গাইবান্ধার সাঘাটা উপজেলার বারকোনা গ্রামে বাঙ্গালী নদের পাড়ে ছয় শতাংশ চর জেগে উঠেছিল প্রায় ৩৫ বছর আগে। সেই চরে বসবাস শুরু করেন ভূমিহীন হাসিনা বেগম ও তার স্বামী আনোয়ার হোসেন। ১৯৮৭ সালে হাসিনা বেগম ওই জায়গা বরাদ্দের জন্য সরকারের কাছে আবেদন করেন। তখন ভূমি অফিসে ওই জমির নথি খুঁজে পাওয়া যায়নি। ইতোমধ্যে হাসিনা বেগমের স্বামী মারা যান। ২০১৮ সালে হাসিনা বেগম আবারও আবেদন করতে যান। আবেদন গ্রহণের জন্য সার্ভেয়ার আবুল কালাম পাঁচ হাজার টাকা ঘুষ চান। অনেককে দিয়ে সুপারিশ করালে তিনি আবেদনটি গ্রহণ করেন। পরে আর নথি পাওয়া যায়নি। পরে ইউনিয়ন কার্যালয়ের সার্ভেয়ার স্বপ্না বেগমের সঙ্গে যোগাযোগ করেন হাসিনা বেগম। তখন স্বপ্না বেগম জানান, আবেদনটি উপজেলা ভূমি অফিসে পাঠানো হয়েছে। এ অবস্থায় গত ৩১ আগস্ট হাসিনা বেগম উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক ও জেলা প্রশাসক বরাবর আবার আবেদন করেন। কিন্তু তিনি ওই খাসজমি বরাদ্দ পাননি।
শুধু হাসিনা বেগমই নন। সরকারের এ রকম খাসজমি বন্দোবস্ত পেতে ভূমিহীনদের নানা হয়রানি, সময়ক্ষেপণসহ নানা ভোগান্তি সহ্য করতে হচ্ছে। অথচ ভূমিহীনদের সরকারি খাসজমি বন্দোবস্ত দেওয়ার জন্য আইন আছে।
কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই প্রভাবশালীদের সঙ্গে দখলদারদের সখ্য গড়ে ওঠে। আবার রাজনীতিক ও সরকারি আমলারাও জোতদারদের পক্ষ নেন। এ কারণে খাসজমি পাওয়া ভূমিহীনদের কাছে কঠিন হয়ে পড়ে।
গতকাল বুধবার উন্নয়ন সংগঠন নিজেরা করি ও সমকালের উদ্যোগে অনুষ্ঠিত 'গণশুনানি :প্রাকৃতিক সম্পদে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অধিকার' শীর্ষক ওয়েবিনারে ভুক্তভোগী ও আলোচকদের বক্তব্যে এমন করুণ চিত্রই উঠে আসে। এই আয়োজনে সহায়তা দেয় ইকো কো-অপারেশন।
এ সময় কোনোরকম হয়রানি ছাড়াই ভূমিহীনদের মধ্যে সরকারি খাসজমি বরাদ্দ দিতে সরকারকে বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণের দাবি জানান বক্তারা। তারা বলেন, খাসজমির মালিক ভূমিহীনরা হলেও বিভিন্ন প্রভাবশালী ব্যক্তি সেসব দখল করে রাখছে। আইন থাকলেও নানা রকম প্রভাববলয়ের কাছে ভূমিহীনরা হেরে যাচ্ছে। এ জন্য নিরীহ ভূমিহীনরা নানাভাবে হয়রানি ও ভয়ভীতির শিকারও হচ্ছেন। মানবাধিকার লঙ্ঘনের মাধ্যমে তাদের জীবন দুর্বিষহ করে তোলা হয়। এ অবস্থার দ্রুত অবসান করে প্রকৃত ভূমিহীনদের সরকারি জমি বরাদ্দ দেওয়ার তাগিদ দিয়ে এ ক্ষেত্রে ক্ষমতা ও প্রভাবের দুষ্টচক্র ভেঙে দিতে হবে।
অনুষ্ঠানে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের পাঁচ ভুক্তভোগী ভূমিহীন তাদের তিক্ত অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেন। সমকালের ফেসবুকে ওয়েবিনারটি সরাসরি সম্প্রচার করা হয়। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন সমকালের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মুস্তাফিজ শফি।
