সাক্ষাৎকার: অ্যাটর্নি জেনারেল এ এম আমিন উদ্দিন

দুর্নীতি পেলে কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না

প্রকাশ: ১১ অক্টোবর ২০২০     আপডেট: ১১ অক্টোবর ২০২০       প্রিন্ট সংস্করণ

ওয়াকিল আহমেদ হিরন

দেশের সর্বোচ্চ আদালতে দুর্নীতি ও অনিয়মকে কোনোরকম আশ্রয়-প্রশ্রয় দেওয়া হবে না বলে জানিয়েছেন নতুন অ্যাটর্নি জেনারেল এ এম আমিন উদ্দিন। রাষ্ট্রের প্রধান এই আইন কর্মকর্তা বলেছেন, অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয় ও সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী বারে দুর্নীতির সঙ্গে যে-ই জড়িত থাকুক, কোনো ছাড় দেওয়া হবে না। সমকালকে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেন নতুন অ্যাটর্নি জেনারেল। গতকাল শনিবার রাজধানীর বনানীতে তার বাসভবনে একান্ত আলাপচারিতায় উঠে আসে উচ্চ আদালতে দীর্ঘদিন ধরে স্থগিত থাকা নারী নির্যাতনের মামলা চালু, মামলাজট কমাতে নানা উদ্যোগ, বিচারক নিয়োগ, সুপ্রিম কোর্ট বার ও অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয়ের দুর্নীতিসহ অনেক বিষয়।

সুপ্রিম কোর্টের এই জ্যেষ্ঠ আইনজীবী জানান, দায়িত্ব গ্রহণের পর পুরো অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয়কে আরও সুশৃঙ্খলভাবে ঢেলে সাজানোর উদ্যোগ নেওয়া হবে, যেখানে থাকবে না কোনো অনিয়ম ও দুর্নীতি। এ ছাড়া নারী নির্যাতনসহ অন্য যেসব চাঞ্চল্যকর মামলা উচ্চ আদালতে স্থগিত করে রাখা হয়েছে, সেগুলো চিহ্নিত করে স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার করে মামলাগুলো পর্যায়ক্রমে চালু করার উদ্যোগ নেবেন তিনি। গত ২৭ সেপ্টেম্বর অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলমের মৃত্যুর পর পদটি শূন্য হয়। এরপর গত বৃহস্পতিবার সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি ও জ্যেষ্ঠ আইনজীবী এ এম আমিন উদ্দিনকে অ্যাটর্নি জেনারেল হিসেবে নিয়োগ দেয় সরকার।

সমকাল: সংবিধান অনুযায়ী অ্যাটর্নি জেনারেল পদটি রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তার। যিনি দেশের সব আদালতে  শুনানি করতে পারেন। বলা হয়, রাষ্ট্রের তিনটি অঙ্গ- নির্বাহী বিভাগ, বিচার বিভাগ ও আইনসভার মধ্যে সমন্বয় সাধন করেন অ্যাটর্নি জেনারেল।

সমকাল: দায়িত্ব গ্রহণের পর আপনার প্রথম চ্যালেঞ্জ হবে কোনটি?

অ্যাটর্নি জেনারেল: প্রথম চ্যালেঞ্জ হবে অ্যাটর্নি জেনারেল অফিস সম্পর্কে আমার জানা। সেখানে বর্তমানে কী অবস্থা। দুই যুগ আগে ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সালের অক্টোবর পর্যন্ত আমি অ্যাটর্নি জেনারেল অফিসের সঙ্গে ছিলাম। সে সময় এক পরিস্থিতি ছিল, এখন অন্য পরিস্থিতি। এখন কোর্ট ও মামলার সংখ্যা অনেক বেশি। অ্যাটর্নি জেনারেল অফিসে কোনো অনিয়ম-দুর্নীতি থাকলে চিহ্নিত করে অবশ্যই ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পুরো অ্যাটর্নি জেনারেল অফিসকে সুশৃঙ্খলভাবে ঢেলে সাজাতে চাই।

সমকাল: আপনি সুপ্রিম কোর্ট বারের বর্তমান নির্বাচিত সভাপতি। এখন অ্যাটর্নি জেনারেল নিযুক্ত হওয়ার পর একত্রে দুটি পদে থাকা আইনগত কোনো সমস্যা হবে কিনা?

অ্যাটর্নি জেনারেল: আমি যেহেতু সুপ্রিম কোর্ট বারেরও সভাপতি, সেহেতু আমি একসঙ্গে দুটি চালাব। প্রথমে আমি একজন আইনজীবী ও সুপ্রিম কোর্ট বারের সদস্য। সে ক্ষেত্রে বারের সভাপতি হিসেবে আমি দায়িত্ব পালন করব। পাশাপাশি অ্যাটর্নি জেনারেল পদেও থাকব। এখানে আইনগত কোনো সমস্যা নেই। দুটি পদ সমন্বয় করে চালানো অসম্ভব নয়; বরং আমার জন্য সুবিধা হবে বারের সঙ্গে সরকারের কোনো বিষয় নিয়ে সমস্যা হলে তাৎক্ষণিক যোগাযোগ করে সমাধানের উপায় বের করা যাবে।

সমকাল: বর্তমান পরিস্থিতিতে উচ্চ আদালতে স্থগিত থাকা নারী নির্যাতন ও চাঞ্চল্যকর মামলা চালু করতে আপনার উদ্যোগ কী হবে?

