সরেজমিন ভাসানচর

ডাকাতদের অভয়ারণ্য এখন নিরাপদ জনপদ

প্রকাশ: ১৯ অক্টোবর ২০২০     আপডেট: ১৯ অক্টোবর ২০২০       প্রিন্ট সংস্করণ

সাহাদাত হোসেন পরশ ভাসানচর (হাতিয়া) থেকে ফিরে

ভাসানচরে গড়ে উঠেছে মহিষের খামার- প্রতিবেদক

ভাসানচরে গড়ে উঠেছে মহিষের খামার- প্রতিবেদক

বঙ্গোপসাগরের বুকে জেগে ওঠা নৈসর্গিক এক ভূখণ্ড ভাসানচর। এর আয়তন ১৩ হাজার বর্গকিলোমিটার। দ্বীপটি নোয়াখালী জেলার হাতিয়া উপজেলার চরঈশ্বর ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্ত। সন্দ্বীপ থেকে এর দূরত্ব ৮ দশমিক ৩ কিলোমিটার। স্বর্ণদ্বীপ (জাহাইজ্জার চর) থেকে ভাসানচরের দূরত্ব ২০ দশমিক ৪ কিলোমিটার। হাতিয়া থেকে দ্বীপটির দূরত্ব ২৪ দশমিক ৫ কিলোমিটার, নোয়াখালী থেকে ৩৮ দশমিক ৯ কিলেমিটার ও চট্টগ্রামের পতেঙ্গা থেকে ৫১ দশমিক ৮ কিলোমিটার। একসময় ভাসানচরের আশপাশে ডাকাতদের অভয়ারণ্য ছিল। মাছধরার নৌকা ও ট্রলারে প্রায়ই ঘটত ডাকাতি। জেলেরা আতঙ্কে দিন কাটাতেন।

ওই চ্যানেল হয়ে যাতায়াতকারী জাহাজও ডাকাতের কবলে পড়ত প্রায়ই। নৌবাহিনীর বিশাল কর্মযজ্ঞ ঘিরে এখন পুরো দ্বীপ ও আশপাশের এলাকায় তৈরি হয়েছে সুরক্ষিত নিরাপত্তা বলয়। এক সময়ের ডাকাতপ্রবণ এলাকা এখন ভয়ডরহীন এক মুক্ত জনপদ। ভাসানচরের নিরাপত্তা ও সুরক্ষা নিশ্চিত করতে বর্তমানে নৌবাহিনীর কন্টিনজেন্ট ছাড়াও ৬১ জন পুলিশ সদস্য দায়িত্ব পালন করছেন। তাদের মধ্যে ৩০ জন আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের (এপিবিএন) সদস্য। ভাসানচরের জেটিতে পণ্যবাহীসহ বিভিন্ন ধরনের জাহাজ নির্বিঘ্নে ভিড়ছে।

বর্তমানে বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা কক্সবাজারের বিভিন্ন ক্যাম্পে বসবাস করছেন। রোহিঙ্গাদের একটি অংশকে অস্থায়ীভাবে ভাসানচরে স্থানান্তরের জন্য ২০১৭ সালে 'আশ্রয়ণ-৩' নামে প্রকল্প একনেক সভায় অনুমোদিত হয়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সার্বক্ষণিক দিকনির্দেশনায় নৌবাহিনী প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করেছে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখ্য সচিব প্রকল্পের স্টিয়ারিং কমিটির আহ্বায়ক হিসেবে সার্বিক অগ্রগতি মনিটরিং ও পর্যালোচনা করেছেন। প্রকল্পের শতভাগ কাজ এরই মধ্যে সম্পন্ন হয়েছে।

প্রকল্পটির পরিচালক কমডোর আব্দুল্লাহ আল মামুন চৌধুরী জানান, নৌবাহিনীর সদস্যদের উপস্থিতির কারণে ভাসানচর ও আশপাশের এলাকায় বড় ধরনের নিরাপত্তা বলয় তৈরি হয়েছে। এখন নির্বিঘ্নে জেলেরা মাছ ধরতে পারছেন।

প্রকল্প পরিচালক আরও বলেন, প্রকল্প এলাকায় শুরুতে কাজ করা বেশ চ্যালেঞ্জিং ছিল। নদী থেকে চার-পাঁচ কিলোমিটার ভেতরে মালামাল নিয়ে নির্মাণকাজ করতে হয়েছে। ৪২০টি ট্রাক্টর এখানে কাজ করেছে। নৌবাহিনীর সদস্যদের এখানে রীতিমতো ট্রাফিকিং করতে হয়েছে পুলিশের মতো। বর্ষাকালে কর্মযজ্ঞ চালানো ছিল আরও চ্যালেঞ্জিং। রাস্তা খুব নিচু ছিল। এখন ভাসানচরের ভেতরের যোগাযোগ ব্যবস্থা ভালো।

