খাবার দেওয়ার কথা বলে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ

খুনির সন্ধান দিল রাংতা কাগজ

প্রকাশ: ০১ সেপ্টেম্বর ২০২০     আপডেট: ০১ সেপ্টেম্বর ২০২০       প্রিন্ট সংস্করণ

ইন্দ্রজিৎ সরকার

এলোমেলোভাবে রাস্তায় ঘুরে বেড়াচ্ছিলেন মানসিকভাবে বিপর্যস্ত মেয়েটি। পেটে প্রচণ্ড ক্ষুধা। তবে খাবার কেনার মতো টাকা তার কাছে ছিল না। এক যুবক তাকে ডেকে সহানুভূতির সঙ্গে কথা বলে। তাকে খাওয়ানোর জন্য নিজের বাড়িতে নিয়ে যেতে চায়। ক্ষুধা-তৃষ্ণায় দুর্বল হয়ে পড়া মেয়েটি রাজি হন। কিন্তু বাড়িতে নেওয়ার নাম করে যুবক মেয়েটিকে নিয়ে যায় পাশের একটি বাঁশঝাড়ে।

সেখানে আসে যুবকের আরও দুই বন্ধু। তিনজন পর্যায়ক্রমে ধর্ষণ করে তাকে। প্রায় অচেতন মেয়েটিকে দ্বিতীয় দফায় নির্যাতনের চেষ্টা চালালে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের শিকার মেয়েটি সবাইকে বলে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে নিজেকে বাঁচানোর শেষ চেষ্টা চালান। এ সময় ক্ষিপ্ত তিন যুবক রশি দিয়ে শ্বাসরোধে হত্যা করে তাকে। পরে ঘটনাটি ধামাচাপা দিতে নিজেরাই 'সুইসাইড নোট' লিখে মেয়েটির কোমরে গুঁজে মৃতদেহ বৈদ্যুতিক খুঁটিতে ঝুলিয়ে দেয়।

পাশবিক এ নির্যাতন ও হত্যার ঘটনা ঘটেছে গত ২২ আগস্ট দেশের উত্তরাঞ্চলের জনপদ নীলফামারীর সৈয়দপুরের কামারপুকুর ইউনিয়নের মৎস্য খামার এলাকায়। নিহত আকলিমা খাতুন ছিলেন তিন সন্তানের জননী। শুরুতে এ ঘটনাকে আত্মহত্যা হিসেবেই ধরে নিয়েছিল সবাই। তদন্তের একপর্যায়ে রাংতা কাগজে কাঠপেন্সিলে লেখা সুইসাইড নোটের সূত্র ধরে বেরিয়ে আসে নেপথ্যের চাঞ্চল্যকর ঘটনা। সে পর্যন্ত পৌঁছাতে কখনও ছোট্ট তথ্যসূত্রের অসামান্য বিশ্নেষণ, কখনও রাখালের ছদ্মবেশ, আবার কখনও প্রযুক্তির ব্যবহারে সংশ্লিষ্টদের দক্ষতা কালজয়ী গোয়েন্দা চরিত্র ফেলুদা-ব্যোমকেশের কথা মনে করিয়ে দেয়।

নীলফামারীর পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মোখলেছুর রহমান সমকালকে বলেন, সিগারেটের প্যাকেটে থাকা রাংতা কাগজে সুইসাইড নোট লিখে ঘটনাটি ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করা হয়েছিল। অবশ্য মেয়েটি যে পরিস্থিতিতে ছিল, তাতে আত্মহত্যা করাও অস্বাভাবিক ছিল না। ফলে প্রকৃত সত্য হয়তো আড়ালেই থেকে যেত। কিন্তু সুইসাইড নোটটিই প্রশ্নের জন্ম দেয়। একজন অধূমপায়ী নারী কেন সাধারণ কাগজের বদলে রাংতা কাগজে সুইসাইড নোট লিখবে? এই ছোট্ট প্রশ্নটিই বদলে দেয় তদন্তের গতিপথ।

রাংতা কাগজটি কোন সিগারেটের প্যাকেট থেকে খুলে নেওয়া হয়েছে, তা খুঁজতে গিয়ে বৈদ্যুতিক খুঁটির অদূরেই বাঁশঝাড়ে একই ব্র্যান্ডের সিগারেটের ছেঁড়া প্যাকেট পাওয়া যায়। সেটিতে সুইসাইড নোটের কথাগুলোই লেখা ছিল। এতে সন্দেহ আরও ঘনীভূত হয়। এলাকায় ওই ব্র্যান্ডের সিগারেট কারা খায়, তা শনাক্ত করতে রাখালের ছদ্মবেশে পুলিশ সদস্যরা বিভিন্ন স্থানে ঘুরে বেড়ান। এভাবে সন্দেহভাজন প্রায় ৭০ জনকে চিহ্নিত করে কৌশলে তাদের হাতের লেখার সঙ্গে সুইসাইড নোটের লেখা মেলানো হয়। একপর্যায়ে আনারুল ইসলাম ও মো. শুভ নামের দু'জনকে শনাক্ত করা সম্ভব হয়।

জিজ্ঞাসাবাদে আনারুল স্বীকার করে, নোটটি তারই লেখা। সে আকলিমাকে ডেকে বাঁশঝাড়ে নিয়ে যায়। পরে সে, শুভ ও হৃদয় তাকে ধর্ষণ করে। ফের ধর্ষণে বাধা দেওয়ায় তারা তাকে হত্যা করে। গত ২৮ আগস্ট আনারুল ও শুভ আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়। হৃদয় এখনও পলাতক।

সমকালের নীলফামারী প্রতিনিধি জানান, ২৫ বছর বয়সী আকলিমার সঙ্গে তার স্বামী শরিফুল ইসলামের সম্পর্ক ভালো ছিল না। স্বামীর পরকীয়া নিয়ে প্রায়ই দু'জনের মধ্যে ঝগড়া হতো। শরিফুল তাকে নির্যাতনও করতেন। একপর্যায়ে তিনি সন্তানদের নিজের কাছে রেখে আকলিমাকে বাড়ি থেকে বের করে দেন। তখন ভাইদের কাছে গেলে তারাও অসহায় আকলিমাকে ঠাঁই দেননি। এ পরিস্থিতিতে রাস্তায় এলোমেলো ঘুরে বেড়ানোর সময় আকলিমা ধর্ষকদের খপ্পরে পড়েন।