কার কত লাভ

বাংলাদেশ ভারত নৌ ট্রানজিটের পণ্যবোঝাই প্রথম জাহাজ চট্টগ্রাম বন্দরে

প্রকাশ: ২২ জুলাই ২০২০       প্রিন্ট সংস্করণ

সারোয়ার সুমন, চট্টগ্রাম

মঙ্গলবার দুপুরে ভারত থেকে ট্রানজিট পণ্য নিয়ে প্রথমবারের মতো একটি জাহাজ নোঙর করে চট্টগ্রাম বন্দরে 	 -সমকাল

মঙ্গলবার দুপুরে ভারত থেকে ট্রানজিট পণ্য নিয়ে প্রথমবারের মতো একটি জাহাজ নোঙর করে চট্টগ্রাম বন্দরে -সমকাল

ট্রানজিটের পণ্য নিয়ে ভারত থেকে আসা প্রথম জাহাজ নোঙর করল চট্টগ্রাম বন্দরে। গতকাল মঙ্গলবার দুপুর ১টা ৪০ মিনিটে বন্দরের এনসিটি টার্মিনালের এক নম্বর জেটিতে নোঙর করে জাহাজটি। এর মাধ্যমে নৌ-বাণিজ্যে নতুন এক দিগন্তের সূচনা করল বাংলাদেশ। নতুন এক সম্ভাবনা তৈরি হলো প্রতিবেশী ভারতের জন্যও। এই নৌ-ট্রানজিট বাংলাদেশ ও ভারতের অর্থনীতিতে কতটা প্রভাব ফেলবে, কে কতটা লাভবান হবে- সেসব নিয়েই এখন চলছে চুলচেরা বিশ্নেষণ।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দু'দেশের সম্পর্ক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে এই নৌ-ট্রানজিট। কিন্তু কার অর্থনীতিতে এটি কতটা প্রভাব ফেলবে, তা নির্ভর করবে কূটনৈতিক বিচক্ষণতার ওপর।
প্রসঙ্গত, ট্রানজিট পণ্যে কাস্টম কর্তৃপক্ষ সাতটি খাতে মাশুল আদায় করতে পারবে। চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ মাশুল পাবে আটটি খাতে। সিঅ্যান্ডএফ প্রতিষ্ঠান কমিশন পাবে। সড়ক ও মহাসড়ক বিভাগ টোল পাবে। আবার ট্রানজিট পণ্য চট্টগ্রাম বন্দর থেকে ভারতীয় সীমান্ত পর্যন্ত নিতে ভাড়া পাবে বাংলাদেশের যানবাহন। ২০ ফুট দীর্ঘ পণ্যবোঝাই একটি কনটেইনারে সব মিলিয়ে লেনদেন হবে প্রায় অর্ধলাখ টাকা। তবে কনটেইনার প্রতি মাশুলের পরিমাণ দশ হাজার টাকারও কম হবে। মাশুলের বিষয়টি পণ্যের ধরন, ওজন ও দামের ওপর উপর নির্ভর করে। সাধারণত ২০ ফুট দীর্ঘ একটি কনটেইনারে ১৪ টন পণ্য আমদানি করা যায়।
এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতি চট্টগ্রাম চ্যাপ্টারের সাবেক সভাপতি অধ্যাপক সিকান্দার খান বলেন, 'ট্রানজিট বা ট্রানশিপমেন্টে লাভ যেমন আছে তেমনি আছে ঝুঁকিও। ভারতের পণ্য আমাদের সমুদ্রবন্দর ও সড়কপথ ব্যবহার করে যাতে আবার নিরাপদে নিজেদের দেশে পৌঁছে যায়; সে জন্য যাবতীয় ব্যবস্থা নিতে হবে বাংলাদেশকে। বিনিময়ে বাংলাদেশ কী পাবে সেটা অনেক গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। ভারত চাইবে সর্বনিম্ন মাশুল দিয়ে সর্বোচ্চ লাভবান হতে। তাদের এই চাওয়াকে গুরুত্ব দিয়ে আমরা কীভাবে নিজেদের লাভ সর্বোচ্চ পর্যায়ে নেব, সেটিই দেখার বিষয়।'
