চীনের উহান শহর থেকে উৎপত্তি হওয়া করোনাভাইরাস বিশ্বের ২১৫টি দেশ ও অঞ্চলে মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়েছে। এরই মধ্যে পৌনে তিন কোটির ওপরে মানুষ আক্রান্ত এবং ৯ লাখের ওপরে মারা গেছেন। অজানা এই ভাইরাস প্রতিরোধে গোটা বিশ্ব যুদ্ধ করে যাচ্ছে। কিন্তু করোনা নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধের উপায় এখনও খুঁজে পাওয়া যায়নি। কয়েকটি দেশ করোনার টিকা নিয়ে কাজ করে চলেছে। আপাতত বিশ্ববাসী সেই টিকার দিকেই তাকিয়ে আছে। অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশও করোনা পরিস্থিতি সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছে। বাংলাদেশে তিন লাখ ৩১ হাজারের ওপরে আক্রান্ত এবং সাড়ে চার হাজারের বেশি মানুষ মারা গেছেন। করোনা পরিস্থিতি সামাল দিতে ব্যর্থতার পেছনে স্বাস্থ্য বিভাগের নানা অব্যবস্থাপনা, সমন্বয়হীনতার পাশাপাশি দুর্নীতিকেও দায়ী করা হচ্ছে। জনস্বাস্থ্যবিদদের অনেকের অভিযোগ, শুরু থেকে করোনার বিষয়টি অনুধাবন করতে না পারার ব্যর্থতার কারণে মানুষকে মূল্য দিতে হচ্ছে। আবার অনেকে বলেছেন, করোনা পরিস্থিতিতে স্বাস্থ্য খাতের ভঙ্গুর চিত্র উন্মোচিত হয়েছে। এ থেকে শিক্ষা নিয়ে পুরো স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা ঢেলে সাজানোর কথা বলছেন। স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেকও স্বাস্থ্য খাতকে ঢেলে সাজানোর পক্ষে মত দিয়েছেন। সম্প্রতি সমকালের সঙ্গে একান্ত সাক্ষাৎকারে স্বাস্থ্য খাতের সার্বিক বিষয় নিয়ে কথা বলেছেন তিনি। আপাতত করোনা ইস্যুকেই মূল ফোকাসে রাখতে চান তিনি। স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেছেন, করোনার সংক্রমণ কমতে শুরু করলেও পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। কার্যকর ভ্যাকসিন না আসা পর্যন্ত সংক্রমণ বন্ধ হওয়ার সম্ভাবনাও নেই। তাই স্বাস্থ্য খাতের সবকিছু এখন করোনাকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হবে। তবে করোনা-পরবর্তী সময়ে স্বাস্থ্য খাতকে ঢেলে সাজানোর লক্ষ্য নিয়ে তিনি কাজ করতে চান। এ লক্ষ্যে বেশকিছু পরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছে। আরও পরিকল্পনা করা হবে। যাতে ভবিষ্যতে জনস্বাস্থ্য কিংবা দুর্যোগজনিত পরিস্থিতি দক্ষতার সঙ্গে মোকাবিলা করা যায়।
করোনার টিকা নিয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, টিকার বিষয়টি প্রধানমন্ত্রী সরাসরি দেখভাল করছেন। এরই অংশ হিসেবে সম্প্রতি চীনের একটি টিকা ট্রায়ালের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। অক্সফোর্ডের টিকারও প্রতিশ্রুতি মিলেছে। যুক্তরাজ্যের ওষুধ কোম্পানি অ্যাস্ট্রাজেনেকার সহযোগী প্রতিষ্ঠান হিসেবে অক্সফোর্ডের টিকাটি উৎপাদন করবে ভারতের সেরাম ইনস্টিটিউট অব ইন্ডিয়া। বাংলাদেশে ওষুধ কোম্পানি বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস ভারতের সেরাম ইনস্টিটিউটের সঙ্গে চুক্তি করেছে। এ দুটি প্রতিষ্ঠান যৌথভাবে বাংলাদেশে অক্সফোর্ডের ভ্যাকসিন সরবরাহ করবে। সরকারিভাবেও বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়েছে।
