দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) করা ঋণ জালিয়াতির ২৬ মামলায় তিন বছর জেল খাটা নিরপরাধ টাঙ্গাইলের পাটকল শ্রমিক মো. জাহালমকে ১৫ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট। আগামী এক মাসের মধ্যে ব্র্যাক ব্যাংক কর্তৃপক্ষকে এ টাকা দিতে বলা হয়েছে। পাশাপাশি দুদককে সতর্ক করে দিয়ে রায়ে বলা হয়েছে, কোনো নির্দোষ ব্যক্তিকে ভবিষ্যতে আর যেন ভুলভাবে জেল খাটতে না হয়। কারণ এই প্রতিষ্ঠানের কাছে জনগণের প্রত্যাশা অনেক।

বিচারপতি এফ আর এম নাজমুল আহাসান ও বিচারপতি কে এম কামরুল কাদের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্টের ভার্চুয়াল বেঞ্চ জাহালমের ক্ষতিপূরণ প্রশ্নে কিছু পর্যবেক্ষণসহ বুধবার এ রায় দেন। এ সময় জাহালম আদালতে উপস্থিত ছিলেন।

এছাড়া সোনালী ব্যাংকের ১৮ কোটি টাকা আত্মসাতের ঘটনার মামলায় প্রধান আসামি আবু সালেকের পরিবর্তে নিরীহ জাহালমকে চিহ্নিত করার ক্ষেত্রে ব্র্যাক ব্যাংকের দুজন কর্মকর্তা অন্যতম ভূমিকা রেখেছেন বলে হাইকোর্ট রায়ে উল্লেখ করেছেন। একই সঙ্গে দুদকের মামলা তদন্ত প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত ১২ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা দ্রুত নিস্পত্তি করার নির্দেশ দেন হাইকোর্ট।

আদালতে জাহালমের পক্ষে ছিলেন আইনজীবী সুভাষ চন্দ্র দাস ও শাহিনুর রহমান। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল আব্দুল্লাহ মাহমুদ বাশার। দুদকের পক্ষে ছিলেন আইনজীবী খুরশিদ আলম খান। অপরদিকে, ব্র্যাক ব্যাংকের পক্ষে আইনজীবী মো. আসাদুজ্জামান ও সোনালী ব্যাংকের পক্ষে ছিলেন ব্যারিস্টার শেখ মো. জাকির হোসেন।

রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করে জাহালম সাংবাদিকদের বলেন, আদালতের রায়ে আমি সন্তষ্ট। এখন দ্রুত টাকা পেলে তা দিয়ে আমি ঋণ পরিশোধ করবো এবং ছোটখাটো ব্যবসা করবো।

গত ২৩ সেপ্টেম্বর হাইকোর্ট পাটকল শ্রমিক জাহালমকে ক্ষতিপূরণ সংক্রান্ত জারি করা রুলের রায় ঘোষনার জন্য এ দিন ধার্য করেছিলেন। এরআগে গত ১২ ফেব্রুয়ারি জারি করা রুলের ওপর শুনানি শেষে মামলাটি অপেক্ষমান (সিএভি) রাখা হয়েছিল। অর্থাৎ যে কোনো দিন রায় ঘোষণার জন্য রাখা হয়। কিন্তু করোনাভাইরাসের কারণে আদালত বন্ধ থাকায় রায় ঘোষণা পিছিয়ে যায়।

সোনালী ব্যাংকের সাড়ে ১৮ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে ২০১২ সালের এপ্রিলে ৩৩টি মামলা করে দুদক। দুদক তদন্ত করে জানায়, জালিয়াত চক্র সোনালী ব্যাংকের ক্যান্টনমেন্ট শাখায় আবু সালেকসহ তিনজনের হিসাব থেকে ১০৬টি চেক ইস্যু করে। চেকগুলো ১৮টি ব্যাংকের ১৩টি হিসাবে ক্লিয়ারিংয়ের মাধ্যমে জমা করে ১৮ কোটি ৪৭ লাখ টাকা আত্মসাৎ করা হয়। ওই ১৮টি ব্যাংকের মধ্যে একটি হলো ব্র্যাক ব্যাংক। কিন্তু তদন্ত কর্মকর্তাদের ভুলে ঠাকুরগাঁয়ের সালেকের বদলে গ্রেপ্তার করা হয় টাঙ্গাইলের পাটকল শ্রমিক জাহালমকে। তাকে 'আবু সালেক' হিসেবে শনাক্ত করেছিলেন ব্র্যাক ব্যাংকের দুই কর্মকর্তা। সে কারণে ব্র্যাক ব্যাংককে এই জরিমানা দিতে বলা হয়েছে।