অ্যাটর্নি জেনারেল: বর্তমান প্রেক্ষাপটে নারী নির্যাতন মামলাগুলো সামনে চলে আসছে। আমি মনে করি, নারী নির্যাতনসহ অন্যান্য চাঞ্চল্যকর যেসব মামলা স্থগিত করে রাখা হয়েছে, সেগুলো বাছাই করে স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার করে মামলাগুলো পর্যায়ক্রমে চালু করতে হবে। এ ব্যাপারে পদক্ষেপ নেওয়া হবে। এ ছাড়া সরকারি স্বার্থসংশ্নিষ্ট মামলাগুলো আছে, যেগুলো বিভিন্ন কারণে উচ্চ আদালতে স্থগিত করে রাখা হয়েছে, দিনের পর দিন লোকচক্ষুর অন্তরালে চলে গেছে- সেগুলো দ্রুত শুনানির উদ্যোগ নেব। এসব মামলা শুনানির পর সরকার জয়লাভ করলে পুনরায় চালু হবে। দীর্ঘসূত্রতার কারণে ভালো ভালো মামলা যেন নষ্ট হয়ে না যায়, সেদিকে খেয়াল রাখা হবে। প্রয়াত অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম এসব মামলা দ্রুত শুনানির জন্য চেষ্টা করেছেন, আমিও চেষ্টা করব। প্রয়োজনে আমরা পিপিদের চিঠি দেব যে আপনাদের এখানে কোন কোন গুরুত্বপূর্ণ মামলা উচ্চ আদালতে স্থগিত আছে, তার তালিকা চাইব।

সমকাল: উচ্চ আদালতে দুর্নীতি প্রতিরোধে আপনার ভূমিকা কী হবে?

অ্যাটর্নি জেনারেল: দুর্নীতি-অনিয়মের বিরুদ্ধে সব সময় আমাদের অভিযান রয়েছে। সুপ্রিম কোর্ট বারের সভাপতি নির্বাচিত হওয়ার পর থেকে আমি এ ব্যাপারে কাজ শুরু করি, যা এখনও অব্যাহত আছে। করোনার সময় উচ্চ আদালতে ভার্চুয়াল কোর্ট শুরুর দিকে আমরা একটি অনিয়মের খবর পেলাম, এরপর প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে আপিল বিভাগের সঙ্গে বারের আইনজীবীরা বসেছি। দুর্নীতি প্রতিরোধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এতে করে উচ্চ আদালতের বিভিন্ন সেকশনে শৃঙ্খলা ফিরে আসছে। এফিডেভিট ও ফাইলিং শাখায় শৃঙ্খলা ফিরে এসেছে।

সুপ্রিম কোর্ট বার, অ্যাটর্নি জেনারেল অফিস মিলে দুর্নীতি প্রতিরোধে কাজ করেছি। বারে ওকালতনামায় অনিয়ম ধরা পড়ার পর পদক্ষেপ নিয়েছি। দুর্নীতি ও অনৈতিক কর্মকাণ্ড নিয়ে কারও সঙ্গে আমরা আপস করিনি; ভবিষ্যতেও করা হবে না। অন্যায় ও অনৈতিক কাজের বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত থাকবে। আদালতের কোথাও কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ পাওয়া গেলে যথাযথ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য অনুরোধ করব।

সমকাল: সরকার নারী নির্যাতনের সর্বোচ্চ শাস্তি যাবজ্জীবনের পরিবর্তে মৃত্যুদণ্ড করার উদ্যোগ নিয়েছে। এ ব্যাপারে আপনার মত কী?

অ্যাটর্নি জেনারেল: সমাজের কিছু লোক গর্হিত এ অপরাধগুলো করছে। তাদের নিবৃত এবং অন্যদের নিরুৎসাহিত ও ভয় দেখানোর জন্য কঠিন ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। এতে করে অন্যরা ভয় পাবে এবং পশুবৃত্তিটা কমে আসবে। এ ধরনের অপরাধ প্রমাণ হলে মৃত্যুদণ্ড হবে জানার পর যেন ভবিষ্যতে আর কেউ এ ধরনের অপরাধের সঙ্গে জড়িয়ে না পড়ে, তার জন্য এ বিধান করা উচিত। যেমন দেখেন, নারী নির্যাতন দমন আইনের ৯(১) ধর্ষণের পর যদি কাউকে হত্যা করা হয়, তাহলে তার শাস্তি মৃত্যুদণ্ড।

আমি মনে করি, ধর্ষণ কিন্তু শারীরিকভাবে নয়, মানসিকভাবে হত্যা করা হচ্ছে। আমাদের প্রধানমন্ত্রী অত্যন্ত সংবেদনশীল। তিনি যখন এটা দেখেছেন, সঙ্গে সঙ্গে আইনটা পরিবর্তনের জন্য আইনমন্ত্রীকে নির্দেশ দিয়েছেন। সরকারের এ উদ্যোগ অবশ্যই ভালো ও সঠিক। বর্তমান সমাজের জন্য এই বিধান অত্যন্ত উপযোগী।

সমকাল: উচ্চ আদালতে মামলাজট কমাতে আপনার পদক্ষেপ বা সুপারিশ কী হবে?

