শেখ রাসেলের জন্মদিনে প্রধানমন্ত্রী

একটি ফুল কুঁড়িতেই শেষ হয়ে গেল

প্রকাশ: ১৯ অক্টোবর ২০২০   

সমকাল প্রতিবেদক

ছোট ভাই শেখ রাসেলের প্রতিভা, অসীম সম্ভাবনা এবং তার নির্মম মৃত্যুর স্মৃতিচারণ করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, একটি ফুল কুঁড়িতেই শেষ হয়ে গেল, রাসেল আর ফুটতে পারেনি। পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট ঘাতকের নির্মম বুলেটের আঘাতে তাকে নির্মমভাবে চিরবিদায় নিতে হয়। তার জীবনটা শেষ হয়ে যায়।

রোববার গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কনিষ্ঠ পুত্র শহীদ শেখ রাসেলের ৫৭তম জন্মদিন উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে এসব কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী।

তিনি বলেন, প্রতিটি শিশু যথাযথ শিক্ষার মাধ্যমে আগামী দিনে দেশের কর্ণধার হবে, তারা সুন্দর জীবন কাটাবে- তার সরকার সেই লক্ষ্য নিয়েই কাজ করছে। শিশুদের উন্নত ভবিষ্যৎ উপহার দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে সরকার নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে, যাতে তারা দেশের কর্ণধার হতে পারে।

শেখ রাসেলের স্মৃতিচারণ করে শেখ হাসিনা বলেন, 'রাসেলের জন্মদিনের কথাটা এখনও আমার মনে পড়ে। একটা ছোট্ট শিশু আসবে, আমাদের পরিবারে, আমি কামাল-জামাল, রেহানা আমরা সবাই খুব উৎসাহিত এবং বেশ উত্তেজিত ছিলাম, কখন সেই শিশুটির কান্না আমরা শুনব, কখন তার আওয়াজটা পাবো, কখন তাকে কোলে তুলে নেব। আর সেই ক্ষণটা যখন এলো তা আমাদের জন্য অত্যন্ত আনন্দের সময় ছিল। ছোট্ট শিশুটি আমাদের সবার চোখের মণি ছিল।'

শৈশবে বাবাকে কাছে না পাওয়ায় ছোট্ট শিশু রাসেলের বেদনার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, ছোট্ট রাসেল কোনো কিছু বুঝে ওঠার আগেই বাবা (বঙ্গবন্ধু) কারাগারে। যখন সে একটু বড় হলো তখন কারাগার থেকে বাবাকে কীভাবে নিয়ে আসবে তার জন্য বাড়ি চলো, বাড়ি চলো বলে কান্নাকাটি করত। তার কষ্টটা আমরা উপলব্ধি করতাম। এভাবে সে বড় হয়েছে। স্বাধীনতার পর তখনও সে বাবার পাশে ছায়ার মতো ঘুরে বেড়াত। স্বাধীনতার পর মাত্র সাড়ে তিন বছর সে বাবাকে কাছে পেল। আর তারপর ১৫ আগস্ট সব শেষ।

শেখ হাসিনা বলেন, শেখ রাসেলের জীবনে একটা শখ ছিল, সে বড় হলে সেনাবাহিনীর সদস্য হবে। যখন গ্রামে বেড়াতে যেতাম- গ্রামের ছোট ছোট শিশুদের একত্রিত করে রাসেল তাদের দিয়ে প্যারেড করাত। শুধু প্যারেড করিয়ে খালি হাতে ফেরাত না। চাচা শেখ আবু নাসের তাকে যে টাকা দিতেন, প্যারেড করার পর সবাইকে সেই টাকা দিয়ে দিত। তাদের জন্য কাপড়চোপড়ও কিনে দিত। মা সবসময় বাচ্চাদের জন্য কাপড়চোপড় কিনে টুঙ্গিপাড়া নিয়ে যেতেন। রাসেলের ইচ্ছামতো প্রতিটি বাচ্চাকে এই কাপড়চোপড় দেওয়া হতো। সবাইকে শার্ট কিনে দিত, প্যান্ট কিনে দিত। (রাসেলের আবদার রক্ষার জন্য) মা সবসময় কিছু কাপড় টুঙ্গিপাড়ায় রেখে দিতেন আলমারিতে।

