নতুন কর্মীদের কী হবে

ভিসা পেয়েও হচ্ছে না বিদেশ যাওয়া

প্রকাশ: ১৯ অক্টোবর ২০২০     আপডেট: ১৯ অক্টোবর ২০২০       প্রিন্ট সংস্করণ

রাজীব আহাম্মদ

ছবি; ফাইল

ছবি; ফাইল

নেত্রকোনার শ্যামগঞ্জের মো. রাজু সৌদি আরবের ভিসা পেয়েছিলেন। 'ভিসা দেওয়া' আত্মীয়কে দুই লাখ ও ভিসা প্রক্রিয়া করা এজেন্সিকে ৫৫ হাজারসহ স্বাস্থ্য পরীক্ষা, পাসপোর্ট বাবদ সব মিলিয়ে তার খরচ হয় প্রায় তিন লাখ ১০ হাজার টাকা। কিন্তু কভিড-১৯ মহামারির কারণে যাওয়া আর হয়ে ওঠেনি। এখন সাত মাস পর রাজু নিশ্চিত নন, যেতে পারবেন কিনা। আর যেতে পারলে আবার টাকা দিতে হবে কিনা।

রাজুর মতো লাখখানেক নতুন কর্মী রয়েছেন অনিশ্চয়তায়। বিদেশ যাওয়ার জন্য প্রথমবারের মতো ভিসা পাওয়ার পর করোনায় আটকে পড়েন এরা। এদিকে তাদের ৯০ দিনের ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে। ভিসা প্রক্রিয়াকরণে যুক্ত রিক্রুটিং এজেন্সিকে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর দেওয়া নিয়োগকারীর 'পাওয়ার অব অ্যাটর্নি' (ওকালা) বাতিল হলে নতুন কর্মীদের বিদেশযাত্রায় যেমন অনিশ্চয়তা রয়েছে, আছে বিপুল খরচেরও শঙ্কা।

বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শ্রমবাজার সৌদি আরব। ইতোমধ্যেই দেশটি ফিলিপাইন থেকে আটকেপড়া নতুন কর্মীদের নিতে শুরু করেছে। বাংলাদেশের জন্যও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো একই নীতি অনুসরণ করলে কর্মীরা মেয়াদোত্তীর্ণ ভিসা বাতিলের আবেদন করে ফের স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও দূতাবাস ফি দিয়ে নতুন ভিসা পাবেন। এর সঙ্গে আরও খরচ হবে করোনা পরীক্ষার ব্যয়সহ কর্মীপ্রতি ১৩ থেকে ১৪ হাজার টাকা। কিন্তু ওকালা বাতিল হলে কর্মীপ্রতি ৪০ থেকে ৪৫ হাজার টাকা বাড়তি লাগবে।

সৌদি দূতাবাসের অনুমোদিত ভিসা সার্ভিস সেন্টারগুলোর সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক কফিল উদ্দিন মজুমদার বলেছেন, 'কীভাবে ভিসা দেওয়া হবে, তা এখনও নিশ্চিত নয়। ওকালা বাতিল হলে জটিলতা বাড়বে। কর্মীদের ক্ষতি হবে।'

জনশক্তি রপ্তানিকারক রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর সংগঠন বায়রার আশঙ্কা, ৩০ থেকে ৪০ ভাগ কর্মীর বিদেশ যাওয়া হবে না। করোনায় অর্থনৈতিক মন্দায় চাহিদা কমে যাওয়ায় অনেক নিয়োগকারীই আর কর্মী নেবেন না। আবার খরচ বাড়লে অনেক কর্মীও যেতে পারবেন না।

কোন এজেন্সিতে আটকেপড়া কত নতুন কর্মী রয়েছে- এ হিসাব চেয়েছিল বায়রা। এক হাজার তিনশর বেশি সক্রিয় এজেন্সির মাত্র ৩২৬টি হিসাব দিয়েছে, ৮৬ হাজার ৩০৬ জন নতুন কর্মী আটকা পড়েছেন। তাদের মধ্যে ৪৫ হাজার ৬৩১ জনের ভিসা স্ট্যাম্পিং, সরকারি ছাড়পত্র এবং বিমানের টিকিট হয়েছিল। ৪০ হাজার ৬৭৫ জনের ভিসা প্রসেসিং চলছিল।

