করোনা শনাক্ত ২ লাখ ছাড়াল

এক মাসেই আক্রান্ত বেড়েছে এক লাখ

প্রকাশ: ১৯ জুলাই ২০২০     আপডেট: ১৯ জুলাই ২০২০       প্রিন্ট সংস্করণ

রাজবংশী রায়

প্রতীকী ছবি

প্রতীকী ছবি

দেশে প্রাণঘাতী ভাইরাস করোনার সংক্রমণ এখনও জ্যামিতিক হারে বাড়ছে। গত চব্বিশ ঘণ্টায় নতুন করে আরও দুই হাজার ৭০৯ জনের শরীরে করোনার সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে দেশে করোনা সংক্রমণের ১৩৩ দিনের মাথায় আক্রান্তের সংখ্যা দুই লাখ ছাড়াল। মোট আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে দুই লাখ দুই হাজার ৬৬ জনে পৌঁছেছে। গত চব্বিশ ঘণ্টায় আরও ৩৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে মৃতের সংখ্যা বেড়ে দুই হাজার ৫৮১ জনে পৌঁছেছে।

বর্তমান পরিস্থিতিতে স্বাস্থ্য বিভাগের সংশ্নিষ্ট কর্মকর্তারা মনে করছেন, দেশে করোনার সংক্রমণ কমে আসছে। সংক্রমণ এখন স্থিতিশীল পর্যায়ে আছে। যথাযথ স্বাস্থ্যবিধি মেনে চললে আগস্টের শুরুতে সংক্রমণ কমতে শুরু করবে। তবে বিশেষজ্ঞরা তাদের ধারণার সঙ্গে একমত নন। জনস্বাস্থ্যবিদ, রোগতত্ত্ববিদসহ বিশেষজ্ঞদের অধিকাংশের মত, সংক্রমণ নিম্নমুখী হয়েছে, এটি এখনই বলা যাবে না। কারণ নমুনা পরীক্ষা বাড়লে আক্রান্ত বেশি শনাক্ত হয়। আর নমুনা পরীক্ষা কমলে আক্রান্ত কম শনাক্ত হয়। আবার দেখা যায়, এক জায়গায় নমুনা পরীক্ষা বেশি হচ্ছে আবার অন্য জায়গায় কম হচ্ছে। এ অবস্থায় সংক্রমণ পরিস্থিতি নিয়ে সঠিক ধারণা পাওয়া সম্ভব নয়। করোনাভাইরাস সংক্রান্ত তথ্য-উপাত্ত পর্যালোচনা করা আন্তর্জাতিক ওয়েবসাইট ওয়ার্ল্ডওমিটারসের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের করোনা সংক্রমিত দেশগুলোর মধ্যে ১৭তম দেশ হিসেবে বাংলাদেশে গতকাল শনিবার আক্রান্তের সংখ্যা দুই লাখ অতিক্রম করেছে। যুক্তরাষ্ট্র, ব্রাজিল, ভারত, রাশিয়া, পেরু, দক্ষিণ আফ্রিকা, মেক্সিকো, চিলি, স্পেন, যুক্তরাজ্য, ইরান, পাকিস্তান, সৌদি আরব, ইতালি, তুরস্ক, জার্মানির পর বাংলাদেশ এ তালিকায় প্রবেশ করল।

প্রথম এক লাখ ছাড়াতে লাগে ১০৩ দিন : বাংলাদেশের সংক্রমণ পরিস্থিতি বিশ্নেষণ করলে দেখা যায়, দেশে প্রথম সংক্রমণ শুরু হয় গত ৮ মার্চ। এরপর ৫৮তম দিনে এসে সংক্রমণ ১০ হাজার ছাড়ায়। ৬৯তম দিনে এসে সংক্রমণ ২০ হাজার ছাড়ায়। সংক্রমণ ১০ থেকে ২০ হাজারে পৌঁছতে সময় নেয় মাত্র ১১ দিন। পরবর্তী ১০ হাজার সংক্রমণ ছাড়াতে আরও সময় লাগে। মাত্র সাত দিনে সংক্রমণ ৩০ হাজার ছাড়ায়। সমসংখ্যক সময়ে ৮২তম দিনে এসে আক্রান্ত ৪০ হাজার ছাড়ায়। সংক্রমণ ৫০ হাজার ছাড়াতে সময় লাগে মাত্র পাঁচ দিন। ৮৭তম দিনে ২ জুন সংক্রমণ অর্ধলাখ ছাড়ায়। পরবর্তী ১৬ দিনের মাথায় ১৮ জুন এসে প্রায় সমসংখ্যক মানুষ করোনায় আক্রান্ত হন। আগের ৮৭ দিনে আক্রান্ত হন ৫২ হাজার ৪৪৫ জন। মৃত্যুবরণ করেন ৭০৯ জন। অর্থাৎ পরবর্তী ১৬ দিনে আক্রান্ত হন ৪৯ হাজার ৮৪৭ জন এবং মৃত্যুবরণ করেন ৬৩৪ জন। সংক্রমণের ১০৩তম দিন ১৮ জুন এসে আক্রান্তের সংখ্যা এক লাখ দুই হাজার ২৯২ জনে এবং মৃত্যুর সংখ্যা এক হাজার ৩৩৪ জনে পৌঁছায়।

