খোঁড়া যুক্তিতে পানির দাম বাড়াচ্ছে ওয়াসা

প্রকাশ: ২৯ জুন ২০২০     আপডেট: ২৯ জুন ২০২০       প্রিন্ট সংস্করণ

অমিতোষ পাল

যুক্তরাজ্যের লন্ডন শহরে প্রতি হাজার লিটার পানির মূল্য বাংলাদেশি মুদ্রার হিসাবে ৩৩০ টাকা। তাও প্রথম ১০ হাজার লিটার পর্যন্ত এই দাম। এর বেশি পানি ব্যবহার করলে তখন প্রতি হাজার লিটারে গুনতে হয় ৩৯০ টাকা। একইভাবে ফিলিপাইনের রাজধানী ম্যানিলায় প্রতি হাজার লিটার পানির মূল্য ১৮২ টাকা। বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকায় পানির দাম ওইসব দেশের তুলনায় অনেক কম। এ জন্যই পানির দাম বাড়াতে চায় ঢাকা ওয়াসা। ঢাকাকে তারা থাইল্যান্ডের ব্যাংকক, সুইডেনের স্টকহোম, দক্ষিণ কোরিয়ার সিউল, ভারতের নয়াদিল্লি ও নেপালের কাঠমান্ডুর সঙ্গে তুলনা করে পানির দাম বাড়ানোর যুক্তি উপস্থাপন করেছে। পানির দাম বৃদ্ধির সর্বশেষ যে প্রস্তাব স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছিল ঢাকা ওয়াসা, সেখানে এসব যুক্তি তুলে ধরা হয়েছে। ওই প্রস্তাবে বলা হয়েছে, ঢাকা ওয়াসার পানির উৎপাদন খরচ বেড়েছে। এর জন্য দাম বাড়াতে হবে। জানা গেছে, যেসব যুক্তি দেখিয়ে পানির দাম বৃদ্ধির দাবি করছে ওয়াসা, তার কোনোটিই গ্রহণযোগ্য নয়। তাদের আরও অনেক কারসাজি রয়েছে পানির মূল্য বৃদ্ধির যুক্তি দাঁড় করানোর পেছনে। তারপরও মন্ত্রণালয় ওয়াসার দাবির পরিপ্রেক্ষিতে পানির দাম কিছুটা বৃদ্ধি করে। আদালতের নিষেধাজ্ঞার কারণে সেই বর্ধিত মূল্য আদায় বন্ধ রয়েছে। ৩০ জুন অর্থাৎ আগামীকাল মঙ্গলবার আদালতে শুনানি হওয়ার কথা রয়েছে।
বিশিষ্ট লেখক-কলামিস্ট সৈয়দ আবুল মকসুদ এ প্রসঙ্গে বলেন, দেশে যখন করোনার মতো মহামারি চলছে, তখন ওয়াসার মাথায় পানির দাম বাড়ানোর চিন্তা আসে কীভাবে? আর মন্ত্রণালয়ই বা সেটাকে কীভাবে অনুমোদন দেয়। এ রকম পরিস্থিতিতে সরকারের উচিত বিল মওকুফ করা। সেটা না করে দাম বাড়াচ্ছে। এমনকি ব্যবহারের চেয়ে বেশি বিলও করছে।
ইনস্টিটিউট অব ইঞ্জিনিয়ার্স, বাংলাদেশের (আইইবি) ঢাকা কেন্দ্রের চেয়ারম্যান ও ঢাকা ওয়াসার বোর্ড সদস্য ওয়ালীউল্লাহ শিকদার বলেন, পানির দাম বৃদ্ধির ওই প্রস্তাব ওয়াসার বোর্ডের মাধ্যমে যায়নি। উচিত ছিল প্রস্তাবটি বোর্ডকে অবহিত করা। এই অবস্থায় পানির মূল্য বৃদ্ধির কোনো প্রয়োজন নেই বলে মনে করেন তিনি। বরং এতে সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
ওয়াসার এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ওয়াসা দাম বাড়ানোর সময় নেপাল-দিল্লি-লন্ডনের কথা বলে। নেপাল পাহাড়ি এলাকা। তাদের পানির খুব সংকট। এ জন্য তাদের উৎপাদন খরচ বেশি পড়ে। দিল্লি মরুভূমিপ্রবণ এলাকা। সেখানে ভূগর্ভস্থ পানি একেবারেই নেই।
বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ ও উন্মুক্ত স্থানের পানি শোধন করে সেটা সরবরাহ করা হয়। এ জন্য খরচ বেশি পড়ে। আর বাংলাদেশে ৭৫ শতাংশ পানি প্রকৃতি থেকে প্রাপ্ত বা ভূগর্ভস্থ। এ পানির উত্তোলন ব্যয় ছাড়া কোনো খরচই নেই। আর যুক্তরাজ্যে শ্রমের মজুরি অনেক বেশি এবং মানুষের আর্থিক সক্ষমতাও বেশি। তাদের সঙ্গে তো বাংলাদেশের তুলনাই আসে না। সবচেয়ে বড় কথা, ওইসব দেশে পাইপলাইনে যে পানি সরবরাহ করা হয়, তা ট্যাপ থেকে সরাসরি পানযোগ্য। কিন্তু ঢাকা শহরে ওয়াসা যে পানি সরবরাহ করে, সেটা ফুটিয়েও সম্পূর্ণ বিশুদ্ধ করা যায় কিনা, তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে। তাহলে কেন পানির দাম বাড়বে?
