অভিযান জোরদার হচ্ছে অনেকে নজরদারিতে

মেডিকেলের প্রশ্ন ফাঁসেও মালেক সিন্ডিকেট

প্রকাশ: ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২০       প্রিন্ট সংস্করণ

সাহাদাত হোসেন পরশ

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের গাড়িচালক আবদুল মালেক গ্রেপ্তার হওয়ার পর একে একে বেরিয়ে আসছে অধিদপ্তরের নানা অনিয়ম-দুর্নীতির চমকপ্রদ তথ্য। নিয়োগ, পদোন্নতি, বদলি, কেনাকাটা, প্রশ্ন ফাঁসসহ স্বাস্থ্য খাতের দুষ্টচক্রের নতুন সদস্যের নামও বেরিয়ে আসছে। মালেকও তার সিন্ডিকেটের অনেকের নাম ফাঁস করেছেন। সংশ্নিষ্ট একাধিক দায়িত্বশীল সূত্র গতকাল বুধবার সমকালকে জানিয়েছে, স্বাস্থ্যসহ আরও কয়েকটি খাতের দুর্নীতিবাজচক্র ভাঙতে শিগগিরই বড় ধরনের শুদ্ধি অভিযান শুরু হচ্ছে। সরকার চায়, এ চক্রের মুখোশ উন্মোচিত হোক।
গত বছর ক্যাসিনোবিরোধী অভিযানের মধ্য দিয়ে সরকার দুর্নীতিবিরোধী অভিযান শুরু করে। এতে ধরা পড়েন বিভিন্ন সেক্টরের অনেক রাঘববোয়াল। দীর্ঘদিন ঝিমিয়ে থাকার পর স্বাস্থ্যের মালেককে গ্রেপ্তারের সূত্র ধরে প্রায় একই আদলে আবার চাঙ্গা হচ্ছে অভিযানিক কার্যক্রম। স্বাস্থ্যের দুর্বৃত্ত চক্রের আরও কয়েকজনের ব্যাপারে তদন্ত প্রায় সম্পন্ন করে এনেছেন গোয়েন্দারা। 'সবুজ সংকেত' পেলেই যে কোনো সময় ধরা পড়বেন রাঘববোয়ালরা। একাধিক সূত্র থেকে এমন আভাস মিলেছে। অনৈতিকভাবে যারা দীর্ঘদিন ধরে কোটি কোটি টাকার মালিক হয়েছেন, নামে-বেনামে সম্পদ গড়েছেন, তার হিসাব খুঁজছে একাধিক গোয়েন্দা সংস্থা। দুর্নীতিবাজদের তালিকা তৈরি করে তাদের নজরদারিতে রাখা হয়েছে। তারা যাতে কোনোভাবে দেশ ছাড়তে না পারেন, সেদিকেও নজর রাখা হচ্ছে।
এদিকে, স্বাস্থ্যের আলোচিত শতকোটি টাকার সম্পদের মালিক গাড়িচালক আবদুল মালেকের বিরুদ্ধে দায়ের করা দুটি মামলার তদন্তভার র‌্যাবে ন্যস্ত করতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে বাহিনীর পক্ষ থেকে গতকাল চিঠি দেওয়া হয়েছে। দু-এক দিনের মধ্যে মামলার তদন্তভার পুলিশ থেকে র‌্যাবের কাছে ন্যস্ত হতে পারে।
র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক লে. কর্নেল আশিক বিল্লাহ সমকালকে বলেন, মালেকের বিরুদ্ধে ফৌজদারি আইনে দুটি মামলা হয়েছে। মামলার তদন্ত র‌্যাবের ওপর ন্যস্ত করতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে চিঠি দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া দুর্নীতি ও মানি লন্ডারিংয়ের বিষয়ে মালেকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে র‌্যাবের পক্ষ থেকে দুর্নীতি দমন কমিশনেও (দুদক) চিঠি দেওয়া হয়েছে। মালেকের তদন্তের সূত্র ধরে দুর্নীতি-অনিয়মের সঙ্গে আর যার যার নাম বেরিয়ে আসবে, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে দুদক কোনো সহযোগিতা চাইলে র‌্যাব তা করতে বদ্ধপরিকর।
গত রোববার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে গাড়িচালক আবদুল মালেককে রাজধানীর তুরাগ এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করে র‌্যাব-১। তবে তার অপকর্ম ও সম্পদের অনুসন্ধান চালাতে থাকেন গোয়েন্দারা। ওই তদন্তে সামান্য গাড়িচালক মালেকের একশ' কোটি টাকার বেশি সম্পদের খোঁজ মিলেছে। বর্তমানে অবৈধ অস্ত্র ও জাল টাকা উদ্ধারের ঘটনায় করা পৃথক দুই মামলায় মালেককে ১৪ দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করছে তুরাগ থানা পুলিশ। এই মামলার তদন্তভার র‌্যাবের কাছে ন্যস্ত হলে মালেককে তাদের হেফাজতে দেওয়া হবে।