লেখাপড়া শিখে আগামী দিনে জাতির উপযুক্ত কর্ণধার হিসেবে গড়ে তুলতে শিক্ষার্থীদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ছাত্রছাত্রীরা সবাই পড়াশোনায় মনোযোগী হবে। অনেক রক্তের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীনতার সুফল প্রতিটি মানুষের ঘরে পৌঁছাবে। শিশুরা দেশপ্রেমিক হবে, মানুষের মতো মানুষ হবে, মানুষের সেবা করবে। নিজেদের উপযুক্ত নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলবে, আধুনিক শিক্ষায় সুশিক্ষিত হবে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সে একযোগে ঢাকার শেখ রাসেল রোলার স্কেটিং কমপ্লেক্স, ইউনিভার্সিটি ল্যাবরেটরি স্কুল ও কলেজ প্রাঙ্গণ এবং বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে পৃথক অনুষ্ঠানে যুক্ত হন। এ সময় শহীদ শেখ রাসেল এনিমেটেড ডকুমেন্টরি 'বুবুর দেশ' প্রদর্শনীর উদ্বোধন; শেখ রাসেলের জীবনীর ওপর প্রকাশিত বই 'শেখ রাসেল আমাদের আবেগ, আমাদের ভালোবাসা'-এর মোড়ক উন্মোচন ও ছবি প্রদর্শনীর উদ্বোধন এবং ইউনিভার্সিটি ল্যাবরেটরি স্কুল অ্যান্ড কলেজ প্রাঙ্গণে শেখ রাসেলের 'ম্যুরাল' উন্মোচন ও 'শহীদ শেখ রাসেল ভবন' উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী।

এ ছাড়া প্রধানমন্ত্রী শেখ রাসেল জাতীয় শিশু-কিশোর পরিষদের কার্যক্রম সংক্রান্ত ভিডিওচিত্র অবলোকন, 'স্মৃতির পাতায় শেখ রাসেল' শীর্ষক বইয়ের মোড়ক উন্মোচন, এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ ৫ প্রাপ্ত ছাত্রছাত্রীদের পুরস্কার বিতরণ, শিক্ষাবৃত্তি প্রদান এবং দরিদ্র ও মেধাবী ছাত্রছাত্রীদের মাঝে ল্যাপটপ বিতরণ করেন। বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্র প্রান্তে প্রধানমন্ত্রীর পক্ষে শিক্ষার্থীদের হাতে ল্যাপটপসহ পুরস্কার তুলে দেন তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক।

গণভবন থেকে প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব ড. আহমদ কায়কাউস অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন। এ সময় গণভবন প্রান্তে আরও উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সচিব তোফাজ্জল হোসেন মিয়া, প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব ইহসানুল করিম প্রমুখ।

বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্র প্রান্তে আরও উপস্থিত ছিলেন শেখ রাসেল জাতীয় শিশু-কিশোর পরিষদের চেয়ারম্যান রকিবুর রহমান, মহাসচিব মাহমুদ উস সামাদ চৌধুরী এমপি, কে এম শহিদুল্লাহ প্রমুখ। ইউনিভার্সিটি ল্যাবরেটরি স্কুল ও কলেজ প্রাঙ্গণ প্রান্তে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক মোহাম্মদ আখতারুজ্জামান, আওয়ামী লীগের ত্রাণ ও সমাজকল্যাণ উপকমিটির চেয়ারম্যান এ কে এম রহমতুল্লাহ এমপি, ত্রাণ ও সমাজকল্যাণ সম্পাদক সুজিত রায় নন্দী প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন। এ ছাড়া শেখ রাসেল রোলার স্কেটিং কমপ্লেক্স প্রান্ত থেকে আট বছরের স্কেটিং খেলোয়াড় নীলকাব্য শহীদ শেখ রাসেলের জন্মদিন উপলক্ষে বক্তব্য দেয়।