পরবর্তী ৩০ দিনে দুই লাখ ছাড়াল : আক্রান্ত এক লাখ থেকে দেড় লাখ ছাড়াতে সময় লাগে আরও কম। মাত্র ১২ দিনের মাথায় ১১৫তম দিনে এসে আক্রান্তের সংখ্যা দেড় লাখ ছাড়ায়। মোট আক্রান্তের সংখ্যা এক লাখ ৫৩ হাজার ২৭৭ জনে পৌঁছায়। একই সঙ্গে মোট মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় এক হাজার ৯২৬ জন। অর্থাৎ শেষ ১২ দিনে ৫০ হাজার ৯৮৫ জন আক্রান্ত এবং ৫৯২ জন মৃত্যুবরণ করেন। গত ৩ জুন থেকে ২ জুলাই পর্যন্ত শেষ ২৮ দিনে করোনায় এক লাখ ৮৩২ জন আক্রান্ত এবং এক হাজার ২২৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। ৩ থেকে গতকাল শনিবার ১৮ জুলাই পর্যন্ত ১৬ দিনে আরও ৪৮ হাজার ৭৮৯ জন আক্রান্ত এবং ৬৫৫ জন মৃত্যুবরণ করেন। অর্থাৎ সর্বশেষ ৩০ দিনে ৯৯ হাজার ৭৭৪ জন আক্রান্ত ও এক হাজার ২৮১ জন মৃত্যুবরণ করেন। এ নিয়ে দেশে মোট আক্রান্তের সংখ্যা দুই লাখ দুই হাজার ৬৬ জন এবং মৃতের সংখ্যা দুই হাজার ৫৮১ জনে পৌঁছল।

পরীক্ষা কমায় আক্রান্ত কমেছে, বেড়েছে শনাক্তের হার : আইইডিসিআরের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. এএসএম আলমগীর সমকালকে বলেন, সংক্রমণ ধীরে ধীরে কমে আসছে। এটি এখন কমতে থাকবে। কোরবানির পশুর হাট নিয়ন্ত্রণ করতে পারলে সংক্রমণ আর বাড়ার তেমন ঝুঁকি নেই। এই কর্মকর্তার বক্তব্যের সঙ্গে বাস্তবতার মিল খুঁজে পাওয়া যায়নি। গত ২১ থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত ১০ দিনে মোট এক লাখ ৭১ হাজার ৬৬৪টি নমুনা সংগ্রহ করা হয়। এর মধ্যে এক লাখ ৬৯ হাজার ৯৬টি নমুনা পরীক্ষা করে ৩৬ হাজার ৭১২ জনের করোনা শনাক্ত করা হয়েছে। শনাক্তের হার ছিল ২১ দশমিক ৭১ শতাংশ। ফি নির্ধারণের পর গত ১ থেকে ১৩ জুলাই পর্যন্ত এক লাখ ৮৫ হাজার ৭৮৭টি নমুনা সংগ্রহ করে সমসংখ্যক পরীক্ষা করা হয়েছে। এর মধ্যে ৪১ হাজার ৪১১ জনের শরীরে করোনার সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছে। শনাক্তের হার ২২ দশমিক ২৮ শতাংশ। গতকাল পর্যন্ত নমুনা পরীক্ষার বিপরীতে শনাক্তের হার ১৯ দশমিক ৮৫ শতাংশ। মৃত্যুর হার ১ দশমিক ২৭ শতাংশ এবং সুস্থতার হার ৫৪ দশমিক ৪৮ শতাংশ। নমুনা পরীক্ষা কমে আসার পর আক্রান্তের সংখ্যা কমলেও শনাক্তের হার বেড়েছে। একই সঙ্গে গত ২ জুলাই পর্যন্ত করোনায় মৃত্যুহার ছিল ১ দশমিক ২৫ শতাংশ। এরপর গতকাল পর্যন্ত তা বেড়ে ১ দশমিক ২৭ শতাংশে পৌঁছেছে।

