ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্র্যাটেজিতে সমর্থন চাওয়াই মূল লক্ষ্য

স্টিফেন বিগানের ঢাকা সফর

প্রকাশ: ১৬ অক্টোবর ২০২০       প্রিন্ট সংস্করণ

রাশেদ মেহেদী

ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্র্যাটেজি- আইপিএসের জন্য কূটনৈতিক সমর্থন আদায়ের লক্ষ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী স্টিফেন বিগানের এবারের ঢাকা সফর। কূটনৈতিক সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে। এ সফরের মধ্য দিয়ে রোহিঙ্গা সংকট নিরসনের প্রচেষ্টা জোরদারসহ দ্বিপক্ষীয় স্বার্থসংশ্নিষ্ট বিষয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক আরও নিবিড় হবে বলে মত দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলেছেন, এ মুহূর্তে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে আইপিএস খুবই গুরুত্বপূর্ণ এবং ভূ-রাজনৈতিক অবস্থান বিবেচনায় এক্ষেত্রে বাংলাদেশের সমর্থনকে তারা যে গুরুত্ব দেয়, তারই প্রতিফলন হচ্ছে ভারত সফরের পরপরই বিগানের ঢাকা সফর।
সংশ্নিষ্ট কূটনৈতিক সূত্র জানায়, স্বাধীন, অবাধ, অন্তর্ভুক্তিমূলক, শান্তিপূর্ণ ও নিরাপদ ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চল গড়ে তোলার বিষয়ে আলোচনা করতেই স্টিফেন বিগানের এবারের দক্ষিণ এশিয়া সফর। এর পাশাপাশি বাংলাদেশের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্কের বিস্তৃতির বিষয়টিও আলোচ্যসূচির প্রাধান্য তালিকায় ছিল। এ ছাড়া দ্বিপক্ষীয় অন্যান্য কয়েকটি ইস্যু- যেমন রোহিঙ্গা সংকট নিরসন, মুক্তবাণিজ্য চুক্তির সম্ভাবনা, নিরাপত্তা, তথ্যপ্রযুক্তি এবং বাণিজ্য সংক্রান্ত বিষয়ে সহযোগিতা বৃদ্ধির বিষয়গুলোও আলোচ্যসূচিতে ছিল।
ঢাকায় বুধবার পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেনের সঙ্গে যৌথ সংবাদ সম্মেলনেও স্টিফেন বিগানের বক্তব্যে ইন্দো-প্যাসিফিক প্রসঙ্গসহ এসব বিষয়ের প্রতিফলন পাওয়া যায়। যৌথ সংবাদ সম্মেলনে যুক্তরাষ্ট্রের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী স্পষ্ট করেই বলেন, যুক্তরাষ্ট্র এশীয়-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে বাংলাদেশকে গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে দেখে। অবাধ ও উন্মুক্ত 'ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চল' গড়তে এই অংশীদারিত্ব আরও বাড়াতে চায়।
কূটনৈতিক সম্পর্ক বিস্তারের বিষয়টিও তিনি স্পষ্ট করেন। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের মিয়ামিতে বাংলাদেশ কনস্যুলেট করার বিষয়ে অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এটা একটি দৃষ্টান্ত- যার মাধ্যমে প্রমাণ হয়, যুক্তরাষ্ট্রের জনগণ ও বাংলাদেশি-আমেরিকানদের কল্যাণে বাংলাদেশের কূটনৈতিক উপস্থিতি বাড়াতে চায় যুক্তরাষ্ট্র। রোহিঙ্গাদের অধিকার পুনরুদ্ধার করে মিয়ানমারে প্রত্যাবাসনে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করার কথাও তিনি বলেছেন। দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যিক সম্পর্ক বৃদ্ধির ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রহ সৃষ্টির প্রমাণ মেলে মুক্তবাণিজ্য চুক্তির সম্ভাবনা নিয়ে বিগানের ইতিবাচক আলোচনা থেকে।
স্টিফেন বিগানের সফরের গুরুত্ব তুলে ধরে সাবেক রাষ্ট্রদূত ও কূটনৈতিক বিশ্নেষক হুমায়ুন কবীর সমকালকে বলেন, এ অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের এই মাপের একজন কর্মকর্তার সফরের মূল উদ্দেশ্য ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্র্যাটেজি বা আইপিএস, এ নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। কারণ গত কয়েক মাস বা তারও বেশি সময় ধরে এ অঞ্চলের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের বাড়তি মনোযোগ দেখা যাচ্ছে। বিশেষ করে কভিড-১৯-পরবর্তী সময়ের ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বিষয়টি আরও স্পষ্ট। এই অঞ্চলভিত্তিক গুরুত্ব যেটা বেড়েছে তারই অংশ এই সফর, এটা বলা যায়। আর একটা বিষয় হচ্ছে, এই পর্যায়ে বাংলাদেশের যোগাযোগটা খুব কমই হয়। তার কারণ এ অঞ্চলের দিকে যুক্তরাষ্ট্রের