বেড়িবাঁধ নদীতীর বিলীন ৫০০ কিলোমিটার

সারাদেশে বন্যায় সড়কেও ব্যাপক ক্ষতি

প্রকাশ: ২৩ জুলাই ২০২০     আপডেট: ২৩ জুলাই ২০২০       প্রিন্ট সংস্করণ

ফসিহ উদ্দীন মাহতাব

পানির তোড়ে জামালপুরের সরিষাবাড়ী উপজেলার শুয়াকৈর সেতুর একাংশ শেষ পর্যন্ত নদীগর্ভে বিলীনই হয়ে গেছে। বুধবারের ছবি- সোলায়মান হোসেন হরেক

পানির তোড়ে জামালপুরের সরিষাবাড়ী উপজেলার শুয়াকৈর সেতুর একাংশ শেষ পর্যন্ত নদীগর্ভে বিলীনই হয়ে গেছে। বুধবারের ছবি- সোলায়মান হোসেন হরেক

দেশের বিভিন্ন স্থানে ভয়াবহ বন্যায় চরম কষ্টে দিন কাটছে মানুষের। বাড়িঘর, ফসলি জমিসহ অন্যান্য জিনিসের ক্ষতি হয়েছে। ভেসে গেছে পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) চলমান নদীতীর ও বাঁধের কাজ। এতে প্রায় ৩৪৯ কোটি টাকার ফসলের ক্ষতি হয়েছে। গত অর্থবছরে ২৯৭টি প্রকল্পের কাজ শেষ করেছে পাউবো। এর মধ্যে ৬৭০টি স্থানে ১০৯ দশমিক ৯২ কিলোমিটারের বাঁধের কাজ চলমান রয়েছে। কিন্তু বন্যা দেখা দেওয়ায় ৪৬ জেলায় এক হাজার ৯৩৮টি স্থানে বেড়িবাঁধ ও নদীর তীরের ৪৯৫ দশমিক ০২ কিলোমিটার বিলীন হয়েছে। এদিকে এবারের বন্যায় এ পর্যন্ত ২৮৮ কিলোমিটার আঞ্চলিক মহাসড়ক ও আন্তঃজেলা সড়ক ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সংশ্নিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।

বন্যায় এখন পর্যন্ত পাউবোর প্রায় এক হাজার ১৭৩ কোটি ৯০ লাখ টাকার সম্পদের ক্ষতি হয়েছে। ইতোমধ্যে প্রতিষ্ঠানটি ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা চিহ্নিত করেছে। বন্যা শেষ হলে বাঁধ নির্মাণ করা হবে। এর সঙ্গে সংশ্নিষ্ট সবাইকে নির্দেশনা দিয়েছে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়।

প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, গত ফেব্রুয়ারি থেকে দেশের বিভিন্ন এলাকায় নদীভাঙন দেখা দেয়। এর মধ্যে ৬৭০টি স্থানে ১০৯ দশমিক ০৯ কিলোমিটারের কাজ চলামান অবস্থায় গত ২৪ জুন বন্যা শুরু হয়। বন্যাকবলিত জেলাগুলোর মধ্যে নদীতীর ও বেড়িবাঁধ বিলীন হয়েছে রংপুরে আটটি স্থানে ৩ দশমিক ৯৮ কিলোমিটার, কুড়িগ্রামের ৩৩টি স্থানে ৯ দশমিক ৫৪ কিলোমিটার, লালমনিরহাটের ১৭টি স্থানে ৩ দশমিক ১১ কিলোমিটার, গাইবান্ধার ১৬টি স্থানে ২ দশমিক ৮৩ কিলোমিটার, ডালিয়া পয়েন্টের ২৪টি স্থানে ৫ দশমিক ২৬ কিলোমিটার, নীলফামারীর ১৩টি স্থানে ১ দশমিক ৬৯ কিলোমিটার, সৈয়দপুর পয়েন্টে ৪১টি স্থানে ৫ দশমিক ৪২ কিলোমিটার, ঠাকুরগাঁওয়ের ৬টি স্থানে ১ দশমিক ৪৩ কিলোমিটার, দিনাজপুরে ৬টি স্থানে ১ দশমিক ১৭ কিলোমিটার এবং পঞ্চগড়ের ৭টি স্থানে শূন্য দশমিক ৭৬ কিলোমিটার।