চীনের মতো অন্যান্য দেশের টিকারও বাংলাদেশে পরীক্ষামূলক প্রয়োগ হবে কিনা- এমন প্রশ্নে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, এ বিষয়ে ভারতের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। ভারত তাদের টিকার বাংলাদেশে ট্রায়াল করতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। আর অক্সফোর্ডের টিকার বিষয়ে বাংলাদেশের কাছে তাদের কী কী জানার আছে, সে জন্য অপেক্ষা করছি। কোন কোন দেশ থেকে টিকার আশ্বাস পাওয়া গেছে- এমন প্রশ্নে জাহিদ মালেক বলেন, বাংলাদেশে ট্রায়াল করতে চায় এমন আর কোনো দেশের অনুরোধ পাইনি। তবে টিকা সংগ্রহে আমরা রাশিয়া ও ভারতকে চিঠি দিয়েছি। তারা টিকা দিতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। এমনকি আমাদের কোনো ওষুধ কোম্পানির টিকা উৎপাদনের সক্ষমতা থাকলে তারা সেভাবেও টিকা দেওয়ার কথা বলেছে। দুটি দেশের দূতাবাস থেকে ব্যক্তিগতভাবে বিষয়টি নিয়ে আমার সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন। মোটকথা, টিকার বিষয়ে তারা সর্বাত্মক সহায়তা করবেন।
বিশেষ কোনো দেশের টিকা বিষয়ে বাংলাদেশের আগ্রহ রয়েছে কিনা- এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, কোনো একটি দেশের প্রতি আমাদের বিশেষ দুর্বলতা নেই। গুণগত মানসম্পন্ন, সহজলভ্য এবং সুলভ মূল্য- এ তিনটি বিষয়ের সমন্বয় করে যে টিকাটি পাওয়া যাবে, সেটিই নেওয়া হবে। কারণ, প্রতি ডোজ ৪০ ডলারে কিনতে হলে ওই টিকা ক্রয় করা বাংলাদেশের মতো দেশের জন্য কঠিন হয়ে পড়বে। সুতরাং সার্বিক বিষয় চিন্তা করে দেশের মানুষের জন্য যে টিকাটি ভালো মনে হবে, সেটিই নেওয়া হবে।
টিকা ক্রয়ের জন্য অর্থের সংকট হবে না উল্লেখ করে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, বিনামূল্যে কেউই টিকা পাবে না। তবে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোর জন্য হয়তো একটু কম মূল্যে টিকা সরবরাহ করা হতে পারে। রাশিয়ার টিকা ১০ থেকে ১৫ ডলার, ফাইজারের টিকা ১৭ থেকে ৩০ ডলার, মডের্নার টিকা ৩০ থেকে ৪০ ডলার দাম পড়বে বলে শোনা যাচ্ছে। অক্সফোর্ড, ভারত ও চীনের টিকার মূল্য এখনও নির্ধারণ করা হয়নি। দেশের মোট জনসংখ্যা যদি ১৬ কোটি ধরা হয় তাহলে ৩২ কোটি ডোজ টিকার প্রয়োজন হবে। এই টিকার দাম কত পড়বে, তা এখনও আমরা জানি না। চলতি অর্থবছরের বাজেটে স্বাস্থ্য খাতের জন্য ১০ হাজার কোটি টাকা থোক বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এর বাইরে প্রয়োজন নেই এমন সামগ্রী ক্রয় না করে ওই অর্থও টিকার জন্য রাখা হয়েছে। সুতরাং টিকা ক্রয়ের অর্থের সংকট হবে না।
করোনা পরিস্থিতি সামাল দেওয়া নিয়ে মূল্যায়ন সম্পর্কিত প্রশ্নের জবাবে জাহিদ মালেক বলেন, যুক্তরাষ্ট্র থেকে শুরু করে উন্নত দেশগুলোকেও করোনা মহামারি সামাল দিতে বেগ পেতে হচ্ছে। মেক্সিকোতে রাস্তায় মৃতদেহ পড়ে থাকছে। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতেও সংক্রমণ পরিস্থিতির প্রতিদিন অবনতি ঘটছে। সবাই সম্মিলিতভাবে অজানা এই ভাইরাসটির বিরুদ্ধে লড়াই করছে। সরকারের পাশাপাশি চিকিৎসক, স্বাস্থ্যকর্মী থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ পর্যন্ত যুক্ত হয়ে করোনা নিয়ন্ত্রণে কাজ করছে। বিশ্বের সব দেশে এসবের মূল্যায়ন হচ্ছে। কিন্তু বাংলাদেশের চিত্র বিপরীত। করোনা পরিস্থিতি নিয়ে বাংলাদেশের স্বাস্থ্য বিভাগ কিংবা সরকারের যতটা সমালোচনা করা হয়েছে, বিশ্বের আর কোনো দেশে এমনটি হয়নি।
