অপারেশন কভিড শিল্ড

এ পর্যন্ত করোনা আক্রান্ত ৩৭৫১, মারা গেছেন ৮ জন

প্রকাশ: ২৯ জুলাই ২০২০       প্রিন্ট সংস্করণ

সাহাদাত হোসেন পরশ

সেনাবাহিনীর ত্রাণ সহায়তা পেয়ে সম্প্রতি আবেগতাড়িত এক বৃদ্ধা	 -সংগৃহীত

সেনাবাহিনীর ত্রাণ সহায়তা পেয়ে সম্প্রতি আবেগতাড়িত এক বৃদ্ধা -সংগৃহীত

করোনাকালে হোম কোয়ারেন্টাইন নিশ্চিত করতে অসহায়, দুস্থ মানুষের হাতে খাবার তুলে দিচ্ছে সেনাবাহিনী। তৈরি করা হয়েছে চিকিৎসা ক্যাম্পও। আবার বন্যাদুর্গতদের কাছেও তারা পৌঁছে যাচ্ছেন খাদ্য সহায়তা নিয়ে। করোনা মহামারিতে দুর্গম এলাকায়ও প্রায় প্রতিদিন খাবার সহায়তা নিয়ে মানবতার নতুন নতুন উদাহরণ তৈরি করছেন সেনা সদস্যরা।
সেনা সদর থেকে পাওয়া তথ্যে জানা যায়- বর্তমানে দেশের ৬২ জেলায় ৫ হাজার ৫০০ সেনা সদস্যের সমন্বয়ে ৪৫০টি টিম ভাইরাস নিয়ন্ত্রণে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। করোনার বিরুদ্ধে এই যুদ্ধকে সেনাবাহিনী নাম দিয়েছে- 'অপারেশন কভিড শিল্ড'। অদৃশ্য এই শত্রুর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে গিয়ে এখন পর্যন্ত তিন হাজার ৭৫১ জন সেনা সদস্য ভাইরাসে আক্রান্ত হন। মারা গেছেন ৮ জন।
সেনাপ্রধান জেনারেল আজিজ আহমেদের নির্দেশে জরুরি পরিস্থিতিতে সহায়তা প্রদানের জন্য আর্মি এভিয়েশন গ্রুপের ৩টি এমআই হেলিকপ্টার ও একটি কাসা সি-২৯৫ বিমান সার্বক্ষণিক প্রস্তুত রয়েছে। দেশের যে কোনো প্রান্ত থেকে জরুরিভাবে রোগী স্থানান্তরের জন্য সেনাবাহিনী তার আরও দুটি হেলিকপ্টারকে এয়ার অ্যাম্বুলেন্স সুবিধা সংযুক্ত করে প্রস্তুত রেখেছে। করোনার ব্যাপারে জনসচেতনামূলক নানামুখী কার্যক্রমও তারা চালিয়ে যাচ্ছেন। নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে শহর থেকে গ্রামবাংলার আনাচে-কানাচে এভাবেই করোনাযুদ্ধে চতুর্মুখী তৎপরতায় নিয়োজিত সেনা সদস্যরা। জাতিসংঘ শান্তি মিশনেও সংঘাতপূর্ণ বহু দেশে শান্তি প্রতিষ্ঠায় প্রশংসীয় ভূমিকা রেখে চলেছে ব্লু-হেলমেটধারী সেনাবাহিনীর সদস্যরা; তেমনি শুরু থেকে সেনাপ্রধানের সার্বিক দিকনির্দেশনায় দেশব্যাপী করোনাযুদ্ধে নিয়োজিত এই বাহিনী। অতীতের জাতীয় জীবনের অনেক দুর্যোগ ও দুর্ঘটনা সাফল্যের সঙ্গে সামনে থেকে মোকাবিলা করেছে সেনাবাহিনী। করোনাকালেও তার ব্যতিক্রম নয়। করোনাকালে সেনাবাহিনীকে জনগণের সেবায় আত্মনিয়োগ করার সুযোগ দেওয়ায় প্রধানমন্ত্রীকে বাহিনীর সব সদস্যের পক্ষ থেকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন সেনাপ্রধান। 
সেনা সদর  সূত্র  আরও জানায়, দেশে করোনাভাইরাসের সংক্রমণের শুরুতেই প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ ও কল্যাণ তহবিলে সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে আর্থিক সহায়তা প্রদান করা হয়। এই তহবিলে সেনাবাহিনীর সব পদবির সদস্যের এক দিনের বেতনের পাশাপাশি সেনাকল্যাণ সংস্থা, বাংলাদেশ মেশিন টুলস ফ্যাক্টরি লিমিটেড, বাংলাদেশ ডিজেল প্লান্ট লিমিটেড এবং ট্রাস্ট ব্যাংক লিমিটেডের পক্ষ থেকে ২৫ কোটি টাকা প্রদান করা হয়েছে।
