সারাদেশে অনির্দিষ্টকালের নৌযান ধর্মঘট শুরু হয়েছে। এতে বিশেষ করে পণ্যবাহী ছোট-বড় সব ধরনের নৌযান চলাচলে অচলাবস্থা দেখা দিয়েছে। স্থবির হয়ে পড়েছে দেশের সব নদীবন্দর। তবে যাত্রীবাহী লঞ্চ চলাচল অনেকটাই স্বাভাবিক।

ধর্মঘট আহ্বানকারী বাংলাদেশ নৌযান শ্রমিক ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক চৌধুরী আশিকুল ইসলাম মঙ্গলবার সন্ধ্যায় সমকালকে জানিয়েছেন, শ্রমিকদের দাবি-দাওয়া আদায় না হওয়া পর্যন্ত পণ্যবাহী নৌযানের ধর্মঘট চলবে। তবে আসন্ন দুর্গাপূজার কারণে যাত্রীবাহী নৌযানগুলো আপাতত ধর্মঘটের আওতামুক্ত থাকছে। এই সময়ের মধ্যে দাবি পূরণ না হলে দুর্গোৎসবের পর যাত্রীবাহী নৌযানও ধর্মঘটের আওতায় আনা হবে।

বাল্ক্কহেডসহ সব নৌপথে সন্ত্রাস-চাঁদাবাজি ও ডাকাতি বন্ধ এবং বেতন-ভাতার সুযোগ-সুবিধাসহ ১১ দফা দাবি আদায়ে সোমবার রাত ১২টা ১ মিনিট থেকে সারাদেশে অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতি তথা ধর্মঘটের ডাক দিয়েছিল আটটি সংগঠনের সমন্বয়ে গঠিত বাংলাদেশ নৌযান শ্রমিক ফেডারেশন। অন্যদিকে, নৌযান শ্রমিকদের নিয়োগপত্র, মাসিক খাদ্য ভাতা প্রদানসহ ১৫ দফা দাবি পূরণে সোমবার সন্ধ্যা ৬টা থেকে সারাদেশে অনির্দিষ্টকালের নৌযান ধর্মঘটের ডাক দিয়েছিল ছয়টি সংগঠনের সমন্বয়ে গঠিত নৌ-শ্রমিক অধিকার সংরক্ষণ ঐক্য পরিষদ। গত ১৩ অক্টোবর রাজধানীর বিজয়নগরে শ্রম অধিদপ্তরের সামনে নৌ-শ্রমিক অধিকার সংরক্ষণ ঐক্য পরিষদের মানববন্ধন থেকে এ ধর্মঘটের ডাক দেওয়া হয়।

উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ে সোমবার নৌযানের নিয়ন্ত্রক সরকারি সংস্থা বিআইডব্লিউটিএ এবং মালিকপক্ষের সঙ্গে শ্রমিক সংগঠনগুলোর নেতাদের দীর্ঘ সাত ঘণ্টা বৈঠক হলেও সমঝোতা হয়নি। এর পরই নৌযান ধর্মঘট চালিয়ে যাওয়ার কথা জানায় শ্রমিক সংগঠনগুলো।

ধর্মঘটের কারণে সারাদেশ থেকেই নৌযান চলাচলে অচলাবস্থার খবর পাওয়া গেছে। ঢাকা নদীবন্দরের সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনাল থেকে বেশিরভাগ যাত্রীবাহী লঞ্চ ছেড়ে গেলেও বন্ধ ছিল অন্যান্য নৌযান চলাচল। ধমর্ঘটের কারণে চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙ্গর ও কর্ণফুলী নদীর বিভিন্ন ঘাটে অবস্থানরত জাহাজে শিল্পের কাঁচামাল এবং ভোগ্যপণ্য লাইটার জাহাজে (ছোট আকারের জাহাজ) ওঠানামা বন্ধ রয়েছে। ফলে কার্যত অচল হয়ে পড়েছে নৌবন্দরটি। তবে চট্টগ্রাম বন্দর জেটিতে কন্টেইনার জাহাজে পণ্য ওঠানামা অব্যাহত আছে। স্থবির হয়ে পড়েছে খুলনার নদীবন্দর ও নৌপথগুলো। এই নদীবন্দরসহ ঘাটগুলোতে কোনো ধরনের পণ্য ওঠানামা করেনি।