করোনা নিয়ন্ত্রণে সফলতার দাবি করে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, জনবহুল, কম শিক্ষিত জনগোষ্ঠী ও একটি স্বল্প আয়ের দেশ হিসেবে আমরা করোনা নিয়ন্ত্রণে যে সফলতা দেখিয়েছি, তাতে একদিন সবাই বাংলাদেশকে মডেল হিসেবে আখ্যায়িত করবে। গত ছয় মাসের পরিসংখ্যান পর্যালোচনা করলেও তা স্পষ্ট হবে। অন্যান্য দেশে যেখানে ৫ থেকে ৬ শতাংশ মৃত্যুহার, সেখানে বাংলাদেশে মৃত্যুহার ১ দশমিক ৩৮ শতাংশের মতো। আক্রান্তের হারও কয়েক দিন ধরে ১২ থেকে ১৫ শতাংশের মধ্যে থাকছে। এর বিপরীতে প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষ সুস্থ হয়ে উঠেছেন। অনেকে স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার সমালোচনা করছেন। তাদের উদ্দেশে সবিনয়ে বলতে চাই- স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা ভালো না হলে এত সংখ্যক মানুষ সুস্থ হয়ে উঠতেন না। আক্রান্তদের ৮০ শতাংশের ওপরে হাসপাতালে ভর্তির প্রয়োজন হয়নি। কারণ, টেলিমেডিসিন সেবা অত্যন্ত শক্তিশালী ছিল। পাঁচ হাজারের ওপরে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত চিকিৎসককে টেলিমেডিসিন সেবায় নিযুক্ত করা হয়েছিল। তারা এখনও কাজ করে যাচ্ছেন। করোনা পজিটিভ হওয়ার পর ওই চিকিৎসকরাই সার্বক্ষণিক ফোন করে আক্রান্ত ব্যক্তির শারীরিক অবস্থার খোঁজ-খবর নিয়েছেন। রোগীরা ওষুধ সেবন থেকে শুরু করে হাসপাতালে ভর্তির প্রয়োজনীয় পরামর্শ এই টেলিমেডিসিন সেবার মাধ্যমে পাচ্ছেন। এতে অধিকাংশ আক্রান্ত ব্যক্তির হাসপাতালে ভর্তির প্রয়োজন হয়নি। বাসাবাড়িতে সেবা নিয়েই অধিকাংশ মানুষ সুস্থ হয়ে উঠেছেন। এটি বড় সফলতা।
করোনা সংক্রমণের মধ্যেই সরকারি-বেসরকারি অফিস-আদালত খুলে সবকিছু স্বাভাবিক করে দেওয়ার যৌক্তিকতা সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, শুধু স্বাস্থ্যগত বিষয় বিবেচনায় নিয়ে রাষ্ট্র চলে না। বিশ্বের উন্নত রাষ্ট্রগুলোও অর্থনীতির বিষয় বিবেচনায় নিয়ে একটি পর্যায়ে গিয়ে লকডাউন কিংবা ছুটি প্রত্যাহার করে নিয়েছে। সুতরাং বাংলাদেশের মতো একটি রাষ্ট্রের পক্ষে মাসের পর মাস ছুটি বহাল রাখা সম্ভব ছিল না। এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে ওই ছুটি প্রত্যাহার করা হয়েছে। এ জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাহসী পদক্ষেপের কথা স্মরণ করতে হবে। কারণ, তিনি সাহসী ওই নির্দেশনা না দিলে অর্থনীতির অবস্থা অনেক খারাপ হতে পারত। ছুটি প্রত্যাহারের পর অনেকে আশঙ্কা করেছিলেন- সংক্রমণ পরিস্থিতি খারাপ হবে। বাস্তবে তেমনটি হয়নি। গত কয়েক দিনের পরিস্থিতি বিবেচনায় নিলে দেখা যায়, সংক্রমণ কমতে শুরু করেছে। তা ছাড়া মানুষের মধ্যেও সচেতনতা বেড়েছে। অধিংকাশ মানুষ মাস্ক ব্যবহার করছেন। হ্যান্ড স্যানিটাইজার দিয়ে হাত পরিস্কার করছেন। সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে চলছেন। এ ছাড়া মানুষের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাও তৈরি হয়েছে। সংক্রমণ কমে আসার পেছনে এটিও একটি বড় কারণ বলে মনে করেন তিনি।