করোনায় কার্যক্রম বন্ধ থাকায় অনেক এজেন্সি বায়রাতে হিসাব দেয়নি। সংগঠনটির মহাসচিব শামীম আহমেদ চৌধুরী নোমান সমকালকে বলেছেন, সব এজেন্সির ব্যবসা নেই। আবার সবার কাছে কর্মী ছিল না। সব মিলিয়ে আটকেপড়া নতুন কর্মীর সংখ্যা এক থেকে সর্বোচ্চ সোয়া এক লাখ হতে পারে। মহাসচিবের ধারণা, এদের ৯০ শতাংশই সৌদিগামী ছিলেন। বাকিদের বড় অংশ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে যাওয়ার ভিসা পেয়েছিলেন।

ঢাকার সৌদি দূতাবাসের বরাতে অনুমোদিত ভিসা সার্ভিস সেন্টারগুলো জানিয়েছে, ৭৭ হাজার ৪০০ কর্মী করোনার লকডাউন শুরুর আগে যাওয়ার জন্য তৈরি ছিলেন। জনশক্তি খাত-সংশ্নিষ্টদের ধারণা, অন্যান্য দেশে যেতে অপেক্ষমাণ কর্মীর সংখ্যা ২৫ থেকে সর্বোচ্চ ৪০ হাজার হতে পারে।

রিক্রুটিং এজেন্সি ফাতেমা এমপল্গয়মেন্ট সার্ভিসের মালিক জাহিদুল ইসলাম জানিয়েছেন, তার প্রতিষ্ঠান ১২০ জন কর্মীর ভিসা প্রসেসিং করছিল। তাদের মধ্যে ৮৮ জন সৌদি এবং বাকি ৩২ জন ওমানগামী কর্মী। ১২০ জনের মধ্যে ৭০ জনের ভিসা স্ট্যাম্পিং এবং বিএমইটির ছাড়পত্র হয়েছিল। ১০ জনের বিমানের টিকিটও হয়েছিল।

আইনে কেনাবেচা নিষিদ্ধ হলেও বাংলাদেশি কর্মীদের প্রায় সবাই নিয়োগকর্তার কাছ থেকে ভিসা কিনে বিদেশ যান। ভিসা কেনা হয় বিদেশে থাকা আত্মীয়স্বজন বা এজেন্সির মাধ্যমে। সৌদির ভিসা ক্যাটাগরি অনুযায়ী, এটি এক থেকে দুই লাখ টাকায় কেনা হয়। ভিসার বিপরীতে রিক্রুটিং এজেন্সিকে ওকালা পেতে দেড় হাজার থেকে এক হাজার ৮০০ টাকা দেয় কর্মী আমদানিকারক এজেন্সি। দেশের রিক্রুটিং এজেন্সি ভিসা প্রসেস করে কর্মী পাঠায়।

জাহিদুল ইসলাম জানিয়েছেন, কর্মীপ্রতি ওকালা বাবদ ৩৪ থেকে ৪০ হাজার টাকা খরচ হয়। বিএমইটি ছাড়পত্র (স্মার্টকার্ড) বাবদ তিন হাজার ৯০০ টাকা দিতে হয়। দূতাবাসে দিতে হয় ২১ ডলার বা এক হাজার ৭০০ টাকা। সাকল্যে কর্মীপ্রতি খরচ ৪০ থেকে ৪৬ হাজার টাকা। তার এজেন্সি ৫৫ থেকে ৬০ হাজার টাকা নেয় প্রসেসিং বাবদ। তিনি খরচ করলেও বিদেশযাত্রা বন্ধ থাকায় কর্মীরা টাকা দেননি। তিনি যেমন লোকসানে আছেন, কর্মীদেরও ক্ষতি হয়েছে।

১০ জন রিক্রুটিং এজেন্সি মালিকের সঙ্গে আলাপে জানা গেছে, মূলত ভিসা কিনে বিদেশ যাওয়ার চক্করে কর্মীদের অভিবাসন ব্যয় বাড়ে। করোনাকালে যদি তাদের আবার ভিসা প্রসেস করতে হয়, তাদের ব্যাপক অর্থনৈতিক ক্ষতি হবে।

