দুর্নীতির পথঘাট খোলা রাখতে লক্ষ্মীপুর-২ আসনের এমপি মোহাম্মদ শহিদ ইসলাম পাপুল তার নির্বাচনী এলাকায় রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন প্রতিষ্ঠা করেছেন। এর জন্য লক্ষ্মীপুরের রায়পুর এলাকায় ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের কিছু নেতার পেছনে খরচ করেছেন অঢেল টাকা। টাকার বিনিময়েই স্থানীয় নেতাদের কবজা করাসহ সবকিছু নিজের হাতের মুঠোয় এনেছিলেন। খোঁজ নিয়ে পাপুলের নির্বাচনী এলাকার বিভিন্ন মানুষের সঙ্গে কথা বলে তার ছয় সহচরের বিষয়ে মিলেছে নানা তথ্য। এ ছাড়া দুর্নীতির অভিযোগে ইতোমধ্যে চারজনকে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) তলবও করা হয়েছে।

মানব ও অর্থ পাচারের অভিযোগে গত ৬ জুন এমপি পাপুল কুয়েতে গ্রেপ্তার হন। কুয়েতের বিভিন্ন ব্যাংক হিসাবে তার নামে জমা থাকা ১৩৮ কোটি টাকা জব্দ করা হয়েছে। দেশটির আদালত তার ব্যাপারে সূক্ষ্ণ দৃষ্টি রাখছে বলে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে জানা গেছে। একই সঙ্গে দেশে-বিদেশে তার নানা ধরনের প্রতারণার খবরও ছাপা হচ্ছে। তার পরও এলাকায় তার প্রভাব কমেনি। এর কারণ পাপুলের পক্ষে তার কিছু 'পোষা' স্থানীয় নেতা এলাকার রাজনীতিসহ সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করছেন। এলাকাবাসীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, অর্থ ও ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়ে ছয়জন অনুগত নেতাকে নিয়ে দুর্বৃত্তায়নের সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছেন পাপুল। এরই মধ্যে তাদের চারজনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তলব করে চিঠি দিয়েছেন দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অনুসন্ধান কর্মকর্তা ও উপপরিচালক মো. সালাহউদ্দিন। তাদের মধ্যে রায়পুর উপজেলা আওয়ামী লীগের আহ্বায়ক কাজী মো. জামশেদ কবির বাকীবিল্লাহ ও লক্ষ্মীপুর জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট নূর উদ্দিন চৌধুরী নয়নকে আগামী ৮ সেপ্টেম্বর এবং লক্ষ্মীপুর জেলা যুবলীগের সভাপতি একেএম সালাউদ্দিন টিপু ও জেলা পরিষদের সদস্য শাখাওয়াত হোসেন আরিফকে ৯ সেপ্টেম্বর রাজধানীর সেগুনবাগিচায় দুদকের প্রধান কার্যালয়ে হাজির হতে বলা হয়েছে। স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলেও এই চারজনসহ ছয়জনের বিরুদ্ধে চাঞ্চল্যকর তথ্য পাওয়া গেছে।

অ্যাডভোকেট নূর উদ্দিন চৌধুরী নয়ন : ২০১৬ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার লক্ষ্মীপুর সফরের সময় জনসভার মঞ্চে ওঠা নেতাদের মধ্যে পাপুলও ছিলেন। ওই সময় স্থানীয় আওয়ামী লীগে পাপুলের কোনো ধরনের সংশ্নিষ্টতা ছিল না। অভিযোগ রয়েছে, দুই কোটি টাকার বিনিময়ে জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট নূর উদ্দিন চৌধুরী নয়ন পাপুলকে মঞ্চে তুলেছিলেন। সেই থেকে শুরু হয় পাপুলের রাজনৈতিক পথচলা। একাদশ সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ থেকে প্রথমে মনোনয়ন চেয়ে ব্যর্থ হন পাপুল। পরে নয়নকে সঙ্গে নিয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মনোনয়নপত্র জমা দেন। তখন আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোটের মনোনীত প্রার্থী ছিলেন জাতীয় পার্টির মো. নোমান। পরে পাপুল নোমানকে আট কোটি টাকা দিয়ে বসিয়ে দেন। এ ক্ষেত্রেও প্রত্যক্ষ ভূমিকা রেখেছিলেন নয়ন। নির্বাচনে জেতানোর জন্য পাপুলের কাছ থেকে নয়ন দ্বিতীয় দফায় আরও ছয় কোটি টাকা নেন বলেও জানা গেছে। পাপুল স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাদের কাজে লাগিয়ে নির্বাচনে কেন্দ্রের সমর্থনও পেয়ে যান।

একেএম সালাউদ্দিন টিপু : পাপুলকে নির্বাচনে জেতানোর জন্য জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট নূর উদ্দিন চৌধুরী নয়নের সহযোগী লক্ষ্মীপুর জেলা যুবলীগের সভাপতি একেএম সালাউদ্দিন টিপু পাপুলের কাছ থেকে প্রায় দুই কোটি টাকা নেন। পাপুল তাকে একটি হ্যারিয়ার ব্র্যান্ডের জিপও কিনে দেন।