সংক্রমণ কমছে- এটি বলা যাবে না, মত বিশেষজ্ঞদের :বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সাবেক আঞ্চলিক উপদেষ্টা অধ্যাপক ডা. মোজাহেরুল হক সমকালকে বলেন, সংক্রমণ নিম্নমুখী হয়েছে, এটি এখনই বলা যাবে না। কারণ নমুনা পরীক্ষা বাড়লে আক্রান্ত বেশি শনাক্ত হয়। আর নমুনা পরীক্ষা কমলে আক্রান্ত কম শনাক্ত হয়। তিনি আরও বলেন, করোনা নিয়ন্ত্রণের প্রধান উপায় হলো- যথাযথ স্বাস্থ্যবিধি ও সামাজিক দূরত্ব মেনে চলা। এগুলো মেনে না চললে সংক্রমণ কখনোই কমবে না। এ জন্য জনসাধারণকে স্বাস্থ্যবিধি ও সামাজিক দূরত্ব মেনে চলার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। যেসব মানুষ এসব মানবেন না, তাদের মানাতে বাধ্য করতে হবে। এ ছাড়া সংক্রমণ কখনোই নিয়ন্ত্রণে আসবে না। সুতরাং আসন্ন কোরবানির হাটে ভিড় কিংবা শহর থেকে গ্রামে আসা-যাওয়ার অবারিত সুযোগ দেওয়া হলে সংক্রমণ পরিস্থিতি আরও বাড়বে- এটি নিঃসন্দেহে বলা যায়।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও ভাইরোলজিস্ট অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম সমকালকে বলেন, করোনার সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধে শুরু থেকেই স্বাস্থ্য বিভাগের অব্যস্থাপনা ছিল এবং এখন সেটি আরও বেড়েছে। করোনা নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধের তুলনায় কর্মকর্তারা পরস্পরের প্রতি কাদা ছোড়াছুড়িতে ব্যস্ত। এ অবস্থা চলতে থাকলে সংক্রমণ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়বে। সামনে ঈদুল আজহা। সারাদেশে কোরবানির হাট বসবে। যারা পশু নিয়ে হাটে আসবেন তাদের মাধ্যমে যেমন রোগ আসতে পারে, একইভাবে যারা হাটে পশু কিনতে যাবেন তাদের মাধ্যমেও রোগটি ছড়িয়ে পড়তে পারে। পাশাপাশি মাংস কাটাকাটি, মাংস সংগ্রহ যারা করবেন তাদের মাধ্যমেও ভাইরাসটি ছড়াতে পারে। এ অবস্থায় আগামী আগস্ট মাসে যে নিম্নমুখী সংক্রমণের কথা বলা হচ্ছে, তা বাস্তবে কাজে নাও আসতে পারে। সুতরাং এটি সবার জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিতে যাচ্ছে বলে মনে করেন তিনি।

কর্তৃপক্ষের বক্তব্য : সার্বিক বিষয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক সমকালকে বলেন, করোনা প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণে সরকার প্রতিদিনই নতুন নতুন পরিকল্পনা করছে এবং তা কার্যকর করছে। এ কারণেই অন্যান্য দেশের তুলনায় সংক্রমণের গতি ঊর্ধ্বমুখী নয়। অন্যান্য অনেক দেশে আক্রান্ত দুই লাখে পৌঁছতে অনেক কম সময় লেগেছে। সে তুলনায় বাংলাদেশে বেশি সময় লেগেছে। এর মধ্য দিয়ে প্রমাণ হয়, আমরা করোনার দ্রুত বিস্তার রোধে অন্যান্য অনেক দেশের তুলনায় সফল। এ ছাড়া বর্তমানে আক্রান্তের সংখ্যা কমে আসছে। এটি ইতিবাচক। আগস্টের প্রথম সপ্তাহ থেকে সংক্রমণ আরও নিম্নমুখী হবে বলে বিশেষজ্ঞরা পূর্বাভাস দিয়েছেন। এ জন্য সবাইকে যথাযথ স্বাস্থ্যবিধি ও নিরাপদ সামাজিক দূরত্ব মেনে চলতে হবে। তাহলেই সংক্রমণ কমিয়ে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জনে আমরা সক্ষম হবো।

গতকালের স্বাস্থ্য বুলেটিনেও স্বাস্থ্য অধিপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (প্রশাসন) অধ্যাপক ডা. নাসিমা সুলতানা সংক্রমণ প্রতিরোধে যথাযথ স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার জন্য সবার প্রতি আহ্বান জানান।