সংসদ সদস্যদের অনুকূলে দেওয়া থোক বরাদ্দের অর্থ খরচে জবাবদিহি না থাকায় অবারিত দুর্নীতি হচ্ছে বলে মনে করে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। সংস্থাটি বলেছে, নজরদারি না থাকায় এসব প্রকল্পের টেন্ডার, ঠিকাদারি, নির্মাণ, প্রকৌশল ও অর্থ ছাড়সহ সর্বত্র অনিয়ম-দুর্নীতি হচ্ছে।
জাতীয় সংসদের ৩০০ আসনের মধ্যে দৈবচয়নের ভিত্তিতে ৫০টি সংসদীয় আসনের থোক বরাদ্দের প্রকল্প পর্যালোচনা ও সংশ্নিষ্টদের সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে তৈরি করা গবেষণা প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে এসব তথ্য তুলে ধরেছে টিআইবি।
বুধবার রাজধানীতে এ গবেষণা প্রকাশ করা হয়। তবে সংরক্ষিত ৫০ নারী আসনকে এর বাইরে রাখা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, সংসদ সদস্যরা এ প্রকল্পের সর্বেসর্বা হওয়ায় একদিকে যেমন স্বার্থের দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হচ্ছে, তেমনি জনগণের টাকায় নেওয়া এসব উন্নয়ন প্রকল্পের অর্থের সিংহভাগ চলে যাচ্ছে দলীয় নেতাকর্মীদের পকেটে।
টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, এসব প্রকল্পে গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়নে কৃষি, কর্মসংস্থান সৃষ্টিসহ অনেক স্কিম থাকলেও মূলত বাস্তবায়নের সময় বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে অধিক লাভজনক রাস্তাঘাট নির্মাণকে। এগুলো দেখভালের জন্য সুনির্দিষ্ট কোনো আইনি কাঠামো গড়ে তোলা হয়নি। সরকারের প্রকল্প বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি) সেভাবে এগুলোর মূল্যায়ন করেনি। এই প্রকল্প থেকে সংসদ সদস্যদের দূরে রাখা অথবা এগুলো পর্যবেক্ষণের জন্য একটি নীতিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো গড়ে তোলার সুপারিশ করে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক বলেন, প্রায় ১৫ বছর ধরে বিতর্কিত এ স্কিমগুলো চালু আছে।
গবেষক দলের প্রধান জুলিয়েট রোজেটি বলেন, ২০১৯ সালের মে থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত সময়ে সেগুলোর বিশ্নেষণ করা হয়। পরিমাণবাচক ও গুণবাচক দু'রকম তথ্য নিয়ে একটি মিশ্র পদ্ধতির গবেষণা করেছেন তারা। আইআরআইডিপি-১-এর ৪৬৪টি স্কিম এবং আইআরআইডিপি-২-এর ১৬৪টি স্কিমের কাজের ওপর পর্যবেক্ষণ চালিয়ে এ গবেষণা প্রস্তুত করা হয়েছে। মন্ত্রণালয়, প্রকল্প বাস্তবায়নকারী বিভাগ, ঠিকাদার, এলজিইডি, স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ, সংসদ সদস্য, সংসদীয় স্থায়ী কমিটিসহ মোট ৩৪১টি সাক্ষাৎকার এতে যুক্ত হয়েছে।
আইআরআইডিপি কী?