একাধিক দায়িত্বশীল সূত্র সমকালকে জানায়, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, অধিদপ্তর ও কেন্দ্রীয় ঔষধাগারের (সিএমএসডি) বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারীকে নজরদারিতে রাখা হচ্ছে। নজরদারিতে থাকা কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নামে-বেনামে ব্যাংক হিসাব ও সম্পদের খোঁজে তদন্ত শুরু হয়েছে। গোয়েন্দা সংস্থার বাইরে দুদকও তদন্ত করছে।
অপর এক কর্মকর্তা জানান, করোনাকালে স্বাস্থ্য খাতে কোটি কোটি টাকার কেনাকাটা করেছে। করোনা মোকাবিলায় নানা সরঞ্জাম কেনা হয়। এই কেনাকাটায় একটি সিন্ডিকেটের ভূমিকা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এক অফিস সহকারী বিলবোর্ড সরবরাহ করেই লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। তার ব্যাপারে বিশদ অনুসন্ধান চলছে। নতুন করে আরও যাদের ব্যাপারে খোঁজ নেওয়া হচ্ছে তারা হলেন- স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের প্রশাসনিক কর্মকর্তা (পার) মো. ইয়াছিন, অতিরিক্ত মহাপরিচালকের পিএ হিসেবে কর্মরত একেএম আজিজুল হক, প্রশাসন শাখার অফিস সহকারী শাহনেওয়াজ মিয়া, সফিকুল ইসলাম, উচ্চমান সহকারী রফিকুল ইসলাম ও বাজেট শাখার উচ্চমান সহকারী আতিকুল ইসলাম। এ চক্রের কয়েকজনের সঙ্গে মালেক সিন্ডিকেটের ঘনিষ্ঠতা ছিল।
তদন্তের সঙ্গে যুক্ত এক কর্মকর্তা জানান, দীর্ঘ কর্মজীবনে মালেক নানাভাবে তদবির করে কয়েকশ' ব্যক্তিকে বিভিন্ন পদে চাকরি দিয়েছেন। এর বিনিময়ে তাদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা নিয়েছেন তিনি।
শুধু অন্যদের চাকরি নয়; মালেক তার মেয়ে, জামাতা, ভাই, ভাতিজাসহ অন্য স্বজনদেরও নানা পদে চাকরি পাইয়ে দিয়েছেন। প্রভাব খাটিয়ে তাদের আবার বছরের পর বছর ঢাকায় বিভিন্ন পদে রেখেছেন। মালেকের মেয়ে নওরিন সুলতানা রয়েছেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কম্পিউটার অপারেটর পদে। ভায়রা মাহবুব হোসেন আছেন গাড়িচালক পদে। আরেক মেয়ের স্বামী রতন অধিদপ্তরের ক্যান্টিন ম্যানেজার। ভাগ্নে মো. সোহেল গাড়িচালক, ভাতিজা আবদুল হাকিম অফিস সহায়ক।
তদন্ত-সংশ্নিষ্ট সূত্র জানায়, পরিবারের এতজন সদস্যকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে চাকরি দিয়ে সংস্থাটি এক অর্থে পারিবারিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করেছে, এ ব্যাপারে মালেককে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। শিগগিরই মালেকের কয়েকজন আত্মীয়স্বজনকেও গোয়েন্দা হেফাজতে এনে মালেক সিন্ডিকেটের ব্যাপারে আরও তথ্য বের করা হবে।
তদন্ত সূত্র জানায়, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কিছু পদে বছরের পর বছর একই ব্যক্তি রয়েছেন। মালেকের মাধ্যমে প্রভাবশালীদের ম্যানেজ করেই ওই পদের 'মধু' তারা খেয়ে আসছেন। চাকরিজীবনের অধিকাংশ সময় একাধিক ডিজি, অতিরিক্ত ডিজিসহ প্রভাবশালীদের গাড়ি চালানোর কারণে মালেক একটি সুবিধাভোগী চক্র গড়ে তোলেন।
