সরকারি ক্রয়ে দুর্নীতির মূল কারণ রাজনৈতিক প্রভাব ও সিন্ডিকেট: টিআইবি

প্রকাশ: ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২০   

সমকাল প্রতিবেদক

ই-জিপি পদ্ধতি চালুর পরও সরকারি ক্রয়ে অনিয়ম বন্ধ এবং স্বচ্ছতাও নিশ্চিত হয়নি। এর প্রধান কারণ সরকারি ক্রয় খাতে রাজনৈতিক প্রভাব, স্থানীয় প্রভাবশালী মহলের যোগসাজশ ও সিন্ডিকেট। 

বুধবার 'সরকারি ক্রয়ে সুশাসন :বাংলাদেশে ই-গভর্নমেন্ট প্রকিউরমেন্ট (ই-জিপি) কার্যকরতা পর্যবেক্ষণ' শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ অনুষ্ঠানে এ কথা বলেছেন ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ-টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান।

ভার্চুয়াল প্ল্যাটফর্মে অনুষ্ঠিত এ অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন টিআইবির ব্যবস্থাপনা উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. সুমাইয়া খায়ের, রিসার্চ অ্যান্ড পলিসির পরিচালক মোহাম্মদ রফিকুল হাসান এবং আউটরিচ অ্যান্ড কমিউনিকেশন ডিরেক্টর শেখ মঞ্জুর ই আলম। এই প্রতিবেদন তৈরিতে গবেষক দলে ছিলেন রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি বিভাগের সিনিয়র প্রোগ্রাম ম্যানেজার শাহজাদা এম আকরাম এবং ডেপুটি প্রোগ্রাম ম্যানেজার নাহিদ শারমীন ও মো. শহিদুল ইসলাম।

গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়, বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানে ক্রয় আইন ও বিধি অনুযায়ী ই-জিপি কতটুকু অনুসরণ করা হয়, তা চিহ্নিত করা, ই-জিপি যথাযথভাবে অনুসরণ না হলে তার কারণ অনুসন্ধান, বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানে ই-জিপির কার্যকারিতা পর্যালোচনা এবং ই-জিপি প্রয়োগে বিদ্যমান চ্যালেঞ্জ থেকে উত্তরণের উপায় সুপারিশ করার উদ্দেশ্যেই এ গবেষণা প্রতিবেদন তৈরি করেছে টিআইবি।

গবেষণায় দেখা যায়, ই-জিপি চালু হলেও রাজনৈতিকভাবে কাজের নিয়ন্ত্রণ ও ঠিকাদারদের মধ্যে ভাগ করে দেওয়ার অভিযোগ এখনও প্রকট। কিছু কিছু এলাকায় কারা টেন্ডার সাবমিট করবে, সেটা রাজনৈতিক নেতা বিশেষ করে স্থানীয় সংসদ সদস্য ঠিক করে দেন। অনেক ক্ষেত্রে একটি বড় লাইসেন্সের অধীনে কাজ নিয়ে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা তার কর্মীদের মধ্যে বণ্টন করে দিচ্ছেন। একই সঙ্গে দরপত্র মূল্যায়নের ক্ষেত্রে সংশ্নিষ্ট কর্মকর্তাদের অবহেলা, নিজেরা কাজ না করে কম্পিউটার অপারেটরদের মাধ্যমে মূল্যায়ন রিপোর্ট তৈরি এবং এ প্রক্রিয়ায় নম্বর বাড়িয়ে-কমিয়ে আনুকূল্য দেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। এ ছাড়া অফিস কর্মকর্তারা ঠিকাদারদের রেট শিডিউল জানিয়ে দেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।

প্রতিবেদনে কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের ই-জিপি প্রক্রিয়া অনুসরণের ক্ষেত্রে পর্যবেক্ষণ রেটিংয়ের মাধ্যমে তুলে ধরা হয়। এ রেটিং অনুযায়ী পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড ৪৪, পানি উন্নয়ন বোর্ড ৪৩ এবং স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর-এলজিইডি ৪২ শতাংশ স্কোর করেছে। প্রাপ্ত সার্বিক স্কোর অনুসারে সব প্রতিষ্ঠানের অবস্থানই 'ভালো নয়' গ্রেডে।

ই-জিপি কার্যক্রমের সার্বিক মূল্যায়ন করে প্রতিবেদনে বলা হয়, সব প্রতিষ্ঠানই প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার ক্ষেত্রে মোটামুটি ভালো ও প্রায় কাছাকাছি অবস্থানে (৬০-৭৫ শতাংশ), তবে সওজ ও আরইবির সক্ষমতা অন্য দুই প্রতিষ্ঠানের চেয়ে তুলনামূলক ভালো। ই-জিপি প্রক্রিয়া মেনে চলার ক্ষেত্রে প্রায় সব প্রতিষ্ঠান কাছাকাছি অবস্থানে (৫৮-৬৪ শতাংশ) রয়েছে। ই-জিপি ব্যবস্থাপনা এবং কার্যকারিতায় কোনো প্রতিষ্ঠানই কোনো স্কোর পায়নি বলে দেখা যায়। আবার স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার ক্ষেত্রে সব প্রতিষ্ঠানের স্কোর অনেক কম (১৯-৩০ শতাংশ)।

প্রতিবেদন সম্পর্কে ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, যদি সত্যিকার অর্থে ই-জিপি কার্যকর করতে হয়, তাহলে একে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করতে হবে। একই সঙ্গে স্থানীয় প্রভাবশালী মহলের যোগসাজশ এবং সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করতেই হবে, এর কোনো বিকল্প নেই। তিনি আরও বলেন, সরকারি ক্রয় খাতের সঙ্গে জড়িত সব সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর আয় এবং ব্যয়ের হিসাব জমা দেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত এবং অবশ্যই তা প্রকাশ করতে হবে।

ই-জিপি কার্যকর করতে ১২ দফা সুপারিশ করা হয় প্রতিবেদনে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে, প্রত্যেক ক্রয়কারী প্রতিষ্ঠানকে ই-জিপি গাইডলাইন অনুযায়ী নিরীক্ষা করাতে হবে। দরপত্র-সংক্রান্ত সব তথ্য ও সিদ্ধান্ত সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারদের জন্য স্বপ্রণোদিতভাবে প্রকাশ করতে হবে। প্রত্যেক ক্রয়কারী প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম স্থানীয় পর্যায়ে তদারকি করতে এবং এ প্রক্রিয়ায় জনগণের অংশগ্রহণ থাকতে হবে। এ ছাড়া প্রত্যেক ক্রয়কারী প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রমের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার জন্য নিয়মিতভাবে গণশুনানির আয়োজন করতে হবে।