দৃষ্টিটা সবচেয়ে বেশি ভারতের দিকে। তবে এবার ঢাকায় বিগানের সফর প্রমাণ করে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশকেও এখন নজরে নিচ্ছে। তবে নজরে নিলেও এটা ভুলে গেলে গেলে চলবে না যে, এই নজরটাও আঞ্চলিক নজরেরই একটা অংশ। এই 'ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্র্যাটেজি'তেই এ অঞ্চলে আরও বেশি দেশের সম্পৃক্ত করার বিষয়টিকে প্রাধান্য দিচ্ছে। আঞ্চলিক দিক থেকে তারা বাংলাদেশকে গুরুত্ব দিচ্ছে বলেই দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের গুরুত্বটাও তাদের কাছে বেড়ে গেছে। যুক্তরাষ্ট্র স্পষ্ট করে না বললেও আইপিএসে বাংলাদেশকে অন্তর্ভুক্ত করার যে প্রচেষ্টা আছে সেটা ভালো করেই বোঝা যায়। কৌশলগত কারণে সেই প্রচেষ্টার বিষয়টি প্রকাশিত নয় কিংবা প্রকাশ করা হচ্ছে না।
তিনি বলেন, আইপিএস ছাড়াও বাংলাদেশকে যুক্তরাষ্ট্র এখন তাদের পণ্যের জন্য ভালো বাজার মনে করছে। রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের প্রতি সমর্থন আগে থেকেই দিচ্ছে। তারা মিয়ানমারকে চাপ দিয়েছে, জাতিসংঘে এই সংকট নিয়ে বাংলাদেকে সমর্থন দিয়েছে। এখন আরও জোরালো প্রচেষ্টা কতটুকু তারা চালাবে সেটা ভবিষ্যতে দেখার বিষয়। কারণ ভারত যুক্তরাষ্ট্রের জন্য যেমন এ অঞ্চলে খুবই গুরুত্বপূর্ণ, আবার মিয়ানামারের সঙ্গে ভারতের কৌশলগত সম্পর্কও ঘনিষ্ঠ। একই সঙ্গে মিয়ানমারের ওপর চীনের প্রভাব অনেক বেশি এবং চীনের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক কী চলছে, সেটাও কারও অজানা নয়। এ ধরনের জটিল সম্পর্কের সমীকরণের ভেতরে ঘুরপাক খাওয়ার কারণেই রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে যুক্তরাষ্ট্রের জোর প্রচেষ্টার বিষয় সম্পর্কে এখনই মন্তব্য করা যায় না। তবে স্টিফেন বিগান এ সংকটের স্থায়ী সমাধান চেয়ে যে আহ্বান রেখেছেন, তা খুবই ইতিবাচক।
মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির (এফটিএ) সম্ভাবনার বিষয়ে এই কূটনৈতিক বিশ্নেষক বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের মতো বিশ্বের বৃহত্তম অর্থনৈতিক শক্তির সঙ্গে বাংলাদেশের এফটিএর বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হচ্ছে, এটা খুবই ভালো। কিন্তু এটা কীভাবে হবে, কতদিনে হবে, সেটা নিয়ে চট করে আশাবাদী হওয়াটা একটু মুশকিল।
বিগানের সফর নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক দেলোয়ার হোসেন বলেন, গত দুই বছরে বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের উন্নয়ন এবং আরও নিবিড় হওয়ার বিষয়টি লক্ষণীয়। মহামারির সময়েও যুক্তরাষ্ট্রের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রীর সফরকে তাই দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আরও জোরদার হওয়ার অংশ বলাই যায়। কিন্তু এখানে বিবেচনা করতে হবে স্টিফেন বিগান প্রথমে ভারত সফরে এসেছেন। এই সফরের সঙ্গে বাংলাদেশ সফরের বিষয়টি যুক্ত হয়েছে। তার ভারত সফরের প্রধান উদ্দেশ্য 'ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্র্যাটেজি' এটা সহজেই বোঝা যায়। সীমান্ত বিরোধ নিয়ে চীনের সঙ্গে ভারতের টানাপোড়েনের এই সময়ে আইপিএসের প্রতি ভারতের জোরালো কূটনৈতিক সমর্থন আদায় করার কৌশল হিসেবেই যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চ পর্যায়ের একজন কর্মকর্তা এ সময়ে সফরে এসেছেন। তার বাংলাদেশ সফরের ক্ষেত্রেও আইপিএসের প্রতি কূটনৈতিক সমর্থন চাওয়াটাই প্রধান ছিল, এটা বুঝতে কষ্ট হয় না।
তিনি বলেন, তবে এই সফরের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোতে আলোচনার সুযোগ হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের বিনিয়োগ বাড়ানোর বিষয়, মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির সম্ভাবনার বিষয়, বাণিজ্য সহযোগিতা, শিক্ষার্থী ভিসা ইস্যু নিয়ে আলোচনা এগুলো বাংলাদেশের জন্য অবশ্যই ইতিবাচক। তবে রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে যে আলোচনাই হোক, একটা বিষয় বুঝতে হবে মিয়ানমারের সঙ্গে ভারতের সম্পর্কের কারণে যুক্তরাষ্ট্র চট করে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপে যাবে না।