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার মোয়াজ্জেম হোসাইন বলেন, 'বন্দর প্রস্তুত থাকলে ট্রানজিট শুরু হতে পারে স্থায়ীভাবে। তুলনামূলক শক্তিশালী রাষ্ট্র হিসেবে ভারত সর্বোচ্চ সুবিধা নিতে চাইবে। কিন্তু ভৌগোলিক সুবিধাটা আমাদের দখলে। এটিকে কাজে লাগিয়ে আমরা কতটা আর্থিক সুবিধা তাদের থেকে আদায় করতে পারব, তা নির্ভর করবে কূটনৈতিক দক্ষতার ওপর।'
ট্রানজিটের সম্ভাব্য রুট ১৩টি : ট্যারিফ কমিশনের কোর কমিটি ট্রানজিটের জন্য সম্ভাব্য যে ১৩টি রুট চিহ্নিত করেছে, সেগুলো হচ্ছে- সুতারকান্দি-বেনাপোল, আখাউড়া-বেনাপোল, তামাবিল-চট্টগ্রাম, সুতারকান্দি-চট্টগ্রাম, আখাউড়া-চট্টগ্রাম, বাংলাবান্ধা-মংলা, বুড়িমারী- মোংলা, শাহবাজপুর-দর্শনা, শাহবাজপুর-চট্টগ্রাম, আখাউড়া-দর্শনা, আখাউড়া-চট্টগ্রাম, রোহানপুর-মোংলা এবং রায়মঙ্গল-আশুগঞ্জ। ঐকমত্য হলে এই ১৩টির বাইরেও নতুন কোনো রুটকে প্রয়োজনে ব্যবহার করতে পারবে দু'দেশ।
কোন রুটে ভারতের কত সাশ্রয় :চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দর ব্যবহার করতে পারলে উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় সাতটি রাজ্যে পণ্য নেওয়া অনেক সহজ ও সাশ্রয়ী হবে ভারতের জন্য। ট্যারিফ কমিশনের কোর কমিটির প্রতিবেদন অনুসারে, ট্রানজিট সুবিধা পেলে আখাউড়া-চট্টগ্রাম রুটে ৭০ শতাংশ, তামাবিল-চট্টগ্রামে ১২ শতাংশ, সুতারকান্দি-বেনাপোলে ৩৩ শতাংশ, আখাউড়া-বেনাপোলে ৪৮ শতাংশ, সুতারকান্দি-চট্টগ্রামে ৫৩ শতাংশ, বাংলাবান্ধা-মোংলা ২৯ শতাংশ, বুড়িমারী-মোংলা ১২ শতাংশ, শাহবাজপুর-দর্শনা ৫৭ শতাংশ, শাহবাজপুর-চট্টগ্রাম ৬৭ শতাংশ, আখাউড়া-দর্শনা ৭০ শতাংশ এবং রায়মঙ্গল-আশুগঞ্জ রুটে ৫০ শতাংশ খরচ সাশ্রয় হবে ভারতের।
বাংলাদেশ লাভবান হবে কতটা :ট্রানজিট পণ্য পরিবহন বাবদ ভারতকে আলাদা কোনো মাশুল দিতে হবে না চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষকে। বিদেশি বাণিজ্যিক জাহাজের মাশুলও প্রযোজ্য হচ্ছে না তাদের জন্য। উপকূলীয় এলাকায় চলাচল করা অন্যান্য জাহাজের মতো আটটি খাতে মাশুল পাবে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ। পোর্ট ডিউজ, রিভার ডিউজ, বার্থিং চার্জ, ল্যান্ডিং চার্জ, টাগ চার্জ, পাইলট চার্জ, পণ্য ওঠানামার লিপটন চার্জ ও আনবার্থ চার্জ পাবে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ। জাহাজের আকার, পণ্যের ধরন ও ওজনের ওপর নির্ধারিত হবে এসব চার্জ। প্রথম জাহাজে চারটি কনটেইনারে ১০৩ টন পণ্য এসেছে। এসব পণ্য চার দিনের বেশি থাকলে এর বাইরে আলাদা ভাড়া দিতে হবে বন্দর কর্তৃপক্ষকে।
বিভিন্ন মাশুলের কথা উল্লেখ করে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে ঢাকার ভারতীয় হাইকমিশনে গত ৫ জুলাই একটি চিঠি পাঠানো হয়। এতে উল্লেখ করা হয়, ভারতীয় পণ্য পরিবহনের সময় সাত ধরনের ফি আদায় করবে বাংলােেদশের কাস্টম কর্তৃপক্ষ। এর মধ্যে প্রতি চালানে প্রসেসিং ফি ৩০ টাকা, প্রতি টনের জন্য ট্রান্সশিপমেন্ট ফি ৩০ টাকা, নিরাপত্তা মাশুল ১০০ টাকা, এসকর্ট মাশুল ৫০ টাকা, প্রশাসনিক মাশুল ১০০ টাকা, প্রতি কনটেইনারের স্ক্যানিং ফি ২৫৪ টাকা। এর বাইরে প্রযোজ্য হারে দিতে হবে ইলেকট্রিক সিলের মাশুল। সব মিলিয়ে বন্দর ও কাস্টম কর্তৃপক্ষ প্রতি কনটেইনার পণ্যে শুধু মাশুল বাবদ আদায় করবে প্রায় ১০০ ডলার (বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৮ হাজার টাকা)।
সড়ক পথে প্রতিটি কনটেইনার আগরতলা পর্যন্ত নিতে বাংলাদেশি যানবাহনকে ভাড়া বাবদ গড়ে ৪০০ থেকে ৫০০ ডলার বা ৩২ থেকে ৪০ হাজার টাকা গুনতে হবে। বন্দর, কাস্টম, সিঅ্যান্ডএফ, পরিবহনসহ সব মিলিয়ে ২০ ফুট দীর্ঘ একটি কনটেইনারে বাংলাদেশের আয় হতে পারে ৭০০ থেকে ৮০০ ডলার। ভারত থেকে প্রতি বছর কি পরিমাণ ট্রানজিট পণ্য আসা-যাওয়া করবে তা এখনও চূড়ান্ত নয়। তবে এখন প্রতি বছর গড়ে ২০ ফুট দীর্ঘ এক লাখ কনটেইনার আসা-যাওয়া করে চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে। ট্রানজিট পণ্য আসা-যাওয়া করলে এই হার আরও বাড়বে বলে জানান চট্টগ্রাম বন্দরের সচিব ওমর ফারুক।
যেভাবে বাংলাদেশে এলো প্রথম ট্রানজিট পণ্য :ভারতের হালদিয়া বন্দর থেকে ২০ ফুট দীর্ঘ মোট ৩২৬ কনটেইনার নিয়ে চট্টগ্রাম বন্দরে আসে 'এমভি সেঁজুতি' নামের জাহাজটি। এই জাহাজে ট্রানজিট পণ্য ছিল চার কনটেইনার। খালি কনটেইনার আছে ১৪০টি। বাংলাদেশি বিভিন্ন আমদানিকারকের পণ্যভর্তি কনটেইনার আছে ১৫৬টি। দুপুর ১টা ৪০ মিনিটে এটি বন্দরের এনসিটি টার্মিনালে নোঙর করে বলে জানান টার্মিনাল অপারেটর সাইফ পাওয়াটেকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তরফদার রুহুল আমিন।
এই জাহাজে থাকা চারটি ট্রানজিট কনটেইনার বাংলাদেশের ওপর দিয়ে যাবে ভারতের আসাম ও ত্রিপুরায়। এমভি সেঁজুতি জাহাজের স্থানীয় এজেন্ট ম্যাঙ্গো লাইন লিমিটেডের ব্যবস্থাপক হাবিবুর রহমান জানান, চট্টগ্রাম বন্দরে নামার পর ট্রানজিট পণ্যগুলো প্রাইম মুভার ট্রেইলরে করে নিয়ে যাওয়ার সব প্রস্তুতি আগেভাগে সম্পন্ন করে রেখেছেন তারা। কাস্টমে পরিশোধ করেছেন নির্ধারিত সব মাশুল। দুটি কনটেইনারে ইস্পাত বার ও দুটিতে ডাল রয়েছে।