এ ছাড়া সিরাজগঞ্জের ১৭টি স্থানে ৫ দশমিক ২৮ কিলোমিটার, বগুড়ার ৬৯টি স্থানে ১৪ দশমিক ১১ কিলোমিটার, পাবনার ২১টি স্থানে ২ দশমিক ৯৭ কিলোমিটার, জয়পুরহাটের ২টি স্থানে শূন্য দশমিক ৪০ কিলোমিটার, রাজশাহীর ১০টি স্থানে শূন্য দশমিক ৬৮০ কিলোমিটার, নাটোরে ৩টি স্থানে শূন্য দশমিক ৭০ কিলোমিটার, নওগাঁর ৫৩টি স্থানে ৫ দশমিক ৯৪১ কিলোমিটার, মাদারীপুরের ২১টি স্থানে ৫ দশমিক ৭৯৭ কিলোমিটার, ফরিদপুরের ১৪টি স্থানে ৩ দশমিক ২০০ কিলোমিটার, রাজবাড়ীর ৭টি স্থানে ৯ দশমিক ৫৪০ কিলোমিটার, গোপালগঞ্জের ৪টি স্থানে শূন্য দশমিক ১৪৫ কিলোমিটার, শরীয়তপুরের ৩১টি স্থানে ৩ দশমিক ২৬১ কিলোমিটার, কুষ্টিয়ার ১১টি স্থানে ২ দশমিক ৪২০ কিলোমিটার, ঢাকা-১ জোনের ৭টি স্থানে শূন্য দশমিক ৬৯২ কিলোমিটার, ঢাকা-২ জোনে ৭টি স্থানে ২ দশমিক ৬৫০৯ কিলোমিটার এবং মানিকগঞ্জ ২০টি স্থানে ১০ দশমিক ১০০ কিলোমিটার নদীতীর ও বেড়িবাঁধ বিলীন হয়েছে।

এদিকে ময়মনসিংহের ৪৭টি স্থানে ২ দশমিক ৯১ কিলোমিটার, টাঙ্গাইলের ১১টি স্থানে ১১ দশমিক ৫৫ কিলোমিটার, কিশোরগঞ্জের ২৫টি স্থানে ৭ দশমিক ০৩ কিলোমিটার, নেত্রকোনায় ২১টি স্থানে ২০ দশমিক ২১, জামালপুরে ১৫টি স্থানে ২ দশমিক ৮২ কিলোমিটার, সিলেটের ৩৫টি স্থানে ২ দশমিক ৪৮ কিলোমিটার, হবিগঞ্জের ৩৭টি স্থানে ৮ দশমিক ৬৩ কিলোমিটার, মৌলভীবাজারে ২৮টি স্থানে ৪ দশমিক ২১ কিলোমিটার, সুনামগঞ্জ-১ জোনে ৩২টি স্থানে ৫ দশমিক ২৫ কিলোমিটার, সুনামগঞ্জ-২ জোনে ২৩টি স্থানে ২ দশমিক ৮৩ কিলোমিটার, কুমিল্লার ১৪টি স্থানে ২ দশমিক ৬৪৫ কিলোমিটার, ব্রাহ্মবাড়িয় ৭টি স্থানে ৪ দশমিক ৫০ কিলোমিটার, নোয়াখালীর ৩টি স্থানে ৭ দশমিক ৫০ কিলোমিটার, লক্ষ্মীপুরের ২২টি স্থানে ৪ দশমিক ৭১ কিলোমিটার, ফেনীর ২২টি স্থানে ২ দশমিক ৮৫ কিলোমিটার, চাঁদপুর ১২টি স্থানে ৬ দশমিক ১০ কিলোমিটার, চট্টগ্রাম-২ জোনে ১টি স্থানে শূন্য দশমিক ৩০ কিলোমিটার, রাঙ্গামাটির ৮টি স্থানে ১ দশমিক ০৮ কিলোমিটার, কক্সবাজারে ১০টি স্থানে ১ দশমিক ৬৬ কিলোমিটার এবং বান্দবানে ১টি স্থানে শূন্য দশমিক ০৭ কিলোমিটার নদীতীর ও বেড়িবাঁধ বিলীন হয়েছে।

