অভাবের কারণে মাদ্রাসা শিক্ষক হাফিজুর রহমান অল্প বয়সেই মেয়ে হাফিজা আক্তার আয়শাকে বিয়ে দেন রাজধানী ঢাকার লালবাগের বিসিদাস স্ট্রিটের ব্যবসায়ী মহিউদ্দিন মানিকের সঙ্গে। ২০১৪ সালের ১৭ জানুয়ারি তাদের বিয়ে হয়। বিয়ের পর থেকেই যৌতুকের জন্য শারীরিক নির্যাতন করেন মানিক। চলতি বছরের ১০ জুলাই পাঁচ লাখ টাকা যৌতুক চেয়ে আবারও মারধর শুরু করেন। নির্যাতনের কারণে হাফিজার গর্ভে থাকা তিন মাসের ভ্রুণ নষ্ট হয়ে যায়। ওই সময় মুমূর্ষু অবস্থায় হাফিজাকেও ধানমন্ডির নিউ লাইফ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। ১২ জুলাই মারা যান হাফিজা। তার বাবা কান্নাজড়িত কণ্ঠে এই প্রতিবেদককে বলেন, 'আগে নির্যাতনের কারণে বারবার আমার কাছে চলে এলেও চার বছর বয়সী সন্তানের টানে সে ফিরে যায়। এবার আর আসেনি। মেয়েটাকে মেরেই ফেলল পাষণ্ডটা।' এদিকে, নির্যাতনের ঘটনায় লালবাগ থানায় ১১ জুলাই হাফিজার বাবা বাদী হয়ে মামলা করলেও প্রভাব খাটিয়ে মানিকও জামিন পেয়ে যান। এখন বিভিন্নভাবে হুমকি দিয়ে মামলা নিষ্পত্তি করার পাঁয়তারা করছেন মানিক।

শুধু মানিক কেন, নারী নির্যাতন প্রতিরোধে দেশে অসংখ্য আইন থাকলেও বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনা যাচ্ছে না। ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন নারীরা। স্বামীর নির্যাতনের শিকার আরেক ভুক্তভোগী সুবর্ণা (ছদ্মনাম) জানান, বিচার চেয়ে আদালতপাড়ায় ঘুরছিলেন তিনি। আজ নিম্ন আদালত তো কাল উচ্চ আদালতের বারান্দা। নিয়মিত আইনজীবীদের কাছে ধরনাও দিয়ে যাচ্ছিলেন। স্বামীর একাধিক অনৈতিক সম্পর্কের কথা জেনেও ভবিষ্যৎ সন্তানের পিতাকে শোধরানোর সুযোগ দিতে চেয়েছিলেন সুবর্ণা। অথচ সেই স্বামীর নির্যাতনেই তার গর্ভে আসা ভ্রুণ নষ্ট হয়ে যায়। নির্যাতক স্বামীর বিচার চেয়ে মামলাও করেন। কিন্তু ক্ষমতাসীন দলের প্রভাব খাটিয়ে জামিন নিয়ে নেন ভ্রূণ হত্যা মামলার আসামি।

অনুসন্ধানে দেখা যায়, বিচারের ধীরগতির কারণে নারী ও শিশু নির্যাতন মামলার জট কেবলই বাড়ছে। এ সুযোগে অধিকাংশ আসামি মামলার বিভিন্ন প্রক্রিয়া চ্যালেঞ্জ করে উচ্চ আদালত থেকে জামিন নিয়ে মুক্ত হয়ে ঘুরছেন। এসব আসামির অনেকে প্রভাবশালী হওয়ায় ক্ষতিগ্রস্ত নারী ও শিশু নির্যাতন মামলার বাদীকে হুমকি বা অর্থের প্রলোভন দেখিয়ে নাজেহাল করছেন। অনেকে সাক্ষ্য-প্রমাণের ঘাটতি মেনে নিয়ে আপস-মীমাংসায় বাধ্য হচ্ছেন। গত বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সুপ্রিম কোর্টের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশের নিম্ন আদালতে বর্তমানে এক লাখ ৬৫ হাজার ৩২৭টি নারী ও শিশু নির্যাতন মামলা বিচারাধীন। এর মধ্যে ৩৪ হাজার ২৩৩টি মামলা পাঁচ বছরের অধিক সময় ধরে নিষ্পত্তির অপেক্ষায়। এ ছাড়া উচ্চ আদালতের নির্দেশে স্থগিত থাকা মামলার সংখ্যা এক হাজার ১৩৯টি।

নারীর অধিকার আদায়ে সোচ্চার সংগঠন নারীপক্ষের সর্বশেষ এক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে দায়ের করা মামলায় ৯৮ দশমিক ৬৪ ভাগ আসামি খালাস পেয়ে যাচ্ছে। সাজা হয় মাত্র ১ দশমিক ৩৬ ভাগ আসামির।