রায়ে আদালত বলেছেন, এ ঘটনায় সোনালী ব্যাংকের কোনো ভুল না পাওয়ায় তাদের জরিমানা করা হয়নি। তবে দুদককে তদন্তের ক্ষেত্রে হাইকোর্ট সতর্ক করে দিয়েছেন, যাতে ভবিষ্যতে এ ধরনের আর কোনো ঘটনা যেন না ঘটে। আর যে ৩৩ মামলায় জাহালমকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছিল, সেগুলোর পুনঃতদন্ত করে দ্রুত সময়ে বিচার শেষ করার নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট।

আদালত রায়ের পর্যবেক্ষণে বলা হয়, জাহালম ক্ষতিপূরণ পাওয়ার যোগ্য। কেননা একজন ব্যক্তি যিনি ১৮ কোটি টাকার দুর্নীতির অভিযোগ নিয়ে তিন বছর জেল খেটেছেন। যার সাথে তার কোন সম্পৃক্ততাই নাই।

জাহালমকে নিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশের জন্য চ্যানেল টোয়েন্টি ফরকে ধন্যবাদও জানান আদালত।

রায়ের পর দুদকের আইনজীবী খুরশীদ আলম খান সাংবাদিকদের বলেন, জাহালমকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার প্রশ্নে জারি করা রুল কিছু পর্যবেক্ষণ সহকারে নিস্পত্তি করে রায় দিয়েছেন হাইকোর্ট। রায়ে ব্র্যাক ব্যাংককে এ ঘটনার জন্য দায়ী করে ৩০ দিনের মধ্যে জাহালমকে ১৫ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। এছাড়া দুদককে ভবিষ্যতে এ ধরনের ভুল ভ্রান্তি যাতে না হয় সে জন্য সতর্ক থাকতে বলেছেন। এই ব্যাংক ঋণের ঘটনায় যে মামলা তার পুনঃতদন্ত দ্রুত শেষ করতে বলেছেন হাইকোর্ট।

জাহালামকে নিয়ে গত বছরের জানুয়ারিতে একটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত প্রতিবেদন সংশ্লিষ্ট আদালতের নজরে আনেন সুপ্রিমকোর্টের আইনজীবী অমিত দাশ গুপ্ত। এ বিষয়ে ব্যাখ্যা জানতে দুর্নীতি দমন কমিশনের কর্মকর্তা, মামলার বাদীসহ চারজনকে তলব করেন হাইকোর্ট। কারাগারে থাকা 'ভুল' আসামি জাহালমকে কেন অব্যাহতি দেওয়া হবে না, তাকে মুক্তি দিতে কেন নির্দেশ দেওয়া হবে না এবং তাকে যথাযথ ক্ষতিপূরণ দিতে কেন নির্দেশ দেওয়া হবে না- তা জানতে চেয়ে স্বঃপ্রণোদিত একটি রুলও জারি করেন হাইকোর্ট।

এরপর দুর্নীতি দমন কমিশনের চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদ দুঃখ প্রকাশ করে ভুলের জন্য দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন। আদালতের আদেশে গত বছর ৩ ফেব্রুয়ারি রাতে গাজীপুরের কাশিমপুর কারাগার থেকে মুক্তি পান জাহালম। পাটকল শ্রমিক জাহালমের তিন বছর কারাগারে থাকার ঘটনায় তদন্ত কর্মকর্তাদের গাফিলতি ছিল কি না- তা খতিয়ে দেখতে একটি কমিটি করে দুদক।