প্রতি বছরই পানির দাম বাড়াচ্ছে ওয়াসা :গত ১২ বছরে ঢাকা ওয়াসা ১৩ বার পানির দাম বাড়িয়েছে। ১৯৯৬ সালের ওয়াসার আইন অনুযায়ী প্রতি বছর পানির ৫ শতাংশ মূল্য বৃদ্ধির ক্ষমতা ওয়াসা বোর্ডের আছে। সেই ক্ষমতাবলে প্রতি বছরই ৫ শতাংশ হারে দাম বাড়িয়েছে ওয়াসা। ২০১৩ সালে এসে প্রতি বছর ১০ শতাংশ পানির দাম বাড়ানোর ক্ষমতা দেওয়ার জন্য মন্ত্রণালয়ে আবেদন করে ঢাকা ওয়াসা। যদিও মন্ত্রণালয় সেটি অনুমোদন করেনি। গত ১২ বছরে পানির দাম কেবল ৬০ শতাংশ নয়, মোটের ওপর প্রতি বছর ৫ শতাংশ হারে দাম বৃদ্ধির কারণে শতভাগ বেড়েছে এমনিতেই। সর্বশেষ গত বছরের ২ সেপ্টেম্বর ওয়াসা পানির দাম বৃদ্ধির জন্য মন্ত্রণালয়ে যে আবেদন দিয়েছে, সেখানে পানির দাম একেবারে প্রায় দ্বিগুণ করার প্রস্তাব দেওয়া হয়। আবাসিক গ্রাহকের ক্ষেত্রে প্রতি হাজার লিটার পানির দাম ১১ টাকা ৫৭ পয়সা থেকে ২০ টাকা ও বাণিজ্যিক গ্রাহকের ক্ষেত্রে ৩৭ টাকা ৪ পয়সার স্থলে ৬৫ টাকা নির্ধারণের দাবি জানায় ওয়াসা। অথচ তার আগে জুলাই মাসেই নিয়মিত হারে ৫ শতাংশ দাম বাড়ানো হয়। আগামী জুলাই থেকেও সেই নিয়মিত ৫ শতাংশ ঠিকই বাড়বে। এর বাইরে আরও দাম বাড়ানোর জন্য ওই প্রস্তাবটি দেওয়া হয়েছে। ওয়াসা গত এপ্রিল থেকে আবাসিক গ্রাহকের পানির দাম ১১ টাকা ৫৭ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ১৪ টাকা ৪৬ পয়সা (২৪.৯৭%) ও বাণিজ্যিক গ্রাহকের পানির দাম ৩৭ টাকা ৪ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ৪০ টাকা (৯.৯৪%) নির্ধারণ করে বিল আদায়ও শুরু করেছে।
পদ্মা ও ভাকুর্তা প্রকল্পের ব্যর্থতার মূল্য দিতে হচ্ছে গ্রাহকদের :প্রায় চার হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে পদ্মা থেকে রাজধানীতে পানি সরবরাহের পদ্মা (জশলদিয়া) প্রকল্প থেকে প্রতিদিন ৪৫ কোটি লিটার পানি পাওয়ার কথা। সেখানে পাওয়া যায় ১২ কোটি লিটার। একইভাবে সাড়ে সাতশ' কোটি টাকা ব্যয়ে সাভারের ভাকুর্তা প্রকল্প থেকে প্রতিদিন পাওয়ার কথা ১৫ কোটি লিটার। পাওয়া যাচ্ছে পাঁচ কোটি লিটার। দুটি প্রকল্পই ব্যর্থ হয়েছে লক্ষ্য পূরণে। আরও কয়েকটি প্রকল্প যথাসময়ে শেষ করতে পারেনি ওয়াসা। এরই মধ্যে বিদেশি ঋণের কিস্তি গোনা শুরু হয়েছে। প্রতি বছর এই কিস্তি পরিশোধ করতেই বড় অঙ্কের টাকা চলে যাচ্ছে ওয়াসার। এদিকে কাঙ্ক্ষিত পানি উৎপাদিত না হওয়ায় আয়ও বাড়ছে না। ফলে বিনিয়োগের তুলনায় পানির উৎপাদন ও আয় দুটিই কমেছে। এ অবস্থায় পানির মূল্য বাড়িয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া ছাড়া বিকল্প নেই ওয়াসার। তাদের এই ব্যর্থতার চাপ গিয়ে পড়ছে গ্রাহকের ওপর।
