সাহেদের ছিল পেশাদার 'তদবির পার্টি'

চিহ্নিত অপরাধীদেরও চাকরি দিতেন রিজেন্টে

প্রকাশ: ২২ জুলাই ২০২০       প্রিন্ট সংস্করণ

সাহাদাত হোসেন পরশ

গ্রেপ্তার রিজেন্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান মো. সাহেদের প্রতারণার কথা লিখিতভাবে জানাতে সোমবার বিকেলে র‌্যাব সদর দপ্তরে যান হাবিবুর রহমান নামের একজন ভুক্তভোগী। রিজেন্টে মালপত্র সাপ্লাই দেওয়া বাবদ তিনি সাড়ে ১৯ লাখ টাকা পাবেন। তার বক্তব্য শোনার পর র‌্যাবের এক কর্মকর্তা মন্তব্য করেন, 'সাহেদ প্রতারণা ও জালিয়াতিকে শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে গেছেন। এত ধরনের প্রতারণার তথ্য পাওয়া যাচ্ছে, সেটা কল্পনাতীত। কীভাবে এত এত কৌশল বের করতেন, সেটাও ভাবনার বিষয়।' সাহেদের প্রতিষ্ঠানের সাবেক একাধিক কর্মী ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উচ্চপদস্থ একাধিক কর্মকর্তা বলেন, কোন ব্যক্তির কোন কাজের ফাইল দপ্তরে আটকে আছে, কোথায় ভালো পোস্টিং পেতে চান, কোথায় ব্যবসায় জড়াতে চান- এসব খুঁজে বের করতে সাহেদের একটি সিন্ডিকেট ছিল। এরপর তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে বড় ধরনের ফাঁদ পাততো সাহেদ সিন্ডিকেট। সামনে পেছনে রেখে তদবিরের নামে কোটি কোটি টাকা নেওয়া হয়েছে। সাহেদের অবৈধ আয়ের একটি বড় উৎস ছিল তদবির বাণিজ্য। অনেক সময় সাহেদ তদবিরে সফল হয়েছেন, আবার অনেক কাজ করতে ব্যর্থ হন। তবে তদবিরে ব্যর্থ হওয়ার পর টাকা ফেরত দেওয়ার নজির তার খুব কম।
সাহেদের অপকর্মের তথ্য জানতে র‌্যাব যে হটলাইন চালু করেছে সেখানে গতকাল মঙ্গলবার পর্যন্ত ১৫০টি অভিযোগ জমা পড়েছে। তার মধ্যে ১৩০টি অভিযোগ এসেছে টেলিফোনে। আর বাকি ২০টি ই-মেইলে। এদিকে রিজেন্ট হাসপাতালে অভিযানের পর ১৭ জনকে আসামি করে দায়ের করা মামলার তদন্তের দায়িত্ব পেয়েছে র‌্যাব।
সাহেদের একজন সাবেক দেহরক্ষী সমকালকে জানান, ২০১১ সালে সাহেদের বাবা ছেলের একান্ত সহকারীকে (পিএস) বিয়ে করেন। সাহেদের মা সাফিয়া করিম আগেই মারা যান।
বৃদ্ধ বয়সে সাহেদের বাবা আশ্রয় খুঁজছিলেন। কারণ তাকে দেখভালের তেমন কেউ ছিল না। তবে পিএসকে বিয়ে করায় নিজের বাবাকে উত্তরার অফিসে প্রকাশ্যে বেল্ট দিয়ে বেদম মারধর করেন সাহেদ। এটা দেখে রিজেন্টের অনেক কর্মী বিস্মিত হয়ে যান। পরে সাহেদের বাবা তার দ্বিতীয় স্ত্রীকে নিয়ে মোহাম্মদপুরের বাসায় থাকতেন। দ্বিতীয় স্ত্রীর ঘরে তার একটি সন্তান রয়েছে।
দায়িত্বশীল একাধিক সূত্র জানায়, প্রতারক সাহেদের অনেক অপকর্মের হোতা নাজিম উদ্দিন। তিনি রিজেন্ট গ্রুপের ট্রান্সপোর্ট শাখার জিএম ছিলেন। মূলত রিজেন্ট গ্রুপের জন্য প্রাইভেটকার, মাইক্রোবাসসহ অন্যান্য যানবাহন সরবরাহ করতেন তিনি। অনেকের কাছ থেকে ভাড়ায় গাড়ি এনে তা তার ফেরত না দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে নাজিমের বিরুদ্ধে। এ ছাড়া সাহেদের প্রভাবে অন্যান্য অপরাধে জড়িয়ে পড়েছিলেন নাজিম। উত্তরায় রেইনবো নামে একটি মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্র রয়েছে। মাদকসেবী হিসেবে সেখানে চিকিৎসা নিতেন নাজিম। এরপর ওই প্রতিষ্ঠানের এক প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে সাহেদকে সেখানে নিয়ে যান তিনি। পরে যৌথ মালিকানাধীন রেইনবো থেকে একজন মালিককে কৌশলে সরিয়ে ওই প্রতিষ্ঠানের অন্যতম মালিক বনে যান নাজিম। এ ছাড়া একজন ব্যাংক কর্মকর্তার মামলায় নাজিম একবার ডিবি পুলিশের হাতেও গ্রেপ্তার হন। ওই সময় তাকে সহায়তা করেন সাহেদ। তবে সাহেদ এবার ধরা পড়ায় নিজেকে বাঁচানোর জন্য পুলিশের কাছে অভিযোগ করেন নাজিম। সাহেদের মাধ্যমে তিনিও ভুক্তভোগী বলে দাবি করেন।
