বানভাসি মানুষের ঘরে নেই ঈদের আনন্দ

প্রকাশ: ৩০ জুলাই ২০২০     আপডেট: ৩০ জুলাই ২০২০       প্রিন্ট সংস্করণ

সমকাল ডেস্ক

ফাইল ছবি

ফাইল ছবি

মাত্র এক দিন পরে মুসলিম সম্প্রদায়ের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব পবিত্র ঈদুল আজহা। করোনা মহামারির কারণে কিছুটা কম হলেও সারাদেশে বিরাজ করছে ঈদের আমেজ। কিন্তু এ আমেজ পুরোপুরি উধাও দেশের বন্যাকবলিত ৩১ জেলায়। তিন দফা বন্যায় প্রায় ১০ লাখ পরিবার পানিবন্দি। ক্ষতিগ্রস্ত ৫০ লক্ষাধিক মানুষ। এক মাসেরও অধিক সময় এসব জেলার মানুষ বানের পানিতে ভাসছে। এর ওপর শুরু হয়েছে ভয়াবহ নদীভাঙন। এতে চোখের পলকে নিঃস্ব হয়ে পড়ছে নদীতীরের মানুষ। বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের তথ্য- বানভাসিদের দুর্ভোগে শিগগিরই কমছে না। এ অবস্থায় বানভাসিদের ঈদের আনন্দ দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়েছে। পানিতে ভাসা বেশিরভাগ মানুষের সাধ্য নেই এবারে ঈদে পশু কোরবানি দেওয়ার। বানভাসিদের মতে, যেখানে জীবনই বাঁচে না, সেখানে কিসের ঈদ। তার তাকিয়ে আছেন সরকারের দিকে। ঈদ উপলক্ষে ভিজিএফসহ বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে ত্রাণ দিয়ে বন্যা ও ভাঙন কবলিত মানুষের সঙ্গে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগির কথা জানিয়েছে প্রশাসন।

নিজস্ব প্রতিবেদক ও প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর- রংপুর গঙ্গাচড়া উপজেলার লক্ষ্মীটারী ইউনিয়নের পশ্চিম ইচলীর কাঁচা সড়কে আশ্রয় নিয়েছেন শংকরদহ গ্রামের নদীভাঙনে নিঃস্ব মান্নাফ মেম্বারের পরিবার। তার স্ত্রী ফরিদা খাতুন অশ্রুসিক্ত চোখে জানালেন, নদী এমনভাবে ভাঙ্গবার নাগছিল যে, এক রাইতোত বাড়ির জিনিসপত্র ৭ বার সারাবার লাগছে। ১৪ দোন (৪২০ শতক) আবাদি মাটি ছিল, ভুট্টা ক্ষেত ছিল, বাড়ির চাইরোপাকে আম, কাঁঠাল, ফলের গাছ ছিল। মুহূর্তোত সব গিলি খাইল নদী। প্রতি বছরোত কোরবানি দেই হামরা। মেম্বার বাড়ি ঈদের দিনোত গ্রামের অনেক মানুষ আইসে। এইবার হামারে খাবার ভাত নাই, আর কোরবানি দিমো কেমন করি। এইবারের ঈদ হামার শ্যাষ। পরিষদ থাকি সবাকে ১০ কেজি চাউল দিছে, মেম্বারেরই চাউল নাই। আবাদ করা অল্প একনা ভুট্টা ছিল ওইটা বেচে খাইতোছি।

ফরিদপুরের চরভদ্রাসন উপজেলার বালিয়াডাংগী গ্রামের ফারুক খান বলেন, 'প্রতি বছরই কোরবানি দেই, এ বছর বন্যায় সব ফসল তলায় গেছে। টাকা জোগার করতে পারি নাই। নিজেরাই কষ্টে আছি, কোরবানি দেওয়া হবে না।' পাশের খালাসীডাংগী গ্রামের কাঠ ব্যবসায়ী জাহাঙ্গীর বলেন, 'একে তো করোনা তার ওপর বন্যা। কোরবানি দেওয়ার উপায় নাই। ছেলেমেয়ে নিয়্যা আগে বাইচ্যা নেই।' একই কথা বললেন একই উপজেলার চরঝাউকান্দা ইউনিয়নের চরকল্যাণপুর লস্করডাঙ্গী থেকে সুখজান (৫০) ও নাছিমা আক্তার (৪৫)। তারা জানান, বাড়িতে পানি ওঠায় জীবন বাঁচাতে ২৫ জুলাই স্থানীয় হেলিপ্যাডে আশ্রয় নিয়েছে তারা।

