ফরিদপুরে শহর রক্ষা বাঁধ ভেঙে ৫ গ্রাম প্লাবিত

৯ জেলায় বন্যার অবনতি

প্রকাশ: ২০ জুলাই ২০২০     আপডেট: ২০ জুলাই ২০২০       প্রিন্ট সংস্করণ

সমকাল ডেস্ক

রোববার সকালে ফরিদপুরে শহর রক্ষা বাঁধ ভেঙে তলিয়ে যায় পাঁচটি গ্রাম - সমকাল

রোববার সকালে ফরিদপুরে শহর রক্ষা বাঁধ ভেঙে তলিয়ে যায় পাঁচটি গ্রাম - সমকাল

উজান থেকে বন্যার পানি ক্রমশই নিচের দিকে নামতে শুরু করেছে। তবে কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, বগুড়াসহ উত্তরাঞ্চলের বিস্তীর্ণ জনপদ এখনও পানির নিচে। বানভাসি মানুষের দুর্ভোগ আর ত্রাণের হাহাকার বেড়েই চলেছে। মধ্যাঞ্চলের জেলাগুলার মধ্যে ফরিদপুর, রাজবাড়ী, মাদারীপুর, মানিকগঞ্জ ও মুন্সীগঞ্জে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। ফরিদপুর শহর রক্ষা বাঁধ ভেঙে পাঁচ গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। এ ছাড়া পাবনা, বগুড়া, গাইবান্ধা ও কুড়িগ্রামে বন্যার অবনতি হয়েছে। বন্যার চোখরাঙানি এখন ঢাকার দিকে। রাজধানীর চারপাশের নদনদীর পানি প্রতি মুহূর্তে বাড়ছে। যে কোনো সময় দু'কূল উপচে তলিয়ে যেতে পারে নিম্নাঞ্চল।

এদিকে, বন্যায় সারাদেশে ২১ জনের মৃত্যুর খবর দিয়েছে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়। এতে দেখা গেছে, ১৬ জনই শিশু। সবচেয়ে বেশি নয়জন মারা গেছে জামালপুরে; যেখানে নানা বয়সী পাঁচটি শিশু রয়েছে। এ ছাড়া কুড়িগ্রামে পাঁচ শিশুসহ ছয়জন, সুনামগঞ্জে তিন, লালমনিরহাট, সিলেট ও টাঙ্গাইলে একটি করে শিশু মারা গেছে। তাদের সবার মৃত্যু হয়েছে পানিতে ডুবে। কয়েকজন নৌকাডুবে প্রাণ হারিয়েছেন।

সরকারি হিসাবে, গতকাল রোববার পর্যন্ত দেশের ১৮টি জেলা বন্যাদুর্গত হয়েছে। পানিবন্দি পরিবারের সংখ্যা পাঁচ লাখ ৮০ হাজার ৬৫৫। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন ২৬ লাখ ১৭ হাজার ৩৯৮ জন। এক হাজার ৪৪৩ আশ্রয়কেন্দ্রে ৬০ হাজার গবাদি পশুসহ প্রায় ৬৩ হাজার মানুষ আশ্রয় নিয়েছেন। সারাদেশে কাজ করছে ২১২টি মেডিকেল টিম।

রোববার পানি উন্নয়ন বোর্ডের পর্যবেক্ষণাধীন নদনদীর ১০১টি পয়েন্টের মধ্যে ৫৬টিতে পানি বেড়েছে, কমেছে ৩৯টিতে। ১৩টি নদনদীর ২১টি পয়েন্টে পানি বিপদসীমা অতিক্রম করেছে। গত ২৪ ঘণ্টায় ব্রহ্মপুত্রের পানি ১১ সেন্টিমিটার কমলেও বিপদসীমার ৬২ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে বইছে। একইভাবে যমুনা, সুরমা ও ঘাঘটের পানিও কমেছে। তবে এ তিনটি নদীর পানি এখনও বিপদসীমার অনেক ওপরে। পানি বেড়েছে পদ্মা-মেঘনায়ও।

