লাখ লাখ মানুষ ঘরছাড়া

প্রকাশ: ২৫ জুলাই ২০২০     আপডেট: ২৫ জুলাই ২০২০       প্রিন্ট সংস্করণ

জয়নাল আবেদীন

সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলার শিমলায় যমুনার ভাঙনে বিলীন হয়েছে পাউবোর স্পার। অসহায় মানুষ আশ্রয় নিয়েছেন বাঁধে-আমিনুল ইসলাম খান রানা

সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলার শিমলায় যমুনার ভাঙনে বিলীন হয়েছে পাউবোর স্পার। অসহায় মানুষ আশ্রয় নিয়েছেন বাঁধে-আমিনুল ইসলাম খান রানা

ব্রহ্মপুত্রের পানি দু'কূল উপচে তলিয়ে দিয়েছে পূর্ব পাড়ের চরঘুঘুমারী গ্রামটি। কুড়িগ্রামের রৌমারী উপজেলার চরশৈলমারী ইউনিয়নের এই গ্রামে কোথাও কোমরসমান, কোথাও বুকসমান পানি। অনেকের ঝুপড়ি ঘর মিশে গেছে বন্যার পানির তোড়ে। গ্রামবাসীর সঙ্গে আবদুল ওহাব স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে আশ্রয় নিয়েছেন শহর রক্ষা বাঁধে। দুই সপ্তাহের বেশি সময় ধরে তারা ঘরছাড়া।

ওহাবের মতো কুড়িগ্রামের বিভিন্ন উপজেলার অর্ধলক্ষাধিক মানুষ নিজেদের ভিটেমাটি ছেড়ে ঠাঁই নিয়েছেন আশ্রয়কেন্দ্র অথবা উঁচু বাঁধের ওপর। গাইবান্ধায় ঘরছাড়া মানুষের সংখ্যা লাখ ছাড়িয়েছে। উত্তরের মতো মধ্যাঞ্চলে জামালপুর, সিরাজগঞ্জ এবং পূর্বাঞ্চলের সুনামগঞ্জেও কয়েক লাখ মানুষ ভিটেমাটি ছেড়ে ছুটছেন নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে। বন্যা পরিস্থিতির সঙ্গে অনেক সংগ্রাম করেও টিকতে না পেরে ঘরছাড়া মানুষের সংখ্যা বাড়ছে প্রতিদিন।

দুর্গত এলাকাগুলোয় খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, অন্তত ১৫টি জেলায় বানভাসি মানুষ নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে ছুটছেন। তবে তাদের বেশিরভাগেরই দৌড় বাঁধে কিংবা উঁচু সড়কে। কেউ কেউ আত্মীয়স্বজনের বাড়িতেও আশ্রয় নিচ্ছেন। অথচ আশ্রয়কেন্দ্রে যাওয়ার প্রবণতা খুবই কম। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের প্রতিবেদনে দেখা গেছে, গত বুধবার পর্যন্ত বন্যাকবলিত জেলাগুলোর মধ্যে সাত লাখ ৩১ হাজার ৯৫৮টি পরিবার পানিবন্দি হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা ৩০ লাখ ৪০ হাজার। এদের মধ্যে মাত্র ৬৯ হাজার ৪৬৩ জন বিভিন্ন আশ্রয়কেন্দ্রে গেছেন। সে হিসাবে মাত্র ২ দশমিক ৩০ শতাংশ মানুষ আশ্রয়কেন্দ্রে গেছেন। বিপুলসংখ্যক বানভাসি আশ্রয়কেন্দ্রে না যাওয়ায় তারা ত্রাণ সহায়তার আওতায় আসেননি বলেও জানা গেছে।

