নগর আদালত চান নগরবাসী

প্রকাশ: ১৪ অক্টোবর ২০২০       প্রিন্ট সংস্করণ

অমিতোষ পাল

নগরবাসীর ছোটখাটো বিরোধ মীমাংসায় গ্রাম আদালতের আঙ্গিকে নগর আদালত গঠনের দাবি করছেন বিভিন্ন সিটি করপোরেশনের কাউন্সিলর ও সচেতন নগরবাসী। তারা মনে করছেন, এ ধরনের নগর আদালত গঠন করা হলে স্থানীয় অনেক সমস্যারই তৃণমূল পর্যায়ে সমাধান করা যাবে। ফলে নগরবাসীকে থানা-পুলিশ-আদালতের বারান্দায় দৌড়ঝাঁপ করতে হবে না। এতে আদালতে মামলার পাহাড়ও কমতে পারে। যারা বছরের পর বছর ধরে বিচার পান না, তারা স্বল্প সময়ে সুবিচার পাবেন বলে মনে করেন সংশ্নিষ্টরা।
অবশ্য ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা বলছেন, মহানগরীতে নগরসেবা দেওয়ার সঙ্গে সম্পৃক্ত প্রতিষ্ঠানগুলো নিজস্ব প্রয়োজনে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে থাকেন। এছাড়া নিম্ন আদালত থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ আদালতও রাজধানীতে রয়েছে। এখানে সহজেই মানুষ আদালতের দ্বারস্থ হতে পারেন। কাজেই নতুন করে আদালতের তেমন প্রয়োজনীয়তা নেই। এ ছাড়া নির্বাচিত কাউন্সিলররা বেশ প্রভাবশালী। তারা নিজেরাই অনেক সমস্যার সমাধান করে থাকেন। খুব প্রয়োজন হলে এ ক্ষেত্রে সিটি করপোরেশন আইনে একটি বিধি প্রণয়ন করে ও কাউন্সিলরদের বিচারিক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। তাহলে তাদেরও ছোটখাটো বিরোধ সমাধান করার দক্ষতা বৃদ্ধি পাবে।
জানা গেছে, আদালতে মামলাজটের নিরসন ও ছোটখাটো বিরোধ সমাধানের জন্যই সত্তর দশকে গ্রাম আদালত গঠিত হয়। ২০১৬ সালে কিছু বিধিবিধান করে এ আইনের কার্যক্রম শুরু হয়। গ্রাম আদালতে অনেক সমস্যারই সমাধান হওয়ার নজির আছে। পাশাপাশি গ্রাম আদালতের মাধ্যমে ন্যায়বিচার না পাওয়ার দৃষ্টান্তও একেবারে কম নয়। তারপরও সচেতন
নগরবাসী মনে করছেন, গ্রাম আদালতের আদলে নগর আদালত গঠন করা হলে আমাদের অনেক বিরোধ তৃণমূল পর্যায়েই নিষ্পন্ন হবে। কারণ ছোট ছোট বিরোধ থেকে বড় বড় বিরোধ ও জটিলতার সৃষ্টি হয়। পাশাপাশি আদালতগুলোতে থাকা মামলাজটও হ্রাস পাবে।
গত ১০ অক্টোবর কয়েকটি বেসরকারি উন্নয়ন সংগঠন নগর আদালত আইনের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে একটি ভার্চুয়াল সংলাপের আয়োজন করে। ওই সংলাপে বক্তারা নগর আদালতের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন। উন্নয়ন সংগঠন নাগরিক উদ্যোগের প্রধান সমন্বয়ক খান মো. শহীদ প্রস্তাবিত নগর আদালত আইনের একটি রূপরেখা উপস্থাপন করেন। তিনি বলেন, অধস্তন আদালতে বর্তমানে প্রায় ৩৭ লাখ মামলা বিচারাধীন। শহর এলাকায় মামলার জট আরও বেশি। দেশে একজন বিচারকের বিপরীতে মামলার সংখ্যা এক হাজার ৮৮৩। প্রতি ১ লাখ মানুষের জন্য বিচারকের সংখ্যা শূন্য দশমিক ৭৩ শতাংশ। শহুরে নাগরিকদের মধ্যে সংঘটিত ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বিরোধ স্থানীয় পর্যায়ে মীমাংসার জন্য কোনো আইন নেই। ফলে যে কোনো ধরনের বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য তাদের আদালতে ছুটতে হয়। আবার এসব ক্ষুদ্র মামলা থেকেই জন্ম নেয় বৃহত্তর বিরোধ। সৃষ্টি হয় আরও মামলা। এভাবে আদালতে মামলার স্তূপ বাড়তে থাকে।