কাতার যেতে ইচ্ছুক ঢাকার কেরানীগঞ্জের শাক্তা ইউনিয়নের শিখন্ডির মনিরুল ইসলাম জানিয়েছেন, তিনি পরিচিত জনশক্তি ব্যবসায়ী নুরুল ইসলামকে দেড় লাখ টাকা দিয়েছিলেন। নুরুল ইসলাম টেলিফোনে জানিয়েছেন, টাকা এজেন্সিকে দিয়েছেন। এজেন্সি ফেরত না দেওয়ায় তিনি টাকা দিতে পারছেন না। কাতারের ভিসা চালু হলেই তিনি মনিরুলকে বিদেশ পাঠানোর ব্যবস্থা করবেন।

ফিলিপাইনের নতুন কর্মী নিয়োগ শুরুর চিঠির সূত্র ধরে জানা গেছে, তাদের ওকালা বাতিল করা হয়নি। স্বাস্থ্য পরীক্ষার পর নতুন ভিসা নিয়ে তারা সৌদি যাচ্ছেন। একই প্রক্রিয়ায় কাতারও সেখান থেকে কর্মী নিচ্ছে। ঢাকার রিক্রুটিং এজেন্সি মালিকরা জানিয়েছেন, বাংলাদেশের জন্য একই নিয়ম প্রযোজ্য হলে কর্মীদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা বাবদ নয় হাজার ৫৫০ টাকা, দূতবাসের ফি বাবদ ২১ ডলার ও করোনা পরীক্ষার ফি বাবদ দেড় হাজার টাকা খরচ হবে। কিন্তু ওকালা বাতিল হলে আবারও ৪০ থেকে ৪৫ হাজার টাকা লাগবে। নতুন করে চার হাজার টাকায় বিএমইটি ছাড়পত্রও নিতে হবে। ওকালা বাতিলের ক্ষতি থেকে কর্মীদের রক্ষার উপায় কূটনৈতিক প্রচেষ্টা। নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএমইটির মহাপরিচালক শামসুল আলম বলেছেন, তারা প্রচেষ্টা চালাচ্ছেন, সব কর্মী যেন কাজে যোগ দিতে পারেন।

কফিল উদ্দিন মজুমদার বলেন, 'কী হবে, তা এখনও নিশ্চিত নয়। করোনার আগে নিয়ম ছিল, কর্মী ভিসার মেয়াদের মধ্যে না গেলে তা বাতিল হবে। নতুন ভিসা পেতে নতুন ওকালা প্রয়োজন হবে। কিন্তু এবার কর্মীরা নিজের গাফিলতিতে নয়, করোনায় আটকা পড়েছেন।'

বায়রা সভাপতি বেনজির আহমেদ বলেছেন, কর্মীদের স্বার্থে সরকার ভর্তুকি দিয়ে ব্যয় কমাতে পারে। প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সংসদীয় স্থায়ী কমিটিকে চিঠিতে একই কথা বলেছে বায়রা।

রিক্রুটিং এজেন্সি মালিকরা জানিয়েছেন, মালয়েশিয়া যেতে ইচ্ছুক কর্মীদের ওকালার মতো ঝামেলা নেই। নিষেধাজ্ঞা উঠে গেলে আটকেপড়া নতুন কর্মীদের পাঠানো সম্ভব হবে। আটকেপড়াদের প্রত্যাবাসনে সম্প্রতি প্রবাসীকল্যাণমন্ত্রী ইমরান আহমদ অনলাইনে বৈঠক করেন মালয়েশিয়ার দাতুক সেরি এম সারাভানের সঙ্গে। মধ্যপ্রাচ্যের দেশ ওমানেও ভিসা পাওয়া ব্যক্তিরা যেতে পারবেন। স্বাস্থ্য পরীক্ষার প্রয়োজন হবে না। তবে এসব দেশের সরকার কবে অনুমতি দেবে, তা এখনও নিশ্চিত নয়।