করোনাভাইরাস সংক্রমণের শুরুতেই তা নিয়ন্ত্রণে সেনাবাহিনীকে দুটি কোয়ারেন্টাইন সেন্টার পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হয়। আশকোনা হজক্যাম্প ও রাজউক অ্যাপার্টমেন্ট প্রকল্পে স্থাপিত হয় সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে চলতি বছরের ১৯ মার্চ দুটি কোয়ারেন্টাইন সেন্টার। বিদেশ থেকে আসা যাত্রীদের প্রয়োজনীয় স্ট্ক্রিনিং শেষে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের নির্বাচিত ব্যক্তিদের হস্তান্তর করা হয় সেনাবাহিনীর কাছে। সেনাবাহিনী এসব যাত্রীদের কোয়ারেন্টাইনে সেন্টারে আনা, ডিজিটাল ডাটাএন্ট্রি সম্পন্ন, কোয়ারেন্টাইন সেন্টারে থাকাকালে আহার, বাসস্থান, চিকিৎসা ও অন্যান্য আনুসঙ্গিক সেবা প্রদানের ব্যবস্থা করে সেনাবাহিনী। বর্তমানে মহাখালীতে প্রস্তুতকৃত আইসোলেশন সেন্টারের প্রশাসনিক ব্যবস্থা ও সার্বিক নিরাপত্তার দায়িত্বে রয়েছে সেনাবাহিনী। এটি শিগগির উদ্বোধন হবে।
সেনাসদর সূত্র আরও জানা যায়- করোনাভাইরাস নিয়ন্ত্রণে সরকার 'ইন এইড টু সিভিল পাওয়ারের' আওতায় দেশের সকল জেলায় সশস্ত্র বাহিনী মোতায়েনের সিদ্ধান্ত নেয়। এর আলোকে চলতি বছরের ২৪ মার্চ স্থানীয় প্রশাসনকে সহায়তার জন্য সেনা মোতায়েনের অংশ হিসেবে সেনাবাহিনী তাদের সঙ্গে প্রয়োজনীয় সমন্বয় করে। ২৫ মার্চ থেকে মাঠ পর্যায়ে কাজ শুরু করে তারা। প্রথম পর্যায়ে করোনা আক্রান্ত ব্যক্তিদের তালিকা তৈরি, বিদেশ থেকে প্রত্যাগতদের কোয়ারেন্টাইনে থাকা নিশ্চিতকল্পে স্থানীয় প্রশাসন কর্তৃক গৃহীত পদক্ষেপে সহায়তা ও সমন্বয় করা হয়। এ ছাড়া জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ে মেডিকেল কার্যক্রমে সেনাবাহিনী সহায়তা প্রদান করে। জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের সমন্বয়ে বিভাগ ও জেলা পর্যায়ে সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত ও সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সাধারণ জনগণ উৎসাহিত করছে। শহর থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত এলাকায় বিভিন্ন ধর্মীয় উপাসনালয়সহ হাটবাজারে সাধারণ মানুষকে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে, মাস্ক এবং স্যানিটাইজার ব্যবহার করতে সবাইকে উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে। সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে বিনামূল্যে মাস্ক ও স্যানিটাইজার বিতরণ করা হয়েছে। বিভিন্ন জেলায় সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে নিয়মিত জীবাণুনাশক স্প্রে ছিটানোর পাশাপাশি জীবাণুমুক্ত টানেল স্থাপন করা হয়।
এই ক্রান্তিকালে সমগ্র দেশ ও জনজীবন যখন স্থবির হয়ে পড়েছিল তখন অসহায় ও দুস্থ মানুষের পাশে দাঁড়ান সেনা সদস্যরা। পার্বত্য চট্টগ্রামের দুর্গম এলাকাসহ দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে নিজের উদ্বৃত্ত রেশন নিয়ে রাতের আঁধারে তাদের পাশে দাঁড়ানো হয়। হোম কোয়ারেন্টাইন নিশ্চিত করতে নিয়মিতভাবে দুস্থদের ত্রাণসামগ্রী দেওয়া হয়েছে। এখনও স্বল্প পরিসরে বিতরণ কার্যক্রম চলমান আছে। বিভিন্ন জেলায় কর্মহীন গরিব ও অসহায় মানুষের মাঝে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য পৌঁছে দিতে সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে আয়োজন করা