করোনা সংক্রমণের প্রেক্ষাপটে প্রতিদিন ২৫ হাজার নমুনা পরীক্ষার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। কিন্তু সেটি বাস্তবে কার্যকর হয়নি। নমুনা পরীক্ষা বাড়ানোর বিষয়ে কোনো পরিকল্পনা আছে কিনা- এমন প্রশ্নে জাহিদ মালেক বলেন, যে সংখ্যক পিসিআর মেশিন আছে তাতে প্রতিদিন ২৫ হাজার নমুনা পরীক্ষা করা সম্ভব। কিন্তু মানুষ আগ্রহী না হলে স্বাস্থ্য বিভাগের কিছু করার নেই। প্রথমে বিনামূল্যের হওয়ায় প্রয়োজন ছাড়াও মানুষ পরীক্ষা করাতেন। আবার অনেকে একাধিকবার পরীক্ষার সুযোগ নিতেন। এ কারণে ফি নির্ধারণ করা হয়েছিল। তখন অনেকে বলেছিলেন, ফি নির্ধারণ বেশি হওয়ায় মানুষ নমুনা পরীক্ষা করাচ্ছে না। এরপর ফি কমানো হলো। কিন্তু নমুনা পরীক্ষা বাড়েনি। লক্ষণ-উপসর্গ না থাকলে তো কারও পরীক্ষা করানোর প্রয়োজন নেই। এ থেকেও প্রমাণ হয়, মানুষ কম সংক্রমিত হচ্ছে। এ জন্য নমুনা পরীক্ষাও কমে আসছে।
অ্যান্টিজেন্ট ও অ্যান্টিবডি পরীক্ষার বিষয়ে সরকারের পরিকল্পনা কী- এমন প্রশ্নে জাহিদ মালেক বলেন, অ্যান্টিজেন্ট পরীক্ষার অনুমোদন ইতোমধ্যে দেওয়া হয়েছে। প্রথম ধাপে সরকারি হাসপাতাল ও ল্যাবে এই পরীক্ষা করা হবে। বিশেষ করে যেসব স্থানে এখনও ল্যাব স্থাপন করা হয়নি কিংবা অস্ত্রোপচারের জন্য দ্রুত পরীক্ষার প্রয়োজন, এসব ক্ষেত্রে অ্যান্টিজেন্ট পরীক্ষা করা হবে। দ্বিতীয় ধাপে যাচাই-বাছাই করে বেসরকারি হাসপাতালে অ্যান্টিজেন্ট পরীক্ষার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। অ্যান্টিবডি পরীক্ষা বিশ্বের কোনো দেশেই অনুমোদন দেওয়া হয়নি। সুতরাং আপাতত এ নিয়ে কোনো পরিকল্পনা নেই।
করোনা পরিস্থিতি মোকাবিলায় নতুন হাসপাতাল নির্মাণ ও পিসিআর মেশিন ক্রয়ের পরিকল্পনা থেকে পিছিয়ে যাওয়ার কারণ সম্পর্কে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, হাসপাতালগুলোতে ৭০ শতাংশের বেশি শয্যা ফাঁকা পড়ে থাকছে। এ কারণে কিছু করোনা ডেডিকেটেড হাসপাতাল ইতোমধ্যে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে নতুন হাসপাতাল নির্মাণ ও যন্ত্রপাতি ক্রয়ের পরিকল্পনা কাটছাঁট করা হয়েছে। ওই অর্থ দিয়ে টিকাসহ স্বাস্থ্যসেবার অন্যান্য সামগ্রী ক্রয়ের চিন্তাভাবনা করা হচ্ছে।
করোনাকালীন স্বাস্থ্য খাতে কেনাকাটায় দুর্নীতিতে জড়িতদের বিষয়ে মন্ত্রণালয়ের অবস্থান কী- এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, স্বাস্থ্য খাতে কী ঘটেছে, তা সবাই প্রত্যক্ষ করেছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঘোষিত দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি অনুযায়ী স্বাস্থ্য খাত চলবে। অনিয়ম-দুর্নীতির প্রমাণ পেলে সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সে যত বড় শক্তিশালী হোক না কেন, ছাড় পাবে না। এ ক্ষেত্রে কোনো আপস করা হবে না। স্বাস্থ্যমন্ত্রী হিসেবে দুর্নীতির বিরুদ্ধে এটিই আমার অবস্থান।