নৌযান শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি শাহ আলম ভূঁইয়া বলেছেন, ২০১৮ সালে তাদের পক্ষ থেকে প্রথমে ১১ দফা দাবি তোলা হয়। এর পর নৌযান শ্রমিকরা গত বছর তিনবার এ দাবিতে কর্মবিরতি পালন করেন। প্রতিবারই সরকার ও মালিকপক্ষ প্রতিশ্রুতি দিয়ে ভঙ্গ করে। শ্রমিকরা বারবার আন্দোলন করলেও তাদের ভাগ্যে প্রতিশ্রুতি ছাড়া কিছুই জোটেনি। এ অবস্থায় আবারও কর্মবিরতিতে যেতে হয়েছে তাদের। নৌ-শ্রমিক অধিকার সংরক্ষণ ঐক্য পরিষদের আহ্বায়ক সৈয়দ শাহাদাত হোসেন বলেন, তারা এক বছর ধরে দাবি-দাওয়া নিয়ে আন্দোলন করে এলেও একটি দাবিও মানা হয়নি। ফলে ধর্মঘটে যাওয়া ছাড়া কোনো বিকল্প ছিল না তাদের সামনে।

নৌ-শ্রমিক অধিকার সংরক্ষণ ঐক্য পরিষদের ১৫ দফা দাবিতে আরও রয়েছে- নৌযান শ্রমিকদের সার্ভিস বুক খোলা, স্বাস্থ্য সুবিধা প্রদান ও কল্যাণ তহবিল গঠন, নৌযানের মাস্টারশিপ-ড্রাইভারশিপ (চালকদের যোগ্যতা নির্ধারণী) পরীক্ষায় অনিয়ম-দুর্নীতি, প্রশ্নপত্র ফাঁস ও নৌ অধিদপ্তর কর্তৃক শ্রমিকদের নানা ধরনের হয়রানি বন্ধ করা প্রভৃতি। আর নৌযান শ্রমিক ফেডারেশনের ১১ দফা দাবিতে আরও রয়েছে শ্রমিকদের সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে নিয়োগপত্র প্রদান, ট্রাস্টি বোর্ডের মাধ্যমে সরকারি প্রতিষ্ঠানের নৌ শ্রমিকদের জন্য কন্ট্রিবিউটরি প্রভিডেন্ট ফান্ড, ফিশারিসহ অন্যান্য বেসরকারি খাতের নৌ-শ্রমিকদের জন্য কল্যাণ তহবিল গঠন, মাসিক খাদ্যভাতা প্রদান, নৌপরিবহন অধিদপ্তরের বিভিন্ন পরীক্ষায় অনিয়ম ও হয়রানি বন্ধ করা প্রভৃতি।

খুলনা ব্যুরো জানায়, নৌযান ধর্মঘটের ফলে মঙ্গলবার থেকে স্থবির হয়ে পড়েছে খুলনার নদীবন্দর ও নৌপথগুলো। খুলনা নদীবন্দরসহ ঘাটগুলোতে কোনো ধরনের পণ্যসামগ্রী ওঠানামা করেনি। সকালে বাংলাদেশ নৌযান শ্রমিক ফেডারেশন বিআইডব্লিটিএ ঘাট এলাকায় বিক্ষোভ ও সমাবেশ করেছে।ফেডারেশনের খুলনা জেলার সাংগঠনিক সম্পাদক দেলোয়ার হোসেন জানান, সোমবার রাত ১২টা ১ মিনিট থেকে সারাদেশের মতো খুলনায়ও অনির্দিষ্টকালের জন্য নৌযান-শ্রমিকদের ধর্মঘট শুরু হয়। তবে ধর্মঘটের মধ্যে লঞ্চ চলাচল স্বাভাবিক রয়েছে। দাবি বাস্তবায়ন না হওয়া পর্যন্ত এ কর্মসূচি অব্যাহত থাকবে।

বরিশাল ব্যুরো জানায়, নৌযান ধর্মঘটের প্রথম দিন বরিশালসহ গোটা দক্ষিণাঞ্চলে পণ্যবাহী নৌযান চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে। তবে যাত্রীবাহী লঞ্চ চলাচল স্বাভাবিক রয়েছে। বরিশাল নগরীসংলগ্ন কীর্তনখোলা নদী দিয়েও সব ধরনের পণ্যবাহী নৌযান চলাচল বন্ধ রয়েছে।