হয় 'এক মিনিটের বাজার', 'সম্প্রীতির বাজার', 'সেনা বাজার'। এসব বাজার থেকে গত ঈদুল ফিতরের আগে প্রয়োজনীয় দ্রব্য ও কাঁচাবাজার ছাড়াও ঈদ উপহার হিসেবে কাপড়চোপড়  প্রদান করা হয়। এমনকি দুস্থ ও  নিম্ন আয়ের পরিবারকে বিনামূল্যে ইফতার প্রদান করতে আয়োজন করা হয়েছিল 'সম্প্রীতি ইফতার'। এখন পর্যন্ত সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে ২ লাখ ৮০ হাজার পরিবারের মাঝে ত্রাণসামগ্রী বিতরণ করা হয়।
সেনাসদর দপ্তরের দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, লকডাউন পরিস্থিতিতে দেশের প্রান্তিক কৃষকদের সহায়তার জন্য সেনাবাহিনী সরাসরি তাদের কাছ থেকে সবজি ক্রয় করে। সেনা সদস্যদের নিজেদের প্রয়োজন মেটানোর পাশাপাশি এসব সবজি ১৭ হাজার অসহায় ও দুস্থ পরিবারের মাঝে বিতরণ করা হয়। এতে অসহায় মানুষের পাশাপাশি কৃষকরা তাদের সবজির ন্যায্যমূল্য পেয়েছেন। এ ছাড়া ২৪ হাজারের বেশি গরিব কৃষকের মাঝে সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে বিনামূল্যে বিভিন্ন ধরনের কৃষি বীজ বিতরণ করা হয়েছে।
জানা গেছে, করোনা সংক্রমণ শুরুর পরপরই অসহায় ও দুস্থ মানুষের মাঝে জরুরি ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে এগিয়ে এসেছে সেনাবাহিনী। নিজস্ব চিকিৎসক দলের মাধ্যমে দায়িত্বপ্রাপ্ত সব জেলায় ভ্রাম্যমাণ চিকিৎসা দেওয়া হয়। অদ্যাবধি সেনাবাহিনী ৩৮ হাজার ২৭৯ জন অসহায় ও দুস্থ মানুষকে বিনা মূল্যে চিকিৎসা ও জরুরি ওষুধ দিয়েছে। এ ছাড়া জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী উদযাপনের অংশ হিসেবে ৯ জুন থেকে ৯ জুলাই এক মাসব্যাপী সেনাবাহিনী নিজ নিজ দায়িত্বরত এলাকায় গর্ভবতী মায়েদের বিশেষ স্বাস্থ্যসেবা দিয়েছে। মাসব্যাপী এ কার্যক্রমে উপকৃত হয়েছেন ১৩ হাজার ৬৬৪ জন গর্ভবতী মা। এর পাশাপাশি করোনায় আক্রান্ত সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের চিকিৎসার জন্য ঢাকা সিএমএইচসহ সব সেনানিবাসের সিএমএইচে পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। সশস্ত্র বাহিনীর প্রাধিকৃত সদস্য ও তাদের পরিবারের করোনাভাইরাস পরীক্ষার জন্য আর্মড ফোর্সেস ইনস্টিটিউট অব প্যাথলজিতে তিনটি এবং অন্যান্য সেনানিবাসে অবস্থিত সিএমএইচগুলোতে ১০টি আরটি-পিসিআর মেশিন স্থাপন করা হয়। সিএমএইচগুলোতে সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যরা ছাড়াও সরকারের নির্দেশক্রমে দেশের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা করোনাকালীন চিকিৎসা নিচ্ছেন।
সেনাবাহিনীর আর্মি এভিয়েশন গ্রুপ নিয়মিতভাবে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে অসহায় ও দুস্থ মানুষের সহায়তায় ত্রাণসামগ্রী ও সেনানিবাসগুলোর জন্য জরুরি চিকিৎসাসামগ্রী পৌঁছে দিয়েছে।  বেসামরিক প্রশাসনের অনুরোধে আর্মি এভিয়েশনের হেলিকপ্টারে পার্বত্য চট্টগ্রামের দুর্গম এলাকায় সরকারি ও বেসরকারি ত্রাণসামগ্রী পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। করোনা মোকাবিলায় যুদ্ধ ঘোষণার পর সেনাবাহিনীর প্রতিটি সৈনিক এই যুদ্ধে সর্বতোভাবে নিয়োজিত থেকে সরকারের নির্দেশে দেশ ও জনগণের কল্যাণে আত্মনিবেদন করেছে।
 

বিষয় : কভিড শিল্ড