জীববিজ্ঞান অলিম্পিয়াড : বিডিবিও-সমকাল আনন্দ আয়োজন

মেধাবী প্রজন্মের জন্য চাই পৃষ্ঠপোষকতা

প্রকাশ: ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২০   

বিশেষ প্রতিনিধি

এদেশে মেধার অভাব নেই। সম্ভাবনাময় তরুণ মেধাবীরা নানা ক্ষেত্রে দেশের মুখ উজ্জ্বল করছে। বয়ে আনছে গৌরব। কিন্তু সঠিক পরিচর্যার অভাবে পরে তাদের অনেকে আবার হারিয়েও যায়। তরুণ মেধাবীদের ধরে রাখতে প্রয়োজন সঠিক পরিকল্পনা ও উদ্যোগ। তা করতে পারলে দেশের উন্নয়নে দক্ষ শক্তি হিসেবে এই মেধাবী প্রজন্মই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবে। শুক্রবার ভার্চুয়াল প্ল্যাটফর্মে 'আন্তর্জাতিক জীববিজ্ঞান অলিম্পিয়াড চ্যালেঞ্জ-২০২০' বিজয়ীদের নিয়ে আনন্দ আয়োজনে আমন্ত্রিত অতিথিরা এসব কথা বলেন।

জনকূটনীতির অংশ হিসেবে বিবেচনা করে জীববিজ্ঞান অলিম্পিয়াডের মতো আয়োজনে আগামীতে সরকারিভাবে সহায়তা দেওয়ার বিষয়টি সক্রিয়ভাবে বিবেচনা করবেন বলেও জানান আয়োজনের প্রধান অতিথি পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন।

অনুষ্ঠানে সমকালের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মুস্তাফিজ শফি বলেন, এ আয়োজনটি সমকাল এবং বাংলাদেশ জীববিজ্ঞান অলিম্পিয়াড যৌথভাবে আয়োজন করছে এবং প্রতি বছর বিদেশের মাটি থেকে দেশের তরুণরা সাফল্যও বয়ে আনছে। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেলে দেশের জন্য এ ধরনের আয়োজন থেকে আরও বড় সাফল্য বয়ে আনা সম্ভব।

অনুষ্ঠানে সভাপতির বক্তব্যে বাংলাদেশ জীববিজ্ঞান অলিম্পিয়াডের সভাপতি অধ্যাপক ড. মো. শহীদুর রশীদ ভূঁইয়া জানান, চলতি বছর জাপানের নাগাসাকিতে আন্তর্জাতিক জীববিজ্ঞান অলিম্পিয়াডের আয়োজন হওয়ার কথা ছিল। তবে কভিড-১৯ মহামারির কারণে আয়োজনটি হয় ভার্চুয়াল প্ল্যাটফর্মে। সেই আয়োজনে জাতীয় জীববিজ্ঞান অলিম্পিয়াড থেকে প্রতিযোগিতার মাধ্যমে নির্বাচিত টিম বাংলাদেশ হিসেবে চারজন অংশ নেয়। এর মধ্যে দু'জন ব্রোঞ্জপদক জয় করে। তারা হচ্ছে- দি আগা খান স্কুলের শিক্ষার্থী রাফসান রহমান রায়ান এবং রাজশাহী কলেজের রাদ শারার। চূড়ান্ত পর্বে অংশ নেওয়া টিম বাংলাদেশের অপর দুই প্রতিযোগী ছিল এসএফএক্স গ্রিন হেরাল্ড ইন্টারন্যাশনাল স্কুলের তাসনিম বিনতে জুলফিকার এবং সেন্ট যোসেফ হায়ার সেকেন্ডারি স্কুলের শিক্ষার্থী আবরার জামিল। ২০১৬ সালে শুরু হওয়া জাতীয় জীববিজ্ঞান উৎসব থেকে প্রতি বছরই বিজয়ীরা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে চূড়ান্ত পর্বে অংশ নিয়ে সাফল্য বয়ে আনছে। ২০১৯ সালেও টিম বাংলাদেশের চারজনের মধ্যে তিনজন ব্রোঞ্জপদক জয় করেছিল। তিনি আরও বলেন, জীববিজ্ঞান অলিম্পিয়াড আয়োজনে ৩০০ নম্বরের ব্যবহারিক পরীক্ষা থাকে। এক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের কার্যকর সহায়তা দেওয়া গেলে বাংলাদেশের শিক্ষার্থীরা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সর্বোচ্চ সাফল্য অর্জনে সক্ষম হবে। এ জন্য তিনি সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা জরুরি বলে মন্তব্য করেন।

