প্রাকৃতিক দুর্যোগ-নদীভাঙন

অধিক ঝুঁকিপূর্ণ ৩৩ জেলা

প্রকাশ: ১১ অক্টোবর ২০২০     আপডেট: ১১ অক্টোবর ২০২০       প্রিন্ট সংস্করণ

ফসিহ উদ্দীন মাহতাব

পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলার নিজামপুর এলাকায় বিধ্বস্ত বেড়িবাঁধ। সাম্প্রতিক ছবি - সমকাল

পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলার নিজামপুর এলাকায় বিধ্বস্ত বেড়িবাঁধ। সাম্প্রতিক ছবি - সমকাল

প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও ভয়াবহ নদীভাঙন থেকে রক্ষায় দেশের ৩৩টি জেলাকে অধিক ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করেছে সরকার। প্রকৃতির ভয়াবহতা ও বিপজ্জনক বিবেচনায় সমগ্র দেশকে ছয়টি গ্রুপে ভাগ করা হয়েছে। অধিক ঝুঁকিপূর্ণ চিহ্নিত করা নদীর অঞ্চল ও মোহনাগুলোকে সমন্বিত ও টেকসই ব্যবস্থাপনায় গড়ে তোলা হচ্ছে। পাশাপাশি প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও নদীভাঙন মোকাবিলায় বাংলাদেশ ব-দ্বীপ পরিকল্পনা-২১০০তে অন্তর্ভুক্ত করে নেওয়া হয়েছে কর্মকৌশল। এ কর্মকৌশল বাস্তবায়ন হলে নদী ও নদীর মোহনায় পানি প্রবাহের সক্ষমতা বাড়বে। ফলে নদীগুলোকে স্থিতিশীল রাখা এবং যথাযথ পলি ব্যবস্থাপনা কার্যক্রম গ্রহণ সহজ হবে। এসব পদক্ষেপে দেশে বন্যায় ক্ষয়ক্ষতির ঝুঁকি কমবে। আর নদীভাঙনকবলিত এলাকায় এ পদক্ষেপের মাধ্যমে ভাঙন রোধ সম্ভব হবে। পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের এক প্রতিবেদন থেকে এ তথ্য জানা যায়।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ভৌগোলিক অবস্থানগত কারণে প্রতি বছর বাংলাদেশে ব্যাপক বন্যা হয়। চলতি বছর এ বন্যা জুন থেকে শুরু হয়। এখনও অতি বৃষ্টিপাতের কারণে বিভিন্ন জেলায় বন্যা অব্যাহত আছে। বিশেষ করে দেশের উত্তরাঞ্চলে রংপুরে রেকর্ড বৃষ্টিতে নাকাল সেখানকার মানুষ। দেশের দক্ষিণাঞ্চলের জেলা সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলায় টানা বৃষ্টিপাত থেমে নেই। ফলে কর্মব্যস্ত মানুষের ঘর থেকে বের হওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।

এ বিষয়ে পানিসম্পদ উপমন্ত্রী এ কে এম এনামুল হক শামীম সমকালকে বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে নদীভাঙন এলাকা চিহ্নিত করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে প্রতিমন্ত্রী, সচিব ও অন্য কর্মকর্তারা ভাঙনকবলিত অধিক ঝূঁকিপূর্ণ এবং সাধারণ ঝুঁকিপূর্ণ জেলাগুলো পরিদর্শন করে চিহ্নিত করেছেন। সেই আলোকে ইতোমধ্যে ভাঙন রোধের কার্যক্রম শুরু হয়েছে। অর্থনৈতিক সক্ষমতা বিবেচনা করে স্থায়ীভাবে ভাঙন রোধে বিভিন্ন ধরনের নেওয়া প্রকল্পের কাজ চলছে।