মানবাধিকারকর্মী ও কলামিস্ট সাদিয়া নাসরিন বলেন, কিছুতেই বন্ধ হচ্ছে না নারী নির্যাতন। উল্টো নারীর প্রতি সহিংসতা ভয়াবহ আকার নিয়েছে। নারী ও শিশু ধর্ষণের বর্তমান চিত্র আতঙ্কিত করে তুলেছে সাধারণ মানুষকে। প্রতিদিনই দেশের কোনো না কোনো প্রান্তে তরুণী, কিশোরী কিংবা শিশু ধর্ষিত হচ্ছে। এর সঙ্গে রয়েছে যৌতুকসহ অন্যান্য কারণে নির্যাতন। নারী নির্যাতনের চিত্র দিন দিন বৃদ্ধির অন্যতম কারণ আইনের দীর্ঘসূত্রতা, পুরুষতান্ত্রিক বিচারিক প্রক্রিয়া, ভিকটিমের নিরাপত্তাহীনতা ও সামাজিক নিপীড়ন।

সারাদেশের সব ধরনের ফৌজদারি অপরাধের বিচারে দীর্ঘসূত্রতার সঙ্গে তুলনা করে দেখা যায়, নারীদের মামলাগুলোর বিচার হতেই বেশি সময় লাগছে। প্রায় সাড়ে সাতটির মধ্যে একটি করে মামলা পাঁচ বছরের বেশি সময় ধরে চলে। অন্যদিকে, ২০০০ সালের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের আওতায় প্রতি চারটি মামলার মধ্যে একটি পাঁচ বছরের বেশি সময় ধরে চলে।

নারী নির্যাতনের এই বিচারহীনতার সংস্কৃতির এমন এক পরিস্থিতিতে আজ সোমবার পালিত হচ্ছে নারী নির্যাতন প্রতিরোধ দিবস। ১৯৯৫ সালের এই দিনে কিছু বিপথগামী পুলিশ সদস্য ধর্ষণের পর কিশোরী ইয়াসমিনকে হত্যা করে। এর প্রতিবাদ করতে গিয়ে বিক্ষোভে ফেটে পড়ে দিনাজপুরের মানুষ। বিক্ষুব্ধ জনতার ওপর গুলি চালায় পুলিশ। পুলিশের গুলিতে নিহত হন পাঁচজন। সেদিন থেকেই সারাদেশে ২৪ আগস্ট 'নারী নির্যাতন প্রতিরোধ দিবস' হিসেবে পালিত হচ্ছে।

নারীর অধিকার আদায়ে সোচ্চার বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠনের নেতারা বলছেন, নারীর প্রতি সহিংসতা বন্ধে শুধু আইন যথেষ্ট নয়। এর কঠোর প্রয়োগ জরুরি। পাশাপাশি প্রয়োজন মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরি করা।

মানবাধিকারকর্মী ও সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধুরী বলেন, সমাজে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে নির্যাতনের শিকার নারীকে মুখ লুকিয়ে চলতে হয়। এ পরিস্থিতি যত দিন থাকবে, নারীর প্রতি সহিংসতা বন্ধ হবে না। নির্যাতনের শিকার নারী নয়, মুখ লুকিয়ে চলতে হবে নির্যাতককে। এর জন্য আইনের কঠোর প্রয়োগের পাশাপাশি মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে হবে।

চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ছয় মাসে দেশে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ৬০১ জন নারী ও শিশু। এর মধ্যে একক ধর্ষণের শিকার ৪৬২ জন এবং দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ১৩৪ জন। ধর্ষণের শিকার ৪০ জনের বয়স ছয় বছর এবং ১০৩ জনের বয়স ১২ বছরের মধ্যে। এ ছাড়া ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ৩৭ নারীকে। আর ধর্ষণের পর আত্মহত্যা করেছেন সাতজন নারী। ধর্ষণের চেষ্টা চালানো হয়েছে ১২৬ নারীর ওপর। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের চলতি বছরের ছয় মাসের মানবাধিকার লঙ্ঘনের সংখ্যাগত প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। ওই প্রতিবেদনে বলা যায়, গত ছয় মাসে যৌন হয়রানির শিকার হয়েছেন ১০৩ জন নারী। এর মধ্যে যৌন হয়রানির কারণে আত্মহত্যা করেছেন ৯ জন। আর যৌন হয়রানির প্রতিবাদ করতে গিয়ে একজন নারী ও আটজন পুরুষ নিহত হয়েছেন।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) এক গবেষণা প্রতিবেদনে দেখা গেছে, বিবাহিত জীবনে ৮৭ শতাংশ নারী জীবনের কোনো না কোনো পর্যায়ে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। নির্যাতনের এ চিত্রে রয়েছে শারীরিক, মানসিক, অর্থনৈতিক ও যৌন নির্যাতন। নারী নির্যাতন বন্ধে মহিলা পরিষদের কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সীমা মোসলেম বলেন, আইনের কঠোর প্রয়োগের পাশাপাশি মানুষের মধ্যে সচেতনতাও বাড়াতে হবে।