আট জেলায় বন্যার আরও অবনতি

লাখো মানুষ পানিবন্দি, দেখা দিয়েছে ভয়াবহ নদীভাঙন

প্রকাশ: ২৮ জুন ২০২০     আপডেট: ২৮ জুন ২০২০       প্রিন্ট সংস্করণ

সমকাল ডেস্ক

ব্রহ্মপুত্র নদের পানি বেড়ে যাওয়ায় গাইবান্ধার ফুলছড়ির পাঁচ গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। বন্যাকবলিত মানুষ ছুটছে নিরাপদ আশ্রয়ে- ফোকাস বাংলা

ব্রহ্মপুত্র নদের পানি বেড়ে যাওয়ায় গাইবান্ধার ফুলছড়ির পাঁচ গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। বন্যাকবলিত মানুষ ছুটছে নিরাপদ আশ্রয়ে- ফোকাস বাংলা

টানা বর্ষণ ও উজানের ঢলে দেশের উত্তরাঞ্চলের জেলা কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, গাইবান্ধা, দিনাজপুর ও পাবনা এবং উত্তর-পূর্বাঞ্চলের জেলা সিলেট ও সুনামগঞ্জ এবং জামালপুরের সব নদীতে পানি বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। এতে এসব এলাকায় বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। প্লাবিত হয়েছে নতুন নতুন এলাকা। পানিবন্দি হয়ে পড়েছে লাখ লাখ মানুষ। দেখা দিয়েছে ভয়াবহ নদীভাঙন। পানিতে ঘরবাড়ি ডুবে ও নদীতে বিলীন হয়ে যাওয়ায় অনেকে উঁচু সড়কে আশ্রয় নিয়েছেন। বন্যাদুর্গত এলাকায় দেখা দিয়েছে খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানির তীব্র সংকট। অথচ দুর্গতদের কাছে পৌঁছায়নি সরকারি-বেসরকারি সহায়তা।

ব্যুরো, অফিস ও প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর-

কুড়িগ্রাম : কুড়িগ্রামের বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটেছে। ব্রহ্মপুত্র ও ধরলা নদীর পানি প্রবাহ তিনটি পয়েন্টে বিপদসীমার অনেক ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। ফলে নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হয়েছে। ইতোমধ্যে জেলার সদর, ফুলবাড়ী, নাগেশ্বরী, উলিপুর, চিলমারী, রৌমারী ও রাজিবপুর- এই সাত উপজেলার ২২টি ইউনিয়নের দুই শতাধিক গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। তলিয়ে গেছে অনেক বাড়িঘর। পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন প্রায় ২৫ হাজার পরিবারের লক্ষাধিক মানুষ। গ্রামীণ হাট-বাজারে পানি ঢুকেছে। তলিয়ে গেছে গ্রামীণ সড়ক। এ ছাড়া বাড়িতে পানি ওঠায় অনেকে বাড়িঘর ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ে চলে আসতে শুরু করেছেন। সেই সঙ্গে দুর্ভোগ বাড়ছে বন্যাদুর্গতদের। পাশিপাশি পানিতে তলিয়ে গেছে এক হাজার ৭০০ হেক্টরের মতো বিভিন্ন ফসলের ক্ষেত।

এর মধ্যে সদর উপজেলার যাত্রাপুর ইউনিয়নের ৩০ গ্রামে ১৫ হাজার মানুষ, উলিপুরের বেগমগঞ্জে ১৩ গ্রামে ১০ হাজার, হাতিয়ায় ১২ গ্রামে ১২ হাজার, চিলমারীর অষ্টমীরচরে ৪২টি গ্রামে ১০ হাজার এবং নয়ারহাট ইউনিয়নের আটটি গ্রামে ৫ হাজারসহ ২২টি ইউনিয়নে লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন বলে সংশ্নিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানরা জানিয়েছেন।