গণশুনানিতে বিচারক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি নিজামুল হক নাসিম এবং বিশিষ্ট মানবাধিকারকর্মী ও শিক্ষাবিদ ড. হামিদা হোসেন। বিশেষজ্ঞ প্যানেলের আলোচনায় অংশ নেন ফজলে হোসেন বাদশা এমপি, উন্নয়ন সংগঠন এএলআরডির নির্বাহী পরিচালক শামসুল হুদা, অধ্যাপক এম এম আকাশ, আরআইবির পরিচালক মেঘনা গুহঠাকুরতা এবং বাংলাদেশ পরিবেশ আইনজীবী সমিতির (বেলা) নির্বাহী পরিচালক সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান। অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন নিজেরা করির সমন্বয়কারী খুশী কবির।
স্বাগত বক্তব্যের পরই অতিথিরা ভুক্তভোগীদের বক্তব্য শোনেন। নোয়াখালীর ভুক্তভোগী মাহফুজ উল হক বলেন, সরকারের সিদ্ধান্ত অনুসারে নোয়াখালীর সুবর্ণচরে বসবাসরত ভূমিহীনরা খাসজমি পাওয়ার জন্য ২০০৫-০৬ সালের দিকে প্রায় দেড় হাজার মানুষ আবেদন করেন। ২০১৪ সালের দিকে প্রায় সাত হাজার ভূমিহীন পরিবারকে খাসজমি বন্দোবস্ত দেওয়া হয়। এরপর আবার বন্দোবস্ত প্রক্রিয়া বন্ধ হয়ে যায়। কারণ, ওইসব জমি নিয়ে ভূমিগ্রাসী জোতদাররা মামলা করে বসে। মামলাগুলো নিষ্পত্তি না হওয়ায় খাসজমি বন্দোবস্ত প্রক্রিয়া বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু মামলার বাদীদের কেউ ওই খাসজমিতে থাকে না। তাদের শহরে নিজস্ব বাড়ি রয়েছে।
টাঙ্গাইলের ভূমিহীন আবদুল মান্নান বলেন, টাঙ্গাইলের মধুপুরের মির্জাবাড়ি ইউনিয়নের আম্বড়িয়া মৌজার ১৯১৭-১৮ সালের সিএস অনুসারে ছেওগাং জলাশয়টির মালিক হেমচন্দ্র চৌধুরী। ১৯৬২-৬৩ সালে জলাশয়টি সরকারি সম্পত্তি হিসেবে ১নং খাস খতিয়ানভুক্ত হয়। এ নিয়ে মামলা হয়। জলাশয়টি ৬০ বছরের বেশি সময় সরকারি সম্পত্তি হিসেবে চিহ্নিত না হওয়ায় জলাশয় আইনের ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে ২০১৯ সালে মামলাটি খারিজ হয়ে যায়। জলাশয়টি আট মৎস্যজীবীকে ইজারা দেওয়া হয়। এর মধ্যে পাঁচজনকে ভয় দেখিয়ে বাদ দেওয়া হয়। বর্তমানে যারা জলাশয়টি দখল করেছে, তাদের কেউ মৎস্যজীবী নয়। আব্দুল হাকিম নামের একজনের নেতৃত্বে ১০-১২ জন সেটি ভোগদখল করছে। অথচ যারা মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করেন, তারাই জলাশয়টি ইজারা পাওয়ার যোগ্য। জলাশয়টি নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে ১৩টি মামলা হয়েছে।