নিজস্ব প্রতিবেদক ও প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর-

ফরিদপুর : ফরিদপুর শহর রক্ষা বাঁধের সাদিপুর এলাকায় ৭০ মিটার ভেঙে পাঁচটি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। গতকাল রোববার সকাল ৭টার দিকে শহরতলির ভাজনডাঙ্গা পয়েন্টে এই বাঁধটি ভেঙে যায়। হঠাৎ করে বাঁধটি ভেঙে যাওয়া আশপাশের কয়েক গ্রামের মানুষ বেড়িবাঁধে খোলা আকাশের নিচে আশ্রয় নিয়েছেন। আলীয়াবাদ ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান আখতারুজ্জামান জানান, হঠাৎ করে শহর রক্ষা বাঁধটি ভেঙে যায়। বাঁধের পাশে পাঁচটি গ্রামের মানুষ মুহূর্তের মধ্যে পানিবন্দি হয়ে পড়েন। অনেকেই বাড়ির প্রয়োজনীয় মালপত্র নিয়ে রাস্তায় উঠেছেন। ফরিদপুরের জেলা প্রশাসক অতুল সরকার জানান, শহর রক্ষা বাঁধের পাশে পানির চাপ কমে গেলে বাঁধটি মেরামত করা হবে। আর এখন যারা খোলা আকাশের নিচে রয়েছেন তাদের শুকনো খাবারসহ প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র দেওয়া হচ্ছে। জেলা প্রশাসক আরও জানান, জেলা সদর থেকে চরভদ্রাসন ও সদরপুর উপজেলার প্রধান সড়কটি চলাচলের উপযোগী করতে সড়ক বিভাগকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। সড়কের ভেঙে যাওয়া অংশে ত্রিশ হাজার বস্তা বালুভর্তি জিওব্যাগ ফেলে বাঁধ মেরামতের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে সে অনুসারে কাজ শুরু করেছে পাউবো।

ফরিদপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী সুলতান মাহমুদ জানান, ফরিদপুর শহর বন্যা প্রতিরক্ষা বাঁধের আলিয়াবাদে প্রায় ৭০ ফুটের মতো জায়গা ধসে গেছে। রোববার সকাল ৭টার দিকে এ ঘটনা ঘটে। সেখানে বালুর বস্তাসহ কীভাবে বাঁধ রক্ষা করা যায় সেই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

মানিকগঞ্জ : মানিকগঞ্জে পদ্মা ও যমুনার পানি কিছুটা কমলেও শাখা নদীর পানি বেড়েই চলছে। এতে জেলার শিবালয়, ঘিওর, দৌলতপুর, হরিরামপুর, সাটু?রিয়া ও সদর উপজেলার বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। সেইসঙ্গে জেলা শহ?রের আশপা?শের আরও নতুন নতুন এলাকাও প্লাবিত হচ্ছে। জেলা বন্যা নিয়ন্ত্রণ কন্ট্রোল রুমের তথ্যানুযায়ী, মানিকগঞ্জে প্রায় ২৩১ বর্গকিলোমিটার এলাকা বন্যার কারণে এ পর্যন্ত প্লাবিত হয়েছে।

রাজবাড়ী : রাজবাড়ীতে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। বসতঘরে পানি ঢুকে পড়ায় বন্যা কবলিত। পদ্মা তীরবর্তী রাজবাড়ী সদর উপজেলার মিজানপুর ইউনিয়নের বেশিরভাগ গ্রামে এখন বন্যার পানি। এ ইউনিয়নের মহাদেবপুর, চর জৌকুড়ি, রামচন্দ্রপুর, চরনারায়ণপুর, রামকৃষ্ণপুর, বড়চর বেনিনগর, সিলিমপুর, চর ধুঞ্চি, মৌকুড়ি, কুঠুরিচর, আমবাড়িয়াসহ অন্তত ১৫টি গ্রামের কয়েক হাজার মানুষ পানিবন্দি। এ ছাড়া কালুখালী উপজেলার কালিকাপুর, রতনদিয়া ও পাংশা উপজেলার হাবাসপুর ইউনিয়নের বেশ কয়েকটি গ্রাম বন্যা কবলিত হয়ে পড়েছে।

শরীয়তপুর : পদ্মার পনি বৃদ্ধি পেয়ে শরীয়তপুর সদর উপজেলাসহ নড়িয়া, জাজিরা ও ভেদরগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন এলাকা প্লাবিত হয়েছে। গত এক সপ্তাহে ওই এলাকার ১৫০ হেক্টর কৃষিজমি, ৫০০ মিটার পাকা সড়ক ও ১০টি বসতবাড়ি পদ্মায় বিলীন হয়েছে। এ ছাড়াও দুই উপজেলায় অন্তত ৩০ হাজার পরিবার পানিবন্দি হয়েছে বলে প্রশাসন জানিয়েছে।

