উচ্চ আদালতে ঝুলে থাকা চাঞ্চল্যকর ও দুর্নীতির মামলাগুলো সচলের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। মহামারি করোনার কারণে আদালতের স্বাভাবিক কার্যক্রম বন্ধ থাকায় এসব মামলার বিচার কার্যক্রম দীর্ঘদিন আটকে ছিল। এসব গুরুত্বপূর্ণ মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি নিয়ে অনেকটা শঙ্কা তৈরি হয়। বর্তমানে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ ও হাইকোর্ট বিভাগে অনেক গুরুত্বপূর্ণ, চাঞ্চল্যকর ও দুর্নীতির মামলা শুনানির অপেক্ষায় রয়েছে।

বিচারিক আদালতের রায়ের পর হাইকোর্টে এসে আটকে যায় এসব মামলা। গড়াতে থাকে বছরের পর বছর। অগ্রাধিকার ভিত্তিতে এসব মামলার দ্রুত নিষ্পত্তির দাবি জানিয়েছেন সংশ্নিষ্ট মামলার আইনজীবী ও মানবাধিকারকর্মীরা। অবশ্য আইনজীবী মনে করেন, জটের কারণে মনোযোগ হারায় এসব মামলার শুনানি।

রাষ্ট্র ও আসামিপক্ষের আইনজীবীরা বলছেন, উচ্চ আদালতে উল্লেখযোগ্য হারে মামলা নিষ্পত্তি হলেও জট কমছে না। এর অন্যতম কারণ, পুরোনো ও চাঞ্চল্যকর মামলার নিষ্পত্তি না হওয়া। একই সঙ্গে বিচারপ্রার্থীরাও বিচারপ্রাপ্তির আশায় দিন গুনছেন। সার্বিক পরিস্থিতিতে মামলাজট কমানো ও ন্যায়বিচারের স্বার্থে এসব মামলার অগ্রাধিকার ভিত্তিতে দ্রুত শুনানির উদ্যোগ নেওয়া উচিত বলে মনে করেন তারা।

তবে এসব মামলা অগ্রাধিকার ভিত্তিতে শুনানির উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন নতুন অ্যাটর্নি জেনারেল এ এম আমিন উদ্দিন। তিনি সমকালকে বলেন, মহামারি করোনাসহ নানা কারণে চাঞ্চল্যকর গুরুত্বপূর্ণ ও দুর্নীতির মামলা শুনানি হয়নি। এগুলো তালিকা ধরে ধরে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে পর্যায়ক্রমে শুনানি হবে। এরই মধ্যে অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয়ের আইন কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করে এসব মামলা সচল করাসহ নানা দিকনির্দেশনা দিয়েছেন আমিন উদ্দিন।

অন্যদিকে, ঢাকার আদালতে বিচারাধীন অনেক চাঞ্চল্যকর হত্যা মামলার পাশাপাশি আলোচিত দুর্নীতি মামলার বিচার কার্যক্রমও পর্যায়ক্রমে সচল করা হচ্ছে। ক্যাসিনোকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে মাদক, অবৈধ অস্ত্র ও অবৈধ সম্পদ অর্জনের মামলা শুনানি হচ্ছে না। করোনা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে আদালতে আটকে থাকা মামলাগুলোর বিচার দ্রুত শেষ করা যাবে বলে মনে করেন সংশ্নিষ্ট আইনজীবীরা।