'একে তো করোনা, তার ওপর বন্যা ও নদীভাঙন। আমাগোর এবারে কিসের ঈদ। দিনপাতই চলত্যইছে না। ঘরবাড়ি এহুন পানিতে ডুইব্যা আছে। বাঁধের ওপর আশ্রয় নিছি। স্বামী, ছেলেপুলে ও নাতি-পুতি নিয়ে ইকোপার্কের মধ্যে ঝুপরি তুইল্যা কোনোমতে আছি। কেউই খোঁজখবর নেয় না। গত ১৪-১৫ দিন থেইক্যা বাঁধের ওপর পইর‌্যা আছি। কি খাই বা না খাই চেয়ারম্যান-মেম্বাররাও দেখবার আইলো না। থাকুনেরই জায়গা নেই, বন্যার মধ্যে কিসের ঈদ।' গত মঙ্গলবার কথাগুলো আবেগের স্বরে বলছিলেন সিরাজগঞ্জের কাজিপুরের মাইজবাড়ি গ্রামের বন্যার্ত রাবেয়া খাতুন।

রাজবাড়ী সদর উপজেলার বরাট ইউনিয়নের আকিরননেছা ইসলামিয়া আলিম মাদ্রাসায় আশ্রয় নিয়েছে অন্তত ২০টি পরিবার। আশ্রয় নেওয়া বানভাসিদের মধ্যে রাশিদা, ফাতেমা ও মমতাজ বেগম জানান, 'বানের পানিতে ডুবে গেছে ঘরবাড়ি। সহায়-সম্বল বলতে কিছু নাই। তাই ঈদের আনন্দও নাই। সরকারের দিকে তাকিয়ে আছি। যদি দয়া করে কেউ কিছু দেয় তাহলে ঈদ হবে। নইলে না।'

গাইবান্ধায় করোনায় কর্মহীন এবং বন্যা ও নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের মধ্যে এবারে ঈদের আনন্দ নেই। করোনায় কর্মহীন এবং বন্যা ও নদীভাঙনে সব হারিয়ে খোলা আকাশের নিচে মানবেতর জীবন যাপন করছে জেলার বিভিন্ন এলাকার কয়েক হাজার পরিবার। অর্থাভাবে নদীভাঙন কবলিত এলাকাগুলোর মানুষের মনে নেই ঈদের আমেজ। তবে ঈদ উপলক্ষে ভিজিএফসহ বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে ত্রাণ দিয়ে ভাঙন কবলিত মানুষের সঙ্গে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগির কথা জানিয়েছেন গাইবান্ধার জেলা প্রশাসক মো. আবদুল মতিন।

সুনামগঞ্জের হাওরপাড়ে ঈদের আমেজ নেই। তিন দফা বন্যায় জনজীবন একেবারে থমকে দাঁড়িয়ে। বিশেষ করে শ্রমজীবী মানুষের পিঠ একেবারে দেয়ালে ঠেকে গেছে। করোনায় এবং তিন দফা বন্যায় কাজ নেই, কারও কাছে কোনো টাকাও নেই। সরকারি ও বেসরকারি কিছু সহায়তাই এখন ভরসা। জেলার বেশিরভাগ জনপদে এখনও থইথই করছে বন্যার পানি। ফলে ঈদের আমেজ অনেকটা ফিকে হয়ে গেছে। আনন্দের বদলে ভোগান্তির ঘোলা জলে হাবুডুবু খাচ্ছেন হাওরপাড়ের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর লাখো মানুষ।

কুড়িগ্রামের সদর উপজেলার যাত্রাপুর ইউনিয়নের বারোবিষ গ্রামের বানভাসি শেফালী বেগম দুঃখের সঙ্গে বলেন, 'হামাগোরে কি ঈদ আছে। নাই। ছোয়াপোয়া নয়া কাপড় চায়। কই থাইকা দিমু। কি খামু। ক্যামনে চলমু। কোনো সংস্থান নাই। হামরাতো গরিব মানুষ। শখ-আল্লাদ কিছু নাই। খালি কষ্ট।' এভাবে দুঃখ আর দুর্ভোগের কথা বর্ণনা করলেন শেফালী বেগম।