উপমন্ত্রী বলেন, তিনি ভাঙনকবলিত এলাকার মানুষ হিসেবে ভাঙনের ক্ষয়ক্ষতি ও ভোগান্তি সম্পর্কে অবগত আছেন। কেউ যাতে ভাঙনের শিকার হয়ে বসতভিটা না হারায়, সরকার সেই পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে।

পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় সূত্রমতে, এবার বন্যায় ৩৩ জেলায় মারাত্মক ক্ষতি হয়েছে। কাঁচা ঘরবাড়ির পাশাপাশি গবাদিপশু ও ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। এসব ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় মন্ত্রণালয়, পানি উন্নয়ন বোর্ড এবং সংশ্নিষ্ট জেলা প্রশাসকদের সঙ্গে সমন্বয় করে দুর্যোগ মোকাবিলায় তৎপর রয়েছে সরকার। বন্যা ও নদীভাঙনকবলিত মানুষের মাঝে ত্রাণ বিতরণ করেছে সরকার। এ ছাড়া দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পাউবোর স্পিডবোটের সহায়তায় ত্রাণ বিতরণ অব্যাহত আছে। গত ২২ আগস্ট পর্যন্ত ৩৩ জেলার নদীভাঙনকবলিত এলাকার ছয় ক্যাটাগরিতে ক্ষতি নির্ধারণ করে জরুরি পদক্ষেপ নিয়েছে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়। ক্ষতিগ্রস্ত ৬৩.০১ কিলোমিটার দৈর্ঘ্য নদীতীর ভাঙনরোধ, নদীতীর সংরক্ষণ কাজের ক্ষতি, বাঁধের ব্রিজ, বাঁধের সম্পূর্ণ ও আংশিক ভাঙন এবং অন্যান্য ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামো উন্নয়নে ১০৯ কোটি ১০ লাখ টাকা ব্যয় করা হয়েছে। আরও ৮৮ কোটি ৮৭ লাখ টাকা ব্যয়ে ৫৪ দশমিক ০৩০ কিলোমিটার নদীতীরের মেরামত ও পুনর্বাসন কাজ চলমান রয়েছে।

এ ছাড়া বন্যায় নদীভাঙন রোধ, বাঁধ ও অন্যান্য অবকাঠামোর ক্ষয়ক্ষতি রোধে সার্বক্ষণিক নজরদারি বহাল রেখেছে সংশ্নিষ্ট কর্তৃপক্ষ। পাউবোর কর্মকর্তা-কর্মচারীরা চলমান মেরামত কাজেও সর্বদা নিয়োজিত রয়েছেন। বন্যার পানি নেমে যাওয়ার পর ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ করে স্থায়ী সমাধানের উদ্যোগ নেবে সরকার। এর জন্য ২০২০-২১ অর্থবছরে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে পাউবোর বাস্তবায়নাধীন ১০১টি প্রকল্পের মধ্যে ৫৩টি নদীতীর সংরক্ষণধর্মী প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে বলে মন্ত্রণালয়ের সূত্রগুলো জানিয়েছে। আগামী ২০২৩ সালের মধ্যে প্রকল্পের কাজ শেষ হবে।

মন্ত্রণালয় ও পাউবো কর্মকর্তারা জানান, সারাদেশে নদীভাঙন রোধ, নদী শাসন, নাব্য রক্ষাসহ সামগ্রিক নদী ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে বন্যা নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে দীর্ঘমেয়াদি বাংলাদেশ ব-দ্বীপ-২১০০ গ্রহণ করা হয়েছে। এই নীতির আলোকে প্রাকৃতিক দুর্যোগজনিত ঝুঁকির সম্মুখীন এলাকাগুলোকে এক-একটি গ্রুপের আওতায় এনে টেকসই পদক্ষেপ নেবে সরকার।

পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রতিবেদন অনুযায়ী, অধিক ঝুঁকিপূর্ণ ৩৩ জেলার মধ্যে আছে বরিশাল, ঝালকাঠি, ভোলা, পিরোজপুর, পটুয়াখালী, বরগুনা, খুলনা, বাগেরহাট, সাতক্ষীরা, নেত্রকোনা, রাজবাড়ী, মানিকগঞ্জ, সিরাজগঞ্জ, পাবনা, মাদারীপুর, কুষ্টিয়া, কিশোরগঞ্জ ও কক্সবাজার।

সাতক্ষীরায় সর্বশেষ আম্পানের ক্ষতি এখনও কাটিয়ে উঠতে পারেনি উপকূলীয় এলাকার মানুষ। আশাশুনি উপজেলার শ্রিউলা, প্রতাপনগর ও আশাশুনি সদর ইউনিয়নের ৪৫টি গ্রামের ওপর দিয়ে নদীর অস্বাভাবিক জোয়ারের পানি প্রবাহিত হচ্ছে। উপজেলার লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছে। আম্পানে ক্ষতিগ্রস্ত বেড়িবাঁধের কয়েকটি স্থান গত সাড়ে তিন মাসেও মেরামত সম্ভব হয়নি। ধসেপড়া ওইসব বেড়িবাঁধ দিয়েই পার্শ্ববর্তী খোলপেটুয়া নদী ও কপোতাক্ষ নদের প্রবল জোয়ারের পানি প্রবেশ করায় প্রতিদিন নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হচ্ছে।

আশাশুনি উপজেলার ভাইস চেয়ারম্যান অসীম বরণ চক্রবর্তী জানান, শ্রীউলা ইউনিয়নের ২২টি গ্রামের সবই পানিতে তলিয়ে গেছে। ৩৭ হাজার মানুষ এই ইউনিয়নে পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। প্রতাপনগর ইউনিয়নের ১৭টি গ্রামের ৩৬ হাজার মানুষ পানিবন্দি।

শ্যামনগরের সুন্দরবন উপকূলবর্তী গাবুরা ইউপি চেয়ারম্যান জিএম মাসুদুল আলম জানান, তার ইউনিয়নের নেবুবুনিয়ায় গত ২০ মে আম্পানে ক্ষতিগ্রস্ত বেড়িবাঁধ সংস্কার করে রাখা হয়েছিল। সম্প্রতি দমকা হাওয়া, বৃষ্টি ও জোয়ারের চাপে তা ভেঙে খোলপেটুয়া নদীর পানিতে সয়লাব হয়ে যায় গাবুরা, নেবুবুনিয়াসহ কয়েকটি গ্রাম।

সম্প্রতি পদ্মা-আড়িয়াল খাঁ নদের ভাঙনে ফরিদপুরের সদরপুর উপজেলার তিনটি ইউনিয়নে ভাঙন শুরু হয়েছে। ভাঙনকবলিত এলাকাগুলো হলো- উপজেলার চরনাছিরপুর ইউনিয়নের বাবুরালী মোল্যার কান্দি, হালিম হাওলাদার কান্দি ও মফিজউদ্দিন হাজির কান্দি। ঢেউখালী ইউনিয়নের চন্দ্রপাড়া ও চরবলাশিয়া এবং আকোটেরচর ইউনিয়নের নদীর পাড়সংলগ্ন কৃষি জমি নদীর ভাঙনে বিলীন হয়েছে। ভাঙনে দিশেহারা হয়ে পড়েছে ওই এলাকার বাসিন্দারা। বসতঘর অন্যত্র সরিয়ে নিয়ে যাচ্ছে তারা।

