বন্যা ও নদীভাঙনে বিপর্যয়

প্রকাশ: ২৪ জুলাই ২০২০       প্রিন্ট সংস্করণ

সমকাল ডেস্ক

পদ্মার ভাঙন থেকে রক্ষায় পাটুরিয়া লঞ্চঘাটে ফেলা হচ্ছে বালুর বস্তা। বৃহস্পতিবারের ছবি 	 মাহবুব হোসেন নবীন

পদ্মার ভাঙন থেকে রক্ষায় পাটুরিয়া লঞ্চঘাটে ফেলা হচ্ছে বালুর বস্তা। বৃহস্পতিবারের ছবি মাহবুব হোসেন নবীন

দেশের ২৫টি জেলা বন্যাকবলিত হয়ে পড়েছে। এর মধ্যে উত্তর ও পূর্বাঞ্চলে টানা তিন দফা এবং মধ্যাঞ্চলের জেলাগুলো দ্বিতীয় দফায় বন্যার পানিতে ডুবে আছে। ফলে লাখো মানুষ পানিবন্দি অবস্থায় রয়েছে। এখনও অধিকাংশ নদনদীতে বিপদসীমার ওপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হচ্ছে। কোনো জেলায় ২৭ দিন, কোনো জেলায় ৩০ দিন আবার কোথাও তার চেয়েও বেশি দিন ধরে বানের পানি রয়েছে। বন্যার পানিতে এসব এলাকার রাস্তাঘাটের পাশাপাশি নষ্ট হয়ে গেছে ফসলের বিস্তীর্ণ ক্ষেত ও বীজতলা। পানিতে ভেসে গেছে হাজারো পুকুরের মাছ। কর্মহীন হয়ে পড়েছে দুর্গত এলাকার মানুষ। বন্যার্তরা কিছু অংশ আশ্রয়কেন্দ্রে উঠলেও বেশিরভাগই ঝুঁকি নিয়ে নিজ বাড়িতে চালের ওপর কিংবা উঁচু রাস্তায় আশ্রয় নিয়েছে। দুর্গতরা যেমন খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানি সংকটে ভুগছে, তেমনি গবাদি পশু নিয়ে পড়েছে বিপাকে। এদিকে দফায় দফায় বন্যার পাশাপাশি সমানে চলছে নদীভাঙন। এতে বিপর্যস্ত নদীতীরের বানভাসি মানুষ।
নিজস্ব প্রতিবেদক ও প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর-
রংপুর :রংপুরের গঙ্গাচড়ায় তিস্তার ভাঙনে লক্ষ্মীটারী ইউনিয়নের শংকরদহ গ্রামটি বিলীনের পথে। গত কয়েক দিনের ভাঙনে ইতোমধ্যে গ্রামটির অর্ধেকের বেশি তিস্তার গর্ভে বিলীন হয়েছে। স্থানীয়রা জানান, তিস্তায় বন্যার পানি কমার সঙ্গে সঙ্গে শংকরদহে তীব্র ভাঙন দেখা দেয়। এতে করে শংকরদহ গ্রামের তিন শতাধিক ঘরবাড়িসহ ফসলি জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে।
লালমনিরহাট :তিস্তা ও ধরলার পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় বৃহস্পতিবার লালমনিরহাট সদর উপজেলার মোগলহাট, কুলাঘাট ও বড়বাড়ি ইউনিয়নের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। মোগলহাটের চর ফলিমারী এলাকায় প্রতিটি বাড়িতে বন্যার পানি ঢুকে পড়েছে।
গাইবান্ধা :গাইবান্ধায় সব নদীর পানি অব্যাহতভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। গোবিন্দগঞ্জের ছয়টি ইউনিয়নসহ পৌরসভার সহস্রাধিক পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। এদিকে দীর্ঘদিন বন্যা থাকায় সুন্দরগঞ্জ, সাঘাটা, ফুলছড়ি ও সদর উপজেলার দেড় লক্ষাধিক মানুষ চরম বিপাকে পড়েছে।
সুনামগঞ্জ :টানা তৃতীয় দফা বন্যায় চরম অস্বস্তিতে পড়েছে জেলার বেশির ভাগ মানুষ। অসহায় হয়ে পড়েছে জেলা শহর, উপজেলা সদর ও গ্রামাঞ্চলের মানুষ। জেলার ছাতক, দোয়ারা, সুনামগঞ্জ সদর, জামালগঞ্জ, বিশ্বম্ভরপুর, তাহিরপুর, জগন্নাথপুর ও দক্ষিণ সুনামগঞ্জের অধিকাংশ বসতঘরে পানি। দীর্ঘ বন্যায় কাজকর্ম হারিয়ে বিপাকে পড়েছে এসব এলাকার খেটে খাওয়া মানুষ। এ ছাড়া বৃহস্পতিবার থেকে ধর্মপাশা, দিরাই ও শাল্লায় বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে।
সিরাজগঞ্জ :সিরাজগঞ্জে যমুনার পানি তৃতীয় দফা বাড়ছে। পাউবোর হিসাবে বৃহস্পতিবার বিকেল ৩টায় পানি বিপদসীমার ৭০ সেন্টিমিটার ওপরে। পাউবোর উপবিভাগীয় প্রকৌশলী একেএম রফিকুল ইসলাম জানান, এবার বড় বন্যার আশঙ্কা রয়েছে।