তিন দফা বন্যায় লালমনিরহাটের পাঁচ উপজেলার লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি অবস্থায় ছিল। বন্যার পানি নেমে গেলেও এর ক্ষত এখনও সারেনি। বন্যার সঙ্গে যোগ হয়েছে নদীভাঙন। এ জেলাতেও নেই ঈদের আনন্দ।

নওগাঁর আত্রাই নদী ছয়টি পয়েন্টে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ভেঙে মান্দা, আত্রাই ও রানীনগর উপজেলার অন্তত অর্ধশতাধিক গ্রামের লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। এসব মানুষের কাছে ঈদের আনন্দ এখন নিরানন্দে পরিণত হয়েছে।

ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের পাশে মানিকগঞ্জের জোকা এলাকায় ২০ ফুট লম্বা একটি সেতুতে বন্যার কারণে আশ্রয় নিয়েছেন গবাদি পশুসহ চারটি পরিবারের সদস্যরা। অন্য বছর ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করে নিলেও এবার কীভাবে এখন দিন কাটবে এ নিয়েই চিন্তায় রয়েছে আশ্রয় নেওয়া পরিবারগুলো। জেলার সব বানভাসি মানুষের একই অবস্থা।

মুন্সীগঞ্জের টঙ্গিবাড়ী ও লৌহজং উপজেলার ভাঙন কবলিত পদ্মা তীরের গ্রামে গিয়ে ভিটেমাটিহারা মানুষের হাহাকার দেখে মনে হবে, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ওই উপন্যাসের কথা। পদ্মাতীরের মানুষজন তাদের ঘর সরাচ্ছেন, গাছ কাটছেন। প্রিয় পৈতৃক ভিটা চোখের সামনে পদ্মার গর্ভে বিলীন হওয়ার দৃশ্য প্রত্যক্ষ করছেন। পদ্মার ভাঙন তাণ্ডবে এলাকার বিত্তবান পরিবারগুলো মুহূর্তেই পথে নামছে ভিটেমাটি হারিয়ে। বানভাসি লৌহজংয়ের যশলদিয়া গ্রামের হুমায়ুন মিয়া বলেন, 'কোমর সমান বন্যার পানিতে থৈ থৈ করছে তার বসতবাড়ি। আর বন্যা পরিস্থিতির যে-ই অবস্থা, তাই পরিবার নিয়্যা তিন বেলা ভাত খাইতে পারলেই ঈদ হইয়্যা যাইবো।'

ঢাকার দোহার উপজেলার ত্রিশটির বেশি গ্রামের কয়েক হাজার মানুষ এখন পানিবন্দি। সড়কে পানি ওঠায় বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে যোগাযোগ ব্যবস্থা। সামনে ঈদ, কিন্তু উৎসবের কোনো আমেজ নেই এসব এলাকায়। বানের পানিতে ভেসে গেছে মানুষের ঈদের আনন্দ।

বন্যা কবলিত বগুড়ার সারিয়াকান্দি উপজেলার ১২টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভায় মানুষের মাঝে এবার ঈদের আনন্দ নেই। উপজেলার বন্যার্ত লোকজন উঁহ্নচু স্থানে ও বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধে গবাদি পশু নিয়ে গাদাগাদিভাবে মানবেতর জীবন যাপন করছেন। সারিয়াকান্দি সদর ইউনিয়নের নিজ তিত পরল গ্রামের (বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধে আশ্রিত) জরিনা বেওয়া (৫৩) আক্ষেপ করে বলেন, রিলিফের (ত্রাণের) চাল চিড়া গুড় খেয়ে বেঁচে আছি। হামাগে (আমাদের) আবার ঈদ কিসের। ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার বিভিন্ন উপজেলার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়ে পাঁচ শতাধিক পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। এসব পরিবারেও নেই ঈদের আমেজ। একই অবস্থা শেরপুর জেলার ২৫ হাজার পানিবন্দি মানুষের। অন্যদিকে টাঙ্গাইলের বানভাসি মানুষের ঈদের আনন্দ ক্রমেই ফিকে হয়ে আসছে। জেলার ১১টি উপজেলার ৬৫২ গ্রাম প্লাবিত হয়ে দুই লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি।