সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহে কারওয়ান বাজার এলাকার ব্যবসায়ী সামছুল আলমের মোবাইল ফোনে কল আসে এক অপরিচিত নম্বর থেকে। ফোনের অপর প্রান্তে থাকা ব্যক্তি বলে, 'আমি তেজগাঁর দাদা, আমাকে ১০ লক্ষ টাকা দিবি।' টাকা না দিলে ভয়ংকর পরিণতি হবে বলেও জানানো হয় তাকে। এ হুমকির পরও টাকা না দেওয়ায় ৮ সেপ্টেম্বর রাতে বাসায় ফেরার পথে তাকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কোপায় দুর্বৃত্তরা।

এ ঘটনায় তেজগাঁও থানায় মামলা করেছেন সামছুল আলম। প্রায় একই পরিস্থিতির শিকার হতে হয়েছে ব্যবসায়ী গোলাম সারওয়ার বিপ্লবকেও। ২৪ আগস্ট তাকে চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে গুরুতর জখম করা হয়। তিনি এখনও চিকিৎসাধীন।

এ ধরনের ঘটনাগুলোর তদন্তে নেমে জড়িতদের শনাক্ত করতে মুশকিলে পড়েন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তারা। কারণ, যে ফোন নম্বর থেকে চাঁদা চাওয়া হয়েছে, সেটির মালিক এ ব্যাপারে কিছুই জানেন না। তবে ফোনটি কিছুদিন আগে ছিনতাই হয়েছে বলে জানান তিনি। এর সূত্র ধরে নানামুখী অনুসন্ধানে অবশেষে চাঁদাবাজ চক্রের পাঁচজনকে শনাক্ত করা সম্ভব হয়। এরই মধ্যে তাদের চারজনকে গ্রেপ্তার করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)।

ভুক্তভোগী ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, কয়েক মাস ধরে একটি চাঁদাবাজ-সন্ত্রাসী চক্র তৎপর হয়ে উঠেছে। তারা মূলত কারওয়ান বাজার ও আশপাশের বিভিন্ন ব্যবসায়ীকে টার্গেট করে মোটা অঙ্কের চাঁদা দাবি করছে। টাকা না পেলেই হামলা চালানো হচ্ছে। নিজেকে 'দাদা' হিসেবে অভিহিত করা এ বাহিনীর প্রধানের আসল নাম নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তবে পলাতক মজিদ ওরফে মুজিব 'দাদা' পরিচয়ে চাঁদা চাইত বলে ধারণা করা হচ্ছে। এই চক্র জুলাই থেকে এ পর্যন্ত অন্তত তিন ব্যবসায়ীর ওপর হামলাসহ বেশ কয়েকজনের কাছে চাঁদা দাবি করেছে।

ডিবির তেজগাঁও বিভাগের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার শাহাদত হোসেন সুমা বলেন, ব্যবসায়ীদের কাছে চাঁদা দাবির ঘটনায় জড়িত মো. মামুন, মামুন পাটোয়ারী, রিপন ও সুমনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। জিজ্ঞাসাবাদে তাদের কাছ থেকে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে। পলাতক অপর চাঁদাবাজকেও দ্রুত আইনের আওতায় আনা সম্ভব হবে।

কারওয়ান বাজার ঘিরে চাঁদাবাজির অভিযোগ অনেক পুরোনো। ব্যবসার ধরন অনুযায়ী এখানে নানা অঙ্কের চাঁদাও নির্ধারিত আছে। কেউ তা দিতে আপত্তি জানানোর সাহস করেন না। কারণ টাকা না দিলেই চালানো হয় সশস্ত্র হামলা। এমনকি চাঁদাবাজি নিয়ে বেশ কয়েকটি খুনের ঘটনাও ঘটেছে। ২০০৯ সালের ২৬ জুন দুপুরে কারওয়ান বাজারের ডিআইটি মার্কেটে ব্যবসায়ী ফারুক মোল্লা, মো. জুয়েল ও আশরাফ মিঞাকে গুলি করে হত্যা করা হয়। তবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দাবি, সাম্প্রতিক সময়ে চাঁদাবাজি নেই বা কমে এসেছে।
ডিবি সূত্র জানায়, চাঁদা দাবির ঘটনায় গ্রেপ্তার মামুন, সুমন ও রিপন কারওয়ান বাজারে ট্রিপল মার্ডার মামলার অন্যতম আসামি। তাদের নামে একাধিক মামলা রয়েছে। তারা যে ফোন নম্বর থেকে কল করে চাঁদা চেয়েছিল তা মেহেদী নামে এক ব্যক্তির। রাজধানীর সেন্ট্রাল রোডে তার কাছ থেকে ফোনটি ছিনতাই হয়।