পানি বিক্রির আয় ধরা হয় অন্য খাতে :ঢাকা ওয়াসার প্রাইভেট টিউবওয়েল রয়েছে প্রায় সাড়ে চার হাজার। আবাসিকগুলোর বার্ষিক নবায়ন ফি ৫০ হাজার টাকা। বাণিজ্যিকগুলোর এক লাখ টাকা। পানির বিল আবাসিক চার টাকা ৭৩ পয়সা। বাণিজ্যিক ১৭ টাকা ৫০ পয়সা। এ খাতে প্রায় ১০০ কোটি টাকা আয় হয়। কিন্তু এই আয় পানি বিক্রি বাবদ না দেখিয়ে সাধারণ খাতের আয় হিসেবে ধরা হয়। ফলে পানির উৎপাদন খরচ আরও বাড়ে। ঢাকা ওয়াসার অডিট ফার্ম হুদা ভাসী চৌধুরী অ্যান্ড কোম্পানির বার্ষিক অডিট প্রতিবেদনেও ওই আয়ের উল্লেখ নেই। এই আয়কে পানি উৎপাদনের আয় হিসেবে যুক্ত করলেও গ্রাহকের কিছুটা মুক্তি হতো।
পানির সঙ্গে বাড়ে স্যুয়ারেজ বিলও :ওয়াসার নিয়ম অনুযায়ী কোনো হোল্ডিংয়ে যে পরিমাণ পানির বিল আসবে, তার সমপরিমাণ স্যুয়ারেজ বিলও দিতে হবে গ্রাহককে। সেভাবেই বিল করে পানির সমান স্যুয়ারেজ বিল আদায় করা হয়। পানির বিল বাড়লে স্যুয়ারেজ বিলও বাড়ে। কিন্তু ওয়াসা কখনই স্যুয়ারেজ বিল বৃদ্ধির কথা বলে না। বিস্ময়কর তথ্য হলো, রাজধানীর সর্বোচ্চ ১৫ শতাংশ এলাকায় স্যুয়ারেজের লাইন রয়েছে। ওয়াসা প্রায় সব এলাকা থেকেই স্যুয়ারেজের বিল আদায় করে। আর অনেক গ্রাহকও জানেন না কোথায় স্যুয়ারেজের লাইন আছে, কোথায় নেই। ফলে এভাবেও গ্রাহকের পকেট কাটছে ঢাকা ওয়াসা।
এসব প্রসঙ্গে ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক তাকসিম এ খানের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তার মোবাইল ফোনে কল করার পাশাপাশি এসএমএস পাঠিয়ে যোগাযোগের কারণ উল্লেখ করা হলেও কোনো জবাব আসেনি। তবে ওয়াসার উপব্যবস্থাপনা পরিচালক ও বাণিজ্যিক ব্যবস্থাপক উত্তম কুমার রায় বলেন, ওয়াসা ভালো পানি দেয়। কিন্তু গ্রাহকেরও দায়িত্ব আছে। অনেকেই পানির ট্যাঙ্ক পরিস্কার করে না। তখন ওয়াসাকে দোষারোপ করে। কিছু জায়গায় পাইপ পরিবর্তন করা বাকি আছে, সেটি করে দেওয়া হবে। আর কোনো প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে গেলেও অনেক সমস্যা তৈরি হয়।
তিনি আরও বলেন, ঢাকায় এত খাল-নদী; কিন্তু পানি পাওয়া যাচ্ছে না। যেতে হচ্ছে পদ্মা-মেঘনায়। একটি জমি অধিগ্রহণ করতে হলে অনেক মামলা এসে জুটছে। অনেক সংস্থাকে নিয়ে কাজ করতে হচ্ছে। সবার স্বার্থ রক্ষা করে কাজ করতে সময় নষ্ট হচ্ছে। সরকারের তো আরও অনেক সংস্থা আছে। তাদের চেয়ে কি ওয়াসা ভালো কাজ করে না?
উত্তম কুমার রায় বলেন, স্যুয়ারেজ লাইন যেসব এলাকায় আছে, সেখানেই কেবল স্যুয়ারেজের বিল নেওয়া হয়। আর পানির দাম বৃদ্ধির বিষয়ে আদালত যা বলবেন, সেটিই তো মেনে নিতে হবে।


বিষয় : ওয়াসা