পিলখানায় বিডিআর হত্যা মামলা ছাড়াও উচ্চ আদালতে সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনীর রিভিউ আবেদনের শুনানি, হলি আর্টিসান মামলার জেল আপিল, ফেনীর সোনাগাজী ফাজিল মাদ্রাসার শিক্ষার্থী নুসরাত জাহান রাফি হত্যার ডেথ রেফারেন্স (মৃত্যুদণ্ডাদেশ অনুমোদন) ও আসামিদের করা আপিল এবং জেল আপিল, একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে মৃত্যুদণ্ডাদেশপ্রাপ্ত দুই আসামি জামায়াত নেতা এ টি এম আজহারুল ইসলাম ও হবিগঞ্জের সৈয়দ মোহাম্মদ কায়সারের রিভিউ আবেদন। এ ছাড়া রমনার বটমূলে বোমা বিস্ম্ফোরণ মামলা, একুশে আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলা, নারায়ণগঞ্জ সাত খুনের মামলা, চট্টগ্রামের দশ ট্রাক অস্ত্র চোরাচালান মামলা, পুরান ঢাকার দর্জি দোকানি বিশ্বজিৎ হত্যা মামলা, রাজন হত্যা মামলা, রাকিব হত্যা মামলা, চট্টগ্রামের লালদীঘিতে ২৪ হত্যা মামলার আপিল, হলি আর্টিসান হত্যা মামলার আপিল, গাইবান্ধার এমপি লিটন হত্যা মামলা, কোটালীপাড়ায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জনসভায় বোমা হামলার মামলা, চলন্ত বাসে সিরাজগঞ্জের রূপাকে ধর্ষণ ও হত্যা মামলা, বাসচাপায় শিক্ষার্থী মীম-রাজিবের মৃত্যুর মামলার আপিলসহ এমন গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর অগণিত মামলার ডেথ রেফারেন্স ও যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত আসামির আপিল শুনানির অপেক্ষায় রয়েছে। এ ছাড়া জিয়া অরফানেজ ও চ্যারিটেবল ট্রাস্টসহ দুদকের করা অসংখ্য দুর্নীতির মামলা শুনানি হচ্ছে না। এ ছাড়া আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের দেওয়া সাজার বিরুদ্ধে ২৯টি আপিলসহ আট শতাধিক ডেথ রেফারেন্স মামলা শুনানির অপেক্ষায় রয়েছে।

ঢাকার আদালতে বুয়েটের ছাত্র আবরার ফাহাদ হত্যা মামলা, সগিরা মোর্শেদ হত্যার বিচার, রানা প্লাজার নিহতদের মামলা, অভিজিৎ হত্যা, নায়ক সালমান শাহ হত্যাসহ চাঞ্চল্যকর হত্যা মামলার কার্যক্রম চলছে। এ ছাড়া নাইকো, গ্যাটকো, বড়পুকুরিয়া কয়লাখনিসহ বড় বড় দুর্নীতির মামলা চার্জ গঠনের ওপর শুনানি পর্যায়ক্রমে অব্যাহত রয়েছে।

সাবেক আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ সমকালকে বলেন, উচ্চ আদালতে জমে থাকা মামলার শুনানির উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে, এটা ভালো খবর। চাঞ্চল্যকর মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তি হলে আদালতের প্রতি জনগণের আস্থা আরও বাড়বে। আসামিদেরও দীঘদিন কারাগারে থাকতে হবে না। তিনি বলেন, প্রধান বিচারপতি মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য বেশ কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন, যা আমাদের জন্য আশাব্যঞ্জক। এটা করা হলে বিচারপ্রার্থী জনগণ নিশ্চয়ই এর সুফল পাবেন।

সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেন, পুরোনো মামলা নিষ্পত্তি না হওয়াই মামলাজটের অন্যতম কারণ। সেটি চাঞ্চল্যকর হোক বা সাধারণ। উচ্চ আদালতে এ ধরনের অসংখ্য মামলা অনিষ্পন্ন অবস্থায় রয়েছে। রাষ্ট্রপক্ষ বা আদালত থেকে এসব মামলা নিষ্পত্তিতে কোনো উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে না। সারাদেশের অধস্তন আদালতগুলোতে একই অবস্থা। তিনি বলেন, বিচারিক আদালতে যে আসামির মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হয়েছে, এখন তিনি যদি উচ্চ আদালতে খালাস পান, তাহলে এই যে দীর্ঘদিন ধরে তিনি কারাগারের কনডেম সেলে বা কারাকক্ষে বছরের পর বছর পার করলেন, এতে সামাজিকভাবে তার পরিবার হেয়প্রতিপন্ন হলো। এর দায় কে নেবে? তাই ন্যায়বিচারের স্বার্থে এসব মামলার দ্রুত নিষ্পত্তি হওয়া প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।

দুদকের আইনজীবী খুরশীদ আলম খান সমকালকে জানান, নতুন অ্যাটর্নি জেনারেল গুরুত্বপূর্ণ ও চাঞ্চল্যকর মামলা শুনানির এই উদ্যোগকে আমরা সাধুবাদ জানাই। তার এ ইতিবাচক উদ্যোগ মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি হবে। উচ্চ আদালতে দুর্নীতির মামলা শুনানির জন্য আদালতের কাছে উপস্থাপন করা হচ্ছে বলে জানান তিনি।

বিষয় : উচ্চ আদালত আলোচিত মামলা

মন্তব্য করুন