গত ১১ জুন ঘোষণা করা হয়েছে ২০২০-২১ অর্থবছরের বাজেট। এবারের বাজেটের আকার ৫ লাখ ৬৮ হাজার টাকা এবং বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে ব্যয় হবে ২ লাখ ৫ হাজার ১৪৫ কোটি টাকা।

শিক্ষা ও প্রযুক্তি খাতে এবারে বরাদ্দ ৮৫ হাজার ৭৬২ কোটি টাকা, যা বাজেটের ১৫.১% এবং জিডিপির ২.৭%। বিদায়ী অর্থবছরে শিক্ষা ও প্রযুক্তিখাতে বরাদ্দ ছিল মোট বাজেটের ১৫.২% এবং জিডিপির ২.৭৫%। কিন্তু শিক্ষা খাতে ছিল বাজেটের ১১.৬৮% এবং জিডিপির ২.১%। এবারের বাজেটে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ ৬৬ হাজার ৪০১ কোটি টাকা, যা বাজেটের ১১.৬৯% এবং জিডিপির ২.০৯%। সেই অনুযায়ী শিক্ষা খাতে বরাদ্দ শতকরা হিসাবে বৃদ্ধি ০.০১ শতাংশ এবং জিডিপির হিসাবে হ্রাস পেয়েছে ০.০১%।

বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী সব প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ল্যাপটপ ও মাল্টিমিডিয়া প্রজেক্টরসহ ইন্টারনেট সংযোগ দেওয়া, ৫০৩টি মডেল প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ইন্টারঅ্যাকটিভ ক্লাসরুম তৈরি করা, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও সমতাভিত্তিক গুণগত প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিত করা, দারিদ্রপীড়িত এলাকায় বিশেষ স্কুল ফিডিং, শিক্ষার্থীদের প্রোফাইল প্রণয়ন এবং বিদ্যালয়গুলোতে আইসিটি ল্যাব স্থাপন করার ঘোষণা দেন। নতুন অর্থবছরে মাধ্যমিক স্তরে পাঁচ লাখ ৫৭ হাজার ছাত্র, ১০ লাখ ৯৫ হাজার ছাত্রী, উচ্চ মাধ্যমিক স্তরে এক লাখ ১৬ হাজার ছাত্র, চার লাখ ৬২ হাজার ছাত্রী এবং ডিগ্রী স্তরে ৫০ হাজার ছাত্র ও এক লাখ ৫০ হাজার ছাত্রীকে উপবৃত্তি এবং পাবলিক পরীক্ষার ফলের ভিত্তিতে এক লাখ ৮৭ হাজার শিক্ষার্থীকে মেধাবৃত্তি দেয়া হবে বলে উল্লেখ করেন। দেশব্যাপী এক হাজার ৮০০টি মাদ্রাসার নতুন ভবন নির্মাণ এবং ৬৫৩টি মাদ্রাসায় আধুনিক মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুমে স্থাপন করার ঘোষণা দেন। 

শিক্ষা খাতে বরাদ্দের দুই-তৃতীয়াংশই ব্যয় হয় শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা প্রদানে, আর এক-তৃতীয়াংশ ব্যয় হয় শিক্ষার উন্নয়নে। সত্যি সত্যি শিক্ষার উন্নয়ন চাইলে বেতন-ভাতার চেয়ে উন্নয়ন খাতে বরাদ্দের পরিমাণ বেশি হওয়া প্রয়োজন। আধুনিক ও প্রযুক্তিনির্ভর শ্রেণিকক্ষ প্রতিষ্ঠার প্রয়োজন।মেধাবীরা যাতে শিক্ষকতা পেশায় আসতে ও থাকতে উৎসাহিত হন, শিক্ষাঙ্গনে এমন পরিবেশ তৈরি করা গুরুত্বপূর্ণ। জনশক্তিকে জনসম্পদে পরিণত করতে হলে শিক্ষায় বরাদ্দ যেমন বাড়াতে হবে, তেমনি সেই বরাদ্দ কীভাবে খরচ হচ্ছে, সেটিও বিবেচনার বিষয়।

শিক্ষার দুই মন্ত্রণালয়ের জন্য বরাদ্দই মূলত শিক্ষা খাতের বরাদ্দ। উন্নতির সুফল দীর্ঘ মেয়াদে পেতে চাইলে শিক্ষা খাতে উল্লেখযোগ্য হারে বিনিয়োগের প্রয়োজন। তাই শিক্ষাবিদ, অর্থনীতিবিদ ও উন্নয়ন বিশেষজ্ঞরা বরাবরই শিক্ষা খাতে সর্বোচ্চ বরাদ্দের দাবি জানিয়ে থাকেন; কিন্তু শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বাজেটের ১১-১২ শতাংশ এবং মোট জিডিপির ২ শতাংশের মধ্যেই ঘুরপাক খায় সবসময়।