তদন্ত-সংশ্নিষ্ট এক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানান, বিভিন্ন সময় মেডিকেল প্রশ্নপত্র ফাঁসের সঙ্গে জড়িত থাকার ঘটনায় অনেককে গ্রেপ্তার করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। প্রশ্ন ফাঁসকারীদের ওই চক্রের সঙ্গে মালেকের সংশ্নিষ্টতার সূত্র মিলেছে। মেডিকেল ও ডেন্টালের প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনায় জসিম উদ্দিন নামে একজন গ্রেপ্তার হয়েছিল। তার খালাতো ভাই ছিলেন স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের প্রেসকর্মী আবদুস সালাম। সালাম ও জসিম প্রশ্ন ফাঁসকারী চক্রের অন্যতম হোতা। এই চক্রের সঙ্গে মালেকের কী ধরনের যোগসূত্র রয়েছে তার বিশদ অনুসন্ধান চলছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একজন কর্মকর্তা গতকাল সমকালকে জানান, প্রশ্ন ফাঁসের পুরোনো এই চক্র নিয়ে তারা নতুনভাবে কাজ শুরু করেছেন।
গত বছরের ৭ সেপ্টেম্বর আওয়ামী লীগের যৌথ সভায় দলে শুদ্ধি অভিযান চালানোর নির্দেশনা দেওয়া হয়। এরপর দলের কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সভায় ছাত্রলীগ সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদককে সরিয়ে দেওয়ার কথা ওঠে। ওই সভায় যুবলীগের দুই নেতারও সমালোচনা করা হয়। এর পাঁচ দিনের মাথায় ১৮ সেপ্টেম্বর প্রথম গ্রেপ্তার হন ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের তৎকালীন সাংগঠনিক সম্পাদক খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়া। এরপর তাকে সংগঠন থেকে বহিস্কার করা হয়। খালেদকে গ্রেপ্তারের মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয় ক্যাসিনোবিরোধী অভিযানের নামে শুদ্ধি অপারেশন। এরপর একে একে অনেক রাঘববোয়াল ধরা পড়েন। এর মধ্য দিয়ে মতিঝিলের ক্লাবপাড়া ঘিরে সংঘবদ্ধ দুষ্টচক্রের নানা অনিয়মের তথ্য সামনে আসতে থাকে। একে একে অনেকে সংগঠন থেকে বহিস্কার হতে থাকেন। কিছুদিন বিরতির পর আবারও চাঙ্গা হচ্ছে একই স্টাইলের অভিযান।
মালেকের দুর্নীতির দায় নিতে চায় না স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তর : অবৈধ সম্পদ অর্জনের দায়ে গ্রেপ্তার আবদুল মালেকের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের দায় তার ব্যক্তিগত বলে দাবি করেছে স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তর। মালেকের বিষয়ে অবস্থান ব্যাখ্যা করে গতকাল এক বিজ্ঞপ্তি দিয়েছে অধিদপ্তর। এতে বলা হয়, ২০১৯ সালের ২৪ নভেম্বর স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীনে এ অধিদপ্তর গঠিত হওয়ার পর ১২ ডিসেম্বর প্রথম মহাপরিচালক হিসেবে যোগ দেন অধ্যাপক ডা. এনায়েত হোসেন। চলতি বছর ১ জানুয়ারি মালেককে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরে প্রেষণে নিয়োগ দেওয়া হয়। প্রতিষ্ঠার পর এখন পর্যন্ত এই অধিদপ্তরের অধীনে কোনো কেনাকাটা, নিয়োগ, পদায়ন বা পদোন্নতি হয়নি। কাজেই আবদুল মালেকের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগগুলোর সঙ্গে স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তর বা অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের কোনো সংশ্নিষ্টতা নেই। স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের কোনো পরিবহন পুল নেই বলেও জানানো হয়েছে সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে।