দুর্গাপূজা শুরু বৃহস্পতিবার, সন্ধ্যা আরতির পর বন্ধ মণ্ডপ

প্রকাশ: ২১ অক্টোবর ২০২০   

সমকাল প্রতিবেদক

বুধবার রাজধানীর খামারবাড়ি সনাতন সমাজ কল্যাণ সংঘ পূজা মণ্ডপ থেকে তোলা। ছবি: ফোকাস বাংলা

বুধবার রাজধানীর খামারবাড়ি সনাতন সমাজ কল্যাণ সংঘ পূজা মণ্ডপ থেকে তোলা। ছবি: ফোকাস বাংলা

আগামীকাল বৃহস্পতিবার শুরু হচ্ছে দুর্গাপূজা। ষষ্ঠীপূজার মধ্য দিয়ে সূচনা ঘটছে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় এ উৎসবের। পাঁচদিনের এ উৎসব শেষ হবে ২৬ অক্টোবর সোমবার বিজয়া দশমীতে প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে।

বৈশ্বিক মহামারি করোনাভাইরাসের কারণে এবার পরিবর্তিত পরিস্থিতির কারণে সন্ধ্যাআরতির পর সব মন্দির ও মণ্ডপ বন্ধ রাখা হবে বলে বুধবার পূজা উদযাপন পরিষদ ও মহানগর সার্বজনীন পূজা কমিটির যৌথ সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়েছে। 

এবার মহাষ্টমীতে কুমারী পূজা ও বিজয়া দশমীতে বিজয়ার শোভাযাত্রাও হচ্ছে না। মণ্ডপে মণ্ডপে সাজসজ্জা ও আলোকসজ্জায় নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। অঞ্জলি, প্রসাদ বিতরণ ও ভোগআরতি আয়োজিত হবে সীমিত পরিসরে। 

করোনার কারণে দুর্গাপূজায় উৎসব সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো পরিহার করে স্বাস্থ্যবিধি মেনে সাত্ত্বিক পূজায় সীমাবদ্ধ রাখা হবে। তাই এবারের দুর্গোৎসবকে কেবল দুর্গাপূজা হিসেবে অভিহিত করা হচ্ছে।

এদিকে বুধবার সারাদেশের পূজামণ্ডপগুলোতে দুর্গা দেবীর বোধন অনুষ্ঠিত হয়েছে। শারদীয় দুর্গোৎসবের প্রাক্কালে এই বোধনের মাধ্যমে দক্ষিণায়নের নিদ্রিত দেবী দুর্গার নিদ্রা ভাঙার জন্য বন্দনা পূজা করা হয়। মণ্ডপে-মন্দিরে পঞ্চমীতে সায়ংকালে তথা সন্ধ্যায় এই বন্দনা পূজা অনুষ্ঠিত হয়।

পূরাণ মতে, রাজা সুরথ প্রথম দেবী দুর্গার আরাধনা শুরু করেন। বসন্তে তিনি পূজার আয়োজন করায় দেবীর এ পূজাকে বাসন্তী পূজা বলা হয়। কিন্তু রাবণের হাত থেকে সীতাকে উদ্ধার করতে লংকা যাত্রার আগে শ্রী রামচন্দ্র দেবীর পূজার আয়োজন করেছিলেন শরৎকালের অমাবস্যা তিথিতে, যা শারদীয় দুর্গোৎসব নামে পরিচিত। দেবীর শরৎকালের পূজাকে এজন্যই হিন্দুমতে অকাল বোধনও বলা হয়।

তবে এ বছরের দুর্গোৎসব শুরুর মাসটি (আশ্বিন) 'মল মাস' তথা 'অশুভ মাস' হিসেবে বিবেচিত হওয়ায় হেমন্ত ঋতুর কার্তিক মাসে এই পূজার আয়োজন হচ্ছে। মল মাসে পূজা-অর্চনা কিংবা ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠানের আয়োজন হয় না। একই কারণে প্রতি বছর মহালয়া তথা দেবীপক্ষ শুরুর সাতদিন পর পাঁচদিনের দুর্গোৎসবের আনুষ্ঠানিক সূচনা ঘটলেও এবার ব্যতিক্রম ঘটছে। গত ১৭ সেপ্টেম্বর মহালয়া আয়োজিত হলেও এবারে দুর্গাপূজা শুরু হচ্ছে দেবীপক্ষের সূচনার ৩৫ দিন পার করে।

সনাতন বিশ্বাস ও পঞ্জিকা মতে, জগতের মঙ্গল কামনায় দেবী দুর্গা এবার দোলায় (পালকি) চড়ে স্বর্গালোক থেকে মর্ত্যলোকে (পৃথিবী) আসবেন (আগমন)। যার ফল হচ্ছে মড়ক। প্রাকৃতিক দুর্যোগ, রোগ ও মহামারির প্রাদুর্ভাব বেড়ে যাবে। দেবী স্বর্গালোকে বিদায় (গমন) নেবেন গজে (হাতি) চড়ে। যার ফল হিসেবে বসুন্ধরা শস্যপূর্ণা হয়ে উঠবে।

