মানব পাচার: দালাল ধরতে রেড অ্যালার্ট জারি করবে সিআইডি

প্রকাশ: ০৪ অক্টোবর ২০২০     আপডেট: ০৪ অক্টোবর ২০২০   

সমকাল প্রতিবেদক

লিবিয়ায় মানব পাচারে জড়িত দালালদের গ্রেপ্তার করতে ইন্টারপোলের মাধ্যমে রেড অ্যালার্ট জারি করা হবে বলে জানিয়েছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)।

রোববার রাজধানীর মালিবাগে সিআইডির প্রধান কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানানো হয়।

গত ২৮ মে লিবিয়ার মিজদা শহরে মানব পাচারকারীরা ২৬ বাংলাদেশিকে হত্যা করে। আহত হন ১২ জন। আহতদের মধ্যে ৯ বাংলাদেশিকে ফিরিয়ে আনা হয়েছে। এ সংক্রান্ত বিষয়ে জানাতে সংবাদ সম্মেলনে আসে সিআইডি।

সংবাদ সম্মেলনে ভুক্তভোগীরা লিবিয়ায় নির্যাতনের রোমহর্ষক বর্ণনা দিয়েছেন। এতে জানানো হয়-লিবিয়ার ঘটনায় বাংলাদেশের বিভিন্ন থানায় ২৬টি মামলা হয়। এরমধ্যে সিআইডি ১৫টি মামলা তদন্ত করছে। ইতিমধ্যে ৪৪ জন আসামি গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের অনেকেই আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। ২৮ মে'র ঘটনায় আহতদের ফিরিয়ে আনতে সেদেশে যোগাযোগ করে সিআইডি। গত ৩০ সেপ্টেম্বর আহত ৯জন দেশে ফিরেছেন। তাদেরও পাচার করা হয়েছিল।

সংবাদ সম্মেলনে এই ৯ জন উপস্থিত ছিলেন।ফিরে আসা ৯ জন তাদের পাচার হওয়ার বিষয়ে সিআইডির কাছে বিস্তারিত বর্ণনা করেছেন। কারা কীভাবে তাদের পাচার করেছিলেন এবং কীভাবে লিবিয়ায় অপহরণের পর ২৬ জনকে হত্যা ও তাদের ওপর নির্যাতন চালানো হয়েছিলো সেসব বর্ণনাও করেছেন তারা। আদালতেও জবানবন্দি দেন তারা।

সিআইডির অর্গানাইজড ক্রাইমের ডিআইজি আবদুল্লাহ হেল বাকী বলেন, মানব পাচারে জড়িত যারা দেশে ছিলেন, তাদের অনেককেই গ্রেপ্তার করা হয়েছে। যারা বিদেশে পলাতক আছে, তাদের গ্রেপ্তার করতে ইন্টারপোলের সহায়তা নেওয়া হবে। ইতোমধ্যে ১০-১২ জন দালালের নাম জানা গেছে।

সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার সৈয়দা জান্নাত আরা বলেন, আগামী সপ্তাহের মধ্যে বিদেশে পলাতক ১০-১২ জনের বিরুদ্ধে ইন্টারপোলের মাধ্যমে রেড অ্যালার্ট জারি করা হবে।

দেশে ফিরে আসা ৯ জন নির্যাতনের রোমহর্ষক বর্ণনা দিয়েছেন। তাদের মধ্যে আহত জানু মিয়া বলেন, তার বাড়ি কিশোরগঞ্জ জেলায়। শ্যামল ও সোহাগ নামের দুই দালাল তাকে জানান- লিবিায়ায় ৪০ হাজার টাকা বেতনে তাকে চাকরি দেবেন। গত বছরের ১৬ ডিসেম্বর মতিঝিল নিয়ে আসা হয় তাকে। তারপর বাসে করে যান বেনাপোল সীমান্তে। সেখান থেকে তাকে ট্যুরিস্ট ভিসায় নিয়ে যাওয়া হয় কলকাতায়। কলকাতা থেকে বিমানে করে মুম্বাই নিয়ে যাওয়া হয় তাকে। সেখান থেকে বিমানে নিয়ে যাওয়া হয় দুবাই। এরপর মিশর হয়ে লিবিয়ায়। মিশরে যেখানে তাকে রাখা হয় সেখানে আরও ১০০ জন বাংলাদেশি ছিল। মিশর থেকে তাদের নেওয়া হয় লিবিয়ার বেনগাজীতে। সেখানে শ্যামল ও সোহাগের সহযোগী রাহাত তাদের আটকে রেখে টাকা দাবি করে। খাবার দেওয়া হত না।

পরে বাংলাদেশে পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করে রাহাতের দেশীয় সহযোগীদের কাছে টাকা দেওয়া হয়। বেনগাজী থেকে অন্য এক দালালের কাছে তাদের হস্তান্তর করে রাহাত। জানুয়ারিতে লিবিয়ায় ১৮ হাজার বেতনে কাজ দেওয়া হয়। বেশি টাকা বেতনে ত্রিপলীতে চাকরি দেওয়ার কথা বলা হয় তাদের। তানজিরুল নামে এক দালাল তাদের সঙ্গে চুক্তি করে ত্রিপলীতে নেওয়ার জন্য। ১৫ মে জানুসহ ১০ জন একটি গাড়িতে করে ত্রিপলীতে যাওয়ার জন্য রওনা দেন তানজিরুল। আরও দুটি গাড়িতে বাংলাদেশিদের নেওয়া হচ্ছিল ত্রিপলীতে। মাঝপথ থেকে অপহরণ করা হয় তাদের।

মিজদা শহরে প্রায় ১৫ দিন আটকে রেখে পাচারকারীরা মুক্তিপণের জন্য তাদের ওপর নির্যাতন চালায়। এমনকি প্রতিদিন কাউকে না কাউকে পিটিয়ে হত্যা করে লাশ দেখানো হতো তাদের। জানানো হতো, টাকা না দিলে তাদেরও প্রাণ হারাতে হবে। নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে ২৭ মে ঘানা ও নাইজেরিয়ার কয়েকজন ভুক্তভোগী একজন অপহরণকারীকে হত্যা করে। ২৮ মে অপহরণকারী চক্রের সদস্যরা এসে তাদের ওপর হামলা চালায়। নির্বিচারে গুলি করা হয়। এতে ২৬ জন বাংলাদেশি নিহত হন এবং ১২ জন আহত হন। গুলিবিদ্ধ হয়ে কয়েকজন বের হয়ে আসে। পরে তাদের উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়ার ব্যবস্থা করে সেদেশের সেনাবাহিনী।