নৌযান শ্রমিক ফেডারেশনের বরিশাল অঞ্চলের সভাপতি মাস্টার শেখ আবুল হাসেম বলেন, ১১ দফা দাবি আদায়ে পূর্ব ঘোষণা অনুযায়ী সোমবার রাত ১২টা ১ মিনিটে সারাদেশের মতো বরিশালেও পণ্যবাহী জাহাজ চলাচল বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। শ্রমিকদের ১১ দফা দাবি মেনে নেওয়া না হলে দুর্গোৎসবের পর যাত্রীবাহী নৌযানও ধর্মঘটের আওতায় আনা হবে।

এদিকে, নৌযান শ্রমিক অধিকার সংরক্ষণ ঐক্য পরিষদের স্থানীয় নেতা কবির হোসেনের নেতৃত্বে  মঙ্গলবার সকালে কীর্তনখোলা নদীর চাঁদমারী এলাকায় বিক্ষোভ করা হয়।

মোংলা (বাগেরহাট) প্রতিনিধি জানান, নৌযান শ্রমিকদের ধর্মঘটের ফলে মোংলা বন্দর কার্যত অচল হয়ে পড়েছে। পশুর চ্যানেলে অবস্থানরত জাহাজগুলো থেকে কোনো পণ্য খালাস হচ্ছে না। তবে বন্দর জেটি ও গ্যাস ফ্যাক্টরিতে সামান্য কাজ হচ্ছে। বন্দরে গতকাল ১৪টি জাহাজ অবস্থান করেছিল।

নৌযান শ্রমিকরা জানান, মোংলা বন্দরের পশুর চ্যানেল ও মোংলা খাড়িতে এ মুহূর্তে প্রায় ৩০০-৪০০ লাইটার জাহাজ অবস্থান করে কর্মবিরতি পালন করছে। ভোর থেকেই জাহাজের পাশ থেকে সব লাইটার জাহাজ সরিয়ে এনে নদীতে নোঙর করে রাখা হয়েছে। বাংলাদেশ-ভারত নৌ প্রটোকলভুক্ত আন্তর্জাতিক রুটসহ দেশের সব রুটে নৌচলাচল বন্ধ রয়েছে।

বাংলাদেশ লাইটারেজ শ্রমিক ইউনিয়নের মোংলা শাখার সহসভাপতি মাইনুল হোসেন মিন্টু ও সাধারণ সম্পাদক মামুন হাওলাদার বাচ্চু বলেন, আগেও শ্রমিকরা তাদের দাবি আদায়ে কর্মবিরতি পালন করলে সরকার ও মালিক পক্ষ দাবি মেনে নেওয়ার আশ্বাস দিয়েও তা বাস্তবায়ন করেননি। নৌযান শ্রমিকরা বাধ্য হয়ে ফের লাগাতার কর্মবিরতি শুরু করেছেন।

আশুগঞ্জ (ব্রাহ্মণবাড়িয়া) প্রতিনিধি জানান, আশুগঞ্জে পণ্যবাহী নৌযান শ্রমিকদের অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতি মঙ্গলবার সকাল থেকে শুরু হয়। এতে নৌবন্দরে তেলসহ বিভিন্ন পণ্যবাহী অন্তত ৫০টি নৌযান আটকা পড়েছে। এসব জাহাজ থেকে পণ্য লোডিং-আনলোডিং বন্ধ রয়েছে।

নৌযান শ্রমিক ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় সমন্বয়ক একেএম হাবিবুল্লাহ বাহার বলেন, নিয়োগপত্র, পরিচয়পত্র ও ভারতগামী শ্রমিকদের ল্যান্ডিং পাস না থাকায় নৌযান শ্রমিকরা নানাভাবে হয়রানির শিকার হচ্ছেন। বেতনসহ বিভিন্ন ভাতা কম হওয়ায় শ্রমিকরা পরিবার-পরিজনের ব্যয় পরিচালনা করতে পারছেন না। তাই শ্রমিকরা কর্মরিতিতে যেতে বাধ্য হচ্ছেন। দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত কর্মবিরতি চলবে।