সাহেদের একাধিক সাবেক কর্মী জানান, কয়েক বছর আগে সাহেদ উত্তরা এলাকায় একটি স্লোগান নিয়ে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়াতেন। তার স্লোগান 'প্যাডেল যার, রিকশা তার।' বিনামূল্যে রিকশা সরবরাহের নাম করে একটি বিদেশি এনজিও থেকে মোটা অঙ্কের অর্থ হাতিয়ে নেন তিনি। আসলে কোনো মানুষকে তিনি বিনামূল্যে রিকশা দেননি। যাদের রিকশা দেওয়া হয়েছিল তাদের বলা হয়- রিকশা কেনার টাকা পরিশোধ না হওয়া পর্যন্ত দিনে ২০০ টাকা জমা দিতে হবে। এভাবে রিকশাওয়ালাদের কাছ থেকে টাকা আদায় করেছেন আবার এনজিওর কাছ থেকেও টাকা নিয়েছেন।
সাহেদ বিদেশে টাকা পাচার করেছেন কিনা তার তদন্তও শুরু হয়েছে। তথ্য-প্রমাণ পাওয়া গেলে মানি লন্ডারিং আইনে মামলা হবে।
অন্য একটি সূত্র জানায়, সাহেদ সব সময় অপরাধপ্রবণ মানসিকতার লোকজনকে তার প্রতিষ্ঠানে বেশি চাকরি দিতেন। তাদের ব্যবহার করে নানা ধরনের অনিয়ম ও অন্যায় কিছু করা তার পক্ষে সম্ভব ছিল। মশিউর ও মিজান নামে দুই ব্যক্তি দীর্ঘদিন সাহেদের রিজেন্ট গ্রুপে কাজ করতেন। মশিউর ছিলেন সাহেদের এপিএস। আর মিজান রিজেন্টের পরিচালক। কয়েক বছর আগে বনানীতে একজন সরকারি কর্মকর্তাকে গুলি করে হত্যা করা হয়। ওই ঘটনায় মশিউর ও মিজানের জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। মিজান ওই মামলায় গ্রেপ্তারও হন।
সাহেদের একজন সাবেক সহকর্মী জানান, একজন সরকারি কর্মকর্তাকে ভালো একটি জায়গায় পোস্টিং করিয়ে দেওয়ার কথা বলে ৩৫ লাখ টাকা নিয়েছিলেন সাহেদ। তবে শেষ পর্যন্ত ওই পোস্টিং করাতে ব্যর্থ হন। পরে আর টাকাও ফেরত দেননি। আরেকজনকে একটি দপ্তরের প্রধান বানানোর কথা বলে পাঁচ কোটি টাকা নিয়েছিলেন। পরে তিনি ওই দপ্তরের প্রধানও হন। সাহেদের জন্য যে সিন্ডিকেট এসব বড় পার্টি ধরে আনত তাদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন পারভেজ। পারভেজের বাড়ি ধামরাই। তিনি রিজেন্টের পরিচালক ছিলেন।
সাহেদের প্রতারণার শিকার শোভন এন্টারপ্রাইজের হুমায়ুন কবির সমকালকে বলেন, রিজেন্টের কেসিএল লিমিটেডে মোটা বালু সরবরাহ করা বাবদ ৩১ লাখ টাকা পাবেন তিনি। ২০১৯ সাল থেকে বালু সরবরাহ করে আসছিলেন তিনি। তাকে দুটি চেক দেওয়া হলেও তা ডিজঅনার হয়েছে। সাহেদ গ্রেপ্তারের পর এখন মামলার প্রস্তুতি নিচ্ছেন তিনি।
সাহেদের প্রতারণার শিকার হাবিবুর রহমান জানান, ২০১৬ সালে সাহেদের প্রতারণার তথ্য জানিয়ে উত্তরা পশ্চিম থানায় গেলে তাকে তাড়িয়ে দেওয়া হয়। থানা থেকে বের হওয়ার পরপরই সাহেদ ফোন করে বলে, 'তুই আমার নামে অভিযোগ জানাতে থানায় গেছিস। এত বড় সাহস।' হাবিবুর রহমান আরও জানান, থানায় সাহেদের লোক থাকত। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ জানাতে গেলেই তারা সাহেদকে খবর দিয়ে দিত।
সাহেদের প্রতারণা ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ এনে উত্তরা পশ্চিম থানায় মামলা করেছে মেট্রোরেল নির্মাণ কাজে সংশ্নিষ্ট একটি সাব-কন্ট্রাক্টর প্রতিষ্ঠান। রিজেন্ট হাসপাতাল থেকে ওই প্রতিষ্ঠানের ৭৬ জন শ্রমিক ও কর্মচারীর করোনা পরীক্ষা করানো হয়েছিল। ওই মামলায় অভিযোগ করা হয়েছে, রিজেন্ট হাসপাতাল থেকে ৭৬ জন শ্রমিকের করোনাভাইরাসের পরীক্ষা করা হয়েছে, যা সঠিক ছিল না। পরীক্ষার কথা বলে রিজেন্ট হাসপাতাল টাকা আত্মসাৎ করেছে।
র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক লে. কর্নেল আশিক বিল্লাহ সমকালকে বলেন, সাহেদের বিরুদ্ধে অভিযোগ পাওয়ার পর ভুক্তভোগীদের আইনি পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
উত্তরা পশ্চিম থানার ওসি তপন চন্দ্র সাহা বলেন, রিজেন্টে অভিযানের পর থেকে এখন পর্যন্ত সাহেদের বিরুদ্ধে ১২টি মামলা হয়েছে। আগেও এ থানায় তার বিরুদ্ধে একটি মামলা ছিল। আরও অনেক ভুক্তভোগী আসছেন। তারাও মামলা করবেন।

বিষয় : সাহেদ