বয়সের ভারে ন্যুব্জ হয়ে পড়েছেন আরও আগে। এখন কানে শুনতে পান না, চোখেও দেখেন কম। তবে সব কথা বুঝতে পারেন। বিছানায় শুয়েই নব্বই পার হওয়া গৌরী দাসী শুনেছেন তার মামলায় যুগান্তকারী রায় দিয়েছেন দেশের উচ্চ আদালত। যার মধ্য দিয়ে কৃষি-অকৃষি সম্পত্তিতে হিন্দু বিধবা নারীর অংশীদারিত্বের অধিকার নিশ্চিত হয়েছে। দীর্ঘ তিন যুগ পর মামলায় তার পক্ষেই চূড়ান্ত রায় এসেছে শুনে চোখে পানি ফেলেছেন তিনি।
খুলনার বটিয়াঘাটা উপজেলার ভান্ডারকোট ইউনিয়নের হালিয়া গ্রামে রাজবিহারী মণ্ডলের বাড়ি। তার দুই ছেলের ছোটটির নাম অভিমন্যু মণ্ডল। তারই স্ত্রী গৌরী দাসী। ১৯৫৮ সালে তিন বছরের মেয়ে গীতাকে রেখে মারা যান অভিমন্যু মণ্ডল। এরপর থেকে নিজের বাপের বাড়িতে থাকতেন গৌরী দাসী। ১৯৮৩ সালে স্বামীর সম্পদের ভাগ চাইতে গেলে তাকে মেরে বের করে দেন ভাসুর জ্যোতীন্দ্রনাথ মন্ডল। উল্টো  ১৯৮৩ সালে নিম্ন আদালতে মামলা করেন তার ভাসুর। সেই থেকে স্বামীর সম্পত্তিতে অধিকার পেতে সংগ্রাম করছেন গৌরী দাসী, তার মেয়েজামাই এবং নাতি-নাতনিরা।
খুলনার বটিয়াঘাটা-চালনা সড়ক দিয়ে দাকোপ যাওয়ার পথে গোপালখালী ঘাট। নদী পার হয়েই ওপারে হালিয়া গ্রাম। তবে হালিয়া গ্রামে গিয়ে গৌরী দাসীকে পাওয়া যায়নি। গ্রামের স্থানীয়রা জানান, গৌরী দাসী এখন থাকেন দাকোপ উপজেলার চালনা এম এম কলেজের পাশে গৌরকাঠী গ্রামে। সেখানে মেয়ে গীতা সরদারের ছোট ছেলে উত্তম সরদারের সঙ্গে থাকেন গৌরী দাসী ও গীতা সরদার।
গৌরী দাসী ঠিক মতো কথা বলতে পারেন না। পরিবারের সদস্যরা জানালেন, ৩৭ বছর আগে দায়ের করা মামলায় বিবাদী ছিলেন গৌরী দাসী। প্রথম প্রথম নিজে মামলা দেখাশোনা করতেন। এরপর মামলা দেখাশোনা করেন একমাত্র মেয়ের জামাই অর্ধেন্দু সরদার। ২০০৪ সালে খুলনার যুগ্ম জেলা জজ আদালত গৌরী দাসীর পক্ষে রায় দেন। রায়ে বসতভিটা ও কৃষিজমিতে গৌরী দাসীর অধিকার থাকবে বলা হয়।
এই রায়ের বিরুদ্ধে ২০০৪ সালে হাইকোর্টে রিভিশন আবেদন করেন জ্যোতীন্দ্রনাথ মণ্ডল। হাইকোর্টে কিছুদিন মামলা চালানোর পর ২০০৪ সালে অর্ধেন্দু সরদার মারা যান। এরপর গত ১৬ বছর ধরে মামলা দেখাশোনা করছেন অর্ধেন্দু সরদারের ছেলে অর্থাৎ গৌরী দাসীর নাতি উত্তম সরদার, নাতবউ দীপ্তি বিশ্বাসসহ তাদের পরিবারের সদস্যরা।
গতকাল বুধবার গৌরকাঠি গ্রামের বাড়িতে কথা হয় গীতা সরদারের সঙ্গে। কাঁদতে কাঁদতে তিনি বলেন, মামলার পেছনে দৌড়াতে দৌড়াতে আমার স্বামী মারা গেলেন। জমিজমা সবকিছু বিক্রি করে মামলা লড়েছি। এত বছর পর রায় হলো কিন্তু তিনি দেখে যেতে পারলেন না। তিনি বলেন, মামলার রায়ের কথা শুনে মা শুধু চোখ দিয়ে পানি ফেলেছেন।
তার ছেলের বউ দীপ্তি বিশ্বাস জানান, শ্বশুর মারা যাওয়ার পর আমার ভাই প্রদীপ বিশ্বাস (আদালতের কর্মচারী) বললেন লেগে থাকলে এই মামলার রায় হবে। আর আমাদেরও জেদ ছিল- এ মামলার শেষ আমরা দেখব। এজন্য কষ্ট করে মামলা চালিয়েছি। মামলার জন্য আমাদের সব শেষ হয়ে গেছে। এখন কোনো রকম খেয়ে না খেয়ে দিন কাটাচ্ছি।
দীপ্তি বিশ্বাস বলেন, আমার শাশুড়ির বয়স ৬৫ বছর। এর মধ্যে ৩৭ বছরই তিনি মামলার পেছনে দৌড়েছেন। এখন রায় পাওয়ার পর কীভাবে সম্পত্তি বুঝে পাব সেটাই বুঝতে পারছি না। তারা তো অনেক শক্তিশালী লোক। এখন সরকার, স্থানীয় জেলা, উপজেলা প্রশাসনসহ সমাজের ব্যক্তিরা যদি আমাদের সম্পত্তি বুঝিয়ে না দেন, তাহলে রায় হলেও ওই সম্পদের দখল আমরা পাব না।
গৌরী দাসীর মেয়ে গীতা সরদার বলেন, আমাদের সব সম্পত্তি তারা বিক্রি করে দিচ্ছে। এখন মাত্র নয় একরের মতো জমি আছে। আমার স্বামী রায় দেখে যেতে পারেননি। মায়ের এখন শেষ ইচ্ছা মৃত্যুর আগে তার মেয়েকে মেয়ের বাবার জমিতে দেখে যাওয়া। আমারও চাওয়া সম্পত্তিতে উত্তরাধিকারীদের প্রতিষ্ঠা করা।

বিষয় : হিন্দু নারীর অধিকার

মন্তব্য করুন