এদিকে কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আরিফুল ইসলাম জানিয়েছেন, গতকাল শনিবার বিকেল ৩টায় ধরলার ফেরিঘাট পয়েন্টে ৪৬ সেন্টিমিটার, ব্রহ্মপুত্রের চিলমারী পয়েন্টে ৪২ সেন্টিমিটার ও নুনখাওয়া পয়েন্টে ২৮ সেন্টিমিটার বিপদসীমার ওপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হয়েছে।

লালমনিরহাট : গতকাল শনিবার বিকেল ৩টায় লালমনিরহাটের তিস্তা ব্যারাজের ডালিয়া পয়েন্টে তিস্তার পানি বিপদসীমার ২০ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। ধরলা নদীর পানি বিপদসীমা ছুঁই ছুঁই করছে। ফলে লালমনিরহাটের আদিতমারী, কালীগঞ্জ, হাতীবান্ধা ও সদর উপজেলার আটটি ইউনিয়নের ২০টি গ্রামের নদী-তীরবর্তী নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। এতে প্রায় আট হাজার পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। ক্ষতি হয়েছে উঠতি বাদাম ও ভুট্টা আবাদের। এদিকে গত বৃহস্পতিবার রাত থেকে শনিবার পর্যন্ত সদর উপজেলার চর গোকুন্ডা গ্রামের ২৫টি বসতবাড়ি নদীতে বিলীন হয়েছে। ভাঙন থেকে বাঁচতে অনেকেই নিজেদের বাড়িঘর অন্যত্র সরিয়ে নিরাপদে চলে যাচ্ছেন। ওই গ্রামের ছবের উদ্দিনের ছেলে শহিদ জানান, তার মতো অনেকেই বসতভিটা হারিয়ে নিস্ব হয়েছে। তার অন্য দুই ভাই শফিকুল ও রফিকুল অন্যের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছেন।

দিনাজপুর : দিনাজপুরের প্রায় সব নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় বেশ কিছু নিচু এলাকা প্লাবিত হয়েছে। অনেকের বাসাবাড়িতে পানি প্রবেশ করেছে। তলিয়ে গেছে জমির ফসল। বিশেষ করে নদীতীরবর্তী এলাকার বাসিন্দারা পড়েছেন বিপাকে।

পাবনা : পাবনায় বাড়তে শুরু করেছে বিভিন্ন নদ-নদীর পানি। গত ২৪ ঘণ্টায় জেলার তিনটি উপজেলার নিম্নাঞ্চল ডুবে গেছে। এরই মধ্যে ঈশ্বরদীর সাঁড়া, পাকশী, লক্ষ্মীকু া, সুজানগরের বরখাপুর, নাজিরগঞ্জের চর ও বেড়া উপজেলার চর পঁচাকোলা, নাকালিয়াসহ নদীতীরবর্তী বিভিন্ন এলাকার সবজি ক্ষেত তলিয়ে গেছে।

ফুলছড়ি (গাইবান্ধা) : ফুলছড়ি উপজেলার গজারিয়া, খাটিয়ামারী, ইউনিয়নের বেশিরভাগ এলাকা ও যমুনা নদীবেষ্টিত সাঘাটা উপজেলার হলদিয়া, পালপাড়া, চিনিরপটল, চকপাড়া, পবনতাইড়, থৈকরপাড়া, বাঁশহাটা, মুন্সিরহাট, গোবিন্দি, নলছিয়াসহ বিভিন্ন গ্রামে পানি ঢুকতে শুরু করেছে।