এ আনন্দ আয়োজনের আলোচনায় আরও অংশ নেন জীববিজ্ঞান অলিম্পিয়াডের প্রধান প্রশিক্ষক অধ্যাপক ড. রাখহরি সরকার, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব বায়োটেকনোলজির (এনআইবি) মহাপরিচালক ড. মো. সলিমুল্লাহ, স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজের অধ্যাপক মনিরুল ইসলাম, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক মোহাম্মদ তারিক আরাফাত, কারিগরি সহায়তা দেওয়া প্রতিষ্ঠান ল্যাব বাংলার চেয়ারম্যান রাখাল রাহা, আয়োজনের সহযোগী প্রতিষ্ঠান কথাপ্রকাশের স্বত্বাধিকারী জসীম উদ্দিন, বাংলাদেশ জীববিজ্ঞান অলিম্পিয়াডের সাধারণ সম্পাদক সৌমিত্র চক্রবর্তী এবং এ বছর আন্তর্জাতিক পর্বে অংশ নেওয়া টিম বাংলাদেশের চার তরুণ শিক্ষার্থী রাফসান রহমান রায়ান, রাদ শারার, তাসনিম বিনতে জুলফিকার এবং আবরার জামিল। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন সমকালের সহকারী সম্পাদক (সুহৃদ সমাবেশের বিভাগীয় প্রধান) সিরাজুল ইসলাম আবেদ।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, যে তরুণ শিক্ষার্থীরা আন্তর্জাতিক পর্যায় থেকে বাংলাদেশের জন্য সম্মান বয়ে আনছে তারা দেশের গর্বের সম্পদ। তারাই ভবিষ্যতে বিভিন্ন ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে নেতৃত্ব দেবে। তিনি বলেন, পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর তিনি দুই ধরনের কূটনীতিকে গুরুত্ব দিচ্ছেন। একটি অর্থনৈতিক কূটনীতি এবং অপরটি জনকূটনীতি। অর্থনৈতিক কূটনীতির মাধ্যমে দেশের জন্য আরও বেশি বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করা এবং বিভিন্ন দেশের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক বাড়ানো। গত ১২ বছরে অর্থনৈতিক অগ্রগতিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে বাংলাদেশ যে অভাবনীয় সাফল্য অর্জন করেছে তা তুলে ধরাই হচ্ছে জনকূটনীতি। জাতীয় পর্যায়ে আয়োজন এবং আন্তর্জাতিক জীববিজ্ঞান অলিম্পিয়াডে অংশগ্রহণ অবশ্যই জনকূটনীতি হিসেবে বিবেচ্য। যারা এই প্রতিযোগিতায় অংশ নিচ্ছে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তারা দেশেরই প্রতিনিধিত্ব করছে। তাদের অর্জন দেশের সম্মান বৃদ্ধি করছে। এ কারণে আগামীতে এ ধরনের আয়োজনে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার বিষয়টি সক্রিয়ভাবে বিবেচনা করা হবে।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ২০০৮ সালের নির্বাচনের আগে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতিকে ডিজিটাল বাংলাদেশের পথে নিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছিলেন। প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও যোগাযোগবিষয়ক উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয় ডিজিটাল বাংলাদেশের রূপরেখা বাস্তবায়নে সঠিক নির্দেশনা দিয়েছেন। এ কারণেই ডিজিটাল বাংলাদেশের স্বপ্ন বাস্তবে রূপ নিয়েছে বলেই কভিড-১৯ মহামারির সময়ে দেশের কোনো কাজই থেমে থাকেনি। বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাংলাদেশ ভার্চুয়াল মাধ্যমে কাজের মাধ্যমে সচল থেকেছে। এ জন্য তিনি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও যোগাযোগবিষয়ক উপদেষ্টার প্রতি কৃতজ্ঞতা ও ধন্যবাদ জানান।

