নানা সমস্যায় জর্জরিত আপিল ট্রাইব্যুনাল ও প্রশাসনিক ট্রাইব্যুনাল। প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও জনবলের অভাবে রাষ্ট্রের এই গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানটি খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলছে। সাম্প্রতিক সময়ে প্রধান বিচারপতি ও আইনমন্ত্রীকে একাধিকবার চিঠি দিয়ে নজরে আনা হলেও সমস্যা নিরসনে কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।
১৯৮২ সালে প্রতিষ্ঠা করা হয় প্রশাসনিক ট্রাইব্যুনাল। সচিবালয়ের বিপরীতে রেল ভবনের পশ্চিমে ১৪ নম্বর আব্দুল গণি রোডে প্রশাসনিক ও আপিল ট্রাইব্যুনালটি অবস্থিত। হাইকোর্টের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি শওকত হোসেন আপিল ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান। জেলা জজ পদমর্যাদাসম্পন্ন দু'জন মমতাজ পারভীন ও বদরুন নাহার এই ট্রাইব্যুনালের সদস্য। প্রায় ২শ' বছরের পুরোনো দোতলা ভবনের ওপরতলায় নিবন্ধন অধিদপ্তরের প্রধানের কার্যালয় এবং নিচতলায় প্রশাসনিক আপিল ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান ও দু'জন সদস্যের চেম্বার। চুন-সুরকি দিয়ে নির্মিত এ দুর্বল ভবনটি যে কোনো সময় ধসে পড়তে পারে। এমন ঝুঁকি মাথায় নিয়ে দীর্ঘদিন অফিস করছেন তারা। ট্রাইব্যুনালের জন্য ল টাওয়ার নামে বহুতল ভবন নির্মাণের দাবি জানিয়েছেন আইনজীবীরা।
সংশ্নিষ্টরা জানিয়েছেন, ১৯৮২ সালে প্রশাসনিক ট্রাইব্যুনাল গঠনের কয়েক বছর পর আপিল ট্রাইব্যুনাল প্রতিষ্ঠা করা হয়। প্রশাসনিক ট্রাইব্যুনাল গঠনের প্রথম থেকেই এটি ছিল গণভবনে। পরে এটা ঢাকা জজকোর্ট এলাকায় সরিয়ে নেওয়া হয়। ১৯৮৮ সালে প্রশাসনিক ট্রাইব্যুনালটি ১৪ নম্বর আব্দুল গণি রোডে স্থানান্তর করা হয়। সেই থেকে অদ্যাবধি গত ৩২ বছর আপিল ও প্রশাসনিক ট্রাইব্যুনালের কার্যক্রম চলছে সচিবালয় সংলগ্ন গণি রোডের টিনশেড ভবনে।
জানা গেছে, সরকারের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো উন্নয়ন হয়েছে। কিন্তু দেশের ১৪ লাখ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর চাকরি সংক্রান্ত সমস্যা নিরসনে গঠিত প্রশাসনিক ও আপিল ট্রাইব্যুনালের অবস্থার কোনো পরিবর্তন ঘটেনি। অবকাঠামোগত নানা সমস্যাকে সঙ্গী করে রাজধানীর প্রাণকেন্দ্রে গত ৩২ বছর যাবৎ টিনশেড ভবনেই চলছে এর বিচার কার্যক্রম।
গত বৃহস্পতিবার সরেজমিন দেখা গেছে, টিনশেড ভবনে স্থাপিত তিন নম্বর প্রশাসনিক ট্রাইব্যুনালের এজলাস নেই। এক নম্বর ট্রাইব্যুনালের সঙ্গে ভাগাভাগি করে বিচার পরিচালনা করা হচ্ছে। ফলে বিচার কার্যক্রম দারুণভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে।
প্রশাসনিক ট্রাইব্যুনালের বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে কথা হয় এই বারের সভাপতি আব্দুর রহিম কাজলের সঙ্গে। তিনি সমকালকে বলেন, বিচারের জন্য টিনশেড ভবন কোনোভাবেই মানানসই নয়। হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি ও জেলা জজ পদমর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তিরা টিনশেড ভবনে বসে বিচার করতে পারেন না। তা ছাড়া ভবনটা অনেক দিনের পুরোনো। বৃষ্টি হলেও পানি চুইয়ে পড়ে। মামলার নথিপত্র, রেকর্ড সব নষ্ট হয়ে যায়। আমরা ঠিকমতো বসতে পারি না। তিনি বলেন, আপিল ও প্রশাসনিক ট্রাইব্যুনালও একটি আদালত। প্রশাসনিক ট্রাইব্যুনালের মর্যাদা ও নিরাপত্তার স্বার্থে স্থায়ী অবকাঠামো নির্মাণ খুবই জরুরি।
প্রশাসনিক বারের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল গত ফেব্রুয়ারি মাসে আইনমন্ত্রী আনিসুল হকের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে তাদের বিভিন্ন সমস্যার কথা তুলে ধরে। পাশাপাশি সংগঠনের পক্ষ থেকে কয়েকটি প্রস্তাবনাও দেওয়া হয়। এর মধ্যে রয়েছে- প্রশাসনিক ট্রাইব্যুনালের স্থায়ী অবকাঠামো উন্নয়ন, প্রশাসনিক ও আপিল ট্রাইব্যুনালে রেকর্ডরুম স্থাপন, জনবল নিয়োগ, আইনজীবী বসার স্থান সংকুলান, লাইব্রেরিতে বই সরবরাহ প্রভৃতি।
ট্রাইব্যুনাল সূত্র জানায়, বর্তমানে প্রশাসনিক আপিল ট্রাইব্যুনালে ৯৫০টি মামলা বিচারাধীন। এ ছাড়া ঢাকায় তিনটি প্রশাসনিক ট্রাইব্যুনালে এক হাজার ৫২টি এবং ঢাকার বাইরে চারটি ট্রাইব্যুনালে দেড় শতাধিক মামলা বিচারাধীন। সাম্প্রতিক সময়ে প্রশাসনিক ট্রাইব্যুনালের কার্যক্রম ধীর গতিতে চলতে থাকায় ২০১১, ২০১২, ২০১৩ এবং ২০১৫ সালের মামলাও বর্তমানে বিচারাধীন।
এই ট্রাইব্যুনালে নিবন্ধিত পাঁচ শতাধিক হলেও প্রায় দেড়শ' আইনজীবী নিয়মিত প্র্যাকটিস করছেন। কিন্তু তাদের বসার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেই। জায়গা থাকলেও বিচারক ও কর্মকর্তাদের গাড়ি পার্কিং করার কোনো নির্ধারিত স্থান নেই।
সরকারি চাকরিজীবীদের চাকরি, পদোন্নতি, অপসারণ ও অব্যাহতি, বিভাগীয় মামলাসহ বিভিন্ন ধরনের মামলার বিচার হয় দেশের মোট সাতটি প্রশাসনিক ট্রাইব্যুনালে। এর মধ্যে ঢাকাতেই (১, ২ ও ৩) তিনটি। অপর চারটি চট্টগ্রাম, খুলনা, বগুড়া ও বরিশালে। এসব ট্রাইব্যুনালের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল নিষ্পত্তির জন্য একমাত্র প্রশাসনিক আপিল ট্রাইব্যুনাল। এমএলএসএস থেকে সচিব পর্যন্ত সরকারি যে কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারী তাদের চাকরি নিয়ে প্রশাসনিক কোনো সংকটে পড়লে এই ট্রাইব্যুনালের দ্বারস্থ হয়ে থাকেন। এ ছাড়া আধা সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান, সরকারি-বেসরকারি ব্যাংকে কর্মরতদের চাকরিগত সমস্যা নিয়ে সরকারের এই গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে মামলা করা হয়।
ট্রাইব্যুনাল সংকট :ঢাকার বাইরে বগুড়া, বরিশাল, চট্টগ্রাম ও খুলনায় প্রশাসনিক ট্রাইব্যুনাল থাকলেও রাজশাহী, সিলেট, রংপুর ও ময়মনসিংহ বিভাগে কোনো প্রশাসনিক ট্রাইব্যুনাল স্থাপন করা হয়নি। ফলে এসব বিভাগের সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মামলা করতে অন্য বিভাগের ট্রাইব্যুনালের দ্বারস্থ হতে হচ্ছে। এতে এসব এলাকার সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে।
দশ হাজার মামলা ফেরত :সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী প্রজাতন্ত্রের যে কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারী চাকরি সংক্রান্ত বিষয়ে সংক্ষুব্ধ হলে প্রতিকার চেয়ে হাইকোর্টে রিট করতে পারতেন। এখন সেটা বন্ধ। কারণ প্রশাসনিক ট্রাইব্যুনাল থাকার পরও তারা সেখানে না গিয়ে সরাসরি হাইকোর্টে রিট করছেন। বর্তমানে হাইকোর্টে এ ধরনের প্রায় ১০ হাজার রিট মামলা বিচারাধীন।
আপিল বিভাগ গত মে মাসে এ সংক্রান্ত একটি মামলা নিষ্পত্তি করে কয়েকটি নির্দেশনা দিয়েছেন। ওই রায়ে আপিল বিভাগ বলেছেন, চাকরির শর্তাবলিতে ক্ষুব্ধ হলেও সরকারি চাকরিজীবীরা এখন আর সরাসরি হাইকোর্টে রিট করতে পারবেন না। শুধু তাই নয়, হাইকোর্টে রিট মামলা হিসেবে বিচারাধীন প্রায় ১০ হাজার মামলা নিষ্পত্তির জন্য প্রশাসনিক ট্রাইব্যুনালে ফেরত পাঠিয়েছেন আপিল বিভাগ।
গতিশীল করতে নানা উদ্যোগ :ঝিমিয়ে পড়া আপিল ও প্রশাসনিক ট্রাইব্যুনালকে আরও গতিশীল, কার্যকর ও মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি করতে নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। হাইকোর্ট বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি শওকত হোসেন গত ৩১ মে প্রশাসনিক আপিল ট্রাইব্যুনালে নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে যোগদানের পর এ উদ্যোগ নিয়েছেন। প্রশাসনিক ট্রাইব্যুনাল আইনজীবী সমিতির সভাপতি আবদুর রহিম কাজল বলেন, নতুন চেয়ারম্যান অনেক তৎপর। তিনি আসার পর আমরা ট্রাইব্যুনালে প্রাণ ফিরে পেয়েছি। বিচারপ্রার্থীদের দুর্ভোগ কমাতে তিনি নানা উদ্যোগ নিয়েছেন।