সুঁই-সুতা দিয়ে ছোট ছোট সেলাইয়ের পর একটি কাঁথা তৈরি হয়। অনেকে ফৌজদারি মামলার তদন্তকে সুঁ্‌ই-সুতার সঙ্গে তুলনা করেন। মামলা দায়েরের পর অনেক সূক্ষ্ণ কাজের মধ্য দিয়ে তদন্ত পরিপূর্ণ রূপ নেয়। তদন্ত কর্মকর্তাকে আলামত সংগ্রহ, ঘটনাস্থল পরিদর্শন, সাক্ষী ডাকা, আসামি গ্রেপ্তার করা থেকে শুরু করে আনুষঙ্গিক সবকিছু করতে হয়। তবে করোনা পরিস্থিতিতে মামলার তদন্তের মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজটি ব্যাপকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। পুলিশের তদন্তাধীন কোনো মামলার কাজই সেভাবে এগিয়ে নেওয়া যাচ্ছে না। বিভিন্ন ইউনিটে হাজার হাজার মামলার তদন্তে একরকম জট বেঁধে গেছে। বাদী-বিবাদী পক্ষের ন্যায়বিচার পেতে বিলম্ব হচ্ছে। বিশেষ করে মামলার বাদীরা আছেন অনিশ্চয়তার মধ্যে।

পুলিশের একাধিক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা সমকালকে জানান, তদন্ত এমন এক বিষয়- যা ডিজিটালি চালিয়ে নেওয়া সম্ভব নয়। করোনা পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যবিধি মেনেই মামলার তদন্ত চালানোর কথা ভাবতে হবে।

এ ব্যাপারে ডিএমপি কমিশনার মোহা. শফিকুল ইসলাম বলেন, মামলার তদন্ত করতে গেলে আসামি গ্রেপ্তার থেকে শুরু করে সাক্ষ্য নেওয়াসহ অনেক কাজ থাকে। এতে অনেক মানুষের কাছাকাছি যেতে হয়। তদন্ত কার্যক্রম ডিজিটালি চালানোরও সুযোগ কম। তবে এখনও যদি কোনো ডেডবডি পাওয়া যায়, সেটির তো ময়নাতদন্ত করতেই হচ্ছে। গুরুত্ব বিবেচনায় ঝুঁকি নিয়েই বর্তমান পরিস্থিতিতে অনেক মামলার তদন্ত চলছে। পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) প্রধান ডিআইজি বনজ কুমার মজুমদার সমকালকে বলেন, করোনাভাইরাসের এই সময়টাতে তদন্ত কাজে বেশ সমস্যা হচ্ছে। কারণ তদন্ত করতে গেলে মানুষের কাছাকাছি যেতে হয়, সশরীরে গিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করতে হয়। তিনি বলেন, বর্তমান পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে পিবিআই আপাতত ছোটখাটো মামলার ক্ষেত্রে টেলিফোনের মাধ্যমে সাক্ষীদের বক্তব্য নেওয়া যায় কিনা সেটির আইনি দিক ও বাস্তবতা খতিয়ে দেখছে। তবে এমন অনেক গুরুত্বপূর্ণ মামলা রয়েছে, যেখানে সশরীরে গিয়েই তদন্ত করতে হয়। সে ক্ষেত্রে কিছুটা বিঘ্ন ঘটছে। এই সময়ে অনেক সাক্ষীকে ডাকলেই পাওয়া যায় না। তবে ডকুমেন্টেশনসহ ফাইলওয়ার্ক চলছে, তদন্তের ডিজিটাল দিকটাতে আপাতত বেশি জোর দেওয়া হচ্ছে।

ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন) কৃষ্ণপদ রায় বলেন, করোনা পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে স্বাস্থ্যবিধি মেনে মামলার তদন্ত চালানোর কথাও ভাবতে হতে পারে।

সিআইডির অর্গানাইজড ক্রাইম বিভাগের প্রধান ডিআইজি ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, এখন তদন্তের মূল কার্যক্রম বন্ধ। তবে মামলার দাপ্তরিক কিছু কাজ থাকে। যেটা ঘরে বসেই করা যায়। সেটি অব্যাহত রয়েছে।