সমকালের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মুস্তাফিজ শফি বলেন, মহামারির কারণে আজকে সবাইকে দূরে দূরে থেকে ভার্চুয়াল মাধ্যমে আনন্দ আয়োজনে অংশ নিতে হচ্ছে। কিন্তু আমাদের বক্তব্য সবার মনে এক টেবিলে বসে থাকার সেই অনুভূতিই দিচ্ছে। এই মহামারি বেশিদিন থাকবে না এবং আবারও আমরা বাঙালির সম্মিলনের আবহমান সংস্কৃতিতে ফিরে যাব। আর এই ফিরে যাওয়ার ক্ষেত্রে অবদান রাখবে জীববিজ্ঞান। কারণ ভ্যাকসিন আবিস্কারের যে প্রচেষ্টা চলছে, সেখানে সবচেয়ে বড় অবদান জীববিজ্ঞানেরই।

তিনি আরও বলেন, আগের মতো সশরীরে অলিম্পিয়াডে অংশগ্রহণের চেয়ে এবার মহামারির মধ্যে ভার্চুয়ালি অলিম্পিয়াডে অংশগ্রহণ অনেক বেশি কষ্টের বিষয় ছিল এবং নতুন অভিজ্ঞতা ছিল। এই নতুন অভিজ্ঞতার মধ্যে এ বছর যে দুটি ব্রোঞ্জ অর্জন তা স্বর্ণের চেয়েও বেশি মনে করি। গত ১১ ও ১২ আগস্ট বুয়েটে পরীক্ষায় অংশ নেওয়া তরুণ শিক্ষার্থীদের চোখে যে স্বপ্ন দেখেছি, লড়াই করার যে স্বপ্ন দেখেছি, সেই লড়াই করার স্বপ্নই বাংলাদেশ। সমকাল প্রতিষ্ঠার পর থেকেই এই স্বপ্নময় তরুণদের সঙ্গে আছে, বিজ্ঞানের নানমুখী আয়োজনের সঙ্গে আছে। কারণ সমকাল চায় একটি বিজ্ঞানমনস্ক আগামী প্রজন্ম, যারা বাংলাদেশকে নতুন উদ্ভাবনের আলোয় উদ্ভাসিত করবে। সরকারি পৃষ্ঠপোষতা পেলে এ ধরনের আয়োজনের মাধ্যমে দেশের জন্য অনেক বড় কিছু অর্জন সম্ভব মন্তব্য করে কার্যকর সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

জীববিজ্ঞান অলিম্পিয়াডের প্রধান প্রশিক্ষক অধ্যাপক ড. রাখহরি সরকার বলেন, বিভিন্ন দেশে জাতীয় শিক্ষা কার্যক্রমের সঙ্গে বিজ্ঞানবিষয়ক বিভিন্ন অলিম্পিয়াডকে সম্পৃক্ত করে নেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশও এক্ষেত্রে পিছিয়ে থাকতে পারে না। কারণ বাংলাদেশে বর্তমান সরকারের দেশে বিজ্ঞান শিক্ষা ত্বরান্বিত করা এবং তথ্যপ্রযুক্তিতে সমৃদ্ধ করার ক্ষেত্রে বড় অবদান রয়েছে। এ কারণে জীববিজ্ঞান অলিম্পিয়াড আয়োজনে প্রত্যক্ষ সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা থাকা উচিত। তিনি বলেন, অলিম্পিয়াডের মতো অনানুষ্ঠানিক শিক্ষা কার্যক্রম আনুষ্ঠানিক শিক্ষাকে অর্থবহ করতে বড় অবদান রাখছে। সেই দিকটি বিবেচনায় রেখে সরকারের এগিয়ে আসা উচিত।

এনআইবির মহাপরিচালক ড. মো. সলিমুল্লাহ বলেন, কভিড-১৯ মহামারি প্রমাণ করে দিয়েছে, সংকটে মানবসভ্যতাকে রক্ষার জন্য বিজ্ঞানকে সমন্বিতভাবে এগিয়ে যেতে হয়। করোনাভাইরাসের সংক্রমণ প্রতিরোধে এর জিনম সিকোয়েন্স করা, ভ্যাকসিন ও ওষুধ আবিস্কারের প্রচেষ্টা জীববিজ্ঞান, পদার্থবিজ্ঞান, রসায়নবিজ্ঞান একসঙ্গেই করছে। তিনি আরও বলেন, প্রতিবছর জীববিজ্ঞান অলিম্পিয়াডের আয়োজনে ব্যবহারিক ক্লাস ও পরীক্ষার সহায়তা দিচ্ছে এনআইবি। সে সময় এনআইবি ক্যাম্পাস তরুণদের পদভারে প্রাণচঞ্চল হয়ে ওঠে। এবার মহামারির কারণে সেটা না হলেও আগামীতে আবার সেই প্রাণচাঞ্চল্য দেখা যাবে বলে প্রত্যাশার কথা জানান তিনি।