রাজধানীর দুই সিটি করপোরেশনের কয়েক কাউন্সিলরের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এলাকাবাসী নানা সমস্যায় জনপ্রতিনিধিদের দ্বারস্থ হন। আইনগত বৈধতা না থাকলেও তারা দু'পক্ষকে ডেকে অনেক সমস্যার সমাধান করে দেন। আবার আইনি সীমাবদ্ধতার কারণে অনেক ক্ষেত্রেই সমাধান করা সম্ভব হয় না। সেগুলো থানা-পুলিশ-আদালতে গড়ায়। আইনগত ভিত্তি থাকলে তারা আরও বেশি কাজ করতে পারতেন।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) ৫৬ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর মোহাম্মদ হোসেন বলেন, এমনিতেই এলাকার বিচার-সালিশ কাউন্সিলররা করে থাকেন। অনেক ক্ষেত্রে দু'পক্ষকে ডেকে এলাকার মুরুব্বিদের নিয়ে এটা করা হয়। প্রথম ধাপে সমাধান না হলে দু'পক্ষের সাক্ষীদের ডাকা হয়। নিকটাত্মীয়দের সাক্ষী হিসেবে রাখা হয়। এভাবে জমিজমা থেকে শুরু করে এলাকার অনেক সমস্যারই তারা সমাধান করে দেন। কিন্তু এভাবে বিচার-সালিশ করার আইনগত বৈধতা কাউন্সিলরদের নেই। নগর আদালতের মতো আইন থাকলে এ ধরনের ছোটখাটো বিরোধ মীমাংসার কাজ আরও বেশি করা যেত। জনগণেরও বেশ উপকার হতো।
অবশ্য এ প্রসঙ্গে ডিএসসিসির আইন কর্মকর্তা খায়রুল হাসান বলেন, নিম্ন আদালত থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ আদালতের সুবিধা ঢাকা শহরে রয়েছে। এ ছাড়া নাগরিক সেবাদানকারী প্রত্যেকটি সংস্থা তাদের প্রয়োজনে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে আদালত পরিচালনা করে থাকে। কিন্তু গ্রামে এই সুবিধাগুলো নেই। ঢাকা শহরে যারা কাউন্সিলর, তারা যথেষ্ট প্রভাবশালী। তাদের কাছে গেলে তারা দুই পক্ষকে নিয়ে বসলে এমনিতেই অনেক সমস্যার সমাধান হয়ে যেতে পারে। তিনি বলেন, নগর আদালত গঠিত হলে সেখানে জনপ্রতিনিধির একটি বিশাল ভূমিকা থাকবে। দলীয় ব্যক্তি আদালত পরিচালনায় মুখ্য ভূমিকা পালন করলে সেই আদালতের বিচারের ন্যায্যতা নিয়েও প্রশ্ন উঠতে পারে। কারণ বর্তমানে একজন জনপ্রতিনিধি দলীয়ভাবে নির্বাচিত হন।
তিনি বলেন, সিটি করপোরেশন আইনে অনেক স্ট্যান্ডিং কমিটি আছে। সেসব কমিটিকে সক্রিয় করা, পাশাপাশি কাউন্সিলরদের কিছু বিচারিক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করলে বিদ্যমান আইনেই তারা স্থানীয় সমস্যাগুলোর সমাধান করতে পারবেন। খুব বেশি প্রয়োজন হলে সিটি করপোরেশন আইন সংশোধন করে এ সংক্রান্ত একটি বিধি সংযোজন করা যেতে পারে। তাহলে ভালো ফল পাওয়া যেতে পারে বলে তিনি মনে করেন।