মুন্সীগঞ্জ : মুন্সীগঞ্জে বন্যার অবনতি হয়েছে। জেলার প্রায় ১৫০টি গ্রাম বন্যার পানিতে প্লাবিত হয়ে পড়েছে। পানিবন্দি হয়ে পড়েছে অর্ধলক্ষাধিক মানুষ। এদিকে পদ্মার পানি বৃদ্ধির সঙ্গে বেড়েছে ভাঙন। এতে দিশেহারা জেলার লৌহজং ও টঙ্গিবাড়ী উপজেলার মানুষ। ফলে বন্যা ও ভাঙনে বিপর্যস্ত এই জেলার নদীতীরের মানুষ।
দোহার (ঢাকা) :পদ্মা নদীর পানি বৃদ্ধিতে ঢাকার দোহার উপজেলার ৩০টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। এ ছাড়া প্রতিমুহূর্তে নতুন নতুন জনপদ প্লাবিত হওয়ার খবর আসছে। বন্যা পরিস্থিতিতে চরম কষ্টে দিন কাটাচ্ছে বানভাসি মানুষ। গতকাল বৃহস্পতিবার সরেজমিন দেখা যায়, উপজেলার আটটি ইউনিয়নের সবক'টি প্লাবিত হয়েছে।
সারিয়াকান্দি (বগুড়া) :সারিয়াকান্দিতে যমুনা ও বাঙালি নদীর পানি আবারও বৃদ্ধি পেয়েছে। এতে উপজেলার বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হচ্ছে। ফলে বন্যার্তদের দুর্ভোগ আরও বাড়ছে। এদিকে বৃষ্টির কারণে সারিয়াকান্দি পৌর এলাকায় জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে।
মিঠামইন (কিশোরগঞ্জ) : গত ২৪ ঘণ্টায় মিঠামইনের বিভিন্ন এলাকায় পানি বৃদ্ধি পেয়ে নতুন করে কমপক্ষে ১০ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। নতুন করে পল্গাবিত হয়েছে উপজেলার ঘাগড়া, কেওয়াজোড়, মিঠামইন সদর, গৌপদীঘি, ঢাকী, কাটখাল, বৈরাটি ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রাম।
ছাতক (সুনামগঞ্জ) :ছাতকে নদনদীর পানি কমছে ধীরগতিতে। তবে এখনও ছাতকের সঙ্গে সারাদেশের সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে। উপজেলার ১৩ ইউনিয়নের প্রায় ২৫ হাজার পরিবারের মানুষ এখনও পানিবন্দি।
তাহিরপুর (সুনামগঞ্জ) : বন্যায় ঢেউয়ের কবল থেকে তাহিরপুরের একটি গোরস্তান রক্ষা করেছে এলাকাবাসী। উপজেলার শ্রীপুর উত্তর ইউনিয়নের শিবরামপুর গ্রামে অবস্থিত কবরস্থানটিতে আশপাশের ১৫-১৬টি গ্রামের মানুষ এখানে লাশ দাফন করে।
চাঁদপুর :চাঁদপুরের হাইমচর উপজেলার নীলকমল ইউনিয়নের ইশানবালায় অর্ধকিলোমিটার এলাকার মেঘনার ভাঙন ঠেকাতে এই ভরা বর্ষাতেই জরুরি ভিত্তিতে পাউবো ৮৩ লাখ টাকা ব্যয় করতে যাচ্ছে। চাঁদপুর পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী বাবুল আক্তার জানান, ৫০০ ফুট নদীতীর এলাকায় ১৫ হাজার জিও ব্যাগ ফেলা হবে।
জামালপুর : জামালপুরে গত ২৭ দিন ধরে জমে আছে বন্যার পানি। যমুনা নদীর পানি তৃতীয়বারের মতো বাড়তে শুরু করেছে। এদিকে গতকাল বৃহস্পতিবার বকশীগঞ্জে বন্যার পানিতে ডুবে মারা গেছে দুই শিশু। তারা হচ্ছে পৌর শহরের সীমারপাড় গ্রামের তোফানুরের ছেলে সোহান (৬) ও মেষেরচরের আক্তার হোসেনের ছেলে মাইন (১১)।
নেত্রকোনা :জেলার কলমাকান্দা, দুর্গাপুর, বারহাট্টা, সদর উপজেলা, মোহনগঞ্জ উপজেলার ২৪টি ইউনিয়ন নতুন করে প্লাবিত হয়েছে। এতে লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি হয়ে দুর্বিষহ জীবনযাপন করছে। জেলার বেশ কয়েকটি নদীর পানি বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।
ঈশ্বরগঞ্জ (ময়মনসিংহ) : ব্রহ্মহ্মহ্মপুত্র নদের পানিতে ঈশ্বরগঞ্জের নতুনচর এলাকা প্লাবিত হয়েছে। গত পাঁচ দিন ধরে গ্রামের আড়াইশ' পরিবার পানিবন্দি রয়েছে। কিছু মানুষ আশ্রয় নিয়েছে উজানকাশিয়ার চর এলাকায় খনন করা বালুর স্তূপের ওপর।