শতবর্ষের রেকর্ডভাঙা বৃষ্টিতে জলাবদ্ধতাসহ পাঁচ দফা বন্যা ও নদীভাঙনে রংপুরে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। ঘরবাড়ি, ফসলি জমি, মাছের ঘের পানিতে তলিয়ে গেছে। কয়েকশ একর জমি, বাড়িভিটা, গাছপালা, মন্দির, মসজিদ, প্রাথমিক বিদ্যালয়, মাদ্রাসা, আশ্রয়ণ কেন্দ্র নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। উজানের পাহাড়ি ঢল ও ভারি বর্ষণে রংপুরে পাঁচ দফা বন্যা হয়। এ বন্যায় গঙ্গাচড়া, পীরগাছা ও কাউনিয়া উপজেলার ১০ হাজারের বেশি পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা জানান, পানির তোড়ে গঙ্গাচড়া, পীরগাছা, কাউনিয়া উপজেলার কাঁচা-পাকা সড়ক, গঙ্গাচড়ার মর্ণেয়া ইউনিয়নের তিনটি ব্রিজের সংযোগ সড়ক ভেঙে গেছে। জলাবদ্ধতায় তলিয়ে আছে ১৮ হাজার হেক্টরের আমন ক্ষেত।

রংপুর জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা আক্তারুজ্জামান বলেন, জেলায় নদীভাঙনে শিকার ৭২৮ জনের তালিকা করা হয়েছে।

শরীয়তপুরে পদ্মার ভাঙনে বিলীন হয়ে যাচ্ছে বসতবাড়ি। ভাঙন ঠেকাতে বালুর বস্তা ফেলা হয়েছে। জাজিরা উপজেলার বড়কান্দি ইউনিয়নের দুর্গারহাট এলাকা ও উপজেলার কুরেরচর ইউনিয়নের সিডার চরেও একই অবস্থা। নিঃস্ব অবস্থায় আপাতত পাশের গুচ্ছগ্রামের উঁচু জমিতে আশ্রয় নিয়েছে ভাঙন এলাকার মানুষ।

পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব কবির বিন আনোয়ার সমকালকে বলেন, তিনি যমুনাপাড়ের লোক। দু'বার তার দাদা ও শ্বশুরবাড়ি ভাঙনের কবলে পড়েছে। ভাঙনকবলিত এলাকার মানুষের সমস্যা আর দুঃখ-দুর্দশার কথা তার জানা আছে। এমন অভিজ্ঞতা নিয়ে ভাঙনকবলিত মানুষের দুঃখ-দুর্দশা রোধে সচেষ্ট রয়েছে সরকার।

তিনি আরও বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আড়িয়াল খাঁ নদের ভাঙন রোধেও উদ্যোগ নিয়েছেন। এ উদ্যোগের বাস্তবায়ন করে যাচ্ছি। আগামীতে এ অঞ্চলের লোকদের আর ভাঙনজনিত সমস্যার মুখে পড়তে হবে না।

এদিকে উন্নয়ন সংস্থাগুলোকে নিয়ে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় দেশের চলমান বন্যা পরিস্থিতির ওপর একটি যৌথ সমীক্ষা প্রতিবেদন তৈরি করেছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, বন্যায় এ পর্যন্ত ৩৩৪টি উপজেলার ৬৬ শতাংশে বেড়িবাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে ৫৪টি ইউনিয়নে দুই থেকে চার কিলোমিটার পর্যন্ত বেড়িবাঁধ ভেঙে গেছে। এসব এলাকায় জরুরি ভিত্তিতে নদীতীর রক্ষায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে প্রতিবেদনে।

সেন্টার ফর এনভায়রনমেন্টাল অ্যান্ড জিওগ্রাফিক ইনফরমেশন সার্ভিসেসের (সিইজিআইএস) নির্বাহী পরিচালক মালিক ফিদা আবদুল্লাহ খান বলেন, প্রতি তিন-চার বছর পরপর দেশে যে বড় বন্যা হয়, এবারও তাই ঘটছে। ফলে এবার স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি সময় ধরে বন্যা স্থায়ী হয়েছে আর পানির স্রোতও বেশি। প্রতি বছর নদীভাঙনের যে পূর্বাভাস দেওয়া হয়, তা আমলে নিয়ে নদীপাড়ের অবকাঠামো নির্মাণ করলে বিপুল সম্পদের বিনাশ হতো না।