২০০৫-০৬ অর্থবছরে সংসদ সদস্যদের প্রস্তাবের পরিপ্রেক্ষিতে এলাকার অবকাঠামো উন্নয়নে প্রতি সংসদ সদস্যের অনুকূলে দুই কোটি টাকার তহবিল বরাদ্দের অনুমোদন হয়। পরে সেই বরাদ্দের পরিমাণ তিন কোটি এমনকি পাঁচ কোটিতেও উন্নীত হয়। এটি অগ্রাধিকার ভিত্তিতে গুরুত্বপূর্ণ পল্লি অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প বা আইআরআইডিপি নামে পরিচিত। গ্র্রামীণ সড়ক ব্যবস্থার উন্নয়ন, সেতু/কালভার্ট নির্মাণ, গ্রোথ সেন্টার, হাটবাজার উন্নয়ন, কৃষি ও অকৃষি পণ্যের উৎপাদন বৃদ্ধিতে সহায়তা, কৃষি-অকৃষি পণ্যের বিপণন সুবিধা বৃদ্ধি ও গ্রামীণ কর্মসংস্থান ত্বরান্বিত করা এ প্রকল্পের উদ্দেশ্য।
বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকারের প্রথম মেয়াদে (২০১০-১৪) তিন কোটি টাকা করে ৩০০ আসনের সংসদ সদস্যদের জন্য এ প্রকল্প বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। দ্বিতীয় মেয়াদে সিটি করপোরেশন এলাকার ১৬টি আসন ছাড়া বাকি ২৮৪টি আসনে পাঁচ কোটি টাকা করে বরাদ্দ দেওয়া হয়। তৃতীয় মেয়াদে ২৮০টি সংসদীয় আসনে পাঁচ কোটি টাকা করে বরাদ্দ দেওয়া হয়, যা গত জুনে একনেক সভায় অনুমোদন পেয়েছে।
গবেষণায় দেখা যায়, আইআরআইডিপি-১ প্রকল্পে ৬০ শতাংশ রাস্তাঘাট নির্মাণ, ১০ শতাংশ সেতু/কালভার্ট, এক শতাংশ হাটবাজার এবং ২৯ শতাংশ রাস্তা ও ড্রেনেজ নির্মাণে ব্যয় করা হয়েছে। আইআরআইডিপি-২ প্রকল্পে ৬২ শতাংশ রাস্তাঘাট, ২ শতাংশ সেতু/কালভার্ট এবং ৩৬ শতাংশ রাস্তা, কালভার্ট ও ড্রেনেজ নির্মাণ করা হয়েছে।
গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কোনো কোনো এলাকায় সংশ্নিষ্ট প্রভাবশালীদের কাছে বছরে ২০ থেকে ২৫ ভাগ কাজ বিক্রি (অবৈধভাবে সাব-কন্ট্রাক্ট) হয়, কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিক নথিতে সাব-কন্ট্রাক্টের কোনো প্রমাণ রাখা হয় না। প্রকল্প এলাকায় কাজের বর্ণনা দিয়ে কোনো তথ্য বোর্ড টানানো দেখা যায়নি। সার্বিকভাবে ৭৬ শতাংশ স্কিমে কাজ চলাকালে তদারকি হয়েছে। এলজিইডির প্রকৌশলীরা ৭০ শতাংশ, কার্য সহকারীরা ১৭ শতাংশ, ইউপি মেম্বার, পৌর চেয়ারম্যানসহ স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা ১৩ শতাংশ প্রকল্প পর্যবেক্ষণ করেছেন। বাকি পর্যবেক্ষকদের পরিচয় পাওয়া যায়নি। স্কিমের কাজ পুরোপুরি না করা, কোনো কেনো স্কিমে একেবারেই না করা এবং এক বছর পর কাজ শেষ না করে জামানতের টাকা উত্তোলনে কর্তৃপক্ষ অনুমোদন দিয়েছে বলে পর্যবেক্ষণের তথ্য পাওয়া গেছে। প্রতিবেদনে কাজের মান সন্তোষজনক উল্লেখ করা হলেও টিআইবি বলছে, এসব কাজের মধ্যে সম্পূর্ণ কাজ হয়েছে ৭৪ শতাংশ, আংশিক হয়েছে ২১ শতাংশ। প্রায় ৫ শতাংশ ক্ষেত্রে কোনো কাজই হয়নি।
প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে ঠিকাদারকে একেকটি স্কিম বাস্তবায়ন করতে ১৪টি ধাপে অবৈধ কমিশন খরচ করতে হয়। এ খরচের পরিমাণ ৮ থেকে ১২ শতাংশ। টাকার অঙ্কে যা ৪১ হাজার থেকে ৫৯ হাজার টাকা পর্যন্ত।
টিআইবির সুপারিশ : সংসদীয় আসনে থোক বরাদ্দের অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর পৃথকভাবে নিরপেক্ষ ও পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়ন করে এগুলোর দুর্বলতা চিহ্নিত করা; প্রকল্পের আইনি কাঠামো বা নীতিমালা সুনির্দিষ্ট করা; সংশ্নিষ্ট আসনের ভৌগোলিক অবস্থান এবং উপযোগিতা অনুযায়ী তার সম্ভাব্যতা যাচাই করা; স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের সংশ্নিষ্ট সমন্বয় কমিটিতে স্থানীয় জনগণের প্রতিনিধিত্ব বাড়ানো এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে দলীয় ও রাজনৈতিক প্রভাব কমানো; স্কিম এলাকায় কাজ চলাকালীন তথ্য বোর্ড স্থাপন করা।