স্বাস্থ্য খাতের গুরুত্বপূর্ণ কিছু পদে পরিবর্তন এসেছে। নতুন কর্মকর্তাদের কাজের মূল্যায়ন সম্পর্কে জানতে চাইলে জাহিদ মালেক বলেন, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে সাত বছর ধরে কাজ করার কারণে এই খাতের সবকিছু সম্পর্কে ওয়াকিবহাল। সবার সঙ্গে মিলেমিশে কাজ করার ওপর সব সময় সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে থাকি। কারণ ভালো টিমওয়ার্ক ছাড়া কাজে সফলতা আসে না। নতুন যারা যোগদান করেছেন, তাদের একটি শিক্ষানবিশ সময় দিতে হবে। তবে এটি দীর্ঘ হলে কাজ এগিয়ে নেওয়া কষ্টসাধ্য হবে। সে ক্ষেত্রে পুরোনো অভিজ্ঞদের আরও বেশি সক্রিয় হতে হবে। তবে নতুনরা দ্রুত কাজ রপ্ত করে স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনাকে এগিয়ে নেবেন বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।
হাসপাতালে চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীদের পিপিই ও মাস্কের সংকট সৃষ্টি হয়েছে। হঠাৎ কেন সংকটের সৃষ্টি হলো- এমন প্রশ্নে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, পিপিই, মাস্কসহ সুরক্ষা সামগ্রীর কোনো সংকট বর্তমানে নেই। করোনা সংক্রমণের শুরুর দিকে এসবের সংকট ছিল। কিন্তু এখন দেশেই অনেক কোম্পানি ও প্রতিষ্ঠান পিপিই ও মাস্ক উৎপাদন করছে। সুতরাং সংকট হবে কেন? স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দের প্রসঙ্গে জাহিদ মালেক বলেন, প্রয়োজনের তুলনায় স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ কম, এটি সবাই জানি। মোট জিডিপির এক শতাংশের কম বরাদ্দ থাকলেও এবার তা বাড়ানো হয়েছে। স্বাস্থ্য বাজেটের ৪৫ ভাগই ব্যয় হয় ওষুধের পেছনে। তাই চিকিৎসাক্ষেত্রে মানুষের আউট অব পকেট অর্থাৎ রোগী নিজে ব্যয় বহন করে ৬৭ শতাংশ। বাজেট বাড়াতে পারলে এই আউট অব পকেট কমিয়ে আনা যাবে। করোনা পরিস্থিতির পর স্বাস্থ্য খাতের গুরুত্ব বেড়েছে। চলতি অর্থবছরে বরাদ্দ বাড়ানোর পাশাপাশি আরও ১০ হাজার কোটি টাকা থোক বরাদ্দ রাখা হয়েছে। আবার একসঙ্গে বেশি বরাদ্দ দিলে তা ব্যয় করার সক্ষমতাও তৈরি করতে হবে। তাই ধাপে ধাপে বাজেট বাড়ানো ও তা ব্যয়ের সক্ষমতা তৈরিতে গুরুত্ব বাড়াতে হবে। অন্যথায় বাজেটে বরাদ্দ বাড়িয়েও লাভ হবে না।
করোনা-পরবর্তী স্বাস্থ্য খাতকে ঢেলে সাজানোর বিষয়ে সরকারের পরিকল্পনা জানতে চাইলে জাহিদ মালেক বলেন, দীর্ঘ সাত বছর স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে কাজের সুবাদে এ খাতের খুঁটিনাটি বিষয়গুলো সম্পর্কে অবগত রয়েছি। মানুষের কাঙ্ক্ষিত সেবা পেতে কিছু সমস্যা চিহ্নিত করেছি। সেগুলো সমাধানের লক্ষ্যে কার্যক্রম শুরুও করেছিলাম। কিন্তু অজানা করোনাভাইরাস সব সমীকরণ পাল্টে দিয়েছে। করোনা নিয়ে ফোকাসের কারণে স্বাস্থ্য খাতের অন্য বিষয়গুলোতে তেমনভাবে নজর দেওয়া সম্ভব হয়নি। এর মধ্যেও প্রতিটি জেলা সদর হাসপাতালে আইসিইউ শয্যা স্থাপনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এ জন্য প্রশিক্ষিত চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীও প্রস্তুত করা হচ্ছে। এগুলো দ্রুততম সময়ে করা হবে। এর বাইরে অসংক্রামক ব্যাধি, বিশেষ করে ক্যান্সার, হৃদরোগ, কিডনি ও ডায়াবেটিসের জন্য পৃথকভাবে নজর দেওয়া হচ্ছে। দেশের সব বিভাগে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে একটি করে বিশেষায়িত কিডনি হাসপাতাল ও একটি করে ক্যান্সার হাসপাতাল নির্মাণ করা হবে। এ ছাড়া দেশের প্রতিটি জেলা সদর হাসপাতালে ১০ শয্যার ডায়ালাইসিস ইউনিট স্থাপন করা হবে। একনেকে এটি অনুমোদনও হয়ে গেছে।