ইউনেস্কো এডুকেশন ফ্রেমওয়ার্কের পরামর্শ অনুযায়ী একটি দেশের জিডিপির ৪-৬ শতাংশ ও মোট বাজেটের ১৫-২০ শতাংশ শিক্ষা খাতে বরাদ্দ রাখার কথা। এমনকি বাংলাদেশ সরকারের সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনাতেও উল্লেখ আছে জিডিপির অন্তত ২.৮৪ শতাংশ শিক্ষা খাতে বরাদ্দ রাখার ব্যাপারে। ইউনেস্কো-আইএলও যৌথ উদ্যোগে ১৯৯৪ খ্রিষ্টাব্দে শিক্ষকের মর্যাদা ও শিক্ষার মানোন্নয়নে ঘোষিত নীতিমালায় বলা আছে, জিডিপির ৬ শতাংশ বা জাতীয় বাজেটের ২০ শতাংশ বরাদ্দ করতে হবে শিক্ষাখাতে, যে রেজুলেশনে বাংলাদেশ একমত পোষণ করে স্বাক্ষর করেছিল।ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত দেশ গঠনের পাশাপাশি দুই দশকের মধ্যে উচ্চ আয়ের দেশে রূপান্তরের এবং এক দশকের সামান্য বেশি সময়ের মধ্যে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবায়নে সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের চলমান এই যুগে আমাদের গুনগত শিক্ষায় শিক্ষিত, দক্ষ, কর্মঠ, প্রগতিশীল ও উদ্ভাবনী চেতনার মানবসম্পদ দ্বারাই এ লক্ষ্যগুলো অর্জন করা সম্ভব। 

বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করে বের হওয়া শিক্ষার্থীদের মধ্যে চাকরি পাওয়ার জন্য বছরের পর বছর অপেক্ষা করতে হয় সেখানে দেশের প্রতিষ্ঠানগুলো দক্ষ জনবলের অভাব মেটাতে বিদেশি নাগরিককে নিযুক্ত করে এবং এ বাবদ প্রতিবছর দেশ থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে পাঁচ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। যার কারণ হলো গুনগত শিক্ষায় আমরা আন্তর্জাতিক মান থেকে পিছিয়ে। ২০১০ সালে প্রণীত জাতীয় শিক্ষানীতির মূলকথা ছিল শিক্ষায় সকল বৈষম্য দূর করা এবং বিশ্বমানের শিক্ষাব্যবস্থা চালু করা। জাতীয় শিক্ষানীতি বাস্তবায়নের জন্য এবারের বাজেটেও পৃথক কোনো বরাদ্দ নেই।

চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের উত্তরণকালে গুণগত শিক্ষার জন্য ইউনেস্কো কর্তৃক ঘোষিত পরিমাণ বরাদ্দই শিক্ষা খাতে রাখা উচিত। জনপ্রত্যাশা থাকলেও শিক্ষকদের জন্য পৃথক বেতন স্কেল, শিক্ষক নিয়োগের পৃথক কর্ম কমিশন ও বেসরকারি শিক্ষকদের চাকুরি জাতীয়করণের কোনো আশ্বাস বাজেটে আসেনি।  শিল্পবিপ্লব ৪ এর সমান্তরাল শিক্ষাব্যবস্থা হচ্ছে এডুকেশন ৪, যা শ্রেণি পঠন-পাঠন থেকে শুরু করে শিক্ষার প্রতিটি ক্ষেত্রে বিশেষ বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণকে নিশ্চিত করে। এডুকেশনের বিভিন্ন জেনারেশন রয়েছে। শিক্ষাবিজ্ঞানে এ জেনারেশনগুলো এডুকেশন ১, এডুকেশন ২ , এডুকেশন ৩ ও এডুকেশন ৪ নামে পরিচিত। আধুনিক চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের সুবিধা গ্রহণে অবশ্যই আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাকে এডুকেশন ৪- এ উত্তরিত হতে হবে, নতুবা ইনোভেটিভ, প্রডাকটিভ এবং যুগের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় চৌকস প্রজন্ম তৈরি অধরাই রয়ে যাবে।

এসডিজি ৪ , চতুর্থ শিল্পবিপ্লব , এডুকেশন ৪ এগুলো আমাদের জন্য অনেকটাই নতুন। নতুন যে কোন কিছুতে সাফল্য অর্জনের জন্য প্রয়োজন প্রচুর গবেষণা যা কোভিড ১৯ আমাদেরকে চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে যাচ্ছে। একটু একটু করে গবেষণার মাধ্যমে কোভিড-১৯ এর প্রভাব থেকে রক্ষা পেতে এগিয়ে যেতে হচ্ছে বিশ্বকে ততক্ষণে আমরা হারিয়ে ফেলছি অনেক প্রিয়জনকে। শিক্ষায় প্রযুক্তির ব্যবহারে আমাদের যেতে হবে আরও অনেক দূর।

এছাড়াও শিক্ষাক্ষেত্রে আমাদের রয়েছে আরও অনেক সীমাবদ্ধতা। কেন আমরা বাস্তবায়ন করতে পারছিনা আমাদের স্বপ্নের শিক্ষানীতি ২০১০। এ সকল প্রশ্নের উত্তরের জন্য আমাদের প্রয়োজন শিক্ষাক্ষেত্রে অনেক গবেষণা। একাডেমিক প্রয়োজনে এবং ব্যাক্তি উদ্যোগে শিক্ষাক্ষেত্রে অনেক গবেষণা হলেও প্রাতিষ্ঠানিক ভাবে ব্যাপক পরিমানে শিক্ষাগবেষণা জরুরি।এজন্য শিক্ষা গবেষণায় দরকার বিশেষ বরাদ্দ। প্রয়োজন বাজেটে সুদৃষ্টি।

লেখক: পিএইচডি গবেষক, শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

billalhossainisc@gmail.com


মন্তব্য করুন