করোনাকালে বিদ্যুতের ভূতুড়ে বিল নিয়ে অভিযোগের পাহাড় জমেছে। তবে এ কাহিনি নতুন নয়। বিদ্যুতের পাশাপাশি গ্যাস-পানি নিয়েও গ্রাহকদের ভোগান্তির অন্ত নেই। ভূতুড়ে বিল ছাড়াও রয়েছে নানা হয়রানি। অভিযোগ দিলেও সহজে মেলে না সমাধান। এসব ভোগান্তি দূর করতে দীর্ঘদিন ধরে সেবা খাতে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর কথা বলে আসছে সরকার। তবে বাস্তব চিত্র ভিন্ন। সংস্থাগুলোর অধিকাংশ কার্যক্রম, বিশেষ করে সরবরাহ ও সঞ্চালন ব্যবস্থা এখনও চলছে অ্যানালগ পদ্ধতিতে।
আবেদন গ্রহণ, বিল প্রদান ও অভিযোগ প্রদানের মতো কিছু বিষয়ে অনলাইন সেবা চালু হয়েছে। গ্যাস ও বিদ্যুতের গ্রাহকদের কিছু অংশ প্রিপেইড মিটারের আওতায় এলেও পানির ব্যবহারে এখনও লাগেনি প্রযুক্তির ছোঁয়া। বিদ্যুৎ গ্রাহকদের মাত্র সাড়ে ৮ শতাংশ এবং গ্যাসের আবাসিক গ্রাহকদের ৭ শতাংশ প্রিপেইড মিটারের আওতায় এসেছে। ঢাকা, চট্টগ্রাম ও খুলনায় পানি সরবরাহ করে ওয়াসা। এর মধ্যে শুধু চট্টগ্রাম ওয়াসা সম্প্রতি পানি সরবরাহ ব্যবস্থায় ডিজিটাল মিটারিং পদ্ধতি ব্যবহারের উদ্যোগ নিয়েছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় সেবার সঙ্গে সংশ্নিষ্ট এই সংস্থাগুলোর কার্যক্রমেও নেই প্রযুক্তির পূর্ণ ব্যবহার। সরবরাহ ও বিতরণ ব্যবস্থায় যুক্ত হয়নি স্বয়ংক্রিয় নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি (স্ক্যাডা সিস্টেম)। ফলে অনিয়ম-দুর্নীতি দূর হচ্ছে না। কমছে না সিস্টেম লস। গ্রাহকরা পাচ্ছেন না কাঙ্ক্ষিত সেবা। বিশেষজ্ঞদের মতে, দুর্নীতি বজায় রাখার স্বার্থে সংশ্নিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্মীদের অনীহা ও কর্তৃপক্ষের যথাযথ উদ্যোগের অভাবেই সেবা খাতকে প্রযুক্তিবান্ধব করার উদ্যোগে গতি মিলছে না। প্রকল্প নেওয়া হলেও তা ঝুলে থাকছে বছরের পর বছর। কারণ, সংস্থাগুলোর অটোমেশন হলে দুর্নীতি হ্রাস পাবে। বন্ধ হবে বিদ্যুৎ, গ্যাস ও পানি চুরি।
করোনা সংক্রমণের শুরুর দিকে বিদ্যুতের মিটার না দেখেই পূর্ববর্তী হিসাব অনুযায়ী আনুমানিক বিল দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। মার্চ ও এপ্রিলের অধিকাংশ বিদ্যুৎ বিল এভাবে দিতে গিয়ে ভজঘট লাগিয়ে ফেলে বিতরণ কোম্পানিগুলো। দেশজুড়ে ভূতুড়ে বিলের অভিযোগ পড়ে বস্তা বস্তা। পরিস্থিতি সামলাতে তদন্ত কমিটি গঠন করতে বাধ্য হয় বিদ্যুৎ বিভাগ। এ সময় বিল নিয়ে তুলনামূলক কম ভোগান্তিতে পড়েন বিদ্যুতের প্রিপেইড গ্রাহকরা। তবে মিটার রিচার্জসহ বিভিন্ন সমস্যার সম্মুখীন হন তারাও। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিদ্যুৎ বিতরণে স্মার্ট মিটার ও স্ক্যাডা সিস্টেম থাকলে এই ঝামেলা এড়ানো যেত। গ্রাহক ফোনেই ব্যবহূত বিদ্যুতের পরিমাণ ও মাসিক ব্যয় দেখতে পারতেন। তেমনি বিতরণ কর্তৃপক্ষ অফিসে বসেই বিষয়টি তদারক করতে পারত। বর্তমানে বিতরণ ব্যবস্থায় কোথাও বিঘ্ন ঘটলে তা খুঁজে পেতে দীর্ঘ সময় লেগে যায়। স্ক্যাডা থাকলে দ্রুত সমস্যা চি?ি?হ্নত করে সমাধান করা সম্ভব। গ্যাস ও পানি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোতে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়লে চুরি ও ভুয়া বিলের দৌরাত্ম্য থাকত না। গ্রাহকরা পেতেন কাঙ্ক্ষিত সেবা।
জানতে চাইলে প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ সুমন আহমেদ সাবির সমকালকে বলেন, প্রযুক্তি এখন এত এগিয়েছে যে সব ধরনের সেবা ডিজিটালি দেওয়া সম্ভব। সেবা খাতের প্রতিষ্ঠানগুলো চাইলে অল্প সময়েই অটোমেশনে যেতে পারে। কিন্তু এ ক্ষেত্রে তাদের আগ্রহ কম। ফলে ভোগান্তিতে পড়েন গ্রাহকরা।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ সমকালকে বলেন, তারা বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতকে পুরোপুরি ডিজিটাইজেশন করার উদ্যোগ নিয়েছেন। প্রিপেইড মিটার, স্মার্ট গ্রিড, পেপারলেস অফিসসহ সব ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। তিনি বলেন, প্রিপেইড মিটার স্থাপনে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একটু গড়িমসি ছিল। নতুন প্রযুক্তি সহজে গ্রহণের মানসিকতা অনেকের নেই। এ বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। সবাইকে বলা হয়েছে, গ্রাহকদের মানসম্মত ও নিরবচ্ছিন্ন সেবা দিতে হবে। এ জন্য প্রযুক্তিবান্ধব দক্ষ জনবল গড়ে তুলতে হবে।
বিদ্যুতে প্রযুক্তির ছোঁয়া সামান্যই :দেশে বিদ্যুৎ বিতরণ প্রতিষ্ঠান রয়েছে ছয়টি। সারাদেশে এগুলোর মোট গ্রাহক প্রায় চার কোটি। এর মধ্যে মাত্র ৩৪ লাখ গ্রাহক প্রিপেইড মিটারের আওতায় এসেছে। অথচ সরকার সেই ২০১০ সালেই বিদ্যুতে প্রিপেইড মিটার চালুর উদ্যোগ নেয়। উত্তরবঙ্গে বিদ্যুৎ সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান নেসকো পাঁচ লাখ প্রিপেইড মিটার সংযোগ দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছিল কয়েক বছর আগে। এটা চলতি বছর শেষ হওয়ার কথা থাকলেও এখন পর্যন্ত নামমাত্র কাজ হয়েছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে পাওয়ার সেলের মহাপরিচালক মোহাম্মদ হোসেন জানান, তাদের চার কোটি গ্রাহকের মধ্যে এক কোটি লাইফলাইন গ্রাহক। দরিদ্র এই গ্রাহকদের বিদ্যুৎ ব্যবহার মাসে ৫০ ইউনিটের কম। তাই আপাতত তাদের প্রিপেইড মিটার পদ্ধতির আওতায় আনার চিন্তা নেই। বাকি গ্রাহকরা ২০২৩ সালের মধ্যে স্মার্ট মিটারের আওতায় আসবেন।