সন্ত্রাসী হামলার শিকার সামছুল আলম জানান, কারওয়ান বাজার-সংলগ্ন পূর্ব তেজতুরি বাজার এলাকায় তার ঢেউটিনের ব্যবসা রয়েছে। তবে দাদাবাহিনী বা এমন কারও নাম তিনি আগে শোনেননি। ১০ লাখ টাকা চাঁদা না দেওয়ায় সেই দাদার সহযোগীরা তার পথরোধ করে প্রথমে কিল-ঘুষি ও পরে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কোপ দেয়। কোপ ঠেকাতে গেলে তার ডান হাতের কব্জির ওপর কেটে যায়। তিনি রাস্তায় পড়ে গেলে দুর্বৃত্তদের একজন তার পকেটে থাকা ২৩ হাজার টাকা কেড়ে নেয়। এ সময় তারা বলে, 'স্যাম্পল দ্যাখায় গেলাম। টাকা না দিলে জানে মাইরা ফেলমু।' পরে তার মোবাইল ফোনে কল করে ঘটনাটি পুলিশকে না জানানোর হুমকিও দেওয়া হয়।

আরেক ভুক্তভোগী কারওয়ান বাজারের পাইকারি ফল ব্যবসায়ী গোলাম সারওয়ার বিপ্লব জানান, ৬ জুলাই অচেনা নম্বর থেকে ফোন করে একজন পাঁচ লাখ টাকা চাঁদা চায় তার কাছে। সেই সঙ্গে প্রতি মাসে ৪০ হাজার টাকা দিতে হবে বলেও জানায়। টাকা দিতে অপারগতা জানালে তাকে গালাগাল করে হত্যার হুমকি দেওয়া হয়। নিয়মিত চাঁদা চেয়ে ফোন করায় বিপ্লব তার ফোন ধরা বন্ধ করে দেন। তখন এসএমএস পাঠিয়ে হুমকি দেওয়া হয়।

এক পর্যায়ে ব্যবসায়ী বিপ্লব এক পুলিশ কর্মকর্তার ফোন নম্বরে কথিত দাদার কল 'ফরোয়ার্ড' করে দেন। সেই পুলিশ কর্মকর্তা ফোন রিসিভ করলে ব্যবসায়ী ভেবে তাকেও চাঁদার জন্য হুমকি দেয় 'দাদা'। এরপর ২৪ আগস্ট সন্ধ্যায় কারওয়ান বাজারে বিপ্লবকে চাপাতি দিয়ে এলোপাতাড়ি কোপানো হয়। তার পিঠে ও মাথায় গুরুতর আঘাত করা হয়। এরপর তার পকেটে থাকা ৩০ হাজার ৫০০ টাকা কেড়ে নিয়ে চলে যায় দুর্বৃত্তরা। আহত বিপ্লব জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠানে (পঙ্গু হাসপাতাল) চিকিৎসা নিচ্ছেন। তার ক্ষতস্থানে ১৩টি সেলাই দিতে হয়েছে।

ঘটনার পরদিন ব্যবসায়ী বিপ্লব তেজগাঁও থানায় মামলা করেন। তার জানামতে, একজন হার্ডবোর্ড ব্যবসায়ীসহ বেশ কয়েকজনের কাছে এভাবে চাঁদা দাবি ও হামলার ঘটনা ঘটেছে। তবে সার্বিক নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে তারা বিষয়টি চেপে গেছেন।