কুষ্টিয়ার ভুক্তভোগী ছমির সরকার বলেন, কুষ্টিয়ার কুমারখালীর শেরকান্দি গ্রামে দেড়শ' বছর ধরে ৫০টি বাগদি সম্প্রদায়ের আদিবাসী বসবাস করছে। ওই জমি সরকারের কাছ থেকে লিজ নিয়ে তারা বসবাস করছেন। কিন্তু বুজরুখ দুর্গাপুরের বাসিন্দা বারী শেখ ওই জমি নিজের দাবি করে ১৯৭৬ সালে মামলা করেন। '৮৯ সালে মামলাটি খারিজ হয়ে যায়। কিন্তু তুহিন বিশ্বাস নামের আরেক ব্যক্তি ওই জমি দখলের জন্য গত বছর আবার মামলা করেন। জনপ্রতিনিধিরা আদিবাসীদের চূড়ান্তভাবে ওই জমি বরাদ্দ দেওয়ার ওয়াদা দিলেও তার মীমাংসা হয়নি। বরং আদিবাসীদের ওপর বারবার হামলার ঘটনা ঘটছে।
খুলনার ভুক্তভোগী রাহেলা বলেন, খুলনার পাইকগাছা উপজেলার দেলুটি ইউনিয়নে ওয়াপদার বাঁধ নির্মাণের জন্য ১৯৬৮ সালে জমি অধিগ্রহণ করা হয়। বাঁধ নির্মাণ শেষে বাঁধের দু'পাশে প্রচুর জমি অব্যবহূত অবস্থায় থেকে যায়। ওই জমি আগে একসনা ইজারা দিত পাউবো। ১৯৮৮ সালে ওই জমি ১০ বছর মেয়াদি ইজারা দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। সেই থেকে ভূমিহীনরা ওই জমি ইজারা নবায়নের মাধ্যমে বাস করে আসছেন। ১৯৯৫ সালে সেই ইজারা নবায়ন বন্ধ করে দেয় সরকার। আগের জমির মালিকরা ওই অব্যবহূত জমি ফেরত চেয়ে আদালতে মামলা করেন। আদালত স্থগিতাদেশ দেন। পরে বাদীরা উচ্চ আদালতে আপিল করেন। কিন্তু ওই জমি থেকে ভূমিহীনদের উচ্ছেদ করতে তাদের হয়রানি করা হচ্ছে। প্রতিবছর পুলিশ বাহিনী দিয়ে ভূমিহীনদের গ্রেপ্তার ও মামলায় আসামি করা হচ্ছে।
বিচারপতি নিজামুল হক নাসিম বলেন, আমি ভুক্তভোগীদের কথা শুনে অত্যন্ত দুঃখিত হয়েছি। তাদের কথা একত্র করে যদি জনসমক্ষে তুলে ধরা যায়, তাহলে সেটা কাজে আসবে। তাদের বোঝাতে হবে, কীভাবে সামনে এগোতে হবে। দেশের গরিব মানুষ অর্থের দাপটের কারণে অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। আইনগতভাবে তারা জমি পাওয়ার দাবিদার। সাধারণ মানুষ কাজ করতে গিয়ে বিপদে পড়েন। তারা মিথ্যা মামলায় হয়রানি হচ্ছেন। যেসব সংগঠন ভূমিহীনদের জন্য কাজ করছে, তারা যদি সঠিকভাবে ভূমিহীনদের পরিচালিত করে, তাহলে কিছু দাবি-দাওয়া আদায় করতে পারবে।
ড. হামিদা হোসেন বলেন, যারা মাঠে কাজ করেন, তাদের আরও গুরুত্ব দিয়ে করা উচিত। মামলাগুলো আরও তদন্ত করা প্রয়োজন। অনেক আমলার সঙ্গে জোতদারদের একটি সখ্য আছে। রাজনীতিবিদদেরও অনেকে স্বার্থ দেখেন। আদালত ১০ বছর পর একটা স্টে অর্ডার দিয়ে দেন। যারা আন্দোলন করেন তারা হতাশ হয়ে যান। রাস্তায় আন্দোলন করলে পুলিশি নিপীড়ন হয়। জোতদার শ্রেণি টাকা-পয়সা খরচ করে সরকারি কর্মকর্তা, পুলিশ ও এমপির সঙ্গে জোট করে। তারা ভোটে নির্বাচিত হন। কিন্তু ভূমিহীনদের বিষয় সংসদে নিয়ে আসেন না। যেসব ভূমিহীন আন্দোলন করছেন, তাদের পক্ষে আমাদের দাঁড়ানো উচিত।
রাজশাহী-২ আসনের সংসদ সদস্য (এমপি) ফজলে হোসেন বাদশা বলেন, মুক্তিযুদ্ধের পর এমন একটি মানবিক সংবিধান তৈরি করা হয়েছিল, যেখানে সবার কথা বলা হয়েছে। এখন আর সেই মানবিক দিকগুলো চোখে পড়ছে না। সংবিধানে প্রত্যেক মানুষের সমান অধিকারের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু রাষ্ট্রে তার কোনো বাস্তবায়ন নেই।