ভাসানচর এলাকা ঘুরে দেখা যায়, সেখানে নির্মিত দুটি শেল্টার হাউসকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের জন্য দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে ভাসানচরে একটি পুলিশ স্টেশন রয়েছে। এ ছাড়া ভাসানচরে একটি পূর্ণ থানার কার্যক্রম শিগগিরই শুরু হবে। এ ব্যাপারে গেজেটও প্রকাশিত হয়।

ভাসানচরে কথা হয় পুলিশ স্টেশনের প্রধান পরিদর্শক আবদুস সামাদের সঙ্গে। তিনি জানান, বর্তমানে একজন পরিদর্শক, দু'জন উপপরিদর্শকসহ মোট ৩১ জন পুলিশ সদস্য ভাসানচরে দায়িত্ব পালন করছেন। তাদের মধ্যে নারী পুলিশ সদস্য ১০ জন। দুই মাস পরপর পুলিশের নতুন টিম ভাসানচরে আসে।

আবদুস সামাদ আরও বলেন, বর্তমানে ভাসানচরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা খুব ভালো। কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি। ভাসানচরের অভ্যন্তরে টহল দেওয়ার জন্য পুলিশের জন্য দুটি পিকআপ ভ্যান রয়েছে।

সরেজমিন দেখা যায়, ভাসানচরের অভ্যন্তরে অনেক সময় নৌবাহিনীর সদস্য, পুলিশ ও এপিবিএনের সদস্যরা যৌথভাবে টহল দিয়ে থাকেন।

শুরুর দিকে পশ্চিমা কিছু বেসরকারি সংস্থার অভিযোগ ছিল, ভাসানচর একটি নিচু দ্বীপ। এটি ঘূর্ণিঝড় জলোচ্ছ্বাসের জন্যও ঝুঁকিপূর্ণ। তবে বর্তমানে ভাসানচর ওই এলাকার সবচেয়ে নিরাপদ দ্বীপ। জলোচ্ছ্বাস থেকে এলাকাটিকে রক্ষায় বাঁধের উচ্চতা ঠিক করা হয়েছে ১৭৬ বছরের সাইক্লোনের তথ্য পর্যালোচনা করে। একই সঙ্গে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে বঙ্গোপসাগরের ১০ হাজার বছরের সাইক্লোনের সিনথেটিক ডাটাকে। ভাসানচর আশ্রয়ণ প্রকল্প বাস্তবায়নে বাংলাদেশ পরামর্শ নিয়েছে যুক্তরাজ্যভিত্তিক প্রতিষ্ঠান এইচআর ওলিংফোর্ডের।

এ পর্যন্ত কোনো ঘূর্ণিঝড়ের কেন্দ্র ভাসানচর অতিক্রম করেনি। সমীক্ষা অনুযায়ী, ভাসানচরের সবচেয়ে কাছ দিয়ে একটি ঘূর্ণিঝড় অতিক্রম করেছিল ১৯৯৭ সালে। তা ভাসানচর থেকে ৩৬ নটিক্যাল মাইল (৬৬.৭ কিলোমিটার) দূরে ছিল। ২০১৮ সালের মে মাসে ভাসানচরে বাঁধের কাজ শেষ হয়। এ জন্য ২০০-২৫০টি বুলডোজার একসঙ্গে কাজ করেছে। বিভিন্ন সময় বর্ষা মৌসুমে চট্টগ্রাম শহরে জলাবদ্ধতা হলেও ভাসানচরের ভেতরে পানি জমেনি। ১৮টি স্লুইসগেটের মাধ্যমে ভাসানচর থেকে পানি নিস্কাশন করা হয়েছে।

ভাসানচর উর্বর এক ভূখণ্ড। ধান, ফল, সবজি চাষের জন্য এটি উপযুক্ত জায়গা। এরই মধ্যে সেখানে ড্রাগন ফলগাছ লাগানো হয়। সে গাছে ফলও ধরেছে। বর্তমানে ভাসানচরে রয়েছে কয়েক হাজার মহিষ। ব্যক্তিগত উদ্যোগে এসব মহিষের খামার পরিচালনা করা হয়। সরকারি সংস্থার মাধ্যমে মহিষের দুধ সংগ্রহ করতে চাইলে দুগ্ধজাত পণ্য উৎপাদন কার্যক্রমও গ্রহণ করা যেতে পারে।

ভাসানচরে বর্তমানে সাড়ে ৩০০ ভেড়া আছে। ৫০টি ভেড়ার মাধ্যমে এর লালন-পালন কার্যক্রম শুরু করা হয়েছিল। ভাসানচরের ঘাস খেয়েই তারা বেঁচে আছে। প্রকল্প এলাকার জলাধারের একটি বড় লেক রয়েছে; যা মিঠা পানির মাছ চাষের জন্য অনুকূল। এরই মধ্যে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন সংস্থার প্রতিনিধিরা ভাসানচর পরিদর্শন করেছেন। একটি চর ঘিরে বিশাল আয়োজন দেখে তারাও বিস্মিত।