পানিসম্পদ উপমন্ত্রী এ কে এম এনামুল হক শামীম সমকালকে বলেন, এবার বড় ধরনের বন্যা চলছে। ক্ষতিগ্রস্ত বেড়িবাঁধ ও নদীর তীর এবং নদীভাঙনে ঝুঁকিপূর্ণ জায়গার খবর পেয়ে তাৎক্ষণিকভাবে পরিদর্শনে যাওয়া হচ্ছে। জরিপ করে ঝুঁকিপূর্ণ জায়গা চিহ্নিত করা হচ্ছে। বন্যা শেষ হলে বাঁধ ও নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত স্থানে কাজ শুরু করা হবে।

২৮৮ কিলোমিটার সড়কের ক্ষতি : এবারের বন্যায় এ পর্যন্ত ২৮৮ কিলোমিটার আঞ্চলিক মহাসড়ক ও আন্তঃজেলা সড়ক ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কোথাও সড়ক এখনও পানির নিচে রয়েছে। কোথাও বানের তোড়ে ভেসে গেছে। এসব সড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে জামালপুর ও সুনামগঞ্জের বেশ কিছু সড়কের। দেশের ২২টি জাতীয় মহাসড়কের প্রধান ছয়টির কোনো অংশ না ডুবলেও, সড়কের পাশে বন্যার পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় সেগুলো হুমকির মুখে রয়েছে। সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের (সওজ) বন্যা পরিস্থিতি কেন্দ্রের সূত্রে গতকাল বুধবার এসব তথ্য পাওয়া গেছে।

সূত্র জানায়, সওজের ৮২টি সড়কের ২৮৮ কিলোমিটার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পানি নেমে যাওয়ার পর বোঝা যাবে, মেরামতে কত টাকা ব্যয় হবে।

সওজের অধীনে সারাদেশে জাতীয় ও আঞ্চলিক মহাসড়ক এবং জেলা সড়ক- এই তিন শ্রেণিতে ২২ হাজার কিলোমিটার রাস্তা রয়েছে। গ্রামীণ ও আঞ্চলিক সড়ক রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন সংস্থার হাতে। ভারি যানবাহন চলাচলে সক্ষম রাস্তা নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণ করে সওজ।

সংস্থাটির অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী সবুজ উদ্দিন খান সমকালকে জানিয়েছেন, জাতীয় মহাসড়ক বন্যার তলিয়ে না গেলেও গত কয়েক দিনের ভারি বৃষ্টিপাতে সেগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে এ জন্য কোথাও যান চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়ার মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়নি। যতটা ক্ষতি হয়েছে, তা ঈদের আগেই মেরামত করা হবে।

জাতীয় মহাসড়কের মধ্যে ঢাকা-চট্টগ্রাম, ঢাকা-সিলেট, ঢাকা-ময়মনসিংহ, ঢাকা-খুলনা এবং ঢাকা-উত্তরবঙ্গের সিরাজগঞ্জ থেকে রাজশাহী ও রংপুরমুখী অংশ বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। সিরাজগঞ্জে বন্যা পরিস্থিতির অবনতির কারণে মহাসড়ক আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। টাঙাইলে বন্যার পানি বাড়ায় গুরুত্বপূর্ণ জয়দেবপুর-চন্দ্রা-এলেঙ্গা মহাসড়কও ঝুঁকিতে রয়েছে।