পাঁচ বছর বয়সের রিয়াসাট মাহমুদ। প্রায় দেড় মাস হলো বাবার কাছ থেকে দূরে আছে সে। বাবা থাকছেন স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে। ছেলের সঙ্গে দেখা হয় না বলে তার মনও খারাপ থাকে। শুধু ছেলে কেন, স্ত্রী ও বাবা-মায়ের সঙ্গেও তার দেখা নেই চার মাস। মাঝে মধ্যে আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন, আবার সামলে নেন মানুষের জীবনের বিপন্নতার কথা চিন্তা করে।
তিনি যশোরের অভয়নগর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা মাহমুদুর রহমান রিজভী (৩৬)। করোনাকালের সম্মুখযোদ্ধা। তার স্ত্রীও চিকিৎসক।
শুরু থেকেই হাসপাতালের আইসোলেশনে থাকা কভিড-১৯ রোগীদের চিকিৎসাসেবা দিয়ে আসছেন রিজভী। জোগাচ্ছেন মানসিক সাহস। মোবাইলে খবর নিচ্ছেন হোম কোয়ারেন্টাইনে থাকা রোগীদের। স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে থেকে বাড়িতে পৌঁছে দিচ্ছেন করোনাজয়ী মানুষদের। করোনা সম্পর্কিত নানা সভায় সময়মতো উপস্থিত থাকছেন। বক্তৃতায় তুলে ধরছেন নানা পরামর্শ। আবার সন্দেহভাজন করোনা রোগী ও উপসর্গে মৃত ব্যক্তির খবর পাওয়া মাত্রই পৌঁছে যাচ্ছেন তাদের কাছে। কখনও ভ্যানে, কখনও ইজিবাইকে, কখনও মোটরসাইকেলে, আবার রাস্তা খারাপ হলে হেঁটেই চলে যাচ্ছেন অসুস্থ ব্যক্তির কাছে। সংগ্রহ করছেন নমুনা। এভাবে উপজেলার এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্ত ঘুরে বেড়াচ্ছেন রিজভী। মাঝখানে জেলা সিভিল সার্জনের অফিস থেকে তাকে ১৪ দিনের জন্য হোম কোয়ারেন্টাইনে যেতে বলা হয়েছিল। কিন্তু তাতে রাজি হননি তিনি।
টানা দু'মাস এভাবে ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করার এক পর্যায়ে সহকর্মীদের তাগাদা ও পরামর্শে রিজভী নিজের নমুনা পরীক্ষা করান। পরীক্ষায় 'পজিটিভ' রিপোর্ট আসে। তখন কী আর করা! গত ৮ জুন থেকে হোম কোয়ারেন্টাইনে গিয়ে শুরু করেন কভিড-১৯-এর বিরুদ্ধে লড়াই। দুই সপ্তাহ আইসোলেশনে থেকে সুস্থ হয়ে আবারও যোগ দেন হাসপাতালে। পুনরায় শুরু করেন কভিড রোগীদের চিকিৎসাসেবা।
এভাবে করোনাকালীন চিকিৎসাসেবাসহ নানা কাজ করে ইতোমধ্যেই রিজভী মানবিক চিকিৎসক হিসেবে প্রশংসিত হয়েছেন পুরো অভয়নগরে।
অভয়নগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে করোনাভাইরাসের নমুনা সংগ্রহ করা শুরু হয় গত ২ এপ্রিল থেকে। এ পর্যন্ত ৭৮৪ জনের নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষা করা হয়েছে। যার মধ্যে ১৮৪ জনের করোনা 'পজিটিভ'। মারা গেছেন চারজন। স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মেডিকেল টেকনোলজিস্ট (ল্যাব) আলমগীর হোসেনকে (৩৩) সঙ্গে নিয়ে ডা. রিজভী প্রথম দিন থেকেই করোনার নমুনা সংগ্রহ করছেন। গতকাল বৃহস্পতিবার পর্যন্ত তিনি একাই সংগ্রহ করেছেন ৭০০ জনের নমুনা। নমুনা সংগ্রহ করতে গিয়ে আলমগীর হোসেনেরও করোনা পজিটিভ ধরা পড়ে। দ্বিতীয় দফা নমুনা পরীক্ষায় গত ২৩ জুন তাদের দু'জনেরই প্রতিবেদন নেগেটিভ এসেছে। প্রতিবেদন হাতে পেয়ে সেই দিনই ২১ জনের নমুনা সংগ্রহ করেন ডা. রিজভী।
কথা হয় এই করোনাযোদ্ধা ডা. মাহমুদুর রহমান রিজভীর সঙ্গে। তিনি বলেন, করোনার বিরুদ্ধে এ লড়াইয়ে জিততেই হবে। এ জন্য আমাদের দরকার দৃঢ় মনোবল। করোনার বিরুদ্ধে সংগ্রাম নিজের ও পরিবারের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। কিন্তু এভাবে মানবসেবা করতে পারাও বিরাট ব্যাপার।
যশোরের সিভিল সার্জন শেখ আবু শাহীন বলেন, যশোর জেলায় করোনা মোকাবিলায় প্রথম থেকে ইতিবাচক মানসিকতা নিয়ে যারা এগিয়ে এসেছেন, মাহমুদুর রহমান রিজভী তাদেরই একজন। করোনার বিরুদ্ধে সংগ্রামে ওর ভূমিকা যশোরের সবারই মনে থাকবে।