সাহেদের ভুয়া চেক

পাওনা টাকা নিয়ে দুশ্চিন্তায় ভুক্তভোগীরা

প্রকাশ: ২৩ জুলাই ২০২০     আপডেট: ২৩ জুলাই ২০২০       প্রিন্ট সংস্করণ

সাহাদাত হোসেন পরশ

কেউ এক লাখ, কেউ আবার প্রতারক মো. সাহেদের কাছে পাবেন এক কোটি টাকা। পাওনাদারের টাকার অঙ্ক এর চেয়ে বেশিও রয়েছে। নানাভাবে নানা মানুষ তার কাছে কোটি কোটি টাকা পাবেন। তারা এখন পুলিশ-র‌্যাবের কাছে আসছেন সাহেদের দেওয়া চেক নিয়ে। কেউ আসছেন চুক্তিপত্র নিয়ে। অনেকে বছরের পর বছর টাকা না পেয়ে পথে বসে গেছেন।

এখন প্রশ্ন হলো, সাহেদ তার কুকর্মের জন্য গ্রেপ্তার হয়েছে ঠিকই; কিন্তু যারা পাওনাদার তাদের প্রশ্ন- সাহেদের কাছ থেকে তারা টাকা ফেরত পাবেন কী করে! রিজেন্টের পল্লবী শাখার বাড়ির মালিক ভাড়া বাবদ এই মহাপ্রতারকের কাছ থেকে ৪৫ লাখ ৫ হাজার টাকা পাবেন। ২২ মাস ধরে কোনো ভাড়া দিচ্ছিলেন না সাহেদ। পানির বিল বকেয়া আছে প্রায় সাত লাখ টাকা।

র‌্যাবের ভ্রাম্যামাণ আদালতের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সারওয়ার আলম সমকালকে জানান, দেশে ফিন্যান্সিয়াল ক্রাইম নানাভাবে হচ্ছে। যারা এর ভুক্তভোগী তারা দ্রুত প্রতিকার পাওয়ার জন্য কঠোর আইনের অভাব রয়েছে। আর্থিকভাবে ক্ষতির মুখে পড়ে অনেকে আদালতে মামলা করে। রায় পেতে পেতে অনেক সময় বিলম্ব হয়। ততদিনে বাদীর ধৈর্য থাকে না। কীভাবে ফিন্যান্সিয়াল ক্রাইম মোকাবিলার জন্য বাস্তবসম্মত একটি আইন করা যায়, সেটা এখনই ভাবা দরকার, যে আইনে ভুক্তভোগীর সুরক্ষার বিষয়টি আরও স্পষ্ট হবে। বিদেশে অনেক আইন রয়েছে, যেখানে তাৎক্ষণিকভাবে আর্থিক ক্ষতির শিকার ব্যক্তিকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার বিধান থাকে। সারওয়ার আলম আরও বলেন, ভোক্তা অধিকার ও নিরাপদ খাদ্য আইনে অভিযোগকারীর দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে অভিযানের পর জরিমানা করা হলে তার ২৫ শতাংশ অভিযোগকারীকে দেওয়ার বিধান রয়েছে। এরই মধ্যে কয়েকজন জরিমানার ২৫ শতাংশ পেয়েছেনও। তবে জরিমানার অর্থ পেতে অভিযোগকারী প্রতারণার আশ্রয় নিয়েছেন- এমন নজিরও পাওয়া গেছে। সাহেদের মাধ্যমে যারা আর্থিক প্রতারণার শিকার হয়েছেন, মামলার পর আদালতের রায়ের মাধ্যমে তারা ক্ষতিপূরণ পেতে পারেন। এর আগে তাদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার বিধান নেই।

সাহেদের প্রতারণার শিকার ফিরোজ আলম চৌধুরী সমকালকে জানান, ২০১৬ সালে সাহেদ পল্লবীতে তার ছয়তলা বাড়ি ভাড়া নেন। এরপর সেখানে রিজেন্ট হাসপাতাল তৈরি করেন। মাসে তার সঙ্গে আড়াই লাখ টাকার চুক্তি ছিল। ২২ মাস ধরে সাহেদ বাড়ি ভাড়া পরিশোধ করছিলেন না। তার কাছে বাড়ি ভাড়া বাবদ ৪৫ লাখ টাকা তার পাওনা রয়েছে। দীর্ঘদিন তিনি পানির বিলও দিচ্ছিলেন না। বাড়ি ছাড়ার জন্য তাকে নোটিশ করা হলেও আমলে নেননি। এ ঘটনায় থানায় জিডিও করা হয়। এ ছাড়া তাকে উকিল নোটিশও দেওয়া হয়।

ফিরোজ আরও জানান, গত রোজার আগে সাহেদ জানিয়েছিলেন- রোজার পর একবারে সব ভাড়া পরিশোধ করবেন। রোজার পর তাকে ফোন দেওয়া হলেও তিনি সাড়া দেননি। একপর্যায়ে বাড়ির মালিককে জানান, ভাড়ার জন্য বারবার ফোন করে যেন তাকে বিরক্ত করা না হয়। মালিকের মোবাইল নম্বর ব্লক করে রাখেন তিনি। এরপর সাহেদের ম্যানেজারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তিনি বাড়িওয়ালার সঙ্গে দুর্ব্যবহার করতে থাকেন।

বাড়ির মালিক আরও জানান, কীভাবে তার কাছ থেকে এত টাকা আদায় করবেন- সেটা নিয়ে তিনি দুশ্চিন্তায় রয়েছেন। বাজারদর হিসেবে তার বাড়ি ভাড়া মাসে ১০ লাখ টাকা হলেও সাহেদ তাকে মাসে আড়াই লাখ টাকা দেওয়ার কথা ছিল। সেটা শেষ পর্যন্ত দিচ্ছেলেন না।

২০১৬ সালে রিজেন্ট হাসপাতালের বেড সরবরাহ করেছিলেন মো. সফিক। তিনি সমকালকে বলেন, বেড সরবরাহ বাবদ সাড়ে চার লাখ টাকা পেতেন তিনি। এক লাখ টাকা পরিশোধ করা হলেও দীর্ঘদিনেও সাড়ে তিন লাখ টাকা হাতে পাননি। টাকা চাইতে গেলে সারাদিন বসিয়ে রেখে রাতে ফেরত পাঠানো হতো। অধৈর্য হয়ে আর টাকা আনতে যাননি। প্রভাবশালী হওয়ায় সাহেদের বিরুদ্ধে মামলা করার সাহস দেখাননি।

রিজেন্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান সাহেদ গ্রেপ্তার হওয়ার পর ভুক্তভোগীরা ঢাকার বিভিন্ন থানায় তার বিরুদ্ধে অন্তত ২০টি মামলা করেছেন। এসব মামলার বেশিরভাগই প্রতারণার মামলা। প্রতারণার অভিযোগে সাহেদের বিরুদ্ধে আগেও অন্তত ৫৬টি মামলা করেছিলেন ভুক্তভোগীরা।

ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (ডিবি) আব্দুল বাতেন জানান, রিজেন্ট হাসপাতালে অভিযানের পর করোনাভাইরাসের পরীক্ষা নিয়ে জালিয়াতি নিয়ে যে মামলাটি করা হয়, সেটি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে সেটা র‌্যাবের কাছে হস্তান্তর করা হবে। সাহেদকেও তুলে দেওয়া হবে তাদের হাতে। তিনি আরও বলেন, 'মাদক ও অস্ত্র আইনের মামলাগুলো গোয়েন্দা পুলিশই তদন্ত করবে। তাছাড়া ভুক্তভোগীদের করা ২০টি মামলারও তদারকি করবে। সাহেদের নামে বৈধ অস্ত্রও আছে। তবে বৈধ অস্ত্র দিয়ে অপরাধ করলে ধরা পড়ার আশঙ্কা বেশি থাকে। এ কারণে সে অবৈধ অস্ত্র ব্যবহার করে থাকতে পারে। সে মাদকের ব্যবসা করত- এমন কোনো প্রমাণ এখনও মেলেনি। তবে সে নিজে সেবন করতে পারে।

র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক লে. কর্নেল আশিক বিল্লাহ বলেন, সাহেদের প্রতারণার তথ্য জানাতে অনেক লোক আসছেন। কেউ ফোনে তথ্য দিচ্ছেন। বহুমুখী প্রতারণার সঙ্গে সে জড়িত ছিল।

উত্তরা পশ্চিম থানার ওসি তপন চন্দ্র সাহা বলেন, এখন পর্যন্ত তার থানায় সাহেদের বিরুদ্ধে ১৩টি মামলা আছে। সর্বশেষ উত্তরা ১৩ নম্বর সেক্টরের এক ব্যক্তি মামলা করেন, যার কাছ থেকে ১০ লাখ টাকা নেন সাহেদ। তাকে মাসে মাসে লভ্যাংশ দেওয়ার কথা থাকলেও প্রতারণা করেন সাহেদ।