তিনি জানান, প্রিপেইড মিটার কোন পদ্ধতিতে চলবে, এর কারিগরি পদ্ধতি নিয়ে বিভিন্ন অসুবিধা ও অর্থায়নে সমস্যার কারণে দীর্ঘদিন এ কার্যক্রমে গতি ছিল না। এখন দ্রুত এগোচ্ছে। আগামী তিন বছরের মধ্যে লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হবে। তিনি বলেন, এরই মধ্যে তাদের সব অফিশিয়াল কার্যক্রম, বৈঠক ডিজিটাল পদ্ধতিতে সম্পন্ন হচ্ছে। কেনাকাটা, প্রকল্প পর্যালোচনায়ও অনলাইন সেবা গ্রহণ করা হচ্ছে। নতুন সংযোগের আবেদনও গ্রাহকদের অভিযোগ অনলাইনে নেওয়া হচ্ছে। বিল প্রদান পদ্ধতি ডিজিটাল হয়েছে। ধীরে ধীরে বিদ্যুতের বিতরণ ও সঞ্চালন ব্যবস্থাপনা পুরোটা স্ক্যাডার আওতায় আসবে।
ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক বিকাশ দেওয়ান জানান, তারা এখন পুরো বিতরণ সিস্টেমকেই অটোমেশনের আওতায় আনার উদ্যোগ নিয়েছেন। ঢাকা ইলেকট্রিসিটি সাপ্লাই কোম্পানির (ডেসকো) ব্যবস্থাপনা পরিচালক কাওসার আমীর আলী বলেন, আগে কিছু সাধারণ প্রযুক্তির প্রিপেইড মিটার দেওয়া হলেও এখন স্মার্ট মিটার স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে বিতরণ ব্যবস্থায় জিপিআরএস পদ্ধতি প্রয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ফলে দুর্ঘটনা দ্রুত চি?িহ্নত করা সম্ভব হবে।
প্রযুক্তির ব্যবহার কম, থামছে না গ্যাস চুরি :গ্যাসের প্রিপেইড মিটার স্থাপনে প্রথম দিকে বেশ তোড়জোড় ছিল। এখন যতটা পারা যায় বিলম্বিত করার কৌশলী অবস্থান নিয়েছে বিতরণ সংস্থাগুলো। চুরির গ্যাসকে ফাঁকির মধ্যে ফেলতেই ডিজিটাল পদ্ধতিতে যেতে অনীহা সংশ্নিষ্টদের। অভিযোগ রয়েছে, গ্যাস চুরির সঙ্গে বিতরণ কোম্পানির অনেক কর্মী জড়িত। তারা নির্দিষ্ট হারে মাসোহারা পেয়ে থাকেন। সারাদেশে গ্যাসের আবাসিক গ্রাহক ৪৩ লাখ। এর মধ্যে শুধু ঢাকা ও চট্টগ্রামের মাত্র তিন লাখ গ্রাহকের ঘরে প্রিপেইড মিটার বসেছে। অথচ ২০১৮ সালেই বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) গ্যাসের দাম বৃদ্ধির আদেশে প্রিপেইড মিটার স্থাপনের আদেশ জারি করেছিল; কিন্তু আজও তা বাস্তবায়িত হয়নি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রিপেইড মিটার স্থাপনে যেমন গ্যাস চুরি কমবে, তেমনি বন্ধ হবে গ্যাসের অপচয়ও। এতে গ্রাহক ও সরকার উভয়ের লাভ। কারণ, প্রিপেইড মিটারে প্রতি চুলায় ৩৩ ঘনমিটার গ্যাস সাশ্রয় হয়। এতে বছরে ৫৩ বিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সাশ্রয় হবে, যার বর্তমান বাজারমূল্য এক হাজার ৯০০ কোটি টাকা। শুধু রাজধানীর সব বাসাবাড়িকে প্রিপেইড মিটারের আওতায় আনা গেলে যে পরিমাণ গ্যাস সাশ্রয় হবে, তা দিয়ে দৈনিক ৪৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক আলী মো. আল মামুন সমকালকে জানান, তাদের ২৮ লাখ গ্রাহকের মধ্যে সোয়া দুই লাখ বাড়িতে প্রিপেইড মিটার বসেছে। আগামী চার-পাঁচ বছরের মধ্যে সবাইকে প্রিপেইড মিটারের আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, ঢাকার বিতরণ লাইন প্রতিস্থাপনের একটি পরিকল্পনা চলছে। এটির কার্যক্রম শুরু হলে বিতরণ ব্যবস্থায় স্ক্যাডা সিস্টেম চালু হবে। সংযোগ আবেদন অনলাইনে নেওয়ার জন্য একটি কার্যক্রম হাতে নেওয়া হয়েছে।