সুনামগঞ্জ, ছাতক ও তাহিরপুর : সুনামগঞ্জে নদীতীরবর্তী এলাকা ও নিম্নাঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতির দেখা দিয়েছে। সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের দায়িত্বশীলরা জানিয়েছেন, গতকাল শনিবার দুপুর ১২টায় সুনামগঞ্জ শহরের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া সুরমা নদীর পানি বিপদসীমার ৫৭ সেন্টিমিটার এবং পাহাড়ি নদী জাদুকাটার পানি বিপদসীমার ৫৬ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। এতে সুনামগঞ্জ শহরের ষোলঘর, কাজীর পয়েন্ট, উত্তর আরপিননগর, তেঘরিয়া, বড়পাড়া এলাকার চলাচলের সড়কে এবং কিছু নিচু ঘরবাড়িতেও পানি উঠেছে।

এ ছাড়া সুনামগঞ্জ সদর, দোয়ারাবাজার, বিশ্বম্ভরপুর এবং তাহিরপুর উপজেলার নিম্নাঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। এর মধ্যে ছাতকের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া সুরমা নদীর পানি বিপদসীমার ১২০ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এতে ছাতক শহর, নোয়ারাই, ছৈলা আফজলাবাদ, জাউয়াবাজার ইউনিয়নসহ উপজেলার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। সুরমা তীরের সব ক্রাশার মিল বন্ধ রয়েছে।

এদিকে পাহাড়ি ঢলে তাহিরপুরের প্রায় ৫০ গ্রামের মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। বসতবাড়িতে পানি ওঠার কারণে শনিবার সকাল থেকেই তাদের রান্নাবান্না বন্ধ হয়ে গেছে। যাদুকাটা নদীর তীরবর্তী গ্রামগুলোর বসতবাড়িগুলো তিন থেকে চার ফুট পানির নিচে পড়েছে।

সিলেট ব্যুরো ও গোয়াইনঘাট (সিলেট) : সিলেটে সবক'টি নদ-নদীর পানি বাড়ছে। এতে নিম্নাঞ্চলের অনেক এলাকা ডুবে গেছে। নদীতীরের তিন উপজেলা কোম্পানীগঞ্জ, গোয়াইনঘাট ও জৈন্তাপুরে নিম্নাঞ্চল পানিতে তলিয়ে গেছে। সারি-গোয়াইনঘাট সড়কসহ বেশ কিছু গ্রামীণ সড়ক পানিতে ডুবেছে। আবহাওয়ার পূর্বাভাস অনুযায়ী, বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকলে বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি হওয়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্নিষ্টরা। এদিকে গোয়াইনঘাটে সৃষ্ট বন্যা পরিস্থিতি অপরিবর্তিত রয়েছে। উপজেলার ১০টি ইউনিয়নের অধিকাংশ এলাকা পানির নিচে। পানিবন্দি পরিবারগুলোর মধ্যে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে জাফলং চা বাগান এলাকায় কিছু শুকনো খাবার বিতরণ করা হলেও এখন পর্যন্ত সরকারি-বেসরকারি কোনো ত্রাণ সহায়তা কোথাও দেওয়া হয়েছে বলে খবর পাওয়া যায়নি।

জামালপুর : জামালপুরের যমুনা তীরবর্তী ইসলামপুর ও দেওয়ানগঞ্জ উপজেলা ছয়টি ইউনিয়ন বন্যায় প্লাবিত হয়েছে। পানির নিচে তলিয়ে গেছে ওই দুই উপজেলার নিম্নাঞ্চলের ঘরবাড়ি, রাস্তাঘাট ও ফসলি জমিসহ বিস্তীর্ণ জনপদ। দুর্গত এলাকার বেশিরভাগ মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে চলে যাচ্ছে আশ্রয়কেন্দ্র বা নিরাপদ আশ্রয়ের উদ্দেশ্যে। জামালপুরের বাহাদুরাবাদ এলাকায় যমুনা নদীর পানি শুক্রবার গভীর রাতে হঠাৎ বিপদসীমার ১৮ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হতে শুরু করে। ফলে মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে বন্যার পানিতে প্লাবিত হয়ে পড়ে ইসলামপুর ও দেওয়ানগঞ্জ উপজেলার ছয়টি ইউনিয়নের নিম্নাঞ্চল।