এবার সারাদেশে ৩০ হাজার ২৩১টি পূজামণ্ডপে দুর্গোৎসব অনুষ্ঠিত হচ্ছে বলে বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ জানিয়েছে। যা গতবারের তুলনায় ১ হাজার ১৬০টি কম। আর ঢাকা মহানগরীর এবারের পূজামণ্ডপের সংখ্যা ২৩১টি, যা গত বছরের তুলনায় ৬টি কম। করোনার কারণে পূজামণ্ডপের সংখ্যা কমেছে।

শারদীয় দুর্গাপূজার প্রথম দিনে আগামীকাল ষষ্ঠীতে দশভূজা দেবী দুর্গার আমন্ত্রণ ও অধিবাস। ষষ্ঠীতিথিতে সকাল ৯টা ২৯ মিনিটের মধ্যে দেবীর ষষ্ঠ্যাদি কল্পারম্ভ ও ষষ্ঠীবিহিত পূজা। সায়ংকালে দেবীর আমন্ত্রণ ও অধিবাসের মধ্য দিয়ে শুরু হবে মূল দুর্গোৎসব। আগামী শুক্রবার মহাসপ্তমী, শনিবার মহাষ্টমী, রোববার মহানবমী এবং সোমবার বিজয়া দশমী। শেষ দিনে প্রতিমা বিসর্জন অনুষ্ঠিত হবে। 

দুর্গোৎসব উপলক্ষে পৃথক বাণীতে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং বিরোধী দলীয় নেতা রওশন এরশাদ হিন্দু ধর্মাবলম্বীসহ দেশবাসীকে শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানিয়েছেন। পৃথক বিবৃতিতে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সভাপতিত্রয় ড. নিমচন্দ্র ভৌমিক, ঊষাতন তালুকদার ও নির্মল রোজারিও, সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট রাণা দাশগুপ্ত, বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি মিলন কান্তি দত্ত, সাধারণ সম্পাদক নির্মল কুমার চ্যাটার্জী, মহানগর সার্বজনীন পূজা কমিটির সভাপতি শৈলেন্দ্র নাথ মজুমদার, সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট কিশোর রঞ্জন মণ্ডল, ছাত্র যুব ঐক্য পরিষদের সভাপতিত্রয় পংকজ সাহা, রাহুল বড়ুয়া ও রবার্ট নিপন ঘোষ এবং সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার তাপস বল দুর্গোৎসবের শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। 

রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশের প্রতিটি পূজামণ্ডপের নিরাপত্তা রক্ষায় পুলিশ, আনসার, র‌্যাব ও বিডিআর সদস্যরা দায়িত্ব পালন করবেন। পুলিশ ও র‌্যাবের পাশাপাশি প্রায় প্রতিটি মণ্ডপে স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী দায়িত্ব পালন করবে। ঢাকেশ্বরী মন্দির মেলাঙ্গনে মহানগর সার্বজনীন পূজা কমিটির উদ্যোগে কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ কক্ষ খোলা হয়েছে।

রাজধানীতে কেন্দ্রীয় পূজা উৎসব বলে পরিচিত ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দির পূজামণ্ডপে বৃহস্পতিবার পাঁচদিনের দুর্গাপূজার সূচনা ঘটবে। পূজার পাশাপাশি সীমিত পরিসরে ভক্তিমূলক সঙ্গীতানুষ্ঠান ও দুঃস্থদের মধ্যে বস্ত্র বিতরণসহ বিভিন্ন অনুষ্ঠানমালা আয়োজিত হবে। রামকৃষ্ণ মিশন ও মঠ পূজামণ্ডপে কুমারী পূজা না হলেও পূজার অন্যান্য অনুষঙ্গ থাকছে। 

এছাড়া রমনা কালীমন্দির ও আনন্দময়ী আশ্রম, সিদ্ধেশ্বরী কালিবাড়ী, গুলশান-বনানী সার্বজনীন পূজামণ্ডপ, রাজারবাগের বরোদেশ্বরী কালীমাতা মন্দির ও শ্মশান পূজামণ্ডপ, মিরপুর কেন্দ্রীয় মন্দির, জয়কালী রোডের রামসীতা মন্দির, পুরনো ঢাকার অভয়নগর দাস লেনের ভোলানন্দগিরি আশ্রম, রাধিকা বসাক লেন, নবেন্দ্র বসাক লেন, ঢাকেশ্বরীবাড়ী, শাঁখারীবাজারের পান্নিটোলা, টিকাটুলীর প্রণব মঠ, ঠাঁটারীবাজার পঞ্চানন শিব মন্দির, সূত্রাপুরের ঋষিপাড়া গৌতম মন্দির, বনগ্রাম তরুণ সংসদ, ওয়ারী সার্বজনীন পূজা কমিটির মণ্ডপ, উত্তর মুশুন্দী, ফরাশগঞ্জ জমিদার বাড়ী, বিহারীলাল জিও মন্দির এবং মতিঝিলের অরুণিমা সংসদ পূজা কমিটির মণ্ডপসহ বিভিন্ন মন্দির ও মণ্ডপে দুর্গাপূজার প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।

বিষয় : দুর্গাপূজা