অ্যাটর্নি জেনারেল: মামলাজট কমানোর ব্যাপারে প্রধান বিচারপতির সঙ্গে দেখা করে এ ব্যাপারে কথা বলব। এর আগে আইনজীবীদের সঙ্গে কথা বলব। সম্প্রতি প্রধান বিচারপতি আপিল বিভাগে পুরোনো মামলা অগ্রাধিকার ভিত্তিতে নিষ্পত্তি করার ঘোষণা দিয়েছেন। এটা খুবই ভালো পদক্ষেপ। আদালতে বিচারাধীন থাকা রিট, সিভিল ও ফৌজদারি মামলা যদি ক্যাটাগরি বা শ্রেণীকরণ করা যায়, সে ক্ষেত্রে একটা মামলা দেখে ওই ক্যাটাগরির সব মামলা দ্রুত শেষ করা যাবে। এভাবেই হয়তো হাইকোর্ট বিভাগে অনেক মামলা নিষ্পত্তি করা যাবে।

তা ছাড়া পুরোনো যেসব মামলা অকার্যকর হয়ে গেছে, কার্যকারিতা হারিয়ে ফেলছে, কিন্তু মামলাটা রয়ে গেছে, তালিকায় (লিস্ট) থাকছে, নম্বর বাড়ছে, এগুলো চিহ্নিত করে শেষ করতে হবে। আপিল বিভাগেও এভাবে মামলা শেষ করা সম্ভব। এ ছাড়া বিচারপ্রার্থীদের বিশ্বাস ও আস্থা ধরে রাখার জন্য আদালতকে দ্রুত মামলা নিষ্পত্তি করতে হবে। সে ক্ষেত্রে বিচারক বাড়ানোর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। মামলা ব্যবস্থাপনায় সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসনকে আরও উন্নত ও আধুনিক হতে হবে।

সমকাল: উচ্চ আদালতে যেভাবে মামলা বাড়ছে, সে হিসেবে মামলা নিষ্পত্তিতে বিচারক নেই। সে ক্ষেত্রে আপনার সুপারিশ কী হবে?

অ্যাটর্নি জেনারেল: উচ্চ আদালতে বছরের পর বছর যে হারে মামলা বাড়ছে, তাতে অবশ্যই বিচারক নিয়োগের প্রয়োজন আছে। যে পদ্ধতিতে উচ্চ আদালতে বিচারক নিয়োগ হচ্ছে, সেটা অবশ্যই সঠিক প্রক্রিয়া। বারের সিনিয়র আইনজীবীদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে বিচারক নিয়োগ হচ্ছে। কারণ, আমাদের বিচক্ষণ আইনমন্ত্রী, তিনি একজন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী। তিনি সবাইকে চেনেন। সে কারণে সাম্প্রতিককালে অভিজ্ঞ, দক্ষ ও যোগ্য আইনজীবীদের বিচারক নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে।

আদালতের সংখ্যা বাড়ানোর জন্য সুপ্রিম কোর্ট এনেক্স ভবনের পেছনে একটা ভবন নির্মাণ করা হচ্ছে। আদালত বাড়ানো হলে সরকার যোগ্যতা ও দক্ষতার ভিত্তিতে অবশ্যই বিচারক নিয়োগ দেবে।

সমকাল: সরকারের সঙ্গে বিচার বিভাগের সম্পর্ক কী হওয়া উচিত?

অ্যাটর্নি জেনারেল: দেখুন, বিচার বিভাগ ও নির্বাহী বিভাগ দুটি আলাদা স্বতন্ত্র প্রতিষ্ঠান। দুটোই স্বাধীন। সংবিধান অনুযায়ী বিচার বিভাগ চলবে। সংবিধানের নির্দেশিত পথ অনুযায়ী রাষ্ট্রের বিচার বিভাগ, নির্বাহী বিভাগ ও আইন বিভাগ তাদের নিজ নিজ অবস্থান থেকে চলবে। আমি রাষ্ট্রের আইন কর্মকর্তা হিসেবে সরকার ও বিচার বিভাগের মধ্যে সুসম্পর্ক গড়ে তুলতে একটা ব্রিজ (সেতুবন্ধ) হিসেবে কাজ করব।

সমকাল: সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ।

অ্যাটর্নি জেনারেল: সমকাল ও তার পাঠকদেরও ধন্যবাদ।