ঢাকা মহানগর পুলিশের প্রসিকিউশন বিভাগের উপকমিশনার জাফর আহমেদ সমকালকে বলেন, ফৌজদারি অপরাধ সংঘটিত হলে থানায় মামলা হচ্ছে, আসামি গ্রেপ্তার হচ্ছে এবং এসব আসামিকে আদালতে হাজিরও করা হচ্ছে। তবে মামলার তদন্ত কাজ অন্য সময়ের মতো স্বাভাবিকভাবে করা সম্ভব হচ্ছে না।

তিনি বলেন, একটি মামলার তদন্তে বেশ কিছু বিষয় থাকে। চলমান পরিস্থিতিতে সেভাবে তদন্ত করা সম্ভব নয়। এ জন্য তদন্ত সংশ্নিষ্ট সংস্থাগুলো থেকে পুলিশের প্রসিকিউশন বিভাগে মামলার অভিযোগপত্র (চার্জশিট) জমার হারও কমে গেছে। যেগুলো জমা পড়ছে, তাও প্রসিকিউশন বিভাগের সংশ্নিষ্ট জিআরও দপ্তরে সংরক্ষণ করা হচ্ছে। কারণ আদালতে বিচার কার্যক্রম স্বাভাবিক না হওয়ায় তা জমা দেওয়া যাচ্ছে না। 

পুলিশের বিভিন্ন তদন্ত সংস্থার দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, করোনাভাইরাসের কারণে তাদের কাছে থাকা মামলাগুলোর তদন্ত কাজ অনেকটাই থেমে গেছে। বিশেষ করে পুরোনো মামলাগুলোর তদন্তে নজরই দেওয়া যাচ্ছে না। আলোচিত ক্যাসিনোকাণ্ডের মতো অনেক মামলার তদন্ত গতিহীন হয়ে পড়েছে। অনেক মামলার তদন্ত কর্মকর্তাও করোনায় আক্রান্ত।

পুলিশ কর্মকর্তারা জানান, করোনা পরিস্থিতিতে নতুন মামলা দায়ের করার সংখ্যাও কমেছে। মার্চ মাসে সারাদেশে মামলা হয়েছে ১৭ হাজার ৭৪৫টি। এপ্রিলে ৯ হাজার ৯৫টি এবং মে মাসে ১১ হাজার ৫০৫টি। চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে ঢাকা মহানগর পুলিশে মামলা হয় দুই হাজার ২৪৭টি। ফেব্রুয়ারিতে এ সংখ্যা ছিল দুই হাজার ১৩১টি। মার্চে দুই হাজার ৫৯। এপ্রিলে মাত্র ৩৪৯টি।

কর্মকর্তারা বলছেন, তদন্তের ডিজিটাল অংশটি এই সময়েও করা হচ্ছে এবং এটার জন্য এখন সময়ও বেশি পাওয়া যাচ্ছে। তবে হত্যা, ছিনতাই, ডাকাতি, ধর্ষণ, মানব পাচারের মতো গুরুতর ফৌজদারি অপরাধের ঘটনায় দায়ের করা মামলায় অনেকটা ঝুঁকি নিয়েই পুলিশ অপারেশন চালাচ্ছে। তবে স্বাভাবিক সময়ে যত দ্রুত কাজটি হতো করোনার কারণে সেখানে এখন কিছুটা সময় লাগছে। কারণ পুলিশের বিভিন্ন ইউনিটের অনেক সদস্য করোনায় আক্রান্ত। অনেকে আইসোলেশনে রয়েছেন।

পুলিশ সদর দপ্তরের একজন কর্মকর্তা সমকালকে বলেছেন, সারাদেশে পুলিশ সদস্যরা করোনাভাইরাস মোকাবিলায় কোনো না কোনোভাবে যুক্ত রয়েছেন। বেশির ভাগ সদস্যকে মাঠ পর্যায়ে কাজ করতে হচ্ছে। পুলিশের আরেকটা অংশ সাইবার অপরাধ ঠেকাতে তৎপর রয়েছে। ফলে পুরোনো মামলাগুলোর তদন্ত কিছুটা গতি হারিয়েছে।