নানা আয়োজনে শেখ রাসেলের জন্মদিন পালিত: নানা আয়োজনে রোববার সারাদেশে শেখ রাসেলের ৫৭তম জন্মদিন পালিত হয়েছে। কর্মসূচিতে ছিল শ্রদ্ধা নিবেদন, আলোচনা সভা, দোয়া ও মিলাদ মাহফিল, শিশু-কিশোর প্রতিযোগিতা, পুরস্কার বিতরণ প্রভৃতি।

সকালে রাজধানীর বনানী কবরস্থানে শহীদ শেখ রাসেলসহ ১৫ আগস্টের সব শহীদের কবরে পুষ্পস্তবক অর্পণ, ফাতেহা পাঠ, মিলাদ ও দোয়া মাহফিলের আয়োজন করে আওয়ামী লীগ। এ সময় দলের সাধারণ সম্পাদক সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য মতিয়া চৌধুরী, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল-আলম হানিফ, সাংগঠনিক সম্পাদক এসএম কামাল হোসেন, অ্যাডভোকেট আফজাল হোসেন, প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক ড. আবদুস সোবহান গোলাপ, দপ্তর সম্পাদক ব্যারিস্টার বিপ্লব বড়ুয়া, উপদপ্তর সম্পাদক সায়েম খান প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন। পরে আওয়ামী লীগের সহযোগী-ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠন ছাড়াও বিভিন্ন দল ও সংগঠনের পক্ষ থেকে শেখ রাসেলসহ ১৫ আগস্টের সব শহীদের কবরে শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়।

ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগ শিশুদের মধ্যে বস্ত্র ও খাবার বিতরণ করেছে। উপস্থিত ছিলেন মহানগর দক্ষিণ আওয়ামী লীগের সভাপতি আবু আহমেদ মন্নাফী, সাধারণ সম্পাদক হুমায়ুন কবির প্রমুখ। বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউর কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে মিলাদ ও দোয়া মাহফিল এবং শিশুদের মধ্যে খাবার বিতরণ করেছে ঢাকা মহানগর যুবলীগ দক্ষিণ। উপস্থিত ছিলেন মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মাইন উদ্দিন রানা, ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক রেজাউল করিম রেজা প্রমুখ।

দিনটি উপলক্ষে ডাক অধিদপ্তর ১০ টাকা মূল্যমানের একটি স্মারক ডাকটিকিট ও উদ্বোধনী খাম এবং পাঁচ টাকা মূল্যমানের ডাটাকার্ড প্রকাশ করেছে। স্মারক ডাকটিকিট ও উদ্বোধনী খাম অবমুক্ত করেন ডাক ও টেলিযোগাযোগমন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার। বাংলাদেশ শিশু একাডেমি শিশুদের আবৃত্তি ও স্বরচিত কবিতা পাঠ এবং আলোচনা সভার আয়োজন করে। শিশু একাডেমির চেয়ারম্যান লাকী ইনামের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন মহিলা ও শিশুবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ফজিলাতুন নেসা ইন্দিরা, অতিরিক্ত সচিব ফরিদা পারভীন, শিশু একাডেমির মহাপরিচালক জ্যোতি লাল কুরী, মহিলাবিষয়ক অধিদপ্তরের মহাপরিচালক পারভীন আকতার, অতিরিক্ত সচিব ড. মহিউদ্দিন আহমেদ, যুগ্ম সচিব মুহিবুজ্জামান প্রমুখ।

বঙ্গবন্ধু সাংস্কৃতিক জোট এতিম ও পথশিশুদের মধ্যে খাবার বিতরণ ও দোয়া মাহফিল করেছে। সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক অরুণ সরকার রানা, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক তারিন জাহান, কেন্দ্রীয় নেতা মোত্তাছিম বিল্লাহ, দীপাবলী দীপা, হাবিবুল্লাহ রিপন প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

এ ছাড়া মুক্তিযোদ্ধা প্রজন্ম সংসদ মিলাদ মাহফিল ও ছিন্নমূল মানুষের মধ্যে খাবার বিতরণ করেছে। সংগঠনের চেয়ারম্যান অধ্যক্ষ সুজাউল করীম চৌধুরী বাবুলের নেতৃত্বে এই কর্মসূচি পালিত হয়।