ে যে কোনো সময় কাজে খাটাতে পারে। যে কারণে ব্যাংকিং পরিভাষায় এই অর্থকে উদ্বৃত্ত টাকা হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান সমকালকে বলেন, করোনাভাইরাসের প্রভাবে অনেকে চাকরি হারানোয় আয় নেই কিংবা কমেছে। অনেকে আবার এক ধরনের আতঙ্কের কারণে টাকা তুলে কাছে রাখছেন। এসব কারণে ব্যাংকগুলোর নগদ টাকার ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে। যদিও সামগ্রিকভাবে ব্যাংক খাতে এ মুহূর্তে তারল্য সংকট রয়েছে বলা যাবে না। তবে কিছু ব্যাংক সমস্যায় আছে। এসব ব্যাংক গ্রাহকের দৈনন্দিন চাহিদা মেটানো, সিআরআর সংরক্ষণ, ঋণ-আমানত অনুপাত (এডিআর) ঠিক রাখতে কলমানি বা বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ধার নিচ্ছে। এর বাইরে কোনো কোনো ব্যাংক হয়তো বিল বন্ডে টাকা খাটানোর কারণে ধার করতে হচ্ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, গত বুধবার গড়ে ৫ শতাংশ সুদে কলমানিতে ৯ হাজার ৭৬৭ কোটি টাকার লেনদেন হয়। আগের দিন মঙ্গলবার একই রকম সুদে লেনদেন হয়েছিল ১০ হাজার ২৮ কোটি টাকা। আর সপ্তাহের প্রথম দিন গত রোববার বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে কয়েকটি ব্যাংক নিয়েছে আরও এক হাজার ৩৭৬ কোটি টাকা। যদিও সাম্প্রতিক সময়ে আরও বেশি ধার নিচ্ছে ব্যাংকগুলো। সব মিলিয়ে দুই উপায়ে দৈনিক গড়ে ১২ থেকে ১৫ হাজার কোটি টাকা ধার করছে ব্যাংকগুলো।

জানা গেছে, কলমানি ও বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ব্যাপকভাবে ধার নেওয়ার প্রবণতা শুরু হয়েছে করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব ঠেকাতে সাধারণ ছুটি ঘোষণার পর থেকে। মূলত এ সময়ে অনেকে কর্মহীন হয়ে পড়ায় বা আতঙ্কের কারণে টাকা তুলে নিচ্ছে। যে কারণে নগদ টাকার চাহিদও বেড়েছে। ফলে সাধারণ ছুটি শুরুর পর প্রথম কর্মদিবস গত ৩১ মার্চ কলামানিতে মাত্র ৫৫ কোটি টাকা লেনদেন হয়। ১ এপ্রিল লেনদেনের পরিমাণ ছিল ৬৫০ কোটি টাকা। এভাবে বাড়তে বাড়তে মাঝে কয়েকদিন ১১ হাজার কোটি টাকার বেশি লেনদেন হয়। এভাবে ধার করে দৈনন্দিন চাহিদা মেটাচ্ছে অনেক ব্যাংক।

রাষ্ট্রীয় মালিকানার অগ্রণী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ শামস-উল ইসলাম সমকালকে বলেন, জুন ক্লোজিংয়ের কারণে সরকারের ঋণ চাহিদা রয়েছে। রাষ্ট্রীয় অনেক সংস্থা এখন ব্যাংক থেকে টাকা তুলে বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে জমা করছে। এ সময়ে সরকারের ঋণের দরকার হচ্ছে। ঝুঁকিমুক্ত বিনিয়োগ হিসেবে অনেক ব্যাংক সরকারি বিল ও বন্ডে বিনিয়োগে আগ্রহী। তবে আমানত কম পাওয়ায় তারা হয়তো বাংলাদেশ ব্যাংক বা কলমানি থেকে ধার নিয়ে চাহিদা মেটাচ্ছে। তবে এই অবস্থা সাময়িক বলে তিনি মনে করেন।

ব্যাংকাররা বিভিন্ন সভা-সেমিনারে বলছেন, করোনাভাইরাসের কারণে স্বাভাবিক ব্যবসায়িক কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ায় ঋণের আদায় হচ্ছে না। নতুন ঋণের চাহিদাও একেবারে কমে গেছে। ব্যাংকারদের বেতন-ভাতা কমানোর জন্য ব্যাংকের উদ্যোক্তাদের সংগঠন বিএবি যে চিঠি দিয়েছে সেখানে বেতন কমানোর বেশ কয়েকটি কারণ তুলে ধরা হয়। যার এক নম্বরে বলা হয়, উল্লেখযোগ্য হারে ঋণ কমেছে। এ ছাড়া সুদহার কমে যাওয়া, বৈদেশিক বাণিজ্য না থাকা এবং ঋণ আদায় না হওয়াকে কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। ব্যাংকাররাও জানান, ঋণের কিস্তি না দিলেও খেলাপি করা যাবে না ঢালাওভাবে এই সুবিধার ফলে ইচ্ছা করেই অনেকে গ্রাহক টাকা দিচ্ছে না। আবার মাঝে দুই মাসের সুদ স্থগিতের পর অনেকেই এমন ধারণা করছেন, হয়তো এক পর্যায়ে সব সুদ মাফ করে দেবে সরকার। এসব নিয়ে বিভ্রান্ত্রির কারণে আদায় কম রয়েছে। এর মধ্যে মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তদের অনেকেই আমানত তুলে নেওয়ায় বাড়তি চাপের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

বিষয় : করোনা