এ প্রসঙ্গে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. মোহসীন সমকালকে বলেন, লোকজনকে আশ্রয়কেন্দ্রে আনার ব্যাপারে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা যথেষ্ট আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করছেন। কিন্তু বেশিরভাগ বানভাসি আশ্রয়কেন্দ্রে না এসে বাঁধে কিংবা নিকটাত্মীয়ের বাড়িতে উঠেছে। ফলে তাদের কাছে ত্রাণসামগ্রী পৌঁছে দেওয়া কষ্টসাধ্য হয়ে পড়েছে। অবশ্য যেখানেই হোক, খবর পেলে ত্রাণসামগ্রী পাঠাতে তারা প্রস্তুত। ঈদে বন্যাদুর্গত এলাকায় সংশ্নিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ছুটি বাতিল করা হয়েছে। সার্বক্ষণিক তারা বন্যা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন।

মন্ত্রণালয়ের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সারাদেশে ৯৬৩টি আশ্রয়কেন্দ্রে বানভাসিরা আশ্রয় নিয়েছেন। আরও অন্তত ৬০০ আশ্রয়কেন্দ্র ব্যবহারের জন্য প্রস্তুত হলেও সেখানে কেউ যাননি। আশ্রয়কেন্দ্রে যাওয়া লোকজনের ৮৭ শতাংশই চার জেলার বাসিন্দা।

এদিকে, আশ্রয়কেন্দ্রের বাইরে ঠিক কত মানুষ অন্যান্য স্থাপনায় বিচ্ছিন্নভাবে আশ্রয় নিয়েছেন, তার সঠিক পরিসংখ্যান জানা যায়নি। এ বিষয়ে সরকারের কাছেও কোনো তথ্য নেই। তবে গাইবান্ধায় খবর নিয়ে জানা গেছে, ব্রহ্মপুত্র ও যমুনার পাড়ে বিশাল শহর রক্ষা বাঁধে এক লাখের বেশি মানুষ আশ্রয় নিয়েছেন। সুন্দরগঞ্জ থেকে সাঘাটা পর্যন্ত বাঁধটি বানভাসি মানুষে ভরে উঠেছে। অবশ্য এদের মধ্যে প্রায় পাঁচ হাজার পরিবার এক বছর ধরেই অবস্থান করছেন। গত বছরের বন্যায় তারা ভিটেমাটি হারিয়েছিলেন।

আশ্রয়কেন্দ্রে যেতে অনীহার বিষয়ে বানভাসিরা বলছেন, সরকারিভাবে উদ্ধার তৎপরতা নেই। বন্যা পরিস্থিতি এত খারাপ হতে পারে, সে বিষয়ে তাদের কাছে কোনো পূর্বাভাস ছিল না। শেষমুহূর্তে অনেকের ইচ্ছে থাকলেও তারা পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। কেউ কেউ ঘরের চালে, পার্শ্ববর্তী উঁচু রাস্তায়ও আশ্রয় নিয়েছেন। নিকটস্থ বাঁধে আশ্রয় নিয়েছেন গ্রামের সবার সঙ্গে মিলেমিশে থাকবেন বলে। অনেকেই বলছেন, অস্থায়ীভাবে আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হলেও সে বিষয়ে তাদের কাছে তথ্য নেই।

মাঠপর্যায়ে ত্রাণ নিয়ে বানভাসিদের মধ্যে হাহাকারের চিত্র দেখা গেলেও ত্রাণ মন্ত্রণালয় বলছে, তাদের ভান্ডার এখনও পূর্ণ। সচিব মো. মোহসীন জানান, দুর্গত এলাকা থেকে চাহিদা পাওয়ামাত্রই ত্রাণ পাঠানো হচ্ছে। প্রয়োজন অনুসারে নগদ টাকাও পাঠানো হচ্ছে। ত্রাণভান্ডারে পর্যাপ্ত সামগ্রী মজুদ রয়েছে। তারই অংশ হিসেবে বৃহস্পতিবার আরেক দফা ১০ জেলায় ৭৫০ টন চাল ও ২০ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।

অন্যদিকে বন্যা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, রাজধানীর ডেমরায় বালু নদীর পানি দ্রুত বিপৎসীমা অতিক্রম করতে পারে।