এএলআরডি নির্বাহী পরিচালক শামসুল হুদা বলেন, সরকারের খাসজমি নিয়ে প্রায়ই অনিয়ম-দুর্নীতির কিছু অভিযোগ আসে। অনেক অভিযোগের ভিত্তি আছে। বিভিন্ন স্থানে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অধিকার হরণ করা হচ্ছে। আমাদের দেশে বড় সমস্যা হলো, ক্ষমতায় থাকলে যে কোনো জমির কাগজপত্র বানানো যায়। ভূমি-সংক্রান্ত বিষয়গুলোর জন্য আলাদা ট্রাইব্যুনাল প্রয়োজন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক এম এম আকাশ বলেন, প্রান্তিক জনগোষ্ঠী বা আদিবাসীদের অধিকার আদায়ে তাদের আইনি সহায়তা করতে হবে, সংগঠন থাকতে হবে। ভূমি প্রশাসনসহ প্রায় সবক্ষেত্রে অসৎ কর্মকর্তা-কর্মচারী রয়েছে। তিনি বলেন, প্রান্তিক জনগোষ্ঠী বা আদিবাসীদের অধিকার প্রভাবশালী ব্যক্তিরা হরণ করেছে। অথচ ভূমি নিয়ন্ত্রণ ও ভোগ করার জন্য আইন আছে। এ জন্য ভূমি-সংক্রান্ত নির্দিষ্ট কর্তৃপক্ষ আছে। এর পরও ভূমি নিয়ন্ত্রণ ও ভোগদখল নিয়ে সমাজে বিশৃঙ্খলা চলছে। ক্ষমতাশীনরা ভূমি আইন ভঙ্গ করছে। প্রান্তিক জনগোষ্ঠী যেখানে সংগঠন করতে পারছে, সেখানে তারা তাদের অধিকার আদায় করতে পারছে।
নিজেরা করির সমন্বয়কারী খুশী কবির বলেন, দেশের প্রান্তিক, ভূমিহীন ও আদিবাসীরা অর্থনৈতিক, সামাজিকসহ নানাভাবে বঞ্চিত হচ্ছেন। অথচ সংবিধানে সব নাগরিকের সমান অধিকারের কথা বলা হয়েছে। আইন ও নীতিমালায় প্রান্তিক ভূমিহীন জনগোষ্ঠীর বিষয়ে বিশেষ সুবিধার কথা রয়েছে। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার (এসডিজি) মূল লক্ষ্য সব মানুষকে এগিয়ে নেওয়া। কিন্তু আমরা যখন মাঠ পর্যায়ে যাই, তখন দেখি ভিন্নচিত্র।
মেঘনা গুহঠাকুরতা বলেন, নিরীহ মানুষকে মারধর করা হচ্ছে। তাদের নামে মিথ্যা মামলা করা হচ্ছে। এই মিথ্যা মামলা যারা করে, তাদের বিরুদ্ধে পাল্টা প্রতিরোধ করা প্রয়োজন। রিজওয়ানা হাসান বলেন, অনেক সময় পুলিশ প্রশাসনের কাছে ভুক্তভোগীদের যেতে হয়। রাজনৈতিক বিষয়ও অনেক সময় যুক্ত থাকে। অনেক ক্ষেত্রেই পুলিশ প্রশাসনের ও রাজনৈতিক সহযোগিতা পাওয়া যায় না। কিন্তু উচ্চ আদালতে যাওয়া ভুক্তভোগীদের জন্য কঠিন হয়ে পড়ে।
সঞ্চালকের বক্তব্যে সমকালের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মুস্তাফিজ শফি বলেন, প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অধিকার রক্ষায় আমাদের একসঙ্গে কাজ করতে হবে। নানা প্রভাববলয় মুক্ত করে ভূমিহীনদের মাঝে খাসজমি বন্দোবস্ত দিতে হবে। তিনি বলেন, সমকাল সব সময়ই প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কণ্ঠস্বর হয়ে কাজ করতে চায়। তাদের অধিকার আদায়ে সহায়তা করতে চায়।

বিষয় : সমকাল-নিজেরা করি ওয়েবিনার

মন্তব্য করুন