শিবচর (মাদারীপুর) : পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় পদ্মার পর এবার শিবচরের আড়িয়াল খাঁ নদেও ব্যাপক ভাঙন দেখা দিয়েছে। পদ্মা নদীর চরাঞ্চলের তিন ইউনিয়নসহ ছয় ইউনিয়নে নদীভাঙনের তীব্রতা বেড়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় চরজানাজাত ইউনিয়ন পরিষদ ও ইলিয়াস আহমেদ চৌধুরী উচ্চ বিদ্যালয়সহ চরের শতাধিক ঘরবাড়ি ভাঙনের মুখে পড়েছে।

পাবনা : পদ্মা ও যমুনার পানি অস্বাভাবিক বৃদ্ধি পাওয়ায় পাবনা জেলার সুজানগর ও বেড়ায় তিন শতাধিক গ্রাম বন্যার পানিতে ডুবে গেছে। এতে প্রায় ৫০ হাজার মানুষ পানিবন্দি অবস্থায় মানবেতর জীবন যাপন করছেন।

জেলা প্রশাসন সূত্র জানায়, ২৪ ঘণ্টায় বেড়া উপজেলার আটটি ইউনিয়নের আরও অন্তত ৫০টি গ্রাম নতুন করে প্লাবিত হয়েছে। বেড়া উপজেলার রূপপুর ইউনিয়নের ঘোপসেলন্দা, হাটুরিয়া-নাকালিয়া ইউনিয়নের মালদাপাড়া, পেঁচাকোলাসহ কয়েকটি গ্রামের বেশিরভাগ বাড়ি বন্যার পানিতে তলিয়ে রয়েছে।

মধুপুর (টাঙ্গাইল) : টাঙ্গাইলের ধনবাড়ী উপজেলার বৈরান নদীর মুশুদ্দি কসাইবাড়ি বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ও মুশুদ্দি বাজার সংলগ্ন গাইড দেয়াল ভেঙে ১৫ গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। এতে করে চলতি আমন মৌসুমের বীজতলা ও শত শত একর জমির সবজি ফসল, মাছের ঘের পানিতে তলিয়ে গেছে। পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন মুশুদ্দি কামারপাড়া, উত্তরপাড়া, পূর্বপাড়া, ভাতকুড়া, ফুলবাড়ী, কয়ড়া, চরপাড়াসহ বিভিন্ন গ্রামের বাসিন্দারা। এদিকে বন্যা নিয়ন্ত্রণে স্থায়ী কোনো উদ্যোগ না নেওয়ায় ক্ষোভ জানিয়েছেন কসাইবাড়ি পানি ব্যবস্থাপনা সমবায় সমিতির সদস্যরা ও স্থানীয়রা।

সিরাজগঞ্জ, শাহজাদপুর ও তাড়াশ :সিরাজগঞ্জে ধীরগতিতে কমছে যমুনার পানি। তবে যমুনার পানি কমলেও বিপদসীমার ওপরে থাকায় জেলার বন্যা পরিস্থিতির এখনও উন্নতি হয়নি। সদর, কাজিপুর, বেলকুচি, চৌহালী, শাহজাদপুর ও উল্লাপাড়ার প্রায় সোয়া দুই লাখ বন্যার্তের মধ্যে নানা দুর্ভোগ শুরু হয়েছে। সদর, কাজিপুর ও চৌহালী উপজেলায় যমুনার তীরবর্তী এলাকায় ভাঙনও দেখা দিয়েছে।

শাহজাদপুরে বন্যার পানিতে ডুবে যাওয়া কৈজুরি, জালালপুর, খুকনি, সোনাতনী ও গালা ইউনিয়নের প্রায় ১০ হাজার মানুষ বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধে আশ্রয় নিয়ে গবাদি পশুর সঙ্গে ঝুপড়ির মধ্যে বাস করছেন। বন্যার পানিতে ডুবে আছে উপজেলার অন্তত ৫০টি গ্রাম। বন্যা দুর্গত ও পানিবন্দি এসব গ্রামের শত শত মানুষের ঘরে বিশুদ্ধ পানি ও খাবারের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। এদিকে সিরাজগঞ্জের তাড়াশসহ চলনবিলের ৯টি উপজেলায় চার শতাধিক পুকুর বন্যার পানিতে ডুবে গেছে।