কাজী মো. জামশেদ কবির বাকীবিল্লাহ : নির্ভরযোগ্য সূত্র জানায়, ২০১৫-১৬ সালের দিকে পাপুলকে রাজনীতিতে নিয়ে নিয়ে আসতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন যে ব্যক্তি তিনি রায়পুর উপজেলা আওয়ামী লীগের আহ্বায়ক কাজী মো. জামশেদ কবির বাকীবিল্লাহ। সে সময় পাপুলের কাছ থেকে তিনি বিপুল আর্থিক সুবিধা নেন বলে জানা গেছে। পাপুল সাংসদ নির্বাচিত হয়ে এই বাকীবিল্লাহকেই তার স্থানীয় রাজনৈতিক প্রতিনিধি হিসেবে নিয়োগ দেন। বাকীবিল্লাহ পাপুলের ছত্রছায়ায় রায়পুর উপজেলার সিএনজি স্টেশন ও অটোরিকশা চালকদের কাছ থেকে চাঁদা বাবদ প্রায় ২৪ কোটি টাকা হাতিয়ে নেন।

মাস্টার আলতাফ হোসেন হাওলাদার : স্থানীয়দের কাছ থেকে জানা গেছে, পাপুলের রাজনৈতিক কর্মসূচিতে লোক সরবরাহ করতেন রায়পুর উপজেলার সাবেক চেয়ারম্যান মাস্টার আলতাফ হোসেন হাওলাদার। এ জন্য কয়েক দফায় পাপুল তাকে প্রায় দুই কোটি টাকা দিয়েছেন। ২০০৯ সালে উপজেলা চেয়ারম্যান নির্বাচনে আওয়ামী লীগ থেকে দলীয় মনোনয়ন পেতে ব্যর্থ হন আলতাফ মাস্টার। তখন তিনি দলীয় প্রার্থী অধ্যক্ষ মামুনুর রশীদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। নির্বাচনী খরচ বাবদ পাপুল তাকে দেন ৫০ লাখ টাকা। নির্বাচনে হেরে গেলেও পাপুলের পৃষ্ঠপোষকতায় একের পর এক রায়পুরের নতুনকানি বগার চর ও কাছিয়ার চর মৌজার ছয় হাজার ৮০৯ একর খাসজমি দখল করেন। সরকারের আশ্রয়ণ প্রকল্পের ওই জমি এখনও তার ভোগদখলে আছে।

এ ছাড়া আলতাফ মাস্টার প্রভাব খাটিয়ে অবৈধভাবে মেঘনা নদীতে তিনটি মাছের ঘাট তৈরি করেন। এসব ঘাটেও পাপুলের কয়েক কোটি টাকা বিনিয়োগ আছে। মাছ ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে নিয়মিত কমিশন আদায় করে থাকেন আলতাব মাস্টার। এ টাকা নিজের কাছে না রেখে জমা রাখেন তার জামাতা মাহবুবুর রহমান মুরাদের ব্যাংক হিসাবে।

রফিকুল হায়দার বাবুল পাঠান : একাধিক সূত্রে জানা গেছে, পাপুলের অনুপস্থিতিতে এলাকায় তার পক্ষে সক্রিয় ভূমিকা রাখছেন লক্ষ্মীপুর জেলা আওয়ামী লীগের সদস্য রফিকুল হায়দার বাবুল পাঠান। তিনি পাপুলের টেন্ডার বাণিজ্য, চাঁদাবাজি, স্থানীয় সালিশসহ নানা কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। বাবুল পাঠান পাপুলের কাছ থেকে প্রায় ছয় কোটি টাকা নিয়ে তার ছেলে মেহেদী হাসান শিশিরকে পাঠানের মাধ্যমে ঠিকাদারি কাজ করছেন। ঠিকাদারি কোম্পানি বাবুল এন্টারপ্রাইজ ও শিশির এন্টারপ্রাইজের নামে মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক রায়পুর শাখার হিসাবে বিপুল পরিমাণ টাকার লেনদেনের তথ্য পাওয়া গেছে।

শাখাওয়াত হোসেন আরিফ : একসময় থাই গ্লাসের মেকানিক হিসেবে কাজ করতেন লক্ষ্মীপুর জেলা পরিষদের সদস্য শাখাওয়াত হোসেন আরিফ। বর্তমানে তিনি শতকোটি টাকার মালিক। গত বছর পাপুলের প্রত্যক্ষ সহায়তায় বিনা টেন্ডারে ১০৬ কোটি টাকার ঠিকাদারি কাজ পান আরিফ। জেলা পরিষদের সদস্য হয়ে প্রভাব খাটিয়ে আরিফ ২০১৮ সাল থেকে চলতি বছরের জুন পর্যন্ত ঠিকাদারি কাজ নিয়ে ওইসব কাজ বাস্তবায়ন না করেই ভুয়া বিলে সরকারি অর্থ আত্মসাৎ করেছেন।

দুদক পাপুল ও তার পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে মানব পাচার, অর্থ পাচার ও নানা দুর্নীতির মাধ্যমে অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ অনুসন্ধান করছে। পাপুলের বিরুদ্ধে দুদকে পেশ করা অভিযোগে বলা হয়, পাপুল কুয়েতে মানব পাচার করে প্রায় এক হাজার ৪০০ কোটি টাকা অবৈধভাবে অর্জন করেছেন। হুন্ডির মাধ্যমে ওই টাকা দেশে আনা এবং বিভিন্ন দেশে পাচারের তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে অভিযোগে। হুন্ডি ও ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের ব্যাংক হিসাব ব্যবহার করে ২০১৬ সালে বিদেশ থেকে ২৮০ কোটি টাকা দেশে এনেছেন পাপুল। দুদকের অনুসন্ধানে পাপুল, তার স্ত্রী সংরক্ষিত নারী আসনের এমপি কাজী সেলিনা ইসলাম, বড় মেয়ে ওয়াফা ইসলাম ও শ্যালিকা জেসমিন প্রধানের নামে বিপুল পরিমাণ স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ পাওয়া গেছে। ওইসব সম্পদের বৈধ উৎস খুঁজে পাওয়া যায়নি।