দেশজুড়ে করোনা পরিস্থিতির কারণেই কেবল নয়, বন্যার ধরন, পরম্পরা, সময় ও চরিত্রের কারণেও দেশের প্রায় অর্ধেক জেলায় চলমান বন্যা পরিস্থিতি যেমন ভিন্ন তেমনই গুরুতর। আমরা জানি, বাংলাদেশে মৌসুমি বন্যা প্রতিবছরের প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া। কিন্তু এবারের বন্যা আগের বছরের বন্যাগুলোর থেকে নানা দিক থেকে ব্যতিক্রম। এটা ঠিক, এ অঞ্চলে বর্ষাকালের আনুষ্ঠানিক সূচনা জুনের মাঝামাঝিই ঘটে থাকে; কিন্তু বর্ষাকাল শুরু হওয়া মাত্রই বন্যা ধেয়ে আসার নজির খুব বেশি নেই। মৌসুমি বায়ু মেঘ উড়িয়ে নিয়ে হিমালয় অঞ্চলে বর্ষণ ঘটায়, তা গড়িয়ে গড়িয়ে এক পর্যায়ে মৌসুমি বন্যা হিসেবে বাংলাদেশে প্রবেশ করে। দুর্ভাগ্যবশত, এবার ঘূর্ণিঝড় আম্পানের প্রভাবে জ্যৈষ্ঠ মাসেই প্রবল বর্ষণ হয়েছিল বাংলাদেশে এবং উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় হিমালয় অঞ্চলে। ফলে বর্ষাকাল শুরুর সঙ্গে সঙ্গেই এ বছর বন্যা এসেছিল। আমরা গভীর উদ্বেগের সঙ্গে লক্ষ্য করছি, গত এক মাসে অন্তত তিন দফা বন্যা এসেছে ব্রহ্মপুত্র অববাহিকায়।

গঙ্গা ও মেঘনা অববাহিকাতেও দেখা দিয়েছে একাধিক দফায় বন্যা। এভাবে পরপর তিন দফা বন্যার নজিরও খুব বেশি নেই। বন্যা একটি প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া হলেও এর দীর্ঘসূত্রতা বিপজ্জনক হয়ে ওঠে। প্রথম দফা ঢলের পর এক মাসেরও বেশি সময় কেটে গেলেও এখন বন্যা নেমে যাওয়ার লক্ষণ নেই। বরং আরও এক দফা বন্যার আশঙ্কা ব্যক্ত করছেন কেউ কেউ। একদিকে যেমন দফায় দফায় বন্যা আসছে, তেমনই দেশের প্রধান তিন নদী অববাহিকাতেই বন্যা দেখা দেওয়ায় এক মেঘনা দিয়ে বন্যার পানি নেমে যেতেও সময় লাগছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে প্রবল নদীভাঙন। সাধারণত বন্যার পানি নেমে যাওয়ার সময় নদীভাঙন দেখা দিলেও এবার যেভাবে শুরু থেকেই দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে নদীভাঙনের খবর আসছে, তা আরও উদ্বেগজনক। কারণ বন্যায় সব ভেসে গেলেও পায়ের নিচের মাটিটুকু রয়ে যায়। কিন্তু নদীভাঙন সেটুকুও কেড়ে নিয়ে নিমেষেই নিঃস্ব করে ফেলতে পারে মানুষকে। মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা-এর মতো এসেছে করোনা পরিস্থিতি। বন্যার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগে আমাদের দেশে সামাজিক উদ্যোগে ত্রাণ তৎপরতার ঐতিহ্য পুরোনো। করোনার কারণে তার ছিটেফোঁটাও যেন চোখে পড়ছে না।

একদিকে যেমন সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত করার তাগিদ রয়েছে, তেমনই অন্যদিকে রয়েছে কর্মহীনতা। মানুষের হাতে অর্থ না থাকলে অন্যকে সাহায্য প্রদান করবে কোথা থেকে? স্বীকার করতেই হবে, এবার বন্যায় সরকারি ত্রাণ তৎপরতাও আগের তুলনায় কম। অবশ্য মার্চ থেকেই করোনাদুর্গতদের জন্য পরিচালিত ত্রাণ তৎপরতা চলছে। কিন্তু বন্যাদুর্গতদের জন্য ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মসূচিতে জোর দিতেই হবে। বন্যার শুরু থেকে আমরা এই সম্পাদকীয় স্তম্ভে একাধিকবার বলেছি, তাৎক্ষণিক ত্রাণের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসন পরিকল্পনা করতে হবে। আমরা দেখছি, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও সোমবার মন্ত্রিসভার ভার্চুয়াল বৈঠকে একই ধরনের নির্দেশনা দিয়েছেন। রোববার আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী পরিষদ নেতাদের অনির্ধারিত ভার্চুয়াল বৈঠকে তিনি বন্যার দীর্ঘমেয়াদ সম্পর্কে নেতাকর্মীদেরও সচেতন করেছেন। আমরা এখন দেখতে চাইব, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনার পর যেমন সরকার তেমনই ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল বন্যাদুর্গতের পাশে গিয়ে দাঁড়াচ্ছে।

বন্যার্তদের ত্রাণ, নদীভাঙনের শিকার মানুষের জন্য মাথা গোঁজার ঠাঁই ছাড়াও আসন্ন আমন মৌসুমে বীজ, চারা ও কৃষি উপকরণ সহায়তা প্রয়োজন হবে। আমরা দেখতে চাই, কৃষি বিভাগ এখন থেকেই এ ব্যাপারে প্রস্তুতি নিয়েছে। পানি নেমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে যাতে ক্ষতিগ্রস্ত রাস্তাঘাট, বাঁধ মেরামত করা যায়, সেই প্রস্তুতিও থাকতে হবে সরকারের। করোনার কারণে ইতোমধ্যে স্থবির অর্থনৈতিক তৎপরতা ক্ষতবিক্ষত যোগাযোগ ব্যবস্থায় আরও গতি হারাতে পারে। একই সঙ্গে 'নতুন ধরনের বন্যা' মোকাবিলায়ও প্রস্তুত হতে হবে আমাদের। এবার যেমন দীর্ঘমেয়াদি বন্যা হয়েছে, আগামীতেও তা দেখা যেতে পারে। তবে সবকিছু করতে হবে স্বল্পতম সময়ের মধ্যেই। ইতোমধ্যে যথেষ্ট বিলম্ব হয়ে গেছে।