সারিয়াকান্দি (বগুড়া) : সারিয়াকান্দিতে যমুনার পানি কমতে শুরু করায় নদী তীরবর্তী এলাকায় বন্যা পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হচ্ছে। অন্যদিকে বাঙালী নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হচ্ছে। ফলে উপজেলার মাছিরপাড়া, গোদাগাড়ী, পাইকপাড়া, চর গোসাইবাড়ী এলাকায় নদীভাঙন শুরু হয়েছে।

কুড়িগ্রাম ও রাজারহাট : কুড়িগ্রামে নদনদীতে আবারও পানি বাড়তে শুরু করেছে। ফলে দ্বিতীয় দফা বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হচ্ছে। জেলার রাজারহাটে অবস্থিত কৃষি ও সিনপটিক আবহাওয়া পর্যবেক্ষণাগারের তথ্যমতে, রোববার ভোররাত ৩টা থেকে বিকেল ৩টা পর্যন্ত ২০০ দশমিক ৪ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী মাহমুদ হাসান জানিয়েছেন, ভারি বৃষ্টিপাতের সঙ্গে উজান থেকে ঢল নেমে আসায় আবারও নদনদীগুলোতে পানি বাড়তে শুরু করেছে।

গাইবান্ধা, ফুলছড়ি ও সুন্দরগঞ্জ : গাইবান্ধার ব্রহ্মপুত্র ও ঘাঘট নদীর পানি রোববারও বিপদসীমার অনেক ওপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় জেলার বন্যা পরিস্থিতি কোথাও অবনতি কোথাও অপরিবর্তিত রয়েছে। পাশাপাশি বন্যা কবলিত বিভিন্ন এলাকায় নদীভাঙন শুরু হয়েছে। সদর উপজেলার মোল্লারচর ইউনিয়নে গত পাঁচ দিনে বাজে চিথুলিয়া ও চিথুলিয়া গ্রাম দুটির ৩১৮টি পরিবার নদীভাঙনে গৃহহারা হয়েছে। সুন্দরগঞ্জের শ্রীপুর, হরিপুর ও কাপাসিয়ার পোড়ার চর, ফুলছড়ি উপজেলার এরেন্ডাবাড়ী ইউনিয়নের জিগাবাড়ী, উড়িয়া ও ফজলুপুর ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকায় এবং সাঘাটা উপজেলার হলদিয়ায় ব্যাপক নদীভাঙন অব্যাহত রয়েছে।

সুনামগঞ্জ : সুনামগঞ্জের বন্যার শঙ্কার কথা জানিয়েছেন সংশ্নিষ্টরা। ২৩ ও ২৪ জুলাইয়ে তৃতীয় দফায় বন্যা আক্রান্ত হতে পারে এই জেলা। আবহাওয়ার পূর্বাভাসে এমন তথ্যই জানানো হচ্ছে। আবহাওয়াবিদরা বলেছেন, ২৪ জুলাই পর্যন্ত উজানে বৃষ্টি বেশি হওয়ার তথ্যই রয়েছে তাদের কাছে।

মহম্মদপুর (মাগুরা) : মধুমতি নদীর তীরবর্তী মহম্মদপুর উপজেলা সদরের চরপাচুড়িয়ার গ্রামটিতে ১০ হাজারের অধিক মানুষের বসবাস। উপজেলা সদরের সঙ্গে এই গ্রামের মানুষের যোগাযোগের মাধ্যম একমাত্র কাঁচা সড়কটি নদীভাঙনের কবলে পড়েছে।

আমতলী (বরগুনা) : পায়রা নদীর ভাঙনে আমতলীর শহর রক্ষা বাঁধের সিসি ব্লকে ধস নেমেছে। গতকাল রোববার সকালে পায়রা নদী সংলগ্ন শহর রক্ষা বাঁধ এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, পায়রা নদীর অস্বাভাবিক জোয়ারের তোড়ে ঢেউ তীরে আছড়ে পড়ছে। এতে ব্লক ভেঙে নদীতে বিলীন হচ্ছে।