ড্রেজিং মেশিন কেনার নামে কোটি টাকার প্রতারণা

প্রকাশ: ২৫ জুলাই ২০২০     আপডেট: ২৫ জুলাই ২০২০       প্রিন্ট সংস্করণ

ফসিহ উদ্দীন মাহতাব

নদী খননের ড্রেজিং মেশিন কিনে দেওয়ার নামে পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) একজন ঠিকাদারের কাছ থেকে সোয়া দুই কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে একটি চক্র। ২২ কোটি টাকা মূল্যের ড্রেজার মেশিন কেনার প্রাথমিক পর্যায়ে এ ঘটনা ঘটে। এম এ এহসান নিজামী ওরফে তানিম নামের একজন সিঙ্গাপুরের ব্যবসায়ী পরিচয়ে ড্রেজিং মেশিন আমদানির কথা বলে সোয়া দুই কোটি টাকা নিয়ে উধাও হয়ে যান।

এ ঘটনায় রাজধানীর গুলশান থানায় মামলা করেছেন ঘটনার শিকার ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান ফাস্ট এসএস এন্টারপ্রাইজের মালিক মো. আবু সাদেক। থানা পুলিশের তদন্তের পর মামলাটি এখন ডিএমপির ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম বিভাগ তদন্ত করছে।

মো. আবু সাদেক সমকালকে জানান, ড্রেজিং মেশিন আনতে না পারায় তারা পাউবো ও নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের অধীন নদী খননের কাজও করতে পারছেন না। তার প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে মুন্সীগঞ্জের মাওয়ায় পাউবোর দুটি ও মন্ত্রণালয়ের তিনটি কাজ চলমান। টাঙ্গাইলের একটি নদী খননের কাজের আদেশও পেয়েছেন তিনি।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে পাউবোর মহাপরিচালক প্রকৌশলী এ এম আমিনুল হক বলেন, যে কোম্পানি কাজ পেয়েছে, কাজটি তো তাকেই করতে হবে। তার ড্রেজিং মেশিনের কী হয়েছে, সে জন্য কাজ বন্ধ রাখা যাবে না। সংশ্নিষ্ট ঠিকাদারকে এ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান ফাস্ট এসএস এন্টারপ্রাইজ প্রা. লিমিটেড কোম্পানির করা মামলায় জানানো হয়েছে, পাউবোর বেশ কিছু ড্রেজিং হাতে থাকায় তাদের নতুন একটি ড্রেজিং মেশিন কেনার প্রয়োজন দেখা দেয়। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে বিভিন্ন ব্যাংকের মাধ্যমে লিজ ফিন্যান্স টার্মে ২২ কোটি টাকা মূল্যের একটি ড্রেজিং মেশিন আমদানি করার জন্য এলসি খোলার চেষ্টা করে প্রতিষ্ঠানটি। কিন্তু কোনো ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান স্বল্প মার্জিনে এলসি খুলতে রাজি না হওয়ায় ড্রেজিং মেশিন আমদানির উদ্যোগ ভেস্তে যেতে বসে। এ সময় একজন 'বড় ব্যবসায়ী' এম এ এহসান নিজামী ওরফে তানিম তাদের জানান, তার পরিচিত ব্যবসায়িক চন্দ্র শেখর বড়ূয়া তাদের ড্রেজিং মেশিন আমদানি করে দিতে পারবে। তানিম জানান, তার সঙ্গে রাজধানীর গুলশানের ইএফই (এসজি) লিমিটেড সিঙ্গাপুরের পরিচয় রয়েছে।

ঠিকাদার মো. আবু সাদেক জানান, তখন তাকে জানানো হয়েছিল, বাংলাদেশে তাদের একটি লিয়াজোঁ অফিস রয়েছে। ইএফই লিমিটেড সিঙ্গাপুরের মাধ্যমে বাংলাদেশে বহু বিনিয়োগ এনেছে। তারা ছোট ছোট ব্যবসায়ীকে মেশিনারিজ আমদানি ও রপ্তানি ক্যাপিটাল লোনের ব্যবস্থা করে থাকে। তাই বিদেশি বিনিয়োগের মাধ্যমে ড্রেজিং কিনতে সে সহযোগিতা করতে পারে।

চলতি বছরের জানুয়ারি মাসের শেষ সপ্তাহে রাজধানীর গুলশান অফিসে একটি বৈঠক হয় তাদের ভেতর। বৈঠকে ঠিক হয়, পানি উন্নয়নের কাজের জন্য ড্রেজিং মেশিনের আমদানি মূল্যের মাত্র ২০ শতাংশ টাকা (১০ শতাংশ টাকা এলসি খোলার আগে ও বাকি ১০ শতাংশ এলসি ডকুমেন্টস মেশিন আসার পরে) দিলে বাকি ৮০ শতাংশ টাকা সিঙ্গাপুরের কোম্পানি ইএফই (এসজি) লিমিটেড পরিশোধ করবে। কথা ছিল, সিঙ্গাপুর থেকে এলসি খুলে চীন থেকে ড্রেজিং মেশিন আমদানি করে বাংলাদেশে তার কোম্পানির ঠিকানায় সরবরাহ করা হবে। বাংলাদেশের কোম্পানি ভবিষ্যতে সিঙ্গাপুরের ইএফই (এসজি) লিমিটেড কোম্পানির ৮০ ভাগ টাকা পরে পাঁচ বছরের নির্দিষ্ট কিস্তিতে সুদসহ পরিশোধ করবে। সিঙ্গাপুরের কোম্পানির বিনিয়োগ করা ৮০ ভাগ টাকার গ্যারান্টি হিসেবে বিন্টাং লারিস ড্রেট অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট এসডিএন বিএইচডি করপোরেট গ্যারান্টি দেবে।

এভাবে করা চুক্তি অনুযায়ী পরে জেভি কোম্পানির অ্যাকাউন্টে দুই কোটি ২৩ লাখ টাকা জমা দেন আবু সাদেক। কিন্তু টাকা জমা দেওয়ার পর মেশিন আর পাননি তিনি। একপর্যায়ে তিনি বুঝতে পারে, প্রতারিত হয়েছেন।

গুলশান থানা পুলিশের একজন কর্মকর্তা বলেন, মামলাটির গুরুত্ব বিবেচনায় এটি এখন পুলিশের ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম বিভাগ তদন্ত করছে। ওই বিভাগের একজন কর্মকর্তা বলেন, প্রাথমিক তদন্তে তাদের মনে হয়েছে, ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানটির মালিক মো. আবু সাদেক প্রতারক চক্রের খপ্পরে পড়েছেন। গুরুত্বের সঙ্গে এ ঘটনার তদন্ত চলছে।