জানতে চাইলে জ্বালানি সচিব আনিসুর রহমান বলেন, গ্যাস প্রিপেইড মিটার স্থাপন কার্যক্রম এগিয়ে নিতে সংশ্নিষ্ট কোম্পানিগুলোকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, অনেক উদ্যোগ পিছিয়ে গেছে। সেগুলোতে গতি সঞ্চারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ঢাকায় গ্যাস বিতরণ ব্যবস্থা আগামী তিন থেকে চার বছরের মধ্যে পাল্টে যাবে। স্ক্যাডা সিস্টেম চালু হবে। তখন কোথাও গ্যাস লিক হলে তিতাসের কর্মকর্তারা অফিসে বসেই জানতে পারবেন। দুর্ঘটনা ও চুরি রোধ করা সম্ভব হবে।
মান্ধাতা আমলে ওয়াসা :মানসম্মত ও চাহিদা অনুসারে পানি না পেলেও মাসে মাসে টাকা গুনতে হচ্ছে গ্রাহকদের। রয়েছে তিন-চার গুণ বেশি বিল দেওয়ার অভিযোগ। এসব বিষয়ে অভিযোগ করেও সহজে প্রতিকার মেলে না। ঢাকা ওয়াসার বিরুদ্ধে পানির নিম্নমান, দূষণ, ব্যাকটেরিয়া, পানির সরবরাহ সংকট, ভূতুড়ে বিল, ১২ বছরে ১৩ বার মূল্যবৃদ্ধির মতো নানা অভিযোগ রয়েছে।
তবে ঢাকা ওয়াসার কর্মকর্তারা বলছেন, তারা তাদের কার্যক্রম ডিজিটাল করার উদ্যোগ নিয়েছেন। এর আওতায় ই-বিলিং, ই-জিপি, ই-পানি ও পয়োসংযোগ, ই-নথি, ই-রিক্রুটমেন্টসহ সিস্টেম চালু করা হয়েছে। এ ছাড়া পানির পাম্পে এসসিএডিএ স্থাপন করে ওয়েব ও মোবাইল অ্যাপ দ্বারা গভীর নলকূপের অপারেশন, কন্ট্রোল ও মনিটরিং কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। ২০০৯ সাল থেকে বিল প্রদান ব্যবস্থাকে অটোমেশন করা হয়েছে। এ ছাড়া আইওটি ও জিআইএস ব্যবহার করে স্মার্ট ওয়াটার ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম বাস্তবায়ন প্রক্রিয়াধীন।
এদিকে গ্রাহক হয়রানি ও অনিয়ম রোধে চট্টগ্রাম ওয়াসার পানির বিলিং পদ্ধতি ডিজিটাল করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এজন্য একটি পাইলট প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। সংস্থাটি আশা করছে, তাদের উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে গ্রাহকরা পানির ভূতুড়ে বিলের খÿ থেকে মুক্ত হবে।
কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) উপদেষ্টা অধ্যাপক শামসুল আলম সমকালকে বলেন, প্রযুক্তির উদ্দেশ্যই হলো স্বচ্ছতা ও স্বাচ্ছন্দ্য নিশ্চিত করা। তাই ডিজিটাইজেশনের পাশাপাশি স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। প্রযুক্তির ব্যবহার এমন হতে হবে যাতে গ্রাহকের স্বাচ্ছন্দ্য বাড়ে, আবার ব্যয়ও কমে।

বিষয় : অ্যানালগ সেবা

মন্তব্য করুন