অধ্যাপক মনিরুল ইসলাম বলেন, কভিড-১৯ মহামারি বুঝিয়ে দিয়েছে মানুষের জন্য, মানবসভ্যতার জন্য জীববিজ্ঞানের গুরুত্ব কতটা। জীববিজ্ঞান শুধু চিকিৎসাবিদ্যা নয়। বরং অনুজীববিজ্ঞান, জৈব প্রকৌশলবিদ্যাও জীববিজ্ঞানের অবিচ্ছেদ্য অংশ- এগুলোই আজ মহামারির দিনে মানুষকে রক্ষার জন্য সবচেয়ে বড় অবদান রাখছে। তিনি আরও বৃহত্তর পরিসরে জাতীয় জীববিজ্ঞান অলিম্পিয়াড আয়োজনের ব্যাপারে গুরুত্ব আরোপ করেন।

ড. তারিক আরাফাত বলেন, তিনি ২০১৬ সাল থেকেই জীববিজ্ঞান অলিম্পিয়াড আয়োজনের সঙ্গে আছেন। তখন অনেকের মধ্যে প্রশ্ন ছিল, জীববিজ্ঞান অলিম্পিয়াডে বুয়েট কেন। এখন মহামারির সময় দেখা যাচ্ছে ভ্যাকসিন তৈরি, ওষুধ আবিস্কারে বায়োটেকনিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের গুরুত্ব কত বেশি। তিনি আরও বলেন, জীববিজ্ঞান অলিম্পিয়াড বাংলাদেশে সার্বিকভাবে বিজ্ঞান শিক্ষাকেই জনপ্রিয় করতে ভূমিকা রাখছে।

কথাপ্রকাশের স্বত্বাধিকারী জসীমউদ্দিন বলেন, মহামারির মধ্যেও এ ধরনের একটি সফল ও সম্মানজনক আয়োজনের সঙ্গে থাকতে পেরে কথাপ্রকাশ গর্বিত এবং ভবিষ্যতেও এ ধরনের আয়োজনের সঙ্গে কথাপ্রকাশ থাকবে।

ল্যাববাংলার চেয়ারম্যান রাখাল রাহা বলেন, তার প্রতিষ্ঠান এ আয়োজনে কারিগরি সহায়তা দিচ্ছে। ভবিষ্যতেও এ সহায়তা অব্যাহত রাখতে দৃঢ় প্রত্যয়ের কথা জানান তিনি।

স্বাগত বক্তব্যে জীববিজ্ঞান অলিম্পিয়াডের সাধারণ সম্পাদক ডা. সৌমিত্র চক্রবর্তী অতিথি, অংশগ্রহণকারী, অভিভাবক সবাইকে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানান।

এ বছর আন্তর্জাতিক পর্যায়ে জীববিজ্ঞান অলিম্পিয়াডের মূল পর্বে অংশ নেওয়া চার শিক্ষার্থী একই সুরে জানায়, তারা মনে মনে জাপানের নাগাসাকিতে যাওয়ার জন্য সার্বিক প্রস্তুতি নিয়েছিল। মহামারির কারণে যেতে না পারায় তাদের ভেতরে কষ্টবোধ হয়েছে। কিন্তু তার পরও তারা এত বড় আয়োজনে অংশ নিতে পেরে গর্বিত। এ আয়োজনে অংশ নেওয়ার অভিজ্ঞতা স্মৃতিতে অমলিন থাকবে সবসময়। তারা জীববিজ্ঞান অলিম্পিয়াড আয়োজনের সঙ্গে সংশ্নিষ্ট সবার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানায় এবং এ ধরনের আয়োজন আরও বেশি ও বিস্তৃত করার আহ্বান জানায়। বিশেষভাবে কৃতজ্ঞতা জানান তাদের জন্য